(প্রথম অংশের পর)
তাই তাঁর ঘোষিত আশা প্রকাশ পেয়েছে এই ভাবে - 'মানুষ জীবনে একবারই মাত্র বাঁচে এবং পূর্বজন্মের কোনও সঞ্চিত কর্মফলের বোঝা তার পিঠে চেপে নেই। তার জীবনের গতিপ্রকৃতি মূলত নির্ধারণ করে সে নিজে আর তার সামাজিক পরিবেশ এবং এই একটিমাত্র জন্মেই কোনো অজেয় শক্তি তার ভাগ্য নিরুপণ করে না। তার ইচ্ছার স্বাধীনতা প্রশ্নাতীত এবং এটি তার একটি অনপনেয় অধিকার, যা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। একবার এই অবস্থান গ্রহণ করলে মানুষ তার স্বাধীনতার ও সর্বাঙ্গীন সুখবিধানের সপক্ষে দাঁড়াবে, যার মধ্যে নিহিত আছে মানবিক সীমার বোধ, কিন্তু যা তাকে নিয়তির আতঙ্ক থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি দেয়। সমগ্র মানবজাতির পক্ষে মানুষের এই গর্ব প্রকাশের অধিকার রয়েছে যে, ইচ্ছা করা এবং সেই ইচ্ছাকে কাজে পরিণত করার শক্তি ও স্বাধীনতাও তার আছে। তথাকথিত নিয়তির ওপরে তার সামান্যতম জয়ও সমগ্র মানবজাতির আত্মিক সংগ্রামকে মহিমান্বিত করবে।' সমাজমুখী এক ব্যক্তিত্বের অধিকারী হিসাবে তিনি প্রত্যয়ী হয়ে বলেছেন, 'সর্বোপরি, ধীরে ধীরে মানুষ জন্মান্তরবাদ ও কর্মবাদের মোহ থেকে মুক্ত হবে। মানুষের এই সমাজব্যবস্থা যে সমাজপতিদের কায়েমী স্বার্থ ও তার সম্বন্ধে ধর্মমোহাচ্ছন্ন এই বোধটি অক্ষুণ্ণ রাখা তার সঙ্গে স্বর্গ ও নরক সম্বন্ধে লোভ ও আতঙ্ক দিয়ে তাকে নিয়তির পায়ে মাথা খোঁড়ার লক্ষ পদ্ধতির বিধান দেওয়া এগুলির স্বরূপ খোলা চোখে দেখে সমূলে প্রত্যাখ্যান করার শক্তি তার জন্মাবে। এই আত্মশক্তি তার প্রত্যয় জাগাবে ভবিষ্যৎ জয় সম্বন্ধে। নিয়তিকে পদদলিত করে ক্রমেই জয়যুক্ত হতে থাকবে আত্মশক্তি।'
□ যুগ-যুগান্ত ধরে নারীর অবস্থার বেদনাভরা ইতিহাস □
মানুষের পার্থিব জীবন সম্পর্কে দৃঢ় প্রত্যয় এবং ব্যক্তিত্বের এই কাঠামোটি সুকুমারী ভট্টাচার্য্যের চরিত্রের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। এবং ছিল বলেই তিনি প্রচলিত সমাজের অযৌক্তিক বিধি নিষেধের বেড়াকে ভেঙেছেন। প্রচলিত সমাজের নারীজীবনের যে ছবিটি আমাদের কাছে অতি পরিচিত- তা তিনি অস্বীকার করে নিজেকে একজন মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যথার্থই সফল হয়েছিলেন। শরৎচন্দ্র গভীর বেদনায় যে বলেছিলেন 'মেয়েমানুষকে আমরা মেয়ে মানুষ করে রেখেছি, মানুষ করতে পারিনি' সুকুমারী ভট্টাচার্য্য তাঁর জীবনে ব্যক্তিত্বের অধিকারী সেই মানুষ হওয়ার প্রক্রিয়াকে গ্রহণ করেছেন। জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে নারীর অগ্রণী ভূমিকা আজও সমাজে সর্বক্ষেত্রে সমানভাবে পরিলক্ষিত হয় না। আর যে সময়ে অধ্যাপিকা ভট্টাচার্যের ছাত্রাবস্থা সেই সময় নবজাগরণের চিন্তা এ দেশে পরিস্ফুট হলেও একজন নারীর স্বাধীনচেতা মনোভাব, জাতি ধর্ম বর্ণের বিভেদসীমাকে অস্বীকার করে নারী-পুরুষকে সমানভাবে দেখার উপযুক্ত সামাজিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। পরিবারের সূত্রে যে জীবনবোধ তিনি পেয়েছিলেন তা একদিকে যেমন তাঁর স্বাধীনচেতা মনোভাবকে জাগ্রত করেছিল, তেমনি জ্ঞানার্জনের পথে সেই চেতনা ক্রমাগত স্ফুরিত হয়েছে।
বাল্যকালে দিদিমা, বাবা, মা এবং পিসিমার সংস্পর্শে গড়ে ওঠা সুকুমারী ভট্টাচার্য জ্ঞানচর্চার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। তাঁর মা শান্তা দত্ত প্রথাগত শিক্ষার বাইরেও জ্ঞান জগতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অনেক বেশী চর্চা করেছেন। পিতার কাছে সুকুমারী ভট্টাচার্য্য সুযোগ পেয়েছিলেন পড়াশুনা করার। পেয়েছিলেন বিপুল ক্ষেত্রের দৃষ্টিকে উন্মোচন করার সুযোগ। তদানীন্তন কালে অনেকের ধারণা ছিল, মেয়েরা লেখাপড়া শিখে কী করবে? জজ ব্যারিষ্টার হবে? সেই তো রাঁধবে আর ছেলে মানুষ করবে। এই চিন্তাকে পরিহার করে পড়াশুনা করার অবস্থা প্রস্তুত করবার ক্ষেত্রে পিতার সস্নেহ সাহায্য সুকুমারী ভট্টাচার্য্যের জীবনে উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। তিনি নিজের কথাতে এও বলতেন যে- লেখাপড়া করাটা ছিল একটা বড় বিদ্রোহ।
তিনি প্রাচীন ভারতের নারীর অবস্থাকে বিশেষভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। দেখেছেন, যে বিশেষণেই নারীকে বিশেষিত করা হোক না কেন, মাতৃত্বের যে গৌরবের মহিমাই প্রচার করা হোক না কেন - নারীর যন্ত্রণা, ব্যথা - নারীর সামাজিক নিপীড়নকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তিনি দেখিয়েছেন, 'ঋগ্বেদে বেশ কয়েকজন নারী কবির নাম জানা যায় - ঘোষা, শ্বাশ্বতী, রোমশা, লোপামুদ্রা, অপালা, বিশ্ববারা তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ঋগ্বেদে অত্ত্বণ ঋষির কন্যা বাক্ (অর্থাৎ বাণী) যাবতীয় প্রধান দেবতাদের যথার্থ মূর্ত রূপ হিসাবে আত্মপরিচয় ঘোষণা করতে অগ্রণী হয়েছিলেন। সংক্ষেপে বললে, বেদান্ত দর্শনের ভিত্তিভূমিতে যে সোহম্ (অর্থাৎ আমিই সেই) তত্ত্ব আছে, তিনি তাই উচ্চারণ করেন। তবু সামাজিক মর্যাদায় তাঁর স্থান অধস্তন। সামাজিকভাবে যারা উর্ধ্বতন, বিশেষত পুরুষ, তাঁদের সামনে তাঁর মুখ খোলা অনুচিত। তাঁর অবদান অনাদৃত থেকে গেছে।' অর্থাৎ ক্ষমতা, যোগ্যতা, জ্ঞান থাকলেও শুধুমাত্র নারী বলেই তার যথাযথ স্বীকৃতি মেলে না। যুগ-যুগান্তের এই ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায় না।
তিনি প্রাচীন ভারতের ইতিহাস থেকে দেখিয়েছেন, 'নারীর যে দ্ব্যর্থহীন চিত্র বেরোয় তাতে নারীকে মূলত ঊনমানবী হিসাবে দেখা হয়। যার জীবনে একমাত্র উদ্দেশ্য পুরুষকে তার যৌবন, রূপ, লাস্য এবং গৃহকর্মে তার শ্রম দিয়ে তুষ্ট করা। সেই পুরুষ ও তার আত্মীয়স্বজনকে নম্র হয়ে সেবা করতে হবে, কাজে বা কথায় তাদের কোনো প্রতিবাদ না করে। নিজের শরীরের উপর তার কোনো অধিকার নেই, তার সম্পত্তি অর্জন বা ভোগ করার অধিকার নেই, এমনকি স্বামীর সম্পত্তিতেও অধিকার নেই।' বলেছেন, 'বৈদিক যুগের প্রারম্ভে তার কিছুটা সম্মান ছিল। ঋগ্বেদে উষস্কে সূর্যের পত্নী বলা হয়েছে যে স্বামীর আগে আগে যায়। এ নিশ্চিতভাবে সমাজের প্রতিবিম্ব। তবে কী করে সে স্বামীর ছায়ারূপে তার অনুসরণ করে, কোনোরকম ব্যক্তিত্বের লেশমাত্র রহিত হয়ে? এর উত্তর দিতে হলে বৈদিক মানুষের সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনে পরিবর্তনের মধ্যে অনুসন্ধান করতে হবে। তারা যাযাবর ও পশুপালক জাতি থেকে কৃষিতান্ত্রিক জীবনে স্থিতিলাভ করল, সেখানে উন্নততর প্রযুক্তি ও লোহা ও লাঙলের ব্যাপক ব্যবহার- যা অর্বাচীন বৈদিক যুগে দেখা যায়, তার ফলে, এবং মধ্যপ্রাচ্য, গ্রীস ও রোমের সঙ্গে নৌবাণিজ্য সূত্র পুনর্ভুক্ত হওয়ার ফলে সংখ্যালঘু এক শ্রেণীর হাতে প্রচুর উদ্বৃত্ত ধন সংগৃহীত হল। এই সংখ্যালঘু শ্রেণীর আকাঙক্ষা ছিল তার প্রকৃত সন্তান সন্ততির হাতে, অর্থাৎ যে পুত্রদের সে তার পত্নীর গর্ভে উৎপন্ন করেছে তাদের হাতে দিয়ে যাবার সন্তানপরম্পরা নির্দিষ্ট করতে এবং পুত্রদের তার উরসপুত্র বলে চিহ্নিত করতে স্ত্রী'র অন্য পুরুষ সঙ্গ নিবৃত্ত করা আবশ্যক ছিল। এটি সুনিশ্চিত করা যেত শুধুমাত্র আত্মীয় পুরুষের সাথে স্ত্রীর সাক্ষাৎ নিষিদ্ধ করে।' স্বাভাবিকভাবেই এর ফলশ্রুতিতে নারীজীবনে বন্দীদশা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অন্তঃপুরবাসিনী আখ্যায় আখ্যায়িত হতে থাকে সমগ্র নারী সমাজ।
□ মাতৃত্বেই নারীর চরম সার্থকতা - অথবা ব্যক্তিত্বের প্রকাশে □
একথা ইতিহাসসম্মত যে, মাতৃত্বের মহিমা প্রচার এ দেশে যেমন হয়েছে তেমন বিশ্বে কোথাও হয়নি। মাতৃত্ব নারীর উপর কেবলমাত্র আরোপিত এক প্রথা ছিল না, নারীকে বাধ্য করা হত মাতৃত্বকেই নারী জীবনের মূল তত্ত্ব হিসাবে মেনে নিতে। কিন্তু তা কি নারীর কাছে আনন্দদায়ক ছিল? এ প্রশ্নে অধ্যাপিকা ভট্টাচার্য্য বলেছেন, 'মাতৃত্ব যে আনন্দময় হতে পারে, যখন নারী নিজে তা চায়, এবং গর্ভধারণ ও প্রসবের কষ্ট সহ্য করতে প্রস্তুত হয় এই আশায় যে, দম্পতির কিছুটা যৌথ নিয়ন্ত্রণ থাকবে সন্তানের উপর। কন্যাসন্তান যে পুত্রের মতই সুখকর ও আনন্দদায়ক হতে পারে, মা যে নিজের ইচ্ছায় কষ্ট সহ্য করেছে একটি জীবনকে পৃথিবীতে আনার জন্য, তাই কিছু সম্মান তার প্রাপ্য এসব কথা প্রাচীন ভারতে কোনো মা ভাবতেই পারত না। সে শুধু তার উর্বরতার গর্ব করত যে শক্তি তুচ্ছতম প্রাণীরও আছে কিন্তু তার কষ্টের জন্য কোনো প্রকার স্বীকৃতি প্রত্যাশা করত না, তার আনন্দ, তার আশা-আকাঙ্ক্ষা, তার স্বপ্ন, সবই শিশুর মধ্যে বদ্ধ যতদিন যে সাবালক হয়ে না ওঠে, এবং তার পরেও ভিন্ন স্তরে। সন্তানকে আনার 'ইচ্ছা' থেকে সে বঞ্চিত, শিশুর মানসিক লালন-পালন ও শিক্ষাদান থেকে সে বঞ্চিত, সে শুধুমাত্র গর্ভধারণের যন্ত্রে পর্যবসিত।' ঐতিহাসিক পটভূমির প্রেক্ষিতকে তুলে ধরে তিনি দেখিয়েছেন, 'প্রাচীন ভারতে নারীদের জন্য অর্থ উপার্জন, অধিকার ও ব্যয় করার থেকে এবং অর্থ বা অন্য সম্পত্তি বিক্রি, বাধা দেওয়া, গচ্ছিত রাখা বা দান করা থেকে বঞ্চিত করার ব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করলে আমরা কয়েকটি কারণ দেখতে পাই। আর্যরা উত্তর ভারতীয় ভূখণ্ডের অধিকাংশ দখল করে নেওয়ার পর তাদের অল্প মূল্যের দাসের এক সরবরাহ ছিল। পূর্বে পরিবারের মেয়েরা বাইরের অর্থনৈতিক কার্যকলাপে পুরুষের সহায়তা করত, এবং তাই তারা উৎপাদন প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে স্বীকৃতি পেত। তারা উপার্জনকারী বা উপার্জনকারীর সহায়ক হিসেবে কিছুটা মানবিক সম্মান পেত। কিন্তু আর্যদের ব্যবহারে যখন বিশাল এক দাস শ্রেণী কাজে লাগল তখন নারীদের আর বাইরের শ্রমসাধ্য কাজে যোগ দিতে হত না। ততদিনে দেশের ভেতরে এবং সাগর পারে উৎপাদন ও বাণিজ্যের উদ্বৃত্ত সঞ্চিত হয়েছে শ্রেণীবিভক্ত এক সমাজে অল্প সংখ্যক সুবিধাভোগীর হাতে। ব্রাহ্মহ্মণ সাহিত্য থেকে শুরু করে আমরা সমাজের উপরের স্তরে মুষ্টিমেয় কিছু পরিবারের পরিস্ফুট ভোগের উল্লেখ পাই। সেই সময়ে আইনসঙ্গত উত্তরাধিকারীর হাতে সম্পত্তি রেখে যাওয়ার উৎকণ্ঠায় অন্তঃপুরেও পুরুষের আরও সজাগ পাহারায় নারীর আরও কঠিন বন্দীত্ব উপস্থিত হলো। তাছাড়া এইভাবে ঘরে থাকায় নারীর রূপের সৌকুমার্য বজায় রইল, যা সম্পত্তির পুরুষ অধিকারীদের কাছে প্রিয়। তখন একথা স্পষ্ট হলো যে নারীরা, যাদের মধ্যে অধিকাংশই প্রকৃতপক্ষে নিরক্ষর এবং কেবলমাত্র গৃহকর্মে নিপুণ। তারা অর্থনৈতিকভাবে তাদের স্বামীদের উপর বোঝা। এবং এই থেকেই তাদের ভোগ্যবস্তু হিসেবে গণ্য করার পদ্ধতি সহজ হল। খ্রীষ্টপূর্ব ২য় শতকে বাৎসায়ন নারীর সম্বন্ধে দুই পরিপ্রেক্ষিতে কুমারী হিসেবে ও গণিকা হিসেবে পরিষ্কার বলেছেন, তাদের সমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয়ভাবে সাজগোজ করতে হবে, কারণ নারী পণ্য।' নারীর রূপচর্চার এই হ'ল করুণ ইতিহাস। আশ্চর্যের বিষয় হল, এই সমাজে শিক্ষায় প্রতিপত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পুরুষদের গণিকা সাহচর্য তাদের প্রতিপত্তি বাড়িয়ে তুলত কিন্তু সেই গণিকার জন্য ছিল সম্পূর্ণ অনিশ্চিত জীবন। শিক্ষিতা গণিকা পেত ঘৃণামিশ্রিত আকর্ষণ- আবার অন্য গণিকার জীবন ছিল প্রান্তবাসিনীর মত কঠিন সংগ্রামে ভরা। শ্রীমতি ভট্টাচার্য্য বলেছেন, 'সমাজ যেখানে নিজের স্বার্থে এই অত্যন্ত অসুস্থ ও অপমানজনক বৃত্তিটিকে জিইয়ে রেখেছিল সেখানে গণিকা সম্বন্ধে তার কিছু দায়িত্বও ছিল- যা সমাজ পালন করেনি'।
আমরা দেখতে পাই মানবিক মর্যাদার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সবকিছু থেকেই নারীরা বঞ্চিত। বৈদিক যুগেই শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত, জীবিকার অধিকার থেকে বঞ্চিত। প্রাচীন যে সমাজের গর্ব করি আমরা হিন্দুত্বের দোহাই পেড়ে সেখানে মেয়েদের মন বলে কোন বস্তুর কোন উল্লেখ নেই। জাতকের গল্পেও যে ছবি চিত্রিত তাতে নারীর উপর নির্মমতাকেই প্রকট করে তোলে। অধ্যাপিকা ভট্টাচার্য্য মন্তব্য করেছেন, 'প্রায় সব বেদগ্রন্থই দেখিয়েছে নারী শুধু অধম জীব নয়, অকল্যাণকরও বটে। বেদে একথা স্পষ্ট আছে যে নারীর শরীর তার নিজস্ব নয়, এবং এতটুকু ওজর আপত্তি না করে পতির কাছে আত্মসমর্পণ করা বিধেয়।'
বর্তমান সমাজের প্রেক্ষিতে নারীর তদানীন্তন সময়ের বন্ধন বোঝা হয়ত সব সময় সম্ভব হয় না সকলের পক্ষে। যদিও চতুর্দিকে নারীর চরম লাঞ্ছনার যে চিত্র আজ দেশজুড়ে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করছে তাতে শিউরে উঠতে হয়। একবিংশ শতাব্দীতে আজও মানুষ হিসাবে নারীর মর্যাদা আমরা কি সত্যিই দিতে পারছি? চলছে অনার কিলিং - এর নামে নির্বিচারে নারী হত্যা। প্রতিদিন দেখছি নারীর চূড়ান্ত সম্ভ্রমহানি। সুকুমারী ভট্টাচার্য্য এই বিষয়ে মর্মস্পর্শী আবেদন রেখে গিয়েছেন সকলের কাছে। সতী হওয়া 'রূপ কানোয়ারের' ঘটনা, দেওরালার ঘটনা তাঁর মনে তুফান তুলেছিল। তিনি যে কথা বলেছিলেন আজ আমাদের দেশে তাকে স্মরণ করার আবার নতুন করে প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে। তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন, 'আজ একুশ শতকের দরজায় দাঁড়িয়ে আমরা এই সতীদাহের সগর্ব প্রশংসা শুনছি। আর সমাজ এইভাবে কৌশলে নারী হত্যা করছে কারণ ভারতবর্ষে পুরুষ হত্যা অপরাধ, কিন্তু নারী হত্যা তা নয়। পরিবর্তে ধর্মের নামে, পবিত্রতার নামে নারীহত্যা করতে পারা সমাজের কাছে সর্বদাই গৌরবের বস্তু। হিন্দু সমাজ ভয় দেখাচ্ছে যে, এই পবিত্র হত্যাকার্যের অধিকারে তারা কোন হস্তক্ষেপ সহ্য করবে না, আত্মহত্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে পুণ্যকর্ম পুণ্য অগ্নিকে উজ্জীবিত রাখার জন্য সেই আত্মহত্যার স্থলে মন্দির তোলা হচ্ছে। যতদিন শিক্ষা, প্রগতি যুক্তিনির্ভর বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গীর মাধ্যমে এই জঘন্য ধর্মীয় অন্যায় নরনারীর চেতনা থেকে উৎপাটিত না হয়, সমাজ সচেতন ভাবে এই সব ঘটনাকে প্রতিরোধ না করে, এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি না দেয় ততদিন, শুধু রূপ কানোয়ারের সঙ্গে সঙ্গেই সতী প্রথার শেষ হবে না।' একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, হিন্দু সমাজ নারীর স্বাতন্ত্র্যকে কোনদিনই স্বীকৃতি দেয়নি, বরং ঘোষণা করেছে- নারী স্বাধীনতা পাওয়ার যোগ্য নয়। সমগ্র নারী সমাজকে তার স্বাধীনতার দাবীতে অগ্রণী হতে হবে। নারীর মধ্যে চাই ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। সুকুমারী ভট্টাচার্য্যের মত নারীরা তাঁদের সময়ে এই সংগ্রামকে বরণ করে নিয়েছিলেন। এটি যুগের প্রেক্ষিতে অনুসরণযোগ্য।
ব্যক্তিজীবনে তাঁর আচরণও উল্লেখযোগ্য ছিল। নারী স্বাধীনতার কথা উন্মুক্ত কণ্ঠে বলেছেন- কিন্তু নারীবাদী তিনি ছিলেন না। তিনি খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন- 'পুরুষ তো শত্রুপক্ষ নয়। তার হাত ধরেই আমরা এগোবো'। নিজের জীবনে তাঁর দিদিমার ভূমিকাকে স্মরণ করে বলেছেন, 'দিদিমা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন -হ্যাঁরে বিয়ে-থা তো করবি তা ঠিক করেছিস কিছু? করেছিলাম, কিন্তু দিদিমার সামনে বলতে কেমন লজ্জা হল। বললাম- না করিনি। দিদিমা বললেন, দ্যাখ 'ধরে বেঁধে' বিয়ে করবি না। ধরে বেঁধে মানে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। যে শাড়িটা তিনবছর পড়লে ছিঁড়ে যাবে দোকানে সেই শাড়ি কেনার সময় বলে, কোনটা নেবে? আর যে মানুষটাকে জীবনে ফেলতে পারবে না তার বেলায় জিজ্ঞেস করে না কেন? তারপরে আরও শোন্ - আমরা আশীর্বাদ করার সময় বলি- সাবিত্রী-সমানা হও। আমরা ভুলে যাই যে, এই সাবিত্রী ঋষিদের সামনে একবছর পর সত্যবানের মৃত্যু হবে জেনেও জেদ করে বলেছিল, আমি তাকেই বিয়ে করব আর কাউকে নয় - আর সেইটেকেই সাবিত্রী করেছিল।"
বলেছেন, ব্যত্তিগতভাবে 'বিবাহের ক্ষেত্রে আমি চেয়েছিলাম সহধর্মিনী হতে তাঁর বিশ্বাস আমার বিশ্বাস এক হবে। আজ ৮৬ বছরের জীবনে দাঁড়িয়ে মনে হয় ধর্ম-অর্থ-প্রতিষ্ঠা- সব তুচ্ছ। নারী ও পুরুষের বিশ্বাসের বন্ধনটাই আসল। আসল পরস্পরকে সম্মানের আদর্শ। সামাজিক ক্ষেত্রেও কেউ কাউকে অতিক্রম করে নয় নারী পুরুষের সমতায় এগিয়ে চলুক আগামী সমাজ।' যথার্থ নারীমুক্তি সম্পর্কিত তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী ছিল স্বচ্ছ, প্রকৃত অর্থে আধুনিক এবং একদেশদর্শিতা থেকে মুক্ত। বর্তমান সময়ে এই সম্পর্কিত শিক্ষণীয় দিকগুলি নিয়ে চর্চা করা প্রয়োজন।
□ সাম্প্রদায়িকতার বর্তমান বীভৎসতা - নাগরিকের কর্তব্য □
প্রাচীন ভারতের ইতিহাস বৈদিক সাহিত্য চর্চা করতে গিয়ে অধ্যাপিকা ভট্টাচার্য্য অন্যান্য অনেক পণ্ডিতব্যত্তির মত কিন্তু গবেষণাগারের চার দেওয়ালের মধ্যে আটক হয়ে পড়েননি। এখানেই আমরা পাই পাণ্ডিত্যের অভিমানমুক্ত যা সামাজিক তাঁর সচেতন জ্ঞানসাধনার পরিচয় ভূমিকায় তাঁকে ক্রিয়াশীল করে তুলেছিল। রূপ কানোয়ারের সতী হওয়ার কলঙ্কজনক ঘটনা যেমন তাঁকে বিচলিত করেছিল- তেমনি বিগত শতাব্দীর নয়-এর দশকে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা এবং তার পরবর্তী ইতিহাস দেখে গভীর মর্মপীড়া অনুভব করেছিলেন। তিনি সেদিন দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, 'একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে আমাদের নাকি বৈদিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হতে হবে- বেদ জানতে হবে, সংস্কৃতে কথা বলা রপ্ত করতে হবে, চর্চা করতে হবে জ্যোতিষশাস্ত্রের। ভয়ঙ্কর ব্যাপার। এ তো পিছনে হাঁটার সামিল।' তিনি সুষ্পষ্ট ভাবে বলেছেন, 'সমাজ এগিয়েছে নীতিশাস্ত্রের উপর ভর করেই। 'এথিক্স' নিয়ে দুশো বছর ধরে বিস্তর চর্চা হয়েছে। আর বেদের নামে অত সহজে ছেড়ে দিতে হবে 'এথিক্স' বা নীতিশাস্ত্রকে? সভ্যতার বৈশিষ্ট্যগুলি ত্যাগ করতে হবে শুধুমাত্র একজন 'হিন্দু' বা 'নববৈদিক' হবার লিপ্সায়।' যতই আমরা নৈতিকতার উন্নত স্তরে 'বেদ'কে স্থাপনা করি না কেন- সত্য ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেছেন, 'তবে হিন্দুধর্মের সঙ্গে বেদের মিল আছে আর একটি বিষয়ে। বেদ এবং হিন্দু ধর্মের মূল শাস্ত্রগুলিতে নৈতিকতার কোনো বালাই নেই। মানুষের জীবন, নীতি, আদর্শের কথা ভাবতে হলে বেদে বিশেষ কোনো নির্দেশ পাব না। হিন্দু ধর্মেও একই অবস্থা। দু'ক্ষেত্রেই বার ব্রত পাব, চিহ্ন মিলবে না নৈতিকতার।' 'অনেকটাই এগিয়ে চলা সমাজের উপর জোর করে বহু পশ্চাতের বৈদিক ভাবনাচিন্তা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক ও অনৈতিহাসিকও।'
সম্প্রতি সংস্কৃত ভাষা সপ্তাহ পালনের প্রস্তাব এসেছে কেন্দ্রীয় সরকারী স্তরে। এর আগে সংস্কৃতভাষাকে শিক্ষার বাহন করবার চেষ্টা হয়েছে- যাকে অধ্যাপিকা ভট্টাচার্য্য অভিহিত করেছেন 'পাগলের প্রলাপ' হিসাবে। বলেছেন, 'আমি সংস্কৃতকে মৃতভাষা বলে মনে করি। যে ছেলেটি বায়োকেমিষ্টি পড়বে, যে মেয়েটি ডাক্তারী পড়বে, তার সংস্কৃত পড়বার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যদি কোন প্রয়োজন থাকে- যার প্রয়োজন সে শিখবে'। তিনি আরও বলেছেন, 'ওরা বলে সংস্কৃত ভাষা ধর্মের বাহন কতটা পর্যন্ত কথাটা ঠিক। প্রাচীন ভারতে ধর্মের বহু গ্রন্থ সংস্কৃতে রচিত হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে একথাও বলতে হবে নাস্তিকতার স্বপক্ষে অনেক বইও সংস্কৃত ভাষায় রচিত হয়েছে। চার্বাক, বৃহস্পতি আছে, জয়রাশির তত্ত্বোপপ্লবসিংহ যা নাস্তিক্যবাদ প্রচার করে, তাও সংস্কৃত ভাষায় আছে। বৌদ্ধ, জৈন, যা বেদকে স্বীকার করে না তাও সংস্কৃতে রয়েছে।' যারা এসব করছে তাদের অশুভ উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে বলেছেন, 'জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষের জন্য নয়, মানুষ এর ফলে বিশ্বাস করবে সংস্কৃত হচ্ছে হিন্দু ধর্মের বাহন। ভারতীয় ইতিহাসের শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে হিন্দু ধর্ম। এ দুটো মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত করে আগামী প্রজন্মের মনকে তৈরী করা।'
ধর্মের এই উন্মাদনা জার্মানীতে যে রক্তক্ষয়ী বর্বর ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল - তাকে তিনি তুলে ধরেছেন। বলেছেন ফ্যাসিবাদ, নাৎসীবাদ পৃথিবীর যেখানে এসেছে - সেখানে এই পথেই এসেছে। তিনি তাঁর কলেজ জীবনের পরিবেশকে উদ্ধৃত করেছেন এক স্মৃতি চারণায়। বলেছেন, 'ভিক্টোরিয়ার পরিবেশ ছিল খুব সুন্দর। হিন্দু মুসলিম সহাবস্থানটা খুব ভালো ছিল। কেউ খেয়ালই করত না যে ও মুসলিম, না হিন্দু না খ্রীষ্টান না কি? ভিকটোরিয়ায় আমি মানুষের ব্যবহার পেয়েছি। ব্রাহ্ম কলেজ বলে জাতিভেদ ছিল না কারোরই ছিল না। মুসলিম মেয়ের পরিচয় মুসলিম বলে নয়, হিন্দু মেয়ের পরিচয় হিন্দু বলে নয়, আমি যে খ্রীষ্টান তাই-বা ক'জন জানত তাও জানি না।'
অথচ এই দেশেই বাবরি মসজিদ ধ্বংস হল। এই পুরাকীর্তির ধ্বংসের ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন সুকুমারী ভট্টাচার্য্য- "বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় ক্যামেরা ঘুরে ঘুরে যখন একজন হিন্দু বিধবা বুড়ির কাছে গিয়ে থামল - বলল, 'মাতাজি আজকে এই যে সাড়ে পাঁচ ঘন্টা ধরে ভাঙার ব্যাপারটা ঘটল তা আপনার কেমন লাগল?' তিনি কপাল চাপড়ে বললেন, হায় রাম, তোমার এই দশা হল! অন্যের বাড়ি ভেঙে তোমায় থাকতে হবে? এই মহিলা ধর্মবিশ্বাসী হিন্দু মহিলা, এঁর কাছে রামের ব্যাপারটা একটা ধর্ম। তাঁর অপমান ঘটেছে সেদিন। তাই তিনি লজ্জিত, কুণ্ঠিত-অপমানিত বোধ করছেন। অথচ সঙ্ঘ পরিবারের এ অপমানবোধ নেই। টয়োটা গাড়িকে রথ সাজিয়ে নিয়ে লক্ষ্যটা তো দিল্লির মসনদ। ঠিক এই চলেছিল ব্যাপারটার সঙ্গে কিন্তু ধর্মের কোনো যোগ নেই। অথচ 'সুদীর্ঘ মুসলিম শাসনকালের কয়েক শতকের মধ্যে আরব, পারস্য থেকে বহু কবি, গায়ক, স্থপতি, ভাস্কর, চিত্রকর এসেছেন, তাজমহল, জামা মসজিদ, সেকেন্দ্রা বহু স্থাপত্যের অমূল্য নিদর্শন সৃষ্টি হয়েছে, সৌধগাত্রে অদ্ভুত সুরুচিসম্ভূত ভাস্কর্য। নির্মিত হয়েছে মিঞা কি মল্হার, দরবারি কানাড়া, নানা আশ্চর্য অপার্থিব ইমন কল্যাণ, বিলাবল সুরতরঙ্গ। গ্রন্থচিত্রণ থেকে মুঘল চিত্রশালার বহুতর ছবি এখনও প্রমাণ করে দেয় অপূর্ব চিত্রকলার। কত কবি কবিতা লিখেছেন এদেশেই আর্বি ফারসি উর্দুতে। কিন্তু এ বৃহৎ কালপর্বে ভারতবর্ষ থেকে একটি নয়া পয়সা আরবে বা পারস্যে যায়নি। এই দীর্ঘ সহাবস্থানের যুগে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈনরা পাশাপাশি শান্তি ও সৌহার্দ্যে বাস করেছে। ওপরতলায় কখনও কিছু ধর্মান্তরণ হলেও বৃহৎ জনসমাজে এতটুকু চিড় ধরেনি কোথাও।' অথচ বর্তমান সময়ে নতুন করে এই ভেদবুদ্ধিকে জাগিয়ে তোলার অপচেষ্টা চলছে।
এই সাম্প্রদায়িক মনোভাবের বিরুদ্ধে সুকুমারী ভট্টাচার্য্য সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করেছিলেন। আবার তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভারতবর্ষে বেশীরভাগ মানুষই ধর্মবিশ্বাসী। তিনি তাই বলেছেন, 'ধর্মবিশ্বাসকে সাম্প্রদায়িক করে তোলার উদগ্র প্রচেষ্টায় সঙ্ঘ পরিবার নিয়ত সক্রিয়, অতএব তাকে প্রতিহত করে বিশ্বাসীকে বোঝাতে হবে কোথায় সাম্যবাদ মানবিকতারই পরিপূরক। কোনো ধর্মেই সরাসরি হিংসাত্মক কাজের সমর্থন নেই, সব ধর্মেই প্রীতি, মৈত্রী, সাম্যের অনেক কথা আছে। ধর্মবিশ্বাসী যখন সাম্প্রদায়িকতার দিকে ঝুঁকবে তখন তাকে তো তার শাস্ত্রের বচন থেকেই দেখানো যায় যে, সাম্প্রদায়িকতা তার শাস্ত্রের শ্রেষ্ঠ শিক্ষার বিরুদ্ধে। তার মন যদি শিক্ষার দিকে উন্মুক্ত থাকে তাহলে তাকে দেখিয়ে দেওয়া যায় মানুষে মানুষে বৈষম্য এবং শোষণ নিপীড়নে সঙ্ঘ পরিবার ব্যবহার করছে মানুষের নীচতম প্রবৃত্তিকে, শাস্ত্রে এর সমর্থন তেমন নেই। যেমন আছে সহিষ্ণুতার। কীভাবে এরা শোষণের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্যাপৃত, সেটা সাধারণ ধর্মবিশ্বাসী মানুষকেও বোঝানো যায়। খণ্ডদুঃখ দূর করা যায়, খণ্ড সংগ্রামে, যুগযুগান্তের শোষণ থেকে মানবসমাজকে মুক্ত করতে পারে সাম্যবাদী শ্রেণীসংগ্রাম ও বিপ্লবতত্ত্ব। যখন কেউ এ মত গ্রহণে অনিচ্ছুক, তখন যে যতদূর পর্যন্ত তার মতবাদে স্থির থেকে শ্রেণী সংগ্রামে আমাদের সহযোদ্ধা, ততক্ষণ তাকে সাদরে গ্রহণ করা উচিত। যে মুহূর্তে তার বিশ্বাস তাকে সাম্প্রদায়িকতার ইন্ধন জোগাবে তখনই সতর্ক হয়ে প্রথমে মমতা নিয়ে সহিষ্ণুভাবে তাকে বোঝাতে হবে কোথায় তার ধর্মমতের পরিপন্থী সাম্প্রদায়িকতা।' এখানে সমাজ আন্দোলনের ক্ষেত্রে দেখা যায় তাঁর ভূমিকা সংগঠকের মত। কেবলমাত্র পাণ্ডিত্য নয় সমাজের ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা যারা নেবে তাদের কাছে বাস্তব কথাকে তুলে ধরা।
সাধারণভাবে মার্কসীয় চিন্তাধারার প্রতি তিনি আস্থাশীল ছিলেন। এই ধর্মীয় উন্মাদনাকে প্রতিহত করার ক্রিয়াশীল ভূমিকার প্রশ্নে বলেছেন, 'মার্কসের পরে মার্কসবাদও অপরিবর্তিত থাকেনি। ওইসব মত অবলম্বন করে দেশে দেশে বিপ্লবও সংঘটিত হয়েছে, কাজেই মার্কসবাদের মূল তত্ত্বটিকে অবিকৃত রেখে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তা যদি আন্দোলনের দ্বারা বিপ্লবের পথে এগোয়, তাহলে বোধহয় ওই পর্যন্ত ধর্মকে সহ্য করে তেমন মানুষদের সহযোদ্ধা বলে স্বীকার করলে সংগঠনের লাভছাড়া ক্ষতি হয় না।' তিনি এও পরিষ্কার করে দেখিয়েছেন যে, 'সাম্প্রদায়িক মনোভাব ধর্মের চেতনাও নয়, ধর্ম থেকে উদ্ধৃত চেতনাও নয়- এর সংযোগ মূলতঃ রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে অর্থাৎ ক্ষমতা-লিপ্সা থেকে'।
শুধু হিন্দুত্বের এই ধ্বজাধারীদের বিরুদ্ধে নয় - বামিয়ানে দুটি বিখ্যাত বুদ্ধমূর্তির ধ্বংস সাধনকেও তিনি একইভাবে নিন্দা করেছেন। বলেছেন, 'বামিয়ানে ও আফগানিস্তানের অন্যত্র যে বর্বরতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে তার পেছনে আছে মৌলবিদের ধর্মান্ধতা। এটা কারও কাছে ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য নয়। শিল্প হল মানুষের সভ্যতার এক পরাকাষ্ঠার পরিচয়। তালিবানরা পৃথিবী জোড়া বর্বরতার হিমশিলার উপরিভাগ মাত্র, তার নীচে অনেক গভীরে, গুঢ় অভিসন্ধিমূলক যে সব ধাংসের পরিকল্পনা হচ্ছে তার কোনোটা হিন্দু-প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য, কোনোটা বা মুসলিম প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য, সে সব অন্তর্গুঢ় শক্তির খেলা চলে জনতার চোখের আড়ালে রাজনীতির প্ররোচনায়। শিল্প মানুষের শ্রেষ্ঠ সত্তার প্রকাশ, তাকে কাসে করা বর্ণরের কাজ - তা সে বুদ্ধমূর্তিই হোক আর বাবরি মসজিদই হোক। সমস্ত সভ্য মানুষের কর্তব্য এ সবের উদ্দেশ্য উদ্ঘাটন করে শ্বাসে ক্রিয়াকে ধিক্কার দেওয়া।'
□ সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ- মার্কসবাদে শ্রদ্ধাশীলতা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন □
আমরা তাই দেখতে পাই অধ্যাপিকা সুকুমারী ভট্টাচার্য্য প্রাচীন ভারত- তার সমাজ-সংস্কৃতি-সাহিত্যের গভীর বিশ্লেষণ করার কাজে আত্মনিয়োগ করলেও বর্তমান সময়ের সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে উদাসীন তো থাকেনই নি- বরং একজন সচেতন, ব্যক্তিত্বের অধিকারী হিসাবে তাঁর চিন্তাধারা অনুযায়ী ক্রিয়া করেছেন। এখানে নিহিত রয়েছে তাঁর চরিত্রের একটি উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য। এর জন্য বিভিন্ন রকমের বাধা এসেছে। শুধুমাত্র পরাধীন ভারতের দিনগুলির সংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতার কাছ থেকেই নয়-পরবর্তীকালেও সেই বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাঁকে। বিগত শতাব্দীর সাতের দশকের সূচনাতে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ, 'The Indian Theogony'। প্রকাশিত হয়েছিল কেমব্রিজ থেকে। ধর্মের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে বেদ-উপনিষদ-গীতার বস্তুতান্ত্রিক ব্যাখ্যা প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। বইটির ভারতীয় সংস্করণ একসময় ভারত সরকার বন্ধ করে দেয়। পরে আর একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন প্রকাশনা সংস্থা এগিয়ে আসে। ঘটনা যাই ঘটুক তাঁর প্রতিবাদী ঋজু চরিত্রের কোনও প্রত্যয় ঘটেনি। আদর্শ শিক্ষিকা হিসাবে তিনি শ্রদ্ধা কুড়িয়েছেন। তাঁর অনুরাগী ছাত্র-ছাত্রী মহলে সে শ্রদ্ধা ছিল একদিকে অগাধ পাণ্ডিত্যের উপর এবং অপর দিকে তাঁর সামাজিক মননের জন্য। লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে অধ্যাপনা তারপর বুদ্ধদেব বসুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপনায় যুক্ত হন। তারও কিছুদিন পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েরই সংস্কৃত বিভাগে তিনি নিযুক্ত হন। একদিকে পরিবারের তদানীন্তন পরিবেশ এবং বিশেষ করে পিতার আদর্শ শিক্ষক চরিত্র যেমন তাঁর মনন গড়ে ওঠার ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছে তেমনি একথাও সত্য যে মতামতের ক্ষেত্রে পিতার সঙ্গে একই মেরুতে তাঁর অবস্থান সবসময় সম্ভব হয়নি। তিনি তাঁর জীবনের কথিত কাহিনীতে বলেছেন, 'কলেজের দ্বিতীয়-তৃতীয় বর্ষ থেকে ধর্ম সম্পর্কে নানারকম বই পড়তাম। ধর্মের বক্তব্যের সাথে নানা ধরনের দার্শনিক মতবাদের বিরোধ বেশ উত্তেজনা সৃষ্টি করত।' একে কেন্দ্র করেই পিতার সাথে তাঁর মানসিক দূরত্ব বাড়তে থাকে। পরিবারের সকলের থেকেই তাঁর চিন্তা ধীরে ধীরে সরে আসতে থাকে। এই অবস্থায় অধ্যাপিকা ভট্টাচার্য তাঁর পিতাকে ফ্রয়েডের মনস্তত্বের উপর এবং ডারউইনের বিবর্তনবাদ সম্পর্কে দুখানি বই পড়তে দেন। এই বই দুখানি পড়বার পর তাঁর পিতা জিজ্ঞেস করেছিলেন - 'এগুলি আগে পড়তে দিসনি কেন?' পিতার এই যুক্তিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী তাঁকে প্রভাবিত করত গভীরভাবে।
কলেজ জীবনে মার্কসীয় সাহিত্য, রুশ সাহিত্য পাঠ তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। তখনও তাঁর ধর্মবিশ্বাস যুক্ত হয়েছিল খ্রীষ্টান ধর্মকে কেন্দ্র করেই। পরবর্তী অধ্যায়ে তারও পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে তাঁর ইংরাজীর 'প্রাইভেট টিউটর' অমল ভট্টাচার্য্যের সঙ্গে পরিচয় আদান প্রদান এবং পরিণতিতে তাঁর সঙ্গে প্রণয়ের সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে। সুকুমারী ভট্টাচার্য্য নিজে অমল ভট্টাচার্য্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, 'উনি চৌদ্দ বছর বয়স থেকে নাস্তিক। আমিও নাস্তিক হলুম।' শ্রীমতি ভট্টাচার্য্য মার্কসীয় চিন্তাধারার সংস্পর্শে এসে তাতে আস্থাশীল হয়েছিলেন এবং ছিলেন বামপন্থী মনোভাবাপন্ন মানুষ। এমনকি, তিনি তাঁর উপলব্ধি অনুযায়ী ব্যক্তিগত জীবনেও যুক্তিবাদী মননশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। উত্তরবঙ্গের এক অধ্যাপিকা স্মৃতিচারণায় জানিয়েছেন, একবার তথাকথিত সাম্যবাদী দলের এক নেতার সঙ্গে সাক্ষাতে সেই নেতার মুণ্ডিত মস্তক দেখে তিনি কী হয়েছে জানতে চান। ওই নেতা তার আত্মীয় বিয়োগের কথা জানালে তিনি সেই নেতাকে মার্কসবাদী হওয়া সত্ত্বেও তার এই ধর্মাচারণ পালনের তীব্র প্রতিবাদ জানান। এক অনুরাগী তাঁর কথোপকথনের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। যখনই সুকুমারী ভট্টাচার্য্যকে স্পষ্ট কিছু কথা বলার ক্ষেত্রে প্রশ্ন করা হ'ত যে, কেন তিনি এরকম করে বললেন তখন তিনি কমিউনিস্ট ইস্তাহারের উদ্ধৃতি ব্যবহার করতেন। বলতেন, 'কমিউনিস্টরা আপন মতামত গোপন করতে ঘৃণাবোধ করে।' তিনি একথাও মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, মানবতাবাদী হতে হলে তাকে মার্কসীয় মতবাদ সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সমস্ত প্রকার সংস্কারকে বিসর্জন দিয়ে এ দুনিয়ায় জন্ম নেওয়া সব শিশুকেই গ্রহণ করার ক্ষেত্রে রুশ সমাজের মানসিকতাকে উর্দ্ধে তুলে ধরে বলেছিলেন সমস্ত আইন ভেঙে কে পারবে একে মেনে নিতে? বলেছেন, 'সে পেরেছিল বিপ্লবোত্তর রুশ দেশ, যখন সব সন্তান বৈধ বলে স্বীকৃত হল।'
তবে একথা সত্য, বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজে একজনকে মার্কসবাদী হতে গেলে জীবনের সমস্ত দিককে ব্যাপ্ত করে রাষ্ট্র উচ্ছেদের সঠিক সংগ্রামে তার আত্মনিয়োগ এবং তার সর্বাত্মক ক্রিয়ার সঙ্গে নিয়ত যুক্ত থাকার কাজটি অত্যন্ত জরুরী। সেক্ষেত্রে এদেশের মাটিতে এদেশের বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষিতে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিশেষীকৃত যথার্থ রূপটিকে জানা এবং উপলব্ধি করা বিগত শতাব্দীর বিশ-তিরিশের দশকে গড়ে ওঠা তথাকথিত সাম্যবাদী দলের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অথচ মার্কসীয় চিন্তাধারায় আস্থাশীল মানুষ সেই দলের বৃত্তের মধ্যে অবস্থান করছেন। অধ্যাপিকা সুকুমারী ভট্টাচার্য্যও সেই বৃত্তের মধ্যে থেকে তাঁর সাধনা করেছেন। মহান লেনিন বলেছেন, বিপ্লবী তত্ত্ব ছাড়া বিপ্লব হতে পারে না। এই বিপ্লবী তত্ত্ব বলতে লেনিন যা বলতে চেয়েছেন তাকে মার্কসবাদী দার্শনিক শিবদাস ঘোষ ব্যাখ্যা করে বলেছেন, 'শুধু রাজনৈতিক প্রোগ্রাম এবং পলিসি বোঝাতে চাননি, তিনি বিপ্লবী তত্ত্ব বলতে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কর্তৃক জীবনের প্রতিটি দিক সম্পর্কে, জ্ঞান বিজ্ঞানের ধারণাগুলিকে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে কো-অর্ডিনেট করে একটি পুরো জ্ঞানের পরিমণ্ডলকেই বুঝিয়েছেন।' পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রশ্নে একটি সঠিক সাম্যবাদী দলের কথাটিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। বিপ্লব এবং সঠিক সাম্যবাদী দলের প্রশ্ন ওতোপ্রোতভাবে যুক্ত। সঠিক সাম্যবাদী দল নেই বা তার উপযুক্ত নেতৃত্বকারী শক্তি নেই, অথচ বিপ্লব সফল হয়ে গেল এ ধারণা অবাস্তব, মার্কসবাদ বিরোধী। তাই শিবদাস ঘোষ দেখিয়েছেন, 'সঠিক বিপ্লবী চেতনা হল সঠিক সর্বহারা শ্রেণী চেতনা। আর সঠিক সর্বহারা শ্রেণী চেতনা হল সঠিক পার্টি চেতনা- অর্থাৎ আপনারা সঠিক পার্টি চিনতে পেরেছেন কিনা।' তা না হলে যে সমাজ পরিবর্তনের আকাঙক্ষা নিয়ে মানুষের সংগ্রাম, তা চরম পরিণতি লাভ করতে পারে না। এ দেশে সুকুমারী ভট্টাচার্য্য সহ বহু ক্ষমতা সম্পন্ন আত্মত্যাগ করা বিদগ্ধজনের, বহু গুণাবলী সম্পন্ন মানুষের বিপ্লবের চাহিদা, আশা আকাঙক্ষা স্বপ্ন সঠিক দলের পরিধির মধ্যে না আসায় শেষ পর্যন্ত পথ হারিয়েছে। জোয়ারের মতো প্রতিবাদের ঢেউ এসেছে বারে বারে, কিন্তু যতটা অগ্রগতি বিপ্লবী আন্দোলনের হওয়ার কথা তা সম্ভব হয়নি- এটা বেদনার বিষয়। যৌবনের দিনগুলিতে তাঁদের অক্লান্ত শ্রম -তারপর জীবনের অন্তিমলগ্নে এসে স্বপ্নকে সফল করে তুলতে না পারার বেদনাভরা ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এদেশে সাম্যবাদী আদর্শ চর্চার ইতিহাস সত্যিই ব্যথিত করে তোলে।
অধ্যাপিকা ভট্টাচার্য্য বামপন্থায় বিশ্বাসী, তাঁর নিজের কথায় 'কমিটেড কমিউনিস্ট'- যে তথাকথিত সাম্যবাদী দলের পরিমণ্ডলে অবস্থান করতেন - তাদের ক্রিয়াকলাপ তিনি নিঃশর্ত সমর্থন করেন নি। করতে পারেন নি। এখানে তিনি তাঁর জীবনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকার দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন। যখনই অন্যায় দেখেছেন প্রতিবাদ করেছেন। যখন বিগত বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক স্তরে দ্বিতীয়ভাষা হিসাবে ইংরাজী পঠনপাঠনকে বিসর্জন দিয়েছে এবং যখন তার বিরুদ্ধে ডঃ সুকুমার সেন সহ সর্বস্তরের শিক্ষাব্রতী পথে নেমে তাকে প্রতিহত করার সংগ্রামে সামিল হয়েছেন-অধ্যাপিকা ভট্টাচার্য্যও সেই আন্দোলনকে সমর্থন করেছেন। বিরোধিতা করেছেন সরকারী সিদ্ধান্তের। বিশেষ করে যখন নন্দীগ্রামে-সিঙ্গুরে বাড়ী, স্কুল, মন্দির, মসজিদ-এর অবস্থানকে বিলুপ্ত করে জমি দখল করে বামফ্রন্ট সরকার পুঁজিপতিদের দিতে চাইল তিনি তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানালেন। সেই আন্দোলনের পথে গঠিত 'শিল্পী সাংস্কৃতিক কর্মী বুদ্ধিজীবী মঞ্চের' উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হিসাবে জীবনের প্রায় অন্তিমলগ্নে অসুস্থ শরীরের ভারে নিজের ক্রিয়াশীলতাকে স্তব্ধ করেননি। প্রতিবাদী পথে তখন তিনি সামিল হয়েছেন। এর জন্য তাঁকে তদানীন্তন সরকারের বিরাগভাজন হতে হয়েছিল। সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম সম্পর্কে তাঁর প্রকাশিত নিবন্ধের জন্য অনেক কথা তাকে শুনতে হয়েছে। এমনকি সংবাদে প্রকাশ, কয়েকজন নেতা তাঁকে এইধরনের সরকার বিরোধী প্রবন্ধ না লিখতে অনুরোধ করেন। সংবাদে আরও প্রকাশ পায়, এই বিরোধিতার জন্য বামপন্থী চিন্তাধারার হওয়া সত্ত্বেও লেখিকা অধ্যাপিকা সুকুমারী ভট্টাচার্য্য সাহিত্য একাডেমির সিনিয়র সিটিজেন ফেলোশিপ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
শুধু তাই নয়, ওই সময়েই সিপিআই(এম)-এর মুখপত্র 'গণশক্তি' ২০শে এপ্রিল ২০০৯-তে বামফ্রন্ট সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের যে তালিকা প্রকাশিত হয় তাতে সুকুমারী ভট্টাচার্য্যের নাম ছাপা হয়। তার প্রতিবাদ করে (২৭শে এপ্রিল ২০০৯) শ্রীমতি ভট্টাচার্য্য বলেন, 'প্রথমেই ছিল আমার নাম, অথচ কেউই এ বিষয়ে আমার সম্মতি চাননি। তৃণমূল দলেরও কেউ নাম বা স্বাক্ষর চান নি। চাইলে দিতাম না। বামফ্রন্ট সমর্থন অনেক বছর করেছি বলে বরাবরই করব-এ অনুমান ভ্রান্ত।' এখানেই তাঁর পাণ্ডিত্যের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা যথার্থ প্রতিবাদী চরিত্রের দৃষ্টান্ত।
□ সুকুমারী ভট্টাচার্য্যের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। আমাদের দায়িত্ব □
বর্তমান সময়ের সামাজিক সমস্যা তাঁকে খুবই পীড়িত করত। দুঃখ করে বলেছেন, 'চোখের সামনে অতি দ্রুত মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। আজকের কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরণী প্রতিদিনই এই অবনমিত মূল্যবোধের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। প্রচারমাধ্যম যে ঐশ্বর্যের স্বপ্ন ছবির পর্দায় তুলে ধরছে, এরা এদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে ওই ঐশ্বর্যের মধ্যে কল্পনায় নিজেকে প্রতিস্থাপিত করে।'
আবার অত্যন্ত আশাবাদী হয়ে বর্তমান প্রজন্মের আচরণ দেখেও এই বলেছেন, 'আমার মনে হয় এটা প্রতিবাদের প্রকাশ। প্রতিবাদের একস্ট্রিম প্রকাশ হচ্ছে তা-'ই, যাকে আমরা 'উচ্ছৃঙ্খলতা' বলি। আর কখন বলি? যখন তা আমাদের মূল্যবোধের সঙ্গে মেলে না। কিন্তু কে তাকে উচ্ছৃঙ্খল করল? - সমাজের নিগড় - সমাজের কুসংস্কার। সমাজের প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই সে উচ্ছৃঙ্খল। আমার মনে হয় এই উচ্ছৃঙ্খলতা মানুষের স্বাভাবিক প্রকাশ - should be Welcome। এই উচ্ছৃঙ্খলতা আছে মানেই তার মধ্যে জীবনীশক্তি আছে। যার মধ্যে এই জীবনীশক্তি আছে তাকে একটু সহায়তা করলে সে অনেক কিছু করতে পারে। বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের মানুষ হওয়া নিয়ে একটি অদ্ভুত কথাও বলেছেন, 'আমি খুব পছন্দ করি জয়েন্ট ফ্যামিলি - সেটা অবশ্যই শান্তিপূর্ণ। আমরা ক্রমশ সেটা হারাচ্ছি। আমরা এখন একা। ঠাকুমা-দিদিমার মুখ থেকে শুনে শুনে বাচ্চারা কত কী শিখত! এর মধ্যে আর একটা ভাল দিক ছিল- স্নেহের স্বরের সঙ্গে শুনত তো-আজকে সেই জায়গায় কেউ নেই।'
বর্তমান সময়ে এদেশে যথার্থ সমাজবিপ্লবের প্রয়োজন অনুভূত হয় অগণিত মানুষের হৃদয়ের গভীরে। অপরদিকে দেশের সংস্কৃতির গভীরে, জীবনের মূলে পুঁজিপতিরা আঘাত হানছে সেই সমাজবিপ্লবকে রুখতে। বিশ্বব্যাপী ভোগবাদের মায়া এবং মোহ দিয়ে যৌবনের প্রাণশক্তিকে আটকাতে চাইছে। তাতেও না পেরে পুরাতন ঐতিহ্যবাদকে ফিরিয়ে এনে - প্রযুক্তির উপকরণের বন্যা বইয়ে দিয়ে-মনুষ্যত্বের সঠিক ধারণাকে সমাজজীবন থেকে ধ্বংস করে ফ্যাসিবাদের সুকৌশল জাল বিস্তৃত হতে চলেছে। সেখানে চাই বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস ধারণা চাই যথার্থ জ্ঞান চর্চা। বর্তমান সময়ে যারা সমাজ প্রগতির আন্দোলনে এগিয়ে আসবেন তাদের কাছে সুকুমারী ভট্টাচার্য্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। 'বুদ্ধিজীবী'- এই নামে ভূষিত হয়ে সরকারী প্রসাদ লোভকে সম্বরণ করা, 'নিরপেক্ষতার' মোহজাল থেকে চেতনাকে মুক্ত করা, জীবনের অন্তিম লগ্ন পর্যন্ত জ্ঞানচর্চাকে শুধুমাত্র ডিগ্রী বা সম্মান লাভের সোপান হিসাবে না দেখে সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজনবোধের সঙ্গে যুক্ত করা, সরল অনাড়ম্বর জীবনের মধ্যে চরিত্রের আলোককে প্রজ্জ্বলিত রাখা, মানুষের প্রতি মমতা, ভালোবাসা- সর্বোপরি ব্যক্তিত্বের কাঠামোতে গড়ে ওঠা জ্ঞান-পিপাসু, এক নারীত্বের ধারণা যার বাগাড়ম্বর নেই- তেমন গুণগুলির চর্চা করার প্রেরণা নেওয়াটাই হবে সুকুমারী ভট্টাচার্য্যের জীবন থেকে আসল নির্যাস গ্রহণ। এবং এখানেই নিহিত রয়েছে তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করার আসল তাৎপর্য্য। সুকুমারী ভট্টাচার্য্য চাইতেন - একজনও যেন অন্ধ ধর্মবিশ্বাস এবং নিয়তির বেড়া ভেঙে বেরুতে পারে আপন তেজে - চাইতেন নারীরা ব্যক্তিত্ব দিয়ে জ্ঞানের স্পৃহা নিয়ে সামাজিক বিধি নিষেধকে ভাঙ্গুক। তিনি মহাভারতের একটি কথাকে বারবার উদ্ধৃত করতেন - ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বলেছিলেন - 'একটি গোপন সত্য তোমাকে বলে যাই - মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এ দুনিয়ায় কিছু নেই।' সেই মানুষ-শ্রেষ্ঠের বিকাশের জন্য বর্তমান সময়ের সামাজিক আন্দোলনে আত্মনিয়োগের পথে থাকুক আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদন। ■
তথ্যসূত্র:
▪️︎সুকুমারী ভট্টাচার্য্য প্রবন্ধ সংগ্রহ, গাঙচিল
▪️︎ধর্ম এই সময়ে - সুকুমারী ভট্টাচার্য্য, চিরায়ত প্রকাশন
▪️︎ভারত ও ভারততত্ত্ব : অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ - অধ্যাপিকা সুকুমারী ভট্টাচার্য্য সম্মাননা গ্রন্থ, এনবিএ
▪️︎বেদে সংশয় ও নাস্তিক্য - সুকুমারী ভট্টাচার্য্য, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অ্যাকাডেমি
▪️︎প্রাচীন ভারতে নারী ও সমাজ - সুকুমারী ভট্টাচার্য্য, এনবিএ
▪️︎'আরেক রকম' পত্রিকা
▪️︎শিবদাস ঘোষ রচনাবলী
▪️︎অন্তঃস্বর : মেয়েদের কথায় মেয়েরা - ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশন (কলেজ) প্লাটিনাম জুবিলি স্মারকগ্রন্থ
▪️︎দৈনিক স্টেটসম্যান
(পথিকৃৎ পত্রিকার আগস্ট ২০১৪ সংখ্যা থেকে নেওয়া)
পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২
দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com