সকাল ছ’টা। কিন্তু এখনই দুমুঠো ভাত মুখে পুরে দৌড়তে হবে স্টেশনের দিকে। আজ একটা ইন্টারভিউ আছে। চাকরিটা সিকিউরিটি গার্ডের। মাসে দশ হাজার দেবে। বারো ঘন্টা ডিউটি। নাইট ডিউটির পরদিন ছুটি। মা বললো, মাথা ঠাণ্ডা রাখিস। মালিকদের কথায় সায় না দিলে আজ আর কাজ জোটে না। কী আর বলি! বাবা অফিস থেকে ছাঁটাই শ্রমিক, পেনশন নেই। আমি তো খেলার জন্য পড়াশুনা কবেই ছেড়েছি, কিন্তু কিছুই করতে পারি নি। আমার চেয়ে দশ বছরের ছোট ভাইটা খুব ব্রিলিয়ান্ট। টাকার অভাবে তার পড়া বন্ধ হওয়ার মুখে। আমি এখন এদিক ওদিক খেপ খেলে, আর টিউশুনি করে কিছু টাকা পাই। তা দিয়ে কিভাবে যে চলে, সে শুধু মা-ই জানে। সাদা জামাটার কলারটা একটু ছিঁড়েছে। কিন্তু মাড় দিয়ে ইস্ত্রি করার পরে ওটা বোঝা যাচ্ছে না। সোয়েটারটা একটু পুরনো। রংটাও ফরমাল না। ভাই বলল, একটা কোট হলে ড্রেসটা আরো ভালো হতো রে দাদা। আমি বললাম, আর কোট! করবো তো লোককে সেলাম। যা আমি কোনোদিন ভাবিনি। তার জন্য আবার কোট! ভাই বলল, তুই চিন্তা করিস না দাদা, আমি একটা ভালো কাজ পেলেই তোকে এই কাজটা ছাড়াবো। তখন তুই ছেলেদের ফুটবল খেলা শেখাস, তোর মন ভালো থাকবে। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে, মাকে প্রণাম করে বেরোলাম। ছোটবেলা থেকে নিয়মিত ফুটবল খেলে আর ব্যায়াম করে চেহারাটা ভালই বানিয়েছিলাম। এখন মনে পড়লে হাসি পায়, স্বপ্ন দেখতাম মোহনবাগানে খেলবো। গোল করবো যুবভারতীতে। হাজার হাজার দর্শক হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানাবে। কিন্তু কোথায় কী? ঠাণ্ডায় হাত জমে যাচ্ছে। কুয়াশায় চারিদিকটা ঘোলা হয়ে আছে। দু’ফুট দূরের জিনিসও দেখতে পাচ্ছি না। সাইকেলে প্যাডেল মারতে না মারতেই ফোনটা বাজতে শুরু করলো। কে আবার! দেখি বুবাই, আমার হাফপ্যান্ট বয়সের বন্ধু। তারও আজ যাওয়ার কথা ইন্টারভিউতে। জিজ্ঞেস করলাম, পৌঁছে গেছিস? আমার টিকিটটা কেটে নে। --আমি যাবো না। --কেনো রে? --আয় বলছি। একটু অবাক হলাম। ওর ক্রাইসিসটা আমার চেয়েও বেশি। তাড়াতাড়ি প্যাডেল মারলাম। স্টেশনের কাছে গ্যারেজে সাইকেলেটা রেখে দ্রুত হেঁটে টিকিট কাউন্টারের কাছে পৌঁছে দেখি বাইরে বকুল গাছটার সামনে একটা জটলা। ওখানটায় তো সাধুবাবা থাকেন। বুকটা ছ্যাৎ করে উঠলো। আমায় দেখে বুবাই ভিড় ছেড়ে বেরিয়ে আসছে। দেখি ওর চোখ ছলছল। বললো সাধুবাবা আর নেই রে। আমি এরকমই কিছু একটা আন্দাজ করছিলাম। ওকে নিয়ে একটু এগিয়ে একটা বেঞ্চে বসলাম। সাধুবাবা এই স্টেশনের ধারে বকুল গাছের নীচে গত বিশ বছর ধরে থাকেন। ওখানেই খাওয়া-শোয়া। ওই বকুল গাছ, ওই সবুজ ঘাস আমাদের বড় চেনা। স্টেশনের ধারেই আমাদের খেলার মাঠ। বিকেলে খেলার পর সাধুবাবার সাথে মাঝেমাঝেই গল্পে মেতে উঠতাম আমরা। বয়সে অনেক বড় হলেও, মানুষটা আমাদের বন্ধুর মতনই ছিলেন। শোনা যায় তিনি নাকি ভাগলপুরের বেশ বড় পরিবারের সন্তান। কেনো যে তিনি এই জীবনে এসেছিলেন তা কোনোদিন জানতে পারিনি। সাধু হলেও পুজোআচ্চা তাকে খুব করতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তবে মাঝেমাঝেই গান গাইতেন, কবীরের গান, নানা রকম ফকিরি গান। আর গাইতেন রামধুন: রঘুপতিরাঘব রাজারাম/ পতিতপাবন সীতারাম...। ছেলেবেলায় আমরাও তার সাথে বসে এই সব গানে গলা মিলিয়েছি। বহু দেশে ঘুরে বেড়ানোর জন্যে উনি নানারকম টোটকা জানতেন। তাই দিয়ে আমাদের অনেক ছোটখাটো অসুখ সারাতেন তিনি। কিন্তু একমুঠো মুষ্ঠিভিক্ষা ছাড়া কিছুই দেওয়া যেত না তাঁকে। তার থেকেও নিজের সামান্যটুকু রেখে উনি আবার পশুপাখিদের দিতেন। বুবাই বেশ কিছুক্ষণ মুখ নীচু করে বসেই ছিল। তারপর বললো, তোর মনে আছে, সেই যখন বিশুর শরীর খারাপ হলো। মনে পড়ে গেল আমরা তখন ক্লাস টেন-এ পড়ি। আমাদের টিমের গোলকিপার বিশু হঠাৎ প্রবল জ্বরে পড়লো। দিন সাতেক গ্রামের ডাক্তারের ওষুধ খেয়ে কিছুই হচ্ছে না। অত শক্তপোক্ত ছেলেটা অচেতন হয়ে পড়েছে। তখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথাটা প্রথম সাধুবাবাই তুলেছিল। বুবাই বললো, মনে আছে। বিশুর বাবা বলেছিল, আমরা গরিব মানুষ! সাধুবাবা বলেছিল, গরিব ঠিকই, আবার মানুষও। গরিব বলে কি বেঘোরে মরবে? চলো কলকত্তা, হামি সাথে যাবে। আমি বললাম, হ্যা রে, এক মাস বিছানার পাশে থেকে সেবা করে বিশুটাকে ফিরিয়ে এনেছিল সাধুবাবা। বুবাইয়ের ডাকে চিন্তার সূত্রটা ছিঁড়ে গেলো। বুবাই বললো, তুই যা ভাই। আজ আমি পারবো না। আমি বললাম, কী করবি? --কী আর করবো? কেউ তো মানুষটাকে শ্মশানে নিয়ে যাবে! শিয়াল কুকুরের ভরসায় তো ফেলে রাখা যায় না। আমি বললাম, দেখ, রেলের জায়গা তো, ঠিক ওরা ব্যবস্থা করবে! আজ কম্পিটিশন কম শুনলাম। চাকরিটা হয়ে যাওয়ার চান্স আছে। চল ভাই, আজ এটা ছাড়া ঠিক হবে না। --তুই যা। আমি ঠিক পরে কাজ জুটিয়ে নেবো। আমি বললাম, বন্দনা? ওর বাড়িতে ছেলে দেখছে মনে আছে তো ? উত্তরে আমার দিকে কেমন করে যেন তাকালো বুবাই। সোজা একটা দৃষ্টি, আমার বুকটা যেন ভেদ করে গেলো। কিছু আর বলতে পারলাম না। একবার মনে পড়লো, বাবার ওষুধ, ভাইয়ের পরীক্ষার ফি আর মায়ের মুখটা। বললাম, একা তো আর পারবি না। চারটে কাঁধ তো লাগবে! --তুই যা, আমি জুটিয়ে নেবো। --ফিরে এসে যদি আমরা বেরোই? --তুই যা ভাই। এই অবস্থায় আমার ইন্টারভিউ দেওয়ার মন নেই। অগত্যা এগোলাম প্ল্যাটফর্মের দিকে। পা দুয়েক চলার পরই বুবাইয়ের ওই দৃষ্টিটা মনে পড়ে গেলো। এগোতে আর পারলাম না। চারটে বডির পর সাধুবাবার লাইন। আমরা চার বন্ধু মাটিতে বসে অপেক্ষা করছি। শঙ্কর বললো, সন্ধ্যে কাবার হয়ে যাবে রে! ঠাণ্ডায় জমে যাবো। কিছুই তো নিয়ে বেরোইনি। বুবাই বললো, জানিস, সপ্তাহখানেক আগে প্রবল ঠাণ্ডা দেখে সাধুবাবাকে একটা কম্বল দিয়ে গেলাম। আমরা একসাথে বুবাইয়ের দিকে তাকাতেই ও বললো, না রে বাবা! কিনে দিইনি। সেই যে পাড়ায় কে একজন কম্বল বিলোচ্ছিল না, ওখান থেকে নিয়ে। শামিম বললো, ওহ্, তাই তুই সেদিন লাইনে দাঁড়িয়েছিলি। সরি ভাই, সেদিন তোকে অনেক গাল দিয়েছিলাম। --আরে ছাড়, শোন না। পরশু রাতে একটা কাজে বাইরে গেছিলাম। ফিরতে অনেক রাত হলো। দেখি সাধুবাবা ঠাণ্ডায় গুঁটিসুঁটি মেরে পাতলা একটা চাদরটা মুড়ি দিয়ে শুয়ে। আমায় দেখেই বললো, ক্যা রে বেটা, ইতনা দের? আমি বললাম, তোমার কম্বল কোথায়? বুড়ো হয়েছ মনে থাকে যেন! --আরে ছোড় ওসব। আমি বললাম, সেটাও বিলিয়ে দিলে? ঠাণ্ডায় মরবে নাকি? বুড়ো বলল, না রে বেটা, বিলাই নি? বেশ রাগ হয়েছিল তখন আমার। বললাম, তো কোথায় গেলো? --কোই চোর লেকে গ্যায়া। যরা সোচ বেটা, যে হামার কম্বল নিলো, সে তো হামার চেয়ে ভি গরিব আছে। রাগ করে আর কী হবে? আমি বলেছিলাম, সাধুবাবা, লোক অভাবে চুরি করে না, করে স্বভাবে। রাগটা সেই জন্যেই হয়। --এবার বুঝেছি। হঠাৎ বলল বুবাই। আমরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী রে? বুবাই বললো, দিনকয়েক আগে একদল লোক সাধুবাবাকে খুব হেনস্থা করেছিল। কম্বলটা ওরাও সরিয়ে থাকতে পারে। আমরা বললাম, বলিস কী? কেনো? শঙ্কর বলল, কারা তারা? সাধুবাবার সাথে তাদের কী শত্রুতা? --কারা আবার, সবগুলো অযোধ্যা ফেরত হনুমান। --আজব তো! ওদের সমস্যাটা কী? --ওরা বলে সাধুবাবার রামধুন গানটা পাল্টাতে হবে। --মানে ? --ওই যে গানের মধ্যে আছে না, ঈশ্বর আল্লা তেরো নাম/ সবকো সম্মতি দে ভগবান। ওদের দাবি এসব কথা গাওয়া যাবে না! --আর সাধুবাবা? সাধুবাবা রাজি হয়নি। দুঃখ করে আমায় বলেছিল, হামার রাম ভি দখল হয়ে গেলো রে বেটা! আরেকটা বডি ঢুকছে। সঙ্গে জনা পঞ্চাশেক লোক। খোল কত্তাল ধুপধুনোয় চারিদিক মাতোয়ারা। বলো হরি, হরি বোল... জানি না এবার হরির পালা আসবে কিনা! ¤ (পথিকৃৎ-এর জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যা থেকে নেওয়া)
পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২
দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com