সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

"পথের দাবী"র শতবর্ষ : একটি প্রতিবেদন

তিন টাকা দামের একটা বই। সেটা এমনকি পঞ্চাশ, একশো, দুশো টাকা দিয়ে কেনার জন্যও হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল, প্রায় একশো বছর আগে, ১৯২৬ সালে, এই বাংলায়।
৪২৬ পৃষ্ঠার বইটা সাদা কাগজে বোর্ড বাঁধাই করা। উপর দিকে লাল অক্ষরে লেখা, ‘পথের দাবী’। লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। প্রকাশক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। বহিরাবরণে নিতান্তই মামুলি এই বইয়ের ভিতরের পাতায় পাতায় কালো হরফে যে অনন্ত সূর্যোদয়ের আকাঙ্ক্ষা রোপিত হয়েছিল পৃথিবীর যে কোনো লুঠেরা সাম্রাজ্যকে ধুলিসাৎ করার সম্ভাবনা সৃষ্টির বীজ আছে তার মধ্যে। তাই এই বই ছাপাতে অনেক প্রকাশক রাজি হয়নি। কেউ কেউ বলেছিলেন কিছু অংশ বাদ দিতে। শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, ‘একটি শব্দও না।’ শেষে উমাপ্রসাদ যখন রাজি হন তখন শরৎচন্দ্র তাঁকে বললেন, ‘ছাপিয়ে যদি জেল হয় তোমার’? উমাপ্রসাদ একটু হেসে বললেন, ‘জেলে যাব। তবে জেল হলে তো একা প্রকাশকেরই হবে না। লেখকেরও হবে। দুজনে একসঙ্গে জেলে থাকব। আপনার সঙ্গে থাকা- সে তো মহাভাগ্যের কথা।’ শরৎচন্দ্র গম্ভীর ভাবে মাথা নেড়ে বললেন, ‘দেখো, যেন গড়গড়াটা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারি।’
অত্যাচারী শাসকের পক্ষে ‘মারাত্মক বিষাক্ত’ এই বই প্রকাশের সাথে সাথে ব্রিটিশ সরকারের হৃৎকম্প শুরু হয়ে গিয়েছিল। তারা ‘পথের দাবী’ উপন্যাসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। কারণটা স্পষ্ট হয় বাংলার তৎকালীন অ্যাডভোকেট জেনারেল স্যার ব্রজেন্দ্রনাথ মিত্রের রিপোর্টে। তিনি উপন্যাসের নানা সংলাপ উদ্ধৃত করে লিখেছিলেন, ‘‘এখানে কোনোই সন্দেহ থাকে না যে এ বইয়ের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ঘৃণা ও অসন্তোষ সৃষ্টি করা। এ বইয়ের সমিতি ভেঙে দেবার কথা, বিপ্লবের উপযুক্ত সময় আসেনি; এ সব যে আছে এগুলি আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে... এই বইয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণার উদ্রেগ করার অপচেষ্টা যথেষ্টভাবে পরিষ্কার... আমি মনে করি এই বইটি ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪এ ধারার আওতায় পড়ে এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯এ ধারা অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার যোগ্য।’’ তিনি লিখেছেন, ‘‘I have carefully read the book 'Pather Dabi'. The author is one of the foremost novelists in Bengal and is widely read. His previous novels dealt with social problems. This is, to my knowledge, the first book dealing with political matters.
...There are three dominant ideas which run through the book. First, that in a dispute between Indians on the one hand– and the Europeans or Eurasians on the other hand, the former get no justice in the courts in India. Secondly, that the cupidity of the European mill owners has brought about grinding poverty of the labourers in India and brutalized them. And thirdly, that the British Government in this Country is run in the interests of British merchants, resulting in inhuman exploitation and reducing the people to a state of abject poverty and helplessness Towards the end of the book– the hero works himself up to a state of frenzy, throws away all restraint and preaches pure bolshevism.’’ এই কারণে উপন্যাসটার সমস্ত কপিও বাজেয়াপ্ত করতে চেয়েছিল সরকার, কিন্তু প্রথম সংস্করণের তিন হাজার কপি বই ছাপার পরপরই নিমেষে বিক্রি হয়ে যায়।
প্রকাশক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পরবর্তীকালে লিখেছেন, ‘‘বাজেয়াপ্তির হুকুম বেরুল, কিন্তু একখানি মাত্র বই সরকারের হাতে গেল। আর সব বই-ই তখন অদৃশ্য হয়েছে। তার কারণ, ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একদিনের মধ্যেই সব বই কলকাতা সহরের মধ্যে ও বাইরে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে রেখে দেওয়া হয়, যাতে সন্ধানে এলেও সব বইগুলি পুলিশের হাতে না পড়ে। কয়দিনের ভিতর সব বইগুলি বিক্রীও হয়ে গেল। তাই আইনতঃ বই-এর প্রচার বন্ধ হোল কিন্তু, ছাপা সব বই-ই তখন পাঠকদের হাতে। এদিকে বাঙলার বিপ্লবীদলের উৎসাহে ও উদ্যোগে অজ্ঞাত প্রেস থেকে নূতন সংস্করণ বার হয়ে বহু স্থানে বই ছড়িয়ে পড়ল। হাতে-লেখা সম্পূর্ণ বই-এর কপিও আমি দেখেছি। বাঙলার ঘরে ঘরে পথের দাবী পড়ার বা এক কপি পথের দাবী কাছে পাওয়ার জন্যে সে কি আকুল আগ্রহ!’’
’পথের দাবী’ সে যুগের বিপ্লবীদের মধ্যে প্রবল আলোড়ন ফেলেছিল। বইটি প্রকাশের কিছুদিন পরে ব্রিটিশ পুলিশ কমিশনার শরৎচন্দ্রকে বলেন, ‘জানেন শরৎবাবু, পথের দাবী লিখে আপনি আমাদের কত বড় ক্ষতি করেছেন। যেখানেই আমরা বিপ্লবীদের ধরতে যাই দেখি তাদের কাছে অন্তত দু’টি বই নিশ্চয়ই আছে। একটি ‘গীতা’ আর অপরটি ‘পথের দাবী’। এ বই বিপ্লবীদের ক্ষেপিয়ে তুলেছে।’
সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া এই ‘পথের দাবী’কে ব্রিটিশ সরকার রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা দেওয়ার পর তার পক্ষে বিপক্ষে লেখালিখি কম হয়নি। ব্রিটিশ অপশাসনের তাঁবেদারেরা উপন্যাসটাকে কদর্য ভাষায় কালিমালিপ্ত করার অপচেষ্টা করেছে। আবার, এই উপন্যাসের সাহিত্যগুণ ও নিষেধাজ্ঞার অযৌক্তিকতা সম্পর্কেও নানা পক্ষ থেকে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। বিশেষত, যে পত্রিকা সে সময়ে সাহিত্য জগতে সাড়া ফেলেছিল সেই কল্লোল পত্রিকা লিখেছে, ‘‘এতকাল পরে শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের ‘পথের দাবী’ উপন্যাসখানি সত্যই বাজেয়াপ্ত হইল। গত বুধবারের (১২ই জানুয়ারী ১৯২৭) extraordinary গেজেটে উহা বাজেয়াপ্ত হইল বলিয়া বিজ্ঞাপিত হইয়াছে। বাংলাদেশের একখানা উপন্যাসকেও শেষকালে খাস-দখলে টানিতে হইল! বাংলা সাহিত্যের পরম ক্ষতি যে একখানি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস এরূপে বন্ধ হইয়া গেল।’’ ‘আত্মশক্তি’ পত্রিকা লিখেছে, ‘‘শরৎচন্দ্র সত্যই বলিয়াছেন, আমাদের এ পরাধীন দেশে সাহিত্যের সম্যক স্ফূর্তি ও প্রকাশ সম্ভব নহে। সরকারের হস্তে তাঁহার এই প্রথম পরাজয়ে, কিংবা বিজয়ে, আমরা তাঁহাকে আন্তরিক অভিনন্দিত করিতেছি। তাঁহার লেখনী হইতে আরও দাবী প্রকাশিত হউক, ইহাই আকাঙ্ক্ষা।’’ এরকম অভিনন্দন শরৎচন্দ্র অগণিত পেয়েছিলেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু-সহ অনেকে আইনসভায় এই নিষেধাজ্ঞার ব্যাখ্যা দাবি করেছিলেন। রোমাঁ রোলাঁ বলেছিলেন, ‘শরৎচন্দ্র একজন প্রথম শ্রেণির শিল্পী। কিন্তু বাংলা সরকারের কিছু কর্তাব্যক্তি শরৎচন্দ্রের একটি উপন্যাসে রাজদ্রোহের গন্ধ পেয়েছেন। সুতরাং এটি এমন বই- যা সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক, নাকি আমলাতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক?’
‘পথের দাবী’ উপন্যাসের নিষিদ্ধকরণ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের চিঠি বিনিময়ের প্রসঙ্গটি বহু আলোচিত। বিষয়টা মাঝে মধ্যে বিকৃত ভাবে উপস্থাপিত হতেও দেখা যায়। ঘটনা হল, রবীন্দ্রনাথকে যখন বই নিষিদ্ধকরণের প্রতিবাদ করার অনুরোধ করা হল, তখন রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সরকারের কাজ সরকার করেছে। সেটা মেনে নিতে হবে। শরৎচন্দ্রকে চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘‘তোমার ‘পথের দাবী’ পড়া শেষ করেছি। বইখানি উত্তেজক। অর্থাৎ ইংরেজের শাসনের বিরুদ্ধে পাঠকের মনকে অপ্রসন্ন করে তোলে। লেখকের কর্তব্যের হিসাবে এটা দোষের না হতে পারে; কেননা লেখক যদি ইংরেজরাজকে গর্হণীয় মনে করেন তাহলে চুপ করে থাকতে পারেন না। কিন্তু চুপ করে না থাকার যে বিপদ আছে, সেটুকু স্বীকার করাই চাই।’’
ওই চিঠিতে এও তিনি লিখেছেন যে, ‘‘শক্তিমানের দিক দিয়ে দেখলে তোমাকে কিছু না বলে তোমার বইকে চাপা দেওয়া প্রায় ক্ষমা। অন্য কোন প্রাচ্য বা প্রতীচ্য বিদেশী রাজার দ্বারা এটি হত না। আমরা রাজা হলে যে হতই না, সে আমাদের জমিদারের ও ভারতীয় রাজন্যের বহুবিধ ব্যবহারে প্রত্যহই দেখতে পাই। কিন্তু তাই বলে কি কলম বন্ধ করতে হবে? আমি তা বলিনে; শাস্তিকে স্বীকার করেই কলম চলবে। যে কোন দেশেই রাজশক্তিতে প্রজাশক্তিতে সত্যকার বিরোধ ঘটেছে, সেখানে এমনিই ঘটেছে; রাজবিরুদ্ধতা আরামে নিরাপদে থাকতে পারে না এই কথাটা নিঃসন্দেহে জেনেই ঘটেছে।’’
চিঠির শেষের দিকে তিনি লিখেছেন, ‘‘তুমি যদি কাগজে রাজবিরুদ্ধ কথা লিখতে, তাহলে তার প্রভাব স্বল্প ও ক্ষণস্থায়ী হত; কিন্তু তোমার মতো লেখক গল্পচ্ছলে যে কথা লিখবে তার প্রভাব নিয়ত চলতেই থাকবে। দেশে ও কালে তার ব্যাপ্তির বিরাম নেই; অপরিণত বয়সে বালক-বালিকা থেকে আরম্ভ করে বৃদ্ধরা পর্যন্ত তার প্রভাবের অধীনে আসবে। এমন অবস্থায় ইংরেজরাজ যদি তোমার বই প্রচার বন্ধ করে না দিত তাহলে এই বোঝা যেত যে, সাহিত্যে তোমার শক্তি ও দেশে তোমার প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধে তার নিরতিশয় অবজ্ঞা ও অজ্ঞতা।’’
বোঝাই যায়, রবীন্দ্রনাথ তাঁর অবস্থান থেকে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানাননি। নিষেধাজ্ঞা জারি যে অন্যায় হয়েছে, একথা বলেননি। অন্যভাবে বলেছেন, ‘‘যে কোন দেশেই রাজশক্তিতে প্রজাশক্তিতে সত্যকার বিরোধ ঘটেছে, সেখানে এমনিই ঘটেছে’’। সরাসরি অন্যায় বলেননি তার অর্থ এই নয় যে, শরৎচন্দ্রের সাথে তাঁর কোনও রেষারেষি ছিল। একেবারেই তা নয়। রবীন্দ্রনাথ গুণীর কদর করতে জানতেন, যোগ্যকে মর্যাদা দিতে জানতেন। তাই তিনি আজীবন নবজাগরণের মনীষী রামমোহন-বিদ্যাসাগরকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে যেমন শ্রদ্ধা নিবেদন করে গেছেন, তেমনি সেই ধারার দুই অতুলনীয় সাহিত্যকার নজরুল ও শরৎচন্দ্রকে অসীম স্নেহে লালন করেছেন। শরৎচন্দ্র সম্পর্কে তাঁর প্রচুর কথা আছে যা একইসঙ্গে প্রমাণ করে তাঁর মহত্ত্ব এবং শরৎচন্দ্রের অসাধারণত্ব। দিলীপকুমার রায় শরৎচন্দ্রের ‘নিষ্কৃতি’ ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন এবং তার ভূমিকা লিখে দেওয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সেই ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন এবং তাতে এক জায়গায় শরৎচন্দ্র সম্পর্কে লিখেছেন, ‘‘He has achieved the best reward of a novelist­ he has completely won the hearts of Bengali readers.’’
যাইহোক, ‘পথের দাবী’র উপর নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চিঠির উত্তরে শরৎচন্দ্র লিখলেন, ‘‘আপনি যা কর্তব্য এবং উচিত বিবেচনা করেছেন তার বিরুদ্ধে আমার অভিমানও নেই, অভিযোগও নেই। কিন্তু আপনার চিঠির মধ্যে অন্যান্য কথা যা আছে সে সম্বন্ধে আমার দুই-একটা প্রশ্নও আছে, বক্তব্যও আছে।... নানা কারণে বাংলা ভাষায় এ ধরনের বই কেউ লেখে না। আমি যখন লিখি এবং ছাপাই তার সমস্ত ফলাফল জেনেই করেছিলাম। সামান্য অজুহাতে ভারতের সর্বত্রই যখন বিনা বিচারে অবিচারে অথবা বিচারের ভান করে কয়েদ নির্বাসন প্রভৃতি লেগেই আছে তখন আমিই যে অব্যাহতি পাব, অর্থাৎ রাজপুরুষেরা আমাকেই ক্ষমা করে চলবেন; এ দুরাশা আমার ছিল না। আজও নেই। কিন্তু বাঙলাদেশের গ্রন্থকার হিসাবে গ্রন্থের মধ্যে যদি মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে থাকি এবং তৎসত্ত্বেও যদি রাজরোষে শাস্তি ভোগ করতে হয় তো করতেই হবে;তা মুখ বুজেই করি বা অশ্রুপাত করেই করি, কিন্তু প্রতিবাদ করা কি প্রয়োজন নয়?’’ কথাগুলো শরৎচন্দ্র লিখলেন বটে কিন্তু অন্য একটা আশঙ্কা থেকে সে চিঠি তিনি রবীন্দ্রনাথকে পাঠালেন না। আশঙ্কাটা এই যে, রবীন্দ্রনাথের ওই চিঠির কথা কোনও ভাবে যদি ব্রিটিশ সরকারের কানে যায় তাহলে বিপদ হবে। কারণ, রবীন্দ্রনাথ ওই চিঠিতে বলেছেন, ‘ইংরেজরা যথেষ্ট সহিষ্ণু, যা আর কোনও দেশে দেখতে পাওয়া যায় না।’ শরৎচন্দ্র বুঝেছিলেন, ব্রিটিশ সরকার নোবেলজয়ী কবির এই কথাকে বিশ্বময় প্রচার করবে এবং তার ফলে স্বাধীনতা আন্দোলন মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাধারানী দেবীকে চিঠিতে (১০ অক্টোবর ১৯২৭) তিনি লিখেছেন, ‘‘...কবির এতবড় সার্টিফিকেট তখুনি স্টেটসম্যান প্রভৃতি ইংরাজি কাগজওয়ালারা পৃথিবীময় তার করে দেবে। এবং এই যে আমাদের দেশের ছেলেদের বিনা বিচারে জেলে বন্ধ করে রেখেছে এবং এই নিয়ে যত আন্দোলন হচ্ছে সমস্ত নিষ্ফল হয়ে যাবে।’’ বিপ্লবী আন্দোলনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং দায়িত্ববোধের এ এক অনন্য নজির। এই আশঙ্কা থেকেই এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আর তিনি কথপোকথনের দিকে যাননি।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের আপসহীন ধারা সম্পর্কে শরৎচন্দ্রের গভীর সহানুভূতি ও আগ্রহ ছিল। কোনও নিষেধাজ্ঞা বা শাস্তির ভয় তাঁকে কখনও পিছিয়ে দিতে পারেনি। ‘বাঙ্গলার কথা’ পত্রিকায় একটা সভার বিবরণ দিতে গিয়ে ১৯২৯ সালের ১৭ মার্চ লেখা হয়েছিল, ‘‘সভাপতি শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র তাঁহার বত্তৃ«তায় দেশের বর্তমান সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার কথা আলোচনা করিয়া বলেন যে আধুনিক সাহিত্যে ইহাদের স্থান থাকা একান্ত প্রয়োজন। তিনি এই বলিয়া আক্ষেপ করেন যে সামাজিক প্রশ্ন সম্বন্ধে এখন অনেকে নির্ভীক ভাবে মত প্রকাশ করেন সত্য, কিন্তু রাজনৈতিক ব্যাপারে সেইরূপ নির্ভীকতা দেখা যায় না। তিনি এই বলিয়া তাঁহার বক্তৃতা শেষ করেন যে বড় সাহিত্যিক বড় জাতির অগ্রদূত স্বরূপ।’’ এই সামাজিক দায়বদ্ধতা, এই নৈতিকতা তাঁর ছিল, সে কথা বলাই বাহুল্য। তাই, লাহোরের একটি সভায় সরকারের প্রতি ঠাট্টা করে বলেছেন, ‘‘একটা বই লিখলুম, ‘পথের দাবী’, সরকার বাজেয়াপ্ত করে দিলে। তার সাহিত্যিক মূল্য কী আছে না-আছে দেখলে না। কোথায় গোটা দুই সত্য লিখেছিলুম, সেইটাই দেখলে।’’
সমাজের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের ধারাবাহিক চেষ্টায়, শরৎচন্দ্রের প্রয়াণের পর, ১৯৩৯ সালে উপন্যাসটির উপর থেকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উঠে যায় এবং সে বছরই ‘পথের দাবী’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ৪২৬ পৃষ্ঠার ওই বইটারও দাম রাখা হয়েছিল তিন টাকা। ছাপা হয়েছিল ৫২০০ কপি। প্রকাশক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তার পর থেকে বিগত একশো বছর ধরে কত প্রকাশক যে কত সংস্করণ ছাপছেন তার কোনও ইয়ত্তা নেই। আজকের শাসকশ্রেণির হাতে একে আইনত নিষিদ্ধ করার উপায় নেই। কিন্তু এই বইয়ের সংস্পর্শ থেকে পাঠকদের দূরে রাখার জন্য এর বিরুদ্ধে অপপ্রচারকে তারা যথেষ্ট উৎসাহিত ও পৃষ্ঠপোষকতা করে। কিন্তু সে সবের কোনও কিছুই ‘পথের দাবী’র অমোঘ আকর্ষণকে খর্ব করতে যাতে না পারে সে পাকা বন্দোবস্ত শরৎচন্দ্র তাঁর কালোত্তীর্ণ কলম দিয়েই করে গেছেন।
(সূত্র : পথিকৃৎ, জানুয়ারি ২০২৬)

পথিকৃৎ

আমাদের পত্রিকা ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত থাকুন এবং সর্বশেষ খবর ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট নিয়মিত পান

যোগাযোগ

পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২

দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com

গুরুত্বপূর্ণ লিংকসমূহ

© Pathikrit. All Rights Reserved. Designed By GenxByte