ওকে সচরাচর কেউ দেখতে পায় না। না পাড়ায়, না রাস্তায়, না বাড়ির ব্যালকনিতে। ওর নামও অনেকদিন পর্যন্ত কেউ তেমন জানতো না। কখনো কখনো কেউ কেউ দেখতে পেতো, রোদ চশমা লাগিয়ে চার চাকায় উঠে বসতে। দু একটা উৎসুক দৃষ্টি তা নিয়ে কথা বললেও, বাকিরা বিষয়টাকে তেমন পাত্তাই দিতো না। কিন্তু তিস্তা একদিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে বললো, এবারের ভাষ্যপাঠে থাকবে সোহিনী। পাড়ায় রবীন্দ্র জয়ন্তী। গীতি আলেখ্য হবে। কিন্তু ভাষ্য পাঠে ফিমেল ভয়েস পাওয়া যাচ্ছিলো ।না। না। তিস্তার প্রস্তাব শুনে, সবাই একবাক্যে জিজ্ঞাসা করে উঠলো, কে, কে সোহিনী? তিস্তা মৃদু হেসে, যার কথা বললো, শুনে সকলের গলায় অবিশ্বাসের সুর। বনানী বলে উঠলো, বাদ দে না তিস্তার কথা। ও বাজে বকছে। কিন্তু সকলকে সত্যিই অবাক করে বিকেলের রিহার্সালে উপস্থিত হলো প্রফেসরের বউ, মানে সোহিনী। মেয়েরা আড়ালে এ ওকে ঠেলাঠেলি করলো, চোখে চোখে ইঙ্গিত চললো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সোহিনীকে দলে নেওয়া হলো। সোহিনীর গলা ভালো। ওর ভাষ্যের জোরে আলেখ্য জমজমাট। অনুষ্ঠানের আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি, হঠাৎই সোহিনী আবার অন্তরালে। তাকে রাস্তায় পাওয়া তো যায়ই না। বাড়ির ব্যালকনিতেও না। এমনকি বাড়ি গিয়েও দেখা পাওয়া গেল না। সোহিনীর ছোট মেয়ে জানালো, মা বলেছে, মা রিহার্সালে যেতে পারবে না। অন্য কাউকে নিতে। সবার যত রাগ গিয়ে পড়লো তিস্তার উপর। বিদিশা এক হাত নিলো তিস্তাকে। কেমন, হলো তো? এইসব বড় লোকদের আমার চেনা আছে হাড়ে হাড়ে। নিজের দর বাড়াতে কী করে হয়, এরা জানে! বনানীও বিদিশার সাথে গলা মেলায়, আমি সেদিনই বলেছিলাম! কেমন, হলো তো? হুঁ। দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না। ওরকম পাঠ আর কি কেউ পারে না? কোনও কাণ্ড জ্ঞান আছে? এখন আমাদের কী হবে? তিস্তা বরাবর একটু ঠাণ্ডা মাথায় ভাবনা চিন্তার মেয়ে। একটু গম্ভীর হয়ে বললো, কী আর হবে? একটু ভালো হতো, না হয় একটু খারাপ হবে। কিন্তু হবে। কারোর জন্য কিছু আটকায় কি? সত্যিই আটকালো না। ভালোয় ভালোয় হলো সবকিছু। আলেখ্যও সুন্দর উৎরে গেল। সবাই প্রশংসা করলো। ভুলে গেল সবাই প্রফেসরের বউ, মানে সোহিনীর কথা। তার মাঝপথে এমন ডুবিয়ে চলে যাওয়ার কথা। তিস্তা মর্নিং ওয়াকে যায়। প্রায়ই তাকায় প্রাচীরের ওপাশে বাগানটার দিকে। মনে মনে ইচ্ছে, দেখা হোক একবার, ওরকম বিট্রে করার কারণটা জানতে চাইবে আর সুযোগ বুঝে দু-এক কথা শুনিয়ে দেওয়াও যাবে। মনে মনে সেসব কথার রিহার্সালও দেয় তিস্তা। কিন্তু সুযোগ হয় না। বারান্দায় সোহিনীর গাঢ় নীল কুর্তি বাতাসে দোল খায়। তিস্তা যেন হাওয়াকেই গালি দেয় মনে মনে। ২ একদিন জৈষ্ঠ্যের তপ্ত বিকেলের পর সন্ধ্যে নেমেছে। তখনো গুমোট গরম। একটুও হাওয়া নেই। গাছের পাতা নড়ছে না। দর দর করে ঘামছে সবাই। তিস্তা দু হাতে দুটো বাজারের ব্যাগ নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে আসছিলো। হঠাৎই শুনতে পেলো, কোথায় গেছিলেন? ব্যাগ ভর্তি বাজার করেছেন দেখছি। তিস্তা মুখ তুলে তাকালো। প্রাচীরের ওপাশে সোহিনী। কেবল মুখটা দেখা যাচ্ছে। তিস্তা মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে চলে যাবে ভাবলো। কিন্তু পারলো না। জিজ্ঞাসা করেই ফেললো, কী ব্যাপার? একেবারে ডুমুরের ফুল হয়ে গেলেন যে! দেখা পাওয়া যায় না! -আর বোলো না। যা গেল কটা দিন! -মানে? -এই এসি নন-এসি করে যা অবস্থা। একেবারে স্পীচ অফ। কিছুতেই সারে না। বুকে কফ জমে সে বিচ্ছিরি অবস্থা! -তাই নাকি? এরই মধ্যে সত্যিই দু চার বার কেশে ফেললো সোহিনী। আর উপরের জানালা থেকেও ইতিমধ্যে দু দুবার ডাক এসে গেল। -না গো যাই। ছেলে ক্যারাটে শিখে এলো, মেয়েরও টিউশন আছে। টিফিন দিতে হবে। যাই... তিস্তার রাগ, অভিযোগ কেমন যেন ভিজে মিইয়ে গেল। সোহিনীর মুখটায় কেমন যেন মলিনতার ছাপ। চোখের কোনে কি একটু কালি জমেছে? সেরকম জেল্লা যেন নেই। যাক গে। ওসব ভেবে আর কী করবে সে। বড় লোকেদের এসি নন-এসি প্রবলেম। তাতে তার কিই বা আসে যায়! ৩ তারও বছর দুয়েক পর। স্কুল থেকে বাসে করে ফিরছিলো তিস্তা। ভীড় বাস। সিট নেই। সামনের দিকে একটা সিটে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল সে। চোখ গেল পেছনের দিকে। জানালার পাশে বসে, চুলগুলো হাওয়ায় উড়ছে। সাইড ফেসটা ঠিক যেন সোহিনীর মতো। ভীড়ের গুঁতোয় এদিক ওদিক দেখবার আর উপায় ছিলো না। শহরে ঢুকবে এবার বাস। ভীড়টা ক্রমশ পাতলা হয়ে এলো। সিটে বসে থাকা লোকজন ছাড়া বাকিরা যে যার গন্তব্যে নেমে গিয়েছে। হঠাৎ কানে এলো পেছনে বসে থাকা জানালার পাশের মেয়েলি স্বর। ফোনে কথা বলছে, মা, এটা আমার টাকা মা। আমার রোজগারের টাকা, তুমি নেবে না কেন? ওপাশ থেকে কী কথা ভেসে এলো শোনা গেল না। এদিকের জন আবার কথা বলে উঠলো, আচ্ছা মা, আমি যদি তোমার ছেলে হতাম, একথা বলতে পারতে তুমি? বাবার এই অবস্থা, এতদিন তো একাই সব ঝড় সামলেছো তুমি। মেয়ে হয়ে আমি কিচ্ছু করতে পারিনি। কেন পারি নি সে তো তুমি জানো মা! তুমি বোঝ, বাবার এই অবস্থা, এখন তোমার চোখ টা চলে গেলে, ভাবতে পারছো কী হবে? অপারেশনটা আর দেরী না করে করিয়ে নাও। না, না আমি কিচ্ছু শুনবো না... আমি যাবো তো, সময় পেলেই যাবো...। তারপর আর কিছু শোনা গেল না। বাসের হর্ন বেজে উঠলো। বাস কাঁসাই নদী ক্রস করে শহরে ঢুকছে। নামতে হবে এবার। তিস্তা ব্যাগ, শাড়ি সামলে উঠে দাঁড়াতেই চোখাচোখি হোলো। -আরে তিস্তা, তুমি ছিলে বাসে? আমি তো খেয়ালই করি নি। সোহিনী সোৎসাহে বলে উঠলো। তিস্তা অবাক হলো। এ তবে সোহিনীর মতো কেউ নয়। স্বয়ং সে-ই। -কী ব্যাপার, তুমি এদিকে? -আরে আমি এদিকেই একটা প্রাইভেট স্কুলে জয়েন করেছি তো! -তুমি? কেন? তিস্তার যেন বিস্ময়ের শেষ নেই। ভাবতেও পারছে না, একটু আগে ফোনের কথাগুলো সোহিনীরই ছিল! উঁহু, এটা তো ঠিক এসি নন-এসি প্রবলেম নয়! ডাল মে কুছ কালা হ্যায়! সোহিনী ততক্ষণে গেটের কাছে। নেমেই বললো, চলো না, চা খাই। ঘরে ঢুকে গেলে তো সেই একই। তার চেয়ে চলো, চা খেতে খেতে গল্প করা যাবে। ধোঁয়া ওঠা চা-এর কাপে চুমুক দিয়ে সোহিনী যেন অন্য মানুষ। এই দোকানে চা, মিষ্টি, সিঙ্গাড়া, চপ সব পাওয়া যায়। ওরা বসেছে দোকানের একেবারে ভেতরের দিকে একটা জানালার পাশে। ফুরফুরে হাওয়া আসছে বেশ। কথায় কথা গড়ালো আজ অনেক দূর। তিস্তা বলে উঠলো, এত কিছুর পর তুমি আছো কী করে ওই বাড়িতে? যেখানে তোমার এতটুকু মতামত, ইচ্ছে, ভালোলাগার কোনও দাম নেই! কথায় কথায় সন্দেহ করলে, একটা মানুষের আর কী থাকে? এভাবে একসাথে থাকা যায়! -দ্যাখো তিস্তা, একটা কথা খুব ভালো করে বুঝেছি, জানো তো। এ লড়াইটা তো একদিনের নয়। যুগ যুগের লড়াই। কী করবে তুমি? ছেলেমেয়ের প্রতি মায়ের দায়িত্ব, কর্তব্য এড়িয়ে তো কিছু করতে পারবো না। মা হিসেবে আমারও দায়িত্ব আছে। একটু বেশি পরিশ্রম হয়তো আজ আমার হচ্ছে। ঘরে, বাইরে সামলে চলা। সবকিছু মেনে নিই নি বলেই, দাঁতে দাঁত চেপে চাকরির চেষ্টা করেছি। শেষপর্যন্ত চাকরিটা করছি। বড়ো চাকরি নয়। খাটুনিও বেশি। দিনের শেষে ক্লান্তিতে হয়তো নুয়ে পড়ি। কিন্তু আবার বেঁচে উঠি পরের দিনের কথা ভেবে। ছোট ছোট মুখগুলোর কথা ভেবে। একটা মানুষ হিসেবে তাদের মায়ের মাথা উঁচু করে বাঁচার এই আনন্দটা নিশ্চয়ই আমার সন্তানেরা একদিন টের পাবে। একটুখানি এই হাঁটা রাস্তা, বাড়ি অব্দি। হাঁটা শেষ হলো, কথা বাকি রইলো অনেক। লোহার বড় গেটটা ঠেলে ঢুকে যাচ্ছে সোহিনী। তার আগে একবার পেছন ফিরে তাকায়, হাসে। প্রফেসরের বউ নয়, নতুন বন্ধুত্বের এই সম্পর্ক। নিজের পথে পা বাড়ানোর আগে একঝলক সতেজ বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নেয় তিস্তা। ¤ (পথিকৃৎ-এর জুলাই ২০২৪ সংখ্যা থেকে নেওয়া)
পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২
দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com