সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

পথিকৃৎ পত্রিকার বিশিষ্ট সদস্য শ্রী বিপ্লব চক্রবর্তীর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য

কিছু মৃত্যু যে পাহাড়ের মতো ভারি হয়, সেই কঠিন সত্যের সামনে আবার আমরা। গত ১৮ জানুয়ারি সকালে খবর এল, বিপ্লব চক্রবর্তী আর নেই। এই না থাকাটা যে কী, তা পথিকৃৎ-এর সাথে ঘনিষ্ঠরা মর্মে মর্মে অনুভব করছেন। বেশ কিছু বছর ধরে বিপ্লব চক্রবর্তী আর পথিকৃৎ প্রকাশনা এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয়ে এসেছে। নব্বইয়ের দশক থেকে এই গুরুদায়িত্ব তাঁর উপর এসেছিল। তার পর থেকে নানা সমস্যা বাধা হিসাবে আসলেও নিরলস পরিশ্রমে পত্রিকা প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করে গেছেন শ্রী বিপ্লব চক্রবর্তী। এমনও দিন গেছে যে-সময়ে প্রায় একাই তিনি সমস্ত কাজ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা ও সাহিত্যের মেধাবী ছাত্র ছিলেন বিপ্লব চক্রবর্তী কিন্তু তাঁর আন চর্চার পরিধি যে কত বিরাট ছিল তার অন্যতম প্রধান অভিজ্ঞান হল পথিকৃৎ-এর সংখ্যাগুলি। এ-যুগের বিশিষ্ট মার্কসবাদী দার্শনিক শিবদাস ঘোষের চিন্তার সংস্পর্শে এসেছিলেন তিনি। তরুণ সহকর্মীদের কাছে সে কথা বারবার বলতেন। তা থেকে অনুভব করা যেত, জ্ঞানচর্চা সম্পর্কে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর জীবনের উদ্দেশ্যকে পরিবর্তিত করে দিয়েছিল। সে কারণেই কৃতী ছাত্র হিসাবে নিছক নিজের কেরিয়ার গড়ার পথে তিনি যাননি। অন্তরের আনন্দে বেছে নিয়েছেন সংগ্রামমুখর বিপ্লবী জীবন। এসইউসিআই (কমিউনিস্ট) দলের মুখপত্র 'গণদাবী'র সম্পাদকমণ্ডলীতে দীর্ঘ দিন ছিলেন তিনি। মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারা অনুসরণ করবার জন্য কী অক্লান্ত আগ্রহ এবং অধ্যবসায় তাঁর ছিল, তা যাঁরা দেখেছেন তাঁরা জানেন। সময়োপযোগী এবং প্রাসঙ্গিক নানা বিষয়ে তিনি লিখতেন। ভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্পর্কে অসামান্য বিশ্লেষণধর্মী লেখা তো আছেই, দর্শন, বিজ্ঞান কিংবা অর্থনীতি বিষয়েও বহু লেখা স্বনামে প্রয়োজনে অন্য নামে লিখেছেন। লেখার জন্য প্রচুর পড়াশোনা করতেন। একবার অসুস্থ হয়ে ক্যালকাটা হার্ট ক্লিনিকে ভর্তি রয়েছেন। পথিকৃৎ-এর এক তরুণ সহকর্মী তাঁকে দেখতে গেছে। বিপ্লব চক্রবর্তীর হাতে বই। জানতে চাইলেন, পরের সংখ্যার কাজ কেমন চলছে। তার পরই বললেন, কিছু সাদা কাগজ আর একটা কলম হবে কিনা। সহকর্মীটি ব্যাগ থেকে কাগজ কলম বের করে দিল। কয়েক দিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েই পত্রিকার জন্য আস্ত একটা প্রবন্ধ দিয়ে দিলেন। আধুনিক সাহিত্যের নানা তত্ত্ব, বিচারপদ্ধতি ইত্যাদি কঠিন বিষয়ে অন্ত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় সে এক মনোজ্ঞ আলোচনা। জানা বোঝার জন্য তাঁর মনে সর্বক্ষণ আকুতি জীবন্ত থাকত। নানা জায়গা থেকে সংগ্রহ করতেন কার্যকরী বই, পত্র-পত্রিকা। যে কোনও কাজকে নিখুঁত ভাবে করার দিকে তাঁর ছিল গভীর অভিনিবেশ। তাঁর শৈল্পিক সমাজ সচেতন মনন ফোটোগ্রাফির প্রতিও আগ্রহ, অনুশীলন ও দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রেরণার উৎস ছিল। পত্রিকায় ছাপার জন্য ছবি যাতে দ্রুত পাওয়া যায় সে কারণে দপ্তরের মধ্যেই একটা ডার্করুম করে নিয়েছিলেন। সোভিয়েত বিষয়ে খুটিনাটি জানবার জন্য অল্প সময়ের মধ্যেই নিপুণ ভাবে শিখে নিয়েছিলেন রুশ ভাষা। মূল রুশ থেকে বাংলায় অনুবাদ করতেন। পথিকৃৎ-এর জন্য বেশ কয়েকটি রুশ গল্পের অনুবাদ তাঁরই। এই অনুবাদের কাজে, রুশ থেকে হোক বা ইংরেজি থেকে, তাঁর দক্ষতা ছিল বিস্ময়কর। শিখতে শুরু করেছিলেন উর্দু ভাষাও। এমনকী কম্পিউটারে উর্দু টাইপিংও শুরু করেছিলেন। এই যে এত কিছু করতেন, সব কিছুই তরুণ সহকর্মীদের মধ্যে সঞ্চারিত করার অভ্যাস ছিল বিপ্লব চক্রবর্তীর। অন্যদের লেখার বিষয়ে সাহায্য করা, বই যোগাড় করে দেওয়া, লেখা পরিমার্জনা করে দেওয়া ইত্যাদি করে যেতেন প্রায় সর্বক্ষণ। সাপ্তাহিক 'অন্যচোখে' পত্রিকার জন্য লেখালিখি থেকে শুরু করে সম্পাদনা, প্রুফ দেখা ইত্যাদি বেশ কিছু দিন সামলেছেন। পথিকৃৎ পত্রিকায় প্রকাশিত অত্যন্ত মূল্যবান কয়েকটি প্রবন্ধ নির্বাচন করে ২০১০ সালে 'পথিকৃতের শিল্পভাবনা' শীর্ষক গ্রন্থটি প্রকাশ করেছিলেন তিনিই। যার ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে সাহিত্য সম্পর্কে পথিকৃৎ-এ প্রকাশিত কয়েকটি প্রবন্ধের সংকলন 'পথিকৃৎ। সাহিত্য প্রসঙ্গ' প্রকাশিত হয়। বিপ্লব চক্রবর্তী তখন একেবারেই শয্যাশায়ী। বিছানায় উঠে বসতে পর্যন্ত পারেন না, কথা প্রায় বন্ধ, দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীণ হয়ে এসেছে। রোগ শয্যায় ঐ গ্রন্থটি তাঁর হাতে যখন তুলে দেওয়া হল উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত, নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য অপেক্ষামান সেই বিপ্লবী কর্মীর মুখ- যাঁর হাতের অনেকগুলি সৃষ্টি সমৃদ্ধ করেছে গ্রন্থটিকে। জীবনের শেষ কয়েক বছর 'সুপার নিউক্লিয়ার পলসি' নামে মস্তিস্কের জটিল রোগ তাঁর জীবনীশক্তিকে একটু একটু করে কেড়ে নিচ্ছিল। তবু যত দিন চলাফেরার এতটুকু শক্তি ছিল, তত দিন নিজের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালন করার আন্তরিক প্রচেষ্টা করে গেছেন তিনি। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে কষ্ট হত খুব, তবু দো'তলার উপরে পথিকৃৎ-এর সাপ্তাহিক বৈঠকে আসতেন তিনি। রোগের কারণে ঠিক মতো কলম ধরতে পারছিলেন না। কম্পিউটারে টাইপ করে লেখবার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। মাঝে মাঝে একটা হাত পাশের সহকর্মীর দিকে বাড়িয়ে দিতেন অর্থাৎ, হাতে খুবই কষ্ট হচ্ছে, হালকা একটু ম্যাসাজ চাইছেন। এক সময় যখন কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল, তখনও কেউ লেখা পড়ে শোনালে প্রয়োজনীয় এবং কার্যকরী পরামর্শ দিতেন। এখনও তাঁর কম্পিউটারে রয়ে গেছে বেশ কিছু অসমাপ্ত লেখা। আগামী দিনে যাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন তাদের সাহায্য করার জন্য তৈরি করে রেখেছেন বিভিন্ন নোট, জোগাড় করে রেখেছেন নানা তথ্য। বিভিন্ন বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জন করলেও তা নিয়ে অহঙ্কার কোনও ভাবেই প্রবেশাধিকার পায়নি সকলের ভালবাসার পাত্র এই মানুষটির চরিত্রে। এ ছিল তাঁর চরিত্রের এক অনুপম সৌন্দর্য। তাঁর প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণেরও এক শক্তিশালী উপাদান। কাজ নিয়ে বিরক্ত বা ক্ষুব্ধ হতে তাঁকে কখনো দেখেনি কেউ। বরং দেখেছে কাজকে কেন্দ্র করে বিভোর হয়ে থাকতে। ছোটবড় সকলেই নিঃসঙ্কোচে তাঁর সাথে তর্ক-বিতর্ক করতে পারতেন। তা নিয়ে বিন্দুমাত্র মান-অভিমান বা অপরের যোগ্যতাকে অবজ্ঞা করার কোনও মানসিকতা তাঁর মধ্যে ছিল না। বরং, এমন হয়েছে, পথিকৃৎ-এর বৈঠকে একটা বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে এক তরুণ সদস্যের মতান্তর দেখা গেল। তা নিয়ে অনেকক্ষণ তর্ক হল। বাড়ি ফেরার পথেও তিনি তর্কের বিষয়টা নিয়ে ভেবে যাচ্ছেন। বাড়ি ফিরে বইপত্র পড়ে দেখলেন এবং পরদিন সকাল হতেই খোঁজ শুরু করলেন সেই সদস্যের। দেখা হতেই তাঁর সদা সরল চোখে দেখা গেল এক মন ভরানো হাসি- কাল তুমিই ঠিক বলেছিলে। আমি ভুল ছিলাম। সেই বিপ্লব চক্রবর্তী আজ নেই। পথিকৃৎ-কে আরও কার্যকরী আরও ক্ষুরধার করার প্রচেষ্টায় নিরলস সক্রিয় থাকার মধ্যেই রয়েছে ব্যতিক্রমী চরিত্র বিপ্লব চক্রবর্তীর প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য। এই কাজ করে চলার অঙ্গীকারেই তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই। ¤ (পথিকৃৎ-এর ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সংখ্যা থেকে নেওয়া)

পথিকৃৎ

আমাদের পত্রিকা ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত থাকুন এবং সর্বশেষ খবর ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট নিয়মিত পান

যোগাযোগ

পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২

দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com

গুরুত্বপূর্ণ লিংকসমূহ

© Pathikrit. All Rights Reserved. Designed By GenxByte