আহমদ মারুফ জইদ। নামটায় যেকটা অক্ষর আছে, ততগুলো মাসও পৃথিবীর বুকে থাকতে পারল না ফুটফুটে শিশুটি। প্যালেস্টাইনের জইদ মায়ের কোলেই মারা গেছে গত ৫ জুলাই। অনেকক্ষণ ধরে অসুস্থ শিশুটিকে নিয়ে আটকে ছিলেন বাড়ির লোকজন, কিন্তু বারবার আবেদন করা সত্ত্বেও মিলিটারি চেকপয়েন্ট পেরিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি ইজরায়েলি সেনারা। দেরি হতে হতে এক সময়, মাত্র চার মাস আগে পৃথিবীর আলোর স্পর্শ পাওয়া চোখদুটো চিরতরে বুজে গেছে। সেই বন্ধ চোখের পাতায়, নরম কপালে মা কাঁদতে কাঁদতে চুমু খাচ্ছেন বারবার, এ দৃশ্য যখন ভেসে ওঠে আমাদের ফোনে, মনে হয় - হিটলারের গ্যাস চেম্বারে শিশুদের হত্যার চেয়ে এ কি কিছু কম ভয়ানক? কত বছর ধরে, কত দশক ধরে অন্তহীন আগ্রাসন আর যুদ্ধের মধ্যে বাঁচছেন প্যালেস্টাইনের মানুষ, কত শিশুর মৃত্যু হয়েছে, কতো প্রজন্ম আজন্ম এবং আমৃত্যু দেখেছে অবরুদ্ধ, বিধ্বস্ত স্বদেশভূমি - এর যেন অন্ত নেই। ২০১৪ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যচিত্র 'বর্ন ইন গাজা' দেখিয়েছে সেইসময় ইজরায়েলের হানাদারিতে উচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া শিশু-কিশোরদের জীবন। কেউ বাবাকে হারিয়েছে, কারও স্কুল উড়ে গেছে বোমায়, কারও প্রিয় ভাই-বন্ধু-দাদা চোখের সামনে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, অনেকেই প্রতিনিয়ত মানসিক বৈকল্য আর আতঙ্কের সাথে যুদ্ধ করে বাঁচছে। এই তথ্যচিত্র নির্মাণের সময় ইজরায়েলি হানায় নিহত শিশুর সংখ্যা ৫০৬, আহত ৩৫৯৮। ২৪০০০ পরিবার ঘর হারিয়েছে, ৪২০০০ একর চাষজমি নষ্ট হয়ে গেছে, যার ওপর নির্ভর করে বাঁচত অসংখ্য পরিবার। যদি কয়েক বছর পিছিয়ে যাওয়া যায়, ২০০৪ থেকে ২০১১ পর্যন্ত দফায় দফায় যুদ্ধ-হানাদারি'র ছবি পাওয়া যাবে ফিদা কিশতা'র ২০১৩ 'র তথ্যচিত্র 'হোয়্যার শুড দ্য বার্ডস ফ্লাই' তে। যুদ্ধবিমানের ধোঁওয়া আর সাইরেনের শব্দে ঢাকা যে দেশের আকাশে পাখিদের ডানা মেলার এক টুকরো জায়গা অবশিষ্ট নেই, সেই দেশের মানুষগুলোর জীবন দেখিয়েছিলেন ফিদা। ২০২৩ এর অক্টোবর থেকে পুরুষ-নারী-শিশু নির্বিশেষে নির্বিচার গণহত্যা চলেছে অবরুদ্ধ গাজা, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক সহ প্যালেস্টাইনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণাকেও অমান্য করে বারবার চলেছে আক্রমণ। পৃথিবীর নানা প্রান্তে এই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, উদ্বাস্তু শরণার্থী মানুষের হাহাকার, লক্ষ-লক্ষ মর্মান্তিক মৃত্যুর মাঝেও মানুষ বেঁচে ওঠার গান গায়, প্রতিরোধের কবিতা লেখে, এই বিধ্বংসের দিনলিপিকে লিখে রাখার, মনে করিয়ে দেওয়ার মতো সিনেমা তৈরি হয়।
'দ্য ভয়েস অফ হিন্দ রজাব' ছবিটি ২০২৫ এ আমাদের দেশে মুক্তি পেতে দেওয়া হয়নি, ভারত-ইজরায়েল সম্পর্কের অবনতি হতে পারে এই যুক্তিতে। পরিচালক আনন্দ পটবর্ধন, অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ সহ অনেকে এর প্রতিবাদ জানিয়ে ফিল্ম বোর্ডের কাছে সাক্ষর সম্বলিত চিঠি পাঠান। ২০২৬ এ ছবিটি এদেশে মুক্তি পেল, জুন মাসে কলকাতার কয়েকটি হাতে গোনা মাল্টিপ্লেক্সে অল্প কিছুদিন একটিমাত্র শো'য়ে চলল এবং প্রায় কোনও প্রচার ছাড়াই নিঃশব্দে চলে গেল। যে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের অবনতি নিয়ে আমাদের দেশের মাথারা এত চিন্তিত, যে দেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে আমাদের নরেন্দ্র মোদী হাস্যমুখে ছবি তোলেন, সেই খুনী ইজরায়েলের হাতে নিহত বছর পাঁচেকের মেয়ে হিন্দ রজাব হামাদা এ ছবির মূল চরিত্র। ছবিটি হিন্দের জীবনের শেষ কয়েক ঘন্টার কথা বলে এবং এই বলার অনেকটা জুড়ে থাকে ওই পাঁচ বছরের মেয়েটির নিজের কণ্ঠস্বর, যার ডাকনাম ছিল হানুদ। ২০২৪ এর ২৯ জানুয়ারি ইজরায়েল অধিকৃত গাজা থেকে কোনও নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য অন্যান্য আত্মীয়ের সাথে গাড়িতে উঠেছিল হিন্দ রজাব। গাড়ির বাকিরা ইজরায়েলি সেনার গুলিতে মারা যাওয়ার পরেও বহুক্ষণ বেঁচে ছিল সে। তার কাকা খবর পেয়ে হিন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি'র, যারা যুদ্ধে বিপন্ন, আহতদের উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্স, স্বেচ্ছাসেবক পাঠিয়ে। সিটের তলায় লুকিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বারবার ফোনে কথা বলেছে হিন্দ, আর্তস্বরে বলেছে - "আমায় বাঁচাও, আমায় নিয়ে যাও।" এদিক থেকে রেড ক্রিসেন্টের প্রতিনিধিরাও ক্রমাগত সাহস জুগিয়ে গেছেন তাকে। কিন্তু তাদের অফিস থেকে হিন্দ'দের গাড়ির ৫২ মাইল দূরত্ব জুড়ে তখন ইজরায়েলের সেনা-পাহারা, ট্যাঙ্ক, বোমা-গুলি-বন্দুক। বহু স্বেচ্ছাসেবক ইতিমধ্যেই মারা গেছেন উদ্ধারকাজের মাঝেই। ইজরায়েলের অনুমোদন ছাড়া উদ্ধারকারী পাঠালেই আবারও আটকে দেওয়া হতে পারে অ্যাম্বুলেন্স, নির্বিচারে চালানো হতে পারে গুলি। ফলে, এই দু পক্ষের কথাবার্তা, অনুমতি, অ্যাম্বুলেন্স যাওয়ার রুট ঠিক করায় কেটে যায় ঘন্টার পর ঘন্টা। ছোট্ট মেয়েটির কাছে পৌঁছাতে না পেরে এ প্রান্তে রেড ক্রিসেন্টের হাত-পা বাঁধা মানুষগুলো ছটফট করতে থাকে, আর দুর্বল নেটওয়ার্ক সংযোগের ওই প্রান্তে থেকে থেকে ফুটে ওঠে একটি পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়ের আর্ত স্বর -"তোমরা কখন আসবে? এসো, আমায় নিয়ে যাও, আমার ভয় করছে যে।" অনেক দেরিতে হলেও দুজন উদ্ধারকারী অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে হিন্দ'দের গাড়ির অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছে যান, কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। অ্যাম্বুলেন্সের ওপরেও গুলি ছোড়া হয়, দুজনেই মারা যান। সাহায্যহীন হয়ে একা পড়ে থাকে হিন্দ, বুলেটের অপেক্ষায়। সেদিনের ফোনের কথাবার্তার যে রেকর্ড রাখা ছিল রেড ক্রিসেন্টের অফিসে, তাকে ব্যবহার করেই ২৯ জানুয়ারি, ২০২৪ এর ঘটনার পুনর্নির্মাণ করেছেন পরিচালক কাউথার বেন হানিয়া। রেড ক্রিসেন্টের অফিসঘরের কাচের দেওয়াল, এ ঘর থেকে ও-ঘরের দূরত্ব, দেওয়ালে টানানো মৃত স্বেচ্ছাসেবক আর যুদ্ধে নিহত বাচ্চাদের ছবির সারি আর বিপন্ন-ভয়ার্ত-অসহায় কিছু মানুষ - এটুকুই ছবির পরিসর। বারবার তারা ফোনে ধরছেন হিন্দ রজাবকে, নানাভাবে চেষ্টা করছেন তাকে একটু সাহস,একটু ভরসা দেওয়ার। ওদিকে বহুদূরে বাড়িতে বসে হিন্দের মা কাতর আবেদন করছেন - আপনারা আমার মেয়েটাকে বাঁচান। হিন্দের পাশে তখন তার আত্মীয়, ভাই-বোনদের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ। এই ভয়াবহতা থেকে বাচ্চাটিকে আড়াল করতে রেড ক্রিসেন্টের এক মহিলা কর্মী ফোনে হিন্দকে বলেন - 'ওদের ডেকো না সোনা, ওরা ঘুমোচ্ছে।' হিন্দ একটু চুপ করে থেকে জবাব দেয় - 'আমি জানি ওরা মরে গেছে। তোমরা আমাকে নিয়ে যাও। আর দেরি কোরো না।' এই উত্তর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে পৃথিবী একদিন শিশুর বাসযোগ্য হয়ে ওঠার কথা ছিল, সে পৃথিবীতে একটি পাঁচ বছরের শিশু চারপাশে ধ্বংস আর মৃত্যু দেখতে দেখতে ঘুমন্ত আর মৃতের ফারাক করতে শিখে গেছে। হিন্দকে নানা কথায় ভুলিয়ে রাখতে জিজ্ঞেস করা হয় তার ভাইয়ের নাম, স্কুলের নাম। হিন্দ বলে - সে স্কুলে যেতে খুব ভালোবাসে আর তার স্কুলের নাম 'এ হ্যাপি চাইল্ডহুড'। এই নাম তীব্র দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে বেড়ায় আমাদের। পুতুলের মতো যে মেয়ে এই মাটিতে খেলা করে বেড়াতো, মায়ের আদর-পাখির গান-নীল আকাশ-স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে যার জীবন হওয়ার কথা ছিল আনন্দময়, যার স্কুলের নাম ছিল 'সুখী শৈশব', সেই অফুরন্ত প্রাণের সম্ভাবনা একেবারে হারিয়ে গেছে এই দুনিয়া থেকে। এ ছবিকে যদি 'গল্প' বা যুদ্ধের ওপর নির্মিত কাল্পনিক কাহিনী বলা যেত, হয়তো একটু স্বস্তি পেতাম আমরা। কিন্তু ঘন্টা দেড়েকের এই ডকুড্রামা দেখতে দেখতে যখনই মনে পড়ে, এই ভয়েস টেপ ২০২৪ এর ২৯ জানুয়ারি মৃত সেই মেয়েটিরই কণ্ঠস্বর, যা দেখছি সেই ঘটনা সত্যিই ঘটে গেছে - তখন এক ভয়ানক দমচাপা কষ্ট, অস্বস্তি আমাদের তোলপাড় করে ফেলে। ছবির একেবারে শেষে হিন্দ রজাবের মা'কে দেখতে পাই আমরা, দেখতে পাই জীবন্ত হিন্দ রজাবের কয়েক সেকেন্ডের ফুটেজ - সমুদ্রের তীরে খেলছে সে, বালি ঘাঁটছে, খিলখিল হাসছে। হিন্দের মা বলছেন, সমুদ্র খুব ভালোবাসত মেয়েটা। ঘটনার বারো দিন পর হিন্দদের গাড়ি যখন উদ্ধার হয়, তখন তার গায়ে ছিল ৩৫৫ টি বুলেটের চিহ্ন, ভেতরে হিন্দ রজাব সহ বাকিদের প্রাণহীন দেহ।
বিগত আড়াই বছরে মার্কিন মদতপুষ্ট ইজরায়েলের পৈশাচিক বর্বরতার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে প্যালেস্টাইনের ২১০০০ শিশু, আহত হয়েছে ৪৪৫০০ এবং আজও গড়ে একটি করে শিশুর মৃত্যু হচ্ছে প্রতিদিন। হিন্দ রজাব হামাদা তাদের একজন। হিন্দ রজাবের কন্ঠস্বর মনে করিয়ে দেয়, এ দুনিয়ায় আকাশচুম্বী অট্টালিকা আছে, আলোর মালায় সাজানো শহর আছে, আর তার পাশেই আছে প্যালেস্টাইনের সেই মায়েদের বুকফাটা কান্না - 'যারা সন্তানকে দু'বার বহন করেন, একবার গর্ভে আরেকবার সমাধিতে'। যে মেয়েটি ধ্বংসস্তূপে বসে পুতুল নিয়ে খেলতে খেলতে হঠাৎ কেঁদে উঠছে বোমার শব্দে, যে ছেলেটি তার দেহের ওজনের চেয়ে বেশি ভারি মোট বইছে সারাদিন, যে ছেলেমেয়েরা হাতে-হাতে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে রাতের অন্ধকারে, যে শিশুরা একজোট হলে খেলছে মৃতদেহ বয়ে নিয়ে যাওয়ার খেলা - হিন্দ রজাব সেই সমস্ত নিহত শৈশবের কন্ঠস্বর। হিন্দ রজাবের কন্ঠ কখনও হয়ে ওঠে সিরিয়ার সমুদ্রতটে ভেসে আসা দু বছরের আয়লান কুর্দির, কখনও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ছুড়ে ফেলা রাষ্ট্রহীন রোজিনা খাতুনের, কখনও বা মার্কিন বোমায় নিহত ইরানের ১৬৮ জন প্রাথমিক স্কুল-পড়ুয়ার। হিন্দ রজাব'দের বাঁচতে চাওয়ার আর্তি মনে করিয়ে দেয়, ভূগোলক জুড়ে যুদ্ধবাজ, মুনাফালোভী, নারীঘাতী-শিশুঘাতী রাষ্ট্রের কুৎসিত বীভৎসার প্রতি ধিক্কার ছিল আমাদের কবির কলমে। সে উত্তরাধিকার আমরা চেতনায় ধারণ করতে পারছি কি? সময় এবং সমাজের চলতি স্রোত যখন আমাদের বিস্মরণের দিকে ঠেলতে চায়, তখন 'দ্য ভয়েস অফ হিন্দ রজাব' এর মতো ছবি বলে যায় - ভুলে যাওয়া অপরাধ। ■
!!!
পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২
দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com