চার্বাক নাট্যগোষ্ঠীকে অভিনন্দন যে তারা বর্তমানে চলমান রীতির বাইরে গিয়ে শরৎচন্দ্রের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস 'শেষ প্রশ্ন'-র নাট্যায়ন মঞ্চস্থ করার দুঃসাহস দেখিয়েছেন। শরৎচন্দ্র তাঁর সাহিত্যকীর্তির মাধ্যমে এ দেশে পার্থিব মানবতাবাদের সর্বোন্নত মতাদর্শকেই তুলে ধরেছেন। সেই প্রয়াসের অন্তিম পর্বে সেই মতাদর্শ অনুযায়ী এক এক করে শ্রেষ্ঠ আদর্শগুণের সমন্বয় ঘটিয়ে অতি যত্নে 'শেষ প্রশ্ন' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে 'কমল'-কে গড়ে তুলে সেই চিন্তারই একটি পরিণত রূপ দিতে চেয়েছেন। আবার এই রূপসী, বিদূষী, সংস্কারমুক্ত কমল যখন রাজেন চরিত্রের মুখোমুখি হল তখন তাঁর বিশ্বাস ও আদর্শকে ছাপিয়ে তাকে আরও একটি বৃহত্তর প্রশ্নের সম্মুখীন হল। দেখানো হয়েছে রাজেন অপর একটি চরিত্র আশ্রমবাসী হরেনের বন্ধু। দু-'জনেই দেশের কাজ করে কিন্তু তাদের মতাদর্শ ভিন্ন। কাজের ধারাতেও অনেক পার্থক্য। রাজেন একটা সময় যখন জানায়, হরেনের আশ্রম ছেড়ে তাকে চলে যেতে হবে, কমল প্রতিবাদ করে বলে, "মন যেখানে মিলবে থাক না সেখানে মতের অমিল। হোক না কাজের ধারা ভিন্ন, কী যায় আসে তাতে। সবাই একই রকম ভাববে, একই রকম কাজ করবে, তবেই এক সঙ্গে বাস করা চলবে, এ কেন? আর পরের মতকে যদি শ্রদ্ধাই করতে না পারা যায় তো সে কিসের শিক্ষা? মত এবং কর্ম, দুই-ই বাইরের জিনিস রাজেন, মনটা সত্য।” এইভাবে কমলের মুখ দিয়ে সর্বোচ্চ বুর্জোয়া মানবতাবাদী চিন্তাধারারই প্রতিফলন ঘটেছে। কিন্তু এই চিন্তার সীমাবদ্ধতাও একই সাথে শরৎচন্দ্রের মনে প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাই রাজেনের মুখ দিয়ে তিনি বললেন, "মনের মিলটাকে আমি তুচ্ছ করিনে। কিন্তু ওকেই অদ্বিতীয় বলে উচ্চৈস্বরে ঘোষণা করাও হয়েছে আজকালকার একটা উচ্চাঙ্গের পদ্ধতি। এতে ঔদার্য ও মহত্ব দুই-ই প্রকাশ পায়। কিন্তু সত্য প্রকাশ পায় না।” রাজেন কমলকে বলছে, "আপনি বিভিন্ন মতবাদকে শ্রদ্ধা করতে পারাটাকে মস্ত বড় শিক্ষা বলছিলেন। কিন্তু সর্বপ্রকার মতকেই শ্রদ্ধা করতে পারে কে জানেন, যার নিজের কোনও মতের বালাই নেই। শিক্ষার দ্বারা বিরুদ্ধ মতকে নিঃশব্দে উপেক্ষা করা যায় কিন্তু শ্রদ্ধা করা যায় না। কর্মের জগতে মানুষের ব্যবহারের মিলটাই বড়, হৃদয় নয়। কই দু-জনের মনের মিল দিয়ে তো সঙ্গীত সৃষ্টি হয় না। বাইরে তাদের সুরের মিল না যদি থাকে সে শুধু কোলাহল। রাজার যে সৈন্যদল যুদ্ধ করে তাদের বাইরের শক্তিটাই রাজার শক্তি। হৃদয় নিয়ে তার গরজ নেই।" কমল রাজেনের বক্তব্যের যৌক্তিকতার প্রতিবাদ করতে পারে না। বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে যায়। এটাই শেষ প্রশ্ন। অর্থাৎ মতের মিল না হলে কি মনের মিল হওয়া সম্ভব? বিশ্ব উপন্যাসের ইতিহাসে শরৎচন্দ্রই সর্বপ্রথম এই প্রশ্ন উত্থাপন করেন। নরনারীর ভালোবাসার ক্ষেত্রে, বন্ধুত্বের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মনের ঐক্যের পাশাপাশি মতের ঐক্যের প্রশ্নটিকেও তুলে ধরলেন। কিন্তু শরৎচন্দ্র প্রশ্নটিকে ঠিকভাবে তুললেও মত ও মনের সম্পর্কের অনুধাবনের ক্ষেত্রে তাঁর সীমাবদ্ধতা ছিল। এটা বুর্জোয়া মানবতাবাদেরই সীমাবদ্ধতা। একমাত্র যুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক সাম্যবাদী দর্শনই মত এবং মনের পারস্পরিক যথার্থ সম্পর্কটি নিরূপণ করতে পেরেছে, বলতে পেরেছে, মন এবং মতের সম্পর্কটি অবিচ্ছেদ্য এবং দ্বান্দ্বিক। মানুষের সচেতনতার স্তরের উপর ভিত্তি করেই তার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তার বিভিন্ন মতামত গড়ে ওঠে, সৌন্দর্য, রুচিবোধ, ভালো মন্দের ধারণা, অনুভূতি, আবেগ সবকিছুই গড়ে ওঠে। এই জন্যই মতাদর্শগত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সচেতনতা যত বৃদ্ধি পায়, চিন্তা ততই পরিশীলিত হয়। মনের রুচিবোধ ও অন্যান্য ভাবনা অনুভূতিও পরিবর্তিত হয়। পরিবর্তনের পথে মনের বিকাশ ঘটে, মন উন্নত হয়। উন্নত মনই উন্নত মতের হদিস পায়। তার অনুসারী হওয়ার সাধনায় ব্রতী হয়। আর মতের ঐক্যের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিস্থাপিত মনের মিল হয় আরও সুগভীর, সুপ্রোথিত, সুন্দর। তাই বাস্তবে মতের মিল ছাড়া মনের মিল সম্ভব নয়। মতের মিলের মধ্য দিয়েই মনের সচ্ছন্দ সুন্দর সৃজনশীল ঐক্য গড়ে ওঠে। 'শেষ প্রশ্ন' উপন্যাসের এই মৌলিক বিষয়টি 'চার্বাক' নাট্যগোষ্ঠী উপলব্ধি করেছেন কিনা তা নাটক দেখে বোঝা গেল না। ফলে উপন্যাসে বর্ণিত ঘটনা বা সংলাপগুলি এক ভাবে কিছুটা এলেও তার উপস্থাপনায় শরৎচিন্তার মূল দিকটি এল না। নাটকটিতে কমল কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে আসেইনি। এখানে কমল যেন একটি পার্শ্ব চরিত্র। মূল হিসেবে এসেছে আশুবাবু এবং তাঁর প্রতি নীলিমার ভালোবাসা। নাটকের শেষটাও সেই দৃশ্যে, পিছনে তাজমহলের কাট আউটে প্রেমের ইঙ্গিত। একটা উপন্যাসের নাট্যরূপ দিতে গিয়ে নাট্যকারের স্বাধীনতার প্রশ্নটি মাথায় রেখেও বলতে হয় আশুবাবু চরিত্রটিকে শরৎচন্দ্র এনেছেন কেন, এটা বোঝার সাথে 'শেষ প্রশ্নের' স্পিরিটটি জড়িত। কমলের মতো উন্নত, বলিষ্ঠ ও যুক্তিবাদী চরিত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে অন্যান্য মতের ও পথের অনুসারী কিছু চরিত্রকে বিশ্বাসগ্রাহ্য করে তুলে ধরা ছিল শরৎচন্দ্রের লক্ষ্য। শরৎচন্দ্র জানতেন যে, তাঁর এই আকাঙ্ক্ষিত নারী চরিত্র তৎকালীন কুসংস্কারগ্রস্ত বাংলার গ্রামীণ সমাজের প্রেক্ষাপটে আনলে তা একেবারেই বেমানান হবে। তাই তিনি বেছে নিয়েছিলেন বাংলা থেকে বহু দূরে আগ্রা শহরে প্রবাসী বাঙালীদের সমাজ জীবন এবং সেখানে উপস্থিত করেছেন আশুবাবু, অজিত, হরেন, শিবনাথ, অক্ষয়, অবিনাশের চরিত্র। সাথে সাথে নীলিমা, মনোরমা, বেলার চরিত্র এসেছে বিভিন্ন মাত্রার অবয়ব নিয়ে। শরৎচন্দ্র জানতেন যে, আগ্রার ওই প্রবাসী শিক্ষিত অধ্যাপক এবং অন্যান্য পেশার মানুষদের মহলেও কমলের সহজ প্রবেশাধিকার সম্ভব নয়। তাই আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য কমলকে ক্রমাগত সংগ্রাম করতে হয়েছে। তীক্ষ্ণ যুক্তিতে অন্যের মতকে খণ্ডন করতে হয়েছে। আবার পাছে কমলের মতো চরিত্রের স্বীকৃতি উপন্যাস সাহিত্যের নিয়ম ভেঙে ঔপন্যাসিকের ইচ্ছামতো জোর করে আদায় না হয়ে যায়, সেই জন্য তিনি আশুবাবুর মতো একজন যুক্তিবাদী, উদার মনের সুন্দর চরিত্র এনেছেন। পাশ্চাত্যে থাকার কারণে তিনিও আধুনিক ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু ঐতিহ্যবাদের প্রতিও বিশ্বাস হারাননি। অধ্যাত্মবাদের সঙ্গে আপসকামী মানবতাবাদের সুরে বাঁধা মন নিয়ে আশুবাবু কমলের অধ্যাত্মবাদ বিরোধী সেকুলার মতাদর্শ এবং জীবনবোধকে স্বীকার করতে পারেননি। কিন্তু গ্রহণ করতে না পারলেও কমলের আদর্শের গুরুত্ব বা জোরালো যুক্তি তিনি অস্বীকারও করতে পারেননি। কমল দেখেছে আশুবাবু শুধু বিরুদ্ধ মতকে সহ্যই করতে পারেন তা নয়, বিরুদ্ধবাদীকে বোঝার চেষ্টা করেন। যুক্তির আবেদন তাঁর মনে সাড়া জাগায়। তাই কমল ইচ্ছে করেই সুযোগ পেলে আশুবাবুর বিশ্বাসকে আঘাত করেছে। এই ডাইনামিক্স কিন্তু চার্বাকের নাট্য-দৃষ্টিতে অনুপস্থিত। নাটকে আশুবাবুর উদার ও সহনশীল মন কিছুটা এসেছে কিন্তু সেটাই হয়ে গেছে প্রধান। নাট্যকার-পরিচালকের নিজের অভিনীত এই চরিত্রটি মাধুর্যে বিধৃত হলেও যে কারণে এমন একটা চরিত্রের অবতারণা সেটা প্রস্ফুটিত হয়নি। সেকুলার মানবতাবাদী চিন্তায় নর-নারীর সম্পর্কও একটা নতুন মাত্রা পায়। পুরনো একনিষ্ঠ প্রেম ও সতীত্বের ধারণার পরিবর্তে সমাজে গতিশীল প্রেম বা 'ডায়নামাসিটি অফ লাভ'কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আমি কোনও এক সময় কাউকে ভালবেসেছিলাম, কিন্তু কালের গতিপথে সেই ভালবাসা আরো সুগভীর সুদৃঢ় ভিত্তি পাওয়ার পরিবর্তে শুকিয়ে গেল, ভালবাসার পাত্রপাত্রীদের মন ভিন্নখাতে প্রবাহিত হল। তা হলে সেই মরে যাওয়া ভালোবাসাকে আঁকড়ে থেকে কী লাভ। সে তো জীবনকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাওয়ার বদলে তাকে আরো পিছপা করবে, রুদ্ধ করবে। এই সম্পর্ককে ছেঁড়া জুতোর মতো টেনে বেড়াবার মধ্যে তো যৌক্তিকতা নেই। 'চার্বাক' নাট্যগোষ্ঠী শেষ প্রশ্নের মূল চরিত্র বা থিম হিসেবে দেখাতে চেয়েছে সেটা হল নীলিমা ও আশুবাবুর সম্পর্ক। কিন্তু উপন্যাসে সেটা একটা প্রেক্ষাপট সৃষ্টির মধ্য দিয়ে, প্রেম-রহস্যের একটা বিশেষ দিক তুলে ধরার প্রয়োজনেই আনা হয়েছে। উপন্যাসে আছে, কমল বলছে, একদিন স্ত্রীকে আশুবাবু ভালবেসেছিলে। কিন্তু তিনি আর বেঁচে নেই। তার কাছে পাওয়ারও কিছু নেই। ভালবাসার পাত্র গেছে নিশ্চিহ্ন হয়ে মুছে। তাকেই মনের মধ্যে অহরহ পালন করে বর্তমানের চেয়ে অতীতটাকে ধ্রুবজ্ঞানে জীবন যাপন করার মধ্যে যে কী বড় আদর্শ আছে কমল তা ভেবেই পায়নি। এই কথায় আশুবাবু আঘাত পেয়ে বললেন, "কিন্তু আমাদের দেশের বিধবাদের হাতে তো শুধু এই জিনিসটাই থাকে চরম সম্বল। স্বামী যায় কিন্তু তার স্মৃতি নিয়েই তো বিধবার জীবনের পবিত্রতা অব্যাহত থাকে। একি তুমি মান না?” কমল উত্তর দিল, "না, একটা বড় নাম দিলেই তো কোনও জিনিস সংসারে সত্যিই বড় হয়ে যায় না। বরঞ্চ বলুন এই ভাবে এদেশে বৈধব্য জীবন কাটানোই বিধি। বলুন একটা মিথ্যেকে সত্যের গৌরব দিয়ে লোকে তাদের ঠকিয়ে আসছে। আমি অস্বীকার করব না।" প্রযোজিত নাটকে এই সংলাপ নেই। অন্যদিকে নীলিমা বিধবা জামাইবাবু অবিনাশের সংসারে থাকে, গৃহিনীর মতো তার কন্যা এবং ঘরবাড়ি সামলায়। অবিনাশ মহামারীতে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে পাঞ্জাবে তার আত্মীয়-স্বজনের কাছে মেয়েকে নিয়ে চলে গেল কিন্তু লোকলজ্জার ভয়ে শ্যালিকাকে নিয়ে গেল না। রুগ্ন আশুবাবুর বাড়িতে রেখে গেল তাঁর দেখাশোনা করার জন্য। নীলিমা ভদ্র, পরিচ্ছন্ন মনের অধিকারী, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও সেবাপরায়ণ। এই সেবা করার মধ্য দিয়েই আশুবাবুর প্রতি তার ভালবাসা জন্মাল, সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এবং অভাবনীয় ভাবে। উপন্যাসে আছে আশুবাবু বিদেশে চলে যাওয়ার জন্য যখন কর্মচারীকে লেখা চিঠি পড়ে শোনাচ্ছিলেন, নীলিমা সেলাই করছিল। হঠাৎ আশুবাবু দেখেন সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। জ্ঞান ফিরতে আশুবাবুর কোলের ওপর মুখ রেখে হুহু করে কেঁদে উঠল। তারপর হঠাৎ তীরের মতো বেরিয়ে গেল। আর আশুবাবুর সঙ্গে দেখা করল না। অথচ নাটকে দেখা গেল সে আশুবাবুর পায়ের তলায় পড়ে কাঁদছে। সেখানেই নাটকের ইতি। অথচ এই আকস্মিক ঘটনার যে বর্ণনা আশুবাবু কমলকে দিয়েছিলেন যার মধ্য থেকে আশুবাবু ও নীলিমার চরিত্রের একটা বড় দিক ধরা পড়ে। সেটা নাটকে নেই। আশুবাবুর কথা, "আর কেউ হলে সন্দেহ করতাম; এ শুধু ছলনা, শুধু স্বার্থ কিন্তু এর সম্বন্ধে এমন কথা ভাবাও অপরাধ। এ কী আশ্চর্য মেয়েদের মন। এই রোগাতুর জীর্ণ দেহ, এই অক্ষম অবসন্ন চিত্ত, এই জীবনের অপরাহ্ণের বেলায়, জীবনের দাম যার কানাকড়ি নয়, তার প্রতি যে সুন্দরী যুবতী-মন আকৃষ্ট হতে পারে এত বড় বিস্ময় জগতে কী আছে? অথচ এ সত্য, এতটুকু মিথ্যে নয়। স্ত্রীর ভালবাসা আমি পেয়েছিলাম। তার স্বাদ চিনি, স্বরূপ জানি। কিন্তু নারীর ভালবাসার সে কেবল একটিমাত্র দিক। হাত পেতে নিতে পারলাম না বটে কিন্তু কি বলে যে একে আজ নমস্কার জানাবো, আমি ভেবে পাইনে মা।" -এই অপূর্ব বাক্য বিন্যাসে বাঁধা সংলাপটি নাটকে নেই। আর এটা না থাকলে নীলিমাকেও বোঝা যাবে না। এই ডায়নামাসিটি পাশ্চাত্যের ঘুণে ধরা সমাজের দেহজ সুখ অনুভূতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ক্রমাগত জীবনসঙ্গী পরিবর্তন নয়। এর মধ্যে মনুষ্যত্ব বিবেক, পরস্পরের গুণাবলীর স্বীকৃতি, চরিত্রের বিকাশ এই সব কিছুরই সমাহার আছে। কমল কোনও স্বৈরিনী নয়। শিবনাথকে কমল শৈবমতে বিয়ে করেছিল। কিন্তু ক্রমেই শিবনাথ কমলের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে এবং কমলের অগোচরে, কমলকে মিথ্যা কথা বলে আশুবাবুর কন্যা মনোরোমার প্রতি আসক্ত হয়েছে। যে আসক্তির কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই। কমলকে ছেড়ে মনোরমার প্রতি আসক্তি কোনও উন্নত রুচিবোধ, মহত্বের মধ্য দিয়ে আসেনি। কমল, যার জীবন সাধারণের মতো ছকে বাঁধা নয়, যার জীবনে গতিশীলতার বলিষ্ঠতা আছে, সেও নিঃশব্দে মর্যাদা নিয়ে শিবনাথের থেকে দূরে সরে গেল। কারণ সে বুঝল তাকে ছলনার আশ্রয় নিয়ে শিবনাথ অগ্রাহ্য করেছে, মনের বাঁধন, বৈবাহিক সম্পর্কের সে অকারণেই অগ্রাহ্য করছে। আবার মনোরামার বাগদত্তা শিক্ষিত রুচিসম্পন্ন অজিত যখন বিদেশ থেকে ফিরে মনোরমার মন পরিবর্তনের খোঁজ পেল, স্বভাবতই তার মনেও এই পূর্বস্থিরীকৃত বিবাহ বন্ধনের প্রতি কোনও আগ্রহ রইল না। অন্যদিকে শিবনাথের সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক বিচ্ছেদের প্রেক্ষিতে অজিতের গুণাবলীর প্রতি কমলের আকর্ষণ জন্মাল এবং অজিত কমলের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও ব্যক্তিত্বের দ্বারা প্রভাবিত হল। তাজমহলের প্রাঙ্গণে প্রথম দর্শনে কমলের রূপ এবং বুদ্ধিদীপ্ত বক্তব্য অজিতকে বিস্ময়ে ক্ষণিকের জন্য হলেও আত্মবিস্মিত করে দেয়। তা কমলের নজর এড়ায়নি এবং উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক চারিত্রিক গুণের কদর ও স্বীকৃতির ভিত্তিতে প্রেমের জন্ম নিল কিন্তু নাটকে হঠাৎ দেখা গেল কমল অজিতকে বাহুলগ্ন করল। যেটা উপন্যাসের স্পিরিট এবং চরিত্রবিন্যাসের সঙ্গে একেবারেই বেমানান। অজিত বা শিবনাথের ভূমিকায় যারা অভিনয় করেছেন তাঁরা একভাবে উতরে দেবার চেষ্টা করলেও কমলের ভূমিকায় অভিনেত্রী নির্বাচন একেবারেই ঠিক হয়নি। কমলের প্রখর ব্যক্তিত্ব, কথা বলার জোর, আবার চারিত্রিক সৌন্দর্য কোমলতা কোনটাই দেখা গেল না। অভিনেত্রীকে কিছুটা স্টাইলাইজড্ করে, মুখে একটা হাস্যভাব বজায় রেখে চরিত্রায়নের নির্দেশ স্পষ্ট। যিনি অভিনয় করেছেন তার অপটুতা, চলার ভঙ্গি কমলের চরিত্র, দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে- একেবারেই উপন্যাস বর্ণিত চরিত্রের ধারে কাছে আসেনি। হয়তো বা নাট্যকার-পরিচালক কমলের চরিত্রের গুরুত্ব বা কমলই যে উপন্যাসের Pivot, সেটা ধরতে না পারায় কমল আর পাঁচ জন পার্শ্ব অভিনেতার বাইরে যেতে পারিনি। বরং নীলিমার চরিত্রটা অনেক বেশি দৃঢ়তায় এসেছে। চরিত্রাভিনেত্রীর ক্ষমতাও অন্যদের তুলনায় অনেক ভালো। আবার নাট্যকার-পরিচালক যেহেতু তাকেই প্রধান নারী চরিত্র হিসেবে ভেবেছেন তাই তার মঞ্চ উপস্থিতি অনেক বেশি সাবলীল এবং প্রোনাউন্সড্। এমনকি মনোরমা এবং আশুবাবুর বাড়ির পরিচারিকা ও ক্ষুদ্র পরিসরে বেলার ভূমিকায় যাঁরা অভিনয় করেছেন তাঁদের কমলের চরিত্রাভিনেত্রীর থেকে অনেক বেশি পারদর্শী মনে হয়েছে। এমনকি স্বল্প ক্ষণে অবিনাশের কন্যার ভূমিকায় যাকে দেখা গেল তাঁকেও খারাপ লাগেনি। সবচেয়ে যেটার অভাব তা হল কমলের মতো সবচেয়ে যেটার অভাব তা হল কমলের মতো রাজেন চরিত্রটির উপলব্ধি। কমলের মতো চরিত্র রাজেনের কাছে পরাস্ত। কাজেই ব্যক্তিত্বের নিরিখে রাজেন আরো বড়। কিন্তু যেহেতু রাজনের মতো আকাঙ্ক্ষিত পুরুষ চরিত্র, যে ঠিক বুর্জোয়া মানবতাবাদী চিন্তার ক্যাটিগরিতে পড়ে না, সেই জন্য এ রকম চরিত্রের উপস্থাপনাটি কী হবে, সেটা শরৎচন্দ্র পরিষ্কারভাবে ধরতে পারেননি। শুধু বুঝেছিলেন যে, সমাজসেবা, সমাজ সংস্কারের আন্দোলনের মধ্য থেকেই এ রকম চরিত্র উঠে আসবে। কিন্তু সেটা যে বুর্জোয়া মানবতাবাদের আওতা ছেড়ে আরও উন্নত সর্বহারা শ্রেণি চিন্তা, সর্বহারা বিপ্লবী আন্দোলনের পটভূমির উপর রচিত হবে, এটা তাঁর অগোচরে থেকে গেছে। ফলে তাঁর চরিত্রটির উপস্থাপনা একটা রহস্যময়তায় ঘেরা। এমনকি যে শরৎচন্দ্র চরিত্র চিত্রণে এত নিপুণ এবং নিখুঁত, তিনিও রাজেনের চরিত্রের বিকাশ ঘটানোর ক্ষেত্রে অপারগতার দরুণ এক দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে কিছুটা আকস্মিকতায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে বললেন। কিন্তু নাটকে যে রাজেন এল, তার মধ্যে সেই ব্যক্তিত্ব দূরে থাক, একেবারে সাধারণ মানের একজন মানুষের দেখা মিলল যে অন্যের কথায় সমাজসেবী বলে হল। অভিনেতার অভিনয়ও অত্যন্ত দুর্বল এবং তাকে মঞ্চে উপস্থাপনাও চূড়ান্ত ত্রুটিপূর্ণ। শরীরের অতিরিক্ত নাড়াচাড়া, ছটফটে ভাব রাজেনের চরিত্রে একেবারেই বেমানান। সবচেয়ে যেটা সমালোচনার তা হল নাটকের শেষের দিকে অগ্নিদগ্ধ রাজেনের আগমণ এবং মৃত্যু যা নাটকের প্রতিপাদ্য বা সারবত্তার সঙ্গে একেবারেই খাপ খায় না। অনেকটা ফরমায়েসি দৃশ্যাঙ্কন। আর সর্বোপরি রাজেন ও কমলের মধ্যে মন ও মত নিয়ে সংলাপ অনেকটা সংক্ষিপ্ত হয়েছে এবং দর্শকদের মনে দাগ কাটার মতো করে পরিবেশিত হয়নি। এই প্রসঙ্গে বলতে হয় নীলিমার মুখ দিয়ে বেলার উপস্থিতিতে যে স্মরণীয় সংলাপ, "স্বাধীনতা তত্ত্ববিচারে মেলে না। ন্যায় ধর্মের দোহাই পেড়ে মেলে না। সবাই দাঁড়িয়ে দল বেঁধে পুরুষের সাথে কোঁদল করে মেলে না। এ কেউ কাউকে দিতে পারে না। দেনা পাওনার বস্তুই এ নয়। কমলকে দেখলেই দেখা যায়, এ নিজের পূর্ণতায় আত্মার আপন বিস্তারে আপনি আসে। বাইরে থেকে ডিমের খোলা ঠুকরে ভেতরের জীবকে মুক্তি দিলে সে মুক্তি পায় না, মরে।" এটা নাটকে প্রায় অনুচ্চারিতের মতো সংক্ষিপ্তভাবে এসেছে। অথচ তত্ত্বের দিক দিয়ে বা ভিন্ন জীবনবোধের প্রতীক কমলকে যে নীলিমা ঠিকই চিনেছিল তার প্রমাণ স্বরূপ এই সংলাপের গুরুত্ব অপরিসীম। সেটা নাট্যকার-পরিচালকের নজর এড়িয়ে গেছে। ঠিক একইভাবে উপন্যাসের শেষ দিকে যখন অজিত আর কমল স্বামী স্ত্রী হিসেবে সংসার করতে যাচ্ছে সে সময়ও অজিত যখন তার সমস্ত বিষয়-সম্পত্তি কমলের নামে লিখে দিয়ে নিজেকে উজাড় করে দিতে চেয়েছে তখনও কমল তাতে রাজি হয়নি। ভালবাসার ক্ষেত্রে তার প্রচারিত আদর্শের দিক থেকে কোথাও আপস করেনি। অথচ এটাও নাটকে অনুপস্থিত। এই বিশ্ব শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের নির্যাসটা কী? চার্বাক নাট্যগোষ্ঠী নাটক শুরুর মুহূর্তে ঘোষকের মারফত জানাল যে, শরৎচন্দ্রের এই উপন্যাস নিয়ে নাট্য জগতে বিশেষ কোনো কাজ হয়নি। তারাই দুঃসাহসিকতার পরিচয় দেবার চেষ্টা করেছেন। এ কথা সত্য। আগেই বলেছি, তাদের বিষয় নির্বাচন অত্যন্ত প্রশংসার দাবি রাখে। উপন্যাসটি সংলাপমুখর। সংলাপের মধ্য দিয়েই আদর্শের, মতের প্রশ্নের উত্থাপন। এ রকম উপন্যাসের নাট্যরূপ দেওয়া নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। কিন্তু উপন্যাসের মর্মবস্তু উপলব্ধি করতে পারলে নাট্যায়নের প্রচেষ্টা অসাধ্য নয়। কিন্তু বিষয়বস্তুকে যথার্থভাবে না ধরতে পারলে তো নাটকে ঈপ্সিত বক্তব্য আসবে না। সেই অর্থে খানিকটা বিকৃতি ঘটবে। 'চার্বাক' নাট্যগোষ্ঠী যদি আমাদের এই গঠনমূলক সমালোচনা থেকে যুক্তির ভিত্তিতে সহমত হতে পারেন তবে তাদের আগামী প্রযোজনায় উন্নত রূপকল্প দেখা যাবে। আঙ্গিকগত দিক থেকে বলতে গেলে, পেছনে তাজমহলের কাটআউট, আবার সেটাকে উল্টে আশুবাবুর বৈঠকখানা দেখানো, এটা বারবার করার জন্য নাটকের সঙ্গে একাত্মতা ঘটায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। নাট্যকার সেটা না করে প্রজেকশনের মধ্য দিয়ে তাজমহল দেখাতে পারতেন। প্রয়োজনে আলোর সাহায্যে সেই প্রজেকশনকে অন অফ করা চলত। মঞ্চসজ্জা মোটামুটি সুন্দর। আলোকসম্পাতও মন্দ নয়। তবে যখন প্রসেনিয়ামের সামনে এসে চরিত্রগুলো অভিনয় করার সময় আলো তাদের মুখে যথার্থভাবে প্রতিফলিত হয়নি। কুশলতার পরিচয় দিয়ে যে মোটরগাড়ির দৃশ্যটি করা হয়েছে সেটাতে নিশ্চিত কৃতিত্ব আছে। তবে দু-একটি চরিত্র মঞ্চে প্রবেশ করে তারপর যে ভাবে ঘুরে নিজের নির্ধারিত স্পটে দাঁড়াচ্ছিলেন সেটা মাঝেমধ্যে নাটকের ব্যাকরণ বহির্ভূত মনে হয়েছে। সঙ্গীতের ব্যবহার খারাপ নয়। নজরুল গীতি ও রবীন্দ্র সঙ্গীত সুপ্রযোজ্য হয়েছে। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা দলগত অভিনয়ের ক্ষেত্রে যে মান রেখেছন, সেটা বহু অনুশীলনের মধ্য দিয়ে এসেছে সেটা বোঝা যায়। পরিশেষে আবার বলি, আমাদের এই নাট্য-পর্যালোচনা 'চার্বাক' গোষ্ঠীর প্রযোজনাকে আরও উন্নত, আরও উদ্দেশ্যবাহী, আরও নাটকীয়তার রসে সিঞ্চিত করার জন্য। আমাদের আশা, আগামী দিনেও তারা এমনই প্রাসঙ্গিক বিষয়ের উপর নাটক দেখিয়ে আমাদের আমোদিত ও শিক্ষিত করে তুলবেন। ¤ (পথিকৃৎ-এর জানুয়ারি ২০২৫ সংখ্যা থেকে নেওয়া)
পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২
দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com