সম্প্রতি প্রখ্যাত ভারততত্ত্ববিদ অধ্যাপিকা সুকুমারী ভট্টাচার্য্যের জীবনাবসান ঘটেছে। তাঁর অনুরাগী ছাত্র-ছাত্রী এবং বিশেষ কিছু প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সামান্য কিছু স্মৃতিচারণ ছাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে তাঁর জীবনব্যাপী জ্ঞানসাধনার অদম্য স্পৃহা এবং তার সামাজিক তাৎপর্য নিয়ে তেমন কোন আলোচনা হয়নি। শুধু তাই নয়, মূলত শিক্ষার অঙ্গনে তাঁর সুদীর্ঘ পদচারণা, সত্ত্বেও তিনি যে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী-সুলভ নিরপেক্ষতার বেড়াকে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই অতিক্রম করে এগিয়ে এসেছেন- তারও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন পরিলক্ষিত হয়নি। অথচ বিশ শতকের প্রথম পর্বে জন্ম নেওয়া একজন নারীর পক্ষে তদানীন্তন সময়ের প্রবল প্রতিকূলতাকে জয় করে জীবনের যাত্রাপথে তাঁর উত্তরণটি নিঃসন্দেহে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দাবী রাখে। বর্তমান কালেও যারা সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে সামাজিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে চান জ্ঞান সাধনায় নিজেদের নিয়োজিত করতে চান, তাদের সকলকেই তাঁর জীবন থেকে অনেক কিছুই নির্যাস গ্রহণ করতে হবে।
মানবিকী বিদ্যা এবং বিশেষ ভাবে ভারত চিন্তা - প্রাচীন ভারতীয় সমাজ সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিকতার গণ্ডী থেকে বের করে তার প্রকৃত রূপটিকে সুকুমারী ভট্টাচার্য্য যুক্তির ভিত্তিতে, ঋজুতার সঙ্গে বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরেছেন। প্রাচীন ভারতকে তিনি অযথা মহিমান্বিত করার বিরুদ্ধে যেমন কলম ধরেছেন, তেমনি তার মধ্যেকার সত্য উপাদানগুলির প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গীর জন্যই তাঁর ভারতচর্চা ছিল নিঃসন্দেহে দেবতা, নিয়তি, 'অবিনশ্বর' আত্মাকেন্দ্রিক নয়- মানুষ কেন্দ্রিক এবং পরবর্তী প্রজন্মেও মানুষের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিয়েই। বর্তমান সময়ে একটি কথা অবশ্যই মনে রাখা দরকার যে, আমাদের এই দেশ একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তির আলোর বিচ্ছুরণে আলোকিত হলেও চিন্তা-ভাবনা আজও যুক্তিহীনতা, কুসংস্কার, জাত-পাত, বর্ণবিদ্বেষের এবং মৌলবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর তমসায় অনেকাংশে আচ্ছন্ন। এই মুহূর্তে আবার দেশজুড়ে নতুন করে যুক্তিহীন ইতিহাস বিরোধী চিন্তাকে গণমানসে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস চলছে সুকৌশলে। 'ভগবৎ-ভক্তির' পীঠস্থান বা 'দেবভূমি' বলে বহুল প্রচলিত এই ভারতবর্ষের প্রকৃত ইতিহাস - বস্তুবাদী ভারতচিন্তার সঠিক অভিজ্ঞান এবং জনসাধারণের মধ্যে তার ব্যাপক প্রচার বর্তমান সময়ের প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে অধ্যাপিকা সুকুমারী ভট্টাচার্য্যের মূল্যায়ন বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষিতে একটি ঐতিহাসিক প্রয়োজন।
□ জীবন সংগ্রামে পরিবারের পরিবেশের প্রভাব □
১৯২১ সালের ১২ই জুলাই তাঁর জন্ম। জন্মসূত্রে তিনি খ্রীষ্টান পরিবারের সদস্য। যদিও নিজে তিনি ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন না। সুকুমারী ভট্টাচার্য্য তাঁর পরিবারের খ্রীষ্টান হওয়ার কাহিনী নিজেই বিবৃত করেছেন এক মর্মস্পর্শী ঘটনাকে উদ্ধৃত করে। ঘটনাটি তাঁর পিতামহ বিপিনবিহারী দত্তের জীবনে গভীর রেখাপাত করেছিল - যার পরিণতিতে তিনি খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্তের এক জ্ঞাতিভাই।
শ্রীমতি ভট্টাচার্য্য বলেছেন, 'যশোরে মাইকেল মধুসুদনের বাড়ি কপোতাক্ষ নদীর তীরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে। সেখানে ঠাকুরদার ছেলেবেলার খেলার সঙ্গিনী ছিলেন এক বিধবা কিশোরী। ঠাকুরদা তখন কলকাতার কলেজে পড়েন, গ্রীষ্মের ছুটিতে দেশে গেছেন। প্রচণ্ড গরমের দিনে তিনি পাশের বাড়ির বন্ধুটির খুব কান্নার শব্দ পেয়ে মেয়েটির মাকে জিজ্ঞেস করেন, 'ও কাঁদে কেন?' মা-র উত্তর, 'আজ একাদশী, ওর তেষ্টা পেয়েছে, কিন্তু বিধবার তো আজ নিরম্বু উপবাস।' অনেক অনুনয় বিনয় করেও বন্ধুর জন্য এতটুকু জলের ব্যবস্থা করতে পারলেন না। সেই সন্ধ্যায় মেয়েটি মারা গেল। ঠাকুরদা সোজা কলকাতায় এসে বিশপ্স কলেজের সাহেবকে বললেন, আমি এখনই খ্রীষ্টান হব। ধর্মের তত্ত্বকথা পরে শুনে শিখব। কিছু তর্কাতর্কির পর সাহেব তাকে খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষা দিলেন। দেশে ফিরে সে কথা জানাতে তাঁর পিতা তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র করেন।' এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিশাল সম্পত্তি এবং জমিদারীর অংশ থেকে তিনি বঞ্চিত হন। কিন্তু তা নিয়ে কোনো দুঃখবোধ তাঁর ছিল না।
ধনদৌলত, সম্পদ সম্পর্কে এই মনোভাব সুকুমারী ভট্টাচার্য্যের পিতা সরসীকুমার দত্তের মধ্যেও ছিল। তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক ছিলেন। তাঁর কাছে পড়া এবং পড়ানো ছিল এক 'আনন্দময় প্রক্রিয়া'। সরল অনাড়ম্বর জীবনযাপনে বিশ্বাসী পিতা সম্পর্কে অধ্যাপিকা ভট্টাচার্য্য স্মৃতিচারণা করেছেন 'বাবার পরিচ্ছদ ছিল অতি সাধারণ। সেটা স্বাধীনতা সংগ্রামের যুগ, দেশে বহু সংখ্যক লোকই গান্ধীবাদী, বাবাও তাই। পরণে সাদা খদ্দরের থান। খদ্দরের পাঞ্জাবী ও পায়ে বিদ্যাসাগরি 'চপ্পল'। তিনি বলতেন, 'দেখ এই শিক্ষকরা বহুকাল ধরে প্রয়োজনের তুলনায় কম টাকা পাচ্ছেন, টাকার প্রয়োজন এদের সত্যিই আছে। ফলে তলে তলে এঁদের লোভও জমেছে খানিকটা। হঠাৎ অনেক বেশি টাকা পেলে এঁরা হয়তো নিচু হয়ে হরির লুট কুড়োবেন। সে জন্য এখন যা পাই তার চেয়ে ততটা বেশি মাইনে হওয়া উচিত, যাতে সংসারে মোটামুটি সচ্ছলতা থাকে, কিন্তু আতিশয্য না হয়।' পরবর্তী কালে দুঃখ করে সুকুমারী ভট্টাচার্য্য এও বলেছেন, 'বাবা দেখে যাননি, কিন্তু পরে আমরা অনেক শিক্ষককে নিচু হয়ে হরির লুট কুড়োতে দেখেছি। বেশ কিছু শিক্ষক যাঁদের সৎ বলে জানতাম তাঁদের লোভী অর্থসঞ্চয়ে একনিষ্ঠ হতে দেখেছি। শিক্ষকরা শিক্ষা দেন দু-ভাবে: পঠনপাঠনের মাধ্যমে আর আপনি আচরি ধর্ম অপরে শিখাও। সচ্ছলতা প্রয়োজন, প্রাচুর্য নয়। তাঁর নিজের আচরণ ও আদর্শ থেকে বেশ কিছু সহকর্মী ও ছাত্র জীবনে নীতির একটা উচ্চ আদর্শ লাভ করেছেন। এ বস্তু আজকের জগতে এত বিরল হয়েছে যে বাবার কথা প্রায়ই মনে পড়ে। পরে অবশ্য দেখেছি কেউ কেউ আদর্শ নিয়ে শুরু করেও পরে অর্থসন্ধানী লোভীতে পরিণত হয়েছেন। তবে একথা ঠিক, বাবা একা নন, তখনও দেশে নির্লোভ অর্থসঞ্চয়ে বিমুখ, বরং নতুন বই ও নতুন শিক্ষার দিকে একান্ত আগ্রহী অনেকে ছিলেন।' পিতা সরসীকুমার দত্তের প্রভাব অধ্যাপিকা ভট্টাচার্য্যের জীবনে তাই একটা বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। গভীর শ্রদ্ধায় তাঁর পিতাকে স্মরণ করে তিনি বলতেন- 'বাবা পড়াশুনার চেয়ে আমাদের কাছে অনেক বড় উচ্চমানের দাবী করতেন। লেখাপড়ার চেয়ে জোর দিতেন চরিত্র গঠনের উপর এবং তাও উপদেশ বর্ষণের পরিবর্তে আপন আচরণের উদাহরণ দিয়ে। তিনি চাইতেন যেন নৈতিক ও সামাজিক অর্থে আমি পুরো মানুষ হয়ে উঠতে পারি। কিন্তু সেটা আমি পারিনি। এ গ্লানি আমার কোন দিন যাবে না।' আত্মসমীক্ষার এই মানসিকতা সুকুমারী ভট্টাচার্য্যকে চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে অনেকখানি সাহায্য করেছে। পিতা ছাড়া আর এক বিশিষ্ট মানুষের প্রভাব তাঁর জীবনে গভীর রেখাপাত করেছিল। তিনি তাঁর শিক্ষক আচার্য্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, যিনি বলতেন - 'ক্রমাগত উৎকর্ষের দিকে এগিয়ে চলো।'
ঘটনা পরম্পরায় জানা যায়, অধ্যাপিকা ভট্টাচার্য্যের পরিবারের মধ্যে একটা রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল। পরিবারের সেই রাজনৈতিক পরিবেশও অধ্যাপিকা সুকুমারী ভট্টাচার্য্যের মধ্যে সামাজিক সংগ্রামের বীজকে উপ্ত হতে সাহায্য করেছিল। তাঁর পিতা ও পিসিমার যোগ ছিল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। বড় পিসিমা বিদ্যুৎপ্রভা বসু ভাল ছাত্রী হিসাবে দিল্লীর লেডি আরউইন কলেজে আমন্ত্রিত হলেও কবির আহ্বানে সমস্ত সুযোগ ছেড়ে চলে আসেন কবির কাছে থাকার আনন্দে খড়ের ছাউনির মাটির ঘরে। আর, কবির পাশের ঘরে ছিল শ্রীমতি ভট্টাচার্য্যের বাবার অবস্থান। বিভিন্ন সামাজিক বিষয় ও দর্শন নিয়ে তাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দর্শনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ সহ আলাপ আলোচনা চলত। ছোটবেলার কাহিনী বলতে গিয়ে শ্রীমতি ভট্টাচার্য্য আরও বলেছেন, 'আমরা যখন বেশ ছোটো, তখন এক পারিবারিক বন্ধুর সঙ্গে মা-বাবার বেশ উত্তেজিত আলোচনা শুনতাম, বলশেভিক তত্ত্ব নিয়ে। কোথাও কোনো সংগ্রাম বা বিপ্লব হচ্ছে ওই নামে। আমাদের সরিয়ে রাখা হত ওই আলোচনা থেকে। তাছাড়া আমরা এত ছোটো ছিলাম যে, বুঝিয়ে দিলেও বুঝতে পারতাম না। শুধু বলতে চাই যে, পৃথিবীর কোনো প্রান্তে যদি অশান্তি ক্ষয়ক্ষতি ধ্বংস-হিংসা বিপ্লব ও পুনর্গঠন হত, সেসব সম্বন্ধে বাবা (মা-ও) অবহিত থাকতেন। মোটের ওপর গান্ধীবাদী হলেও গান্ধীবাদে বেশ কিছু আপত্তিও ছিল বাবার। বলতেন এত বড়ো একটা দেশের মানুষের বস্ত্রসংকট দূর করার জন্য খদ্দর বুনে সমাধান করা যাবে না। সে সময়ও লোকে দিতে পারবে না, সে মূল্যও না। তা ছাড়া গান্ধীজির যন্ত্রবিমুখতা আধুনিক যুগে সম্পূর্ণ অচল একটা তত্ত্ব। বিশের শতকে দ্বিতীয় শতকের জীবনযাত্রা যাপন করা চলে না। কাজেই গান্ধীজির স্বল্পব্যয়ের পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনের আদর্শকে সম্মান করলেও নিশ্চিতভাবে গান্ধীজির অনুসরণ করতে পারতেন না। একদিকে গান্ধীবাদীদের নিষ্প্রশ্ন অনুসরণ, অন্যদিকে গান্ধীজির প্রতি শাসকদলের ব্যবহার এই দুটোর কোনোটিই বাবা মেনে নিতে পারতেন না। ফলে গান্ধী সম্বন্ধে যথেষ্ট শ্রদ্ধা থাকলেও তাঁর রাজনীতি সমাজনীতি নিয়ে ভিন্নমতও বেশ ছিল। মোটের উপর দেশের স্বাধীনতার জন্য একনিষ্ঠ আগ্রহ দু-জনের মধ্যে একই রকম অনুপ্রেরণা জাগাত।' এই অনুপ্রেরণা সুকুমারী ভট্টাচার্য্যের জীবনের চিন্তা চেতনা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, তা নিঃসংশয়ে বলা যায়।
□ সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের বিরোধিতার পথে প্রতিবাদী চরিত্রের স্ফুরণ □
অধ্যাপিকা ভট্টাচার্য্যের শিক্ষাজীবনও অতিবাহিত হয়েছে নানা ধরনের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। পরিবার থেকে পাওয়া প্রতিবাদী মন, যুক্তিবাদী মানসিকতা তাঁকে সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। তিনি বলেছেন, 'বি.এ. পরীক্ষায় অনার্সে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার জন্য ঈশানবৃত্তি পাওয়ার কথা। কিন্তু ওই বৃত্তি দেওয়ার মালিকের নির্দেশ ছিল বৃত্তি প্রাপককে হিন্দু হতে হবে, আমার জন্ম খ্রীষ্টান পরিবারে, কাজেই ওটা আমার নাগালের বাইরে, অন্যটা অনার্স প্রাপকদের মধ্যে উচ্চতম নম্বর যার, তার জন্য জুবিলি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট বৃত্তি। সেটা পেলাম, কারণ তার ক্ষেত্রে জাতিবর্ণ নির্দেশ ছিল না। তখনকার দিনে তারও অর্থমূল্য বত্রিশ টাকা, সেটার জন্য খুশি ছিলাম বটে কিন্তু চল্লিশটাকা- যা তখন একজন কেরানির মাসিক মাইনে, যেটা আমাদের গরিব সংসারে সত্যকার সাহায্য হত, তা পেলাম না বলে, বাড়ির সমস্যা আর্থিকভাবে আরো দূর করতে পারলাম না বলে অসম্ভব কষ্ট পেয়েছিলাম। আরো এইজন্য যে লেখাপড়া জগতে জাতিবর্ণ বিভাগ দিয়ে মূল্যায়ন আমার কাছে অত্যন্ত অসংগত মনে হয়েছিল। দিনকতক বেশ মনমরা হয়ে ছিলাম। সন্ধেবেলা বাবা ছাত্র পড়াতে যেতেন, আমি একা ঘরে চুপ করে বসে থাকতাম। একদিন বাবার ছাত্র পড়বে না বলে তাঁর সঙ্গে হাঁটতে বেরোলাম। বাবা জিজ্ঞেস করলেন, 'গয়া স্টেশনে ট্রেন ঢোকার আগে কী মনে হয় তোর মনে আছে?' গয়ায় আমার বড়োপিসিমা থাকতেন, আমরা মাঝে মধ্যে তাঁর কাছে যেতাম। তাই মনে ছিল, বললাম, 'হ্যাঁ পরপর পাঁচটা টানেলে ট্রেন ঢোকে।' 'ঢোকার সময় কী হয়?' বললাম, 'বাইরের আলোগুলো নিভে যায়। আর ট্রেনের ভেতরের আলোগুলো জ্বলে ওঠে।' প্রায়ান্ধকার রাস্তায় বাবা আমার সামনে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, 'ওই আলোগুলো কখনো নিভতে দিসনে।' বাবার কথাকটি আমার জীবনের মূল মন্ত্র হয়ে আছে।' একথা সত্য যে, তিনি তাঁর জীবনে এই আলো নিভতে দেননি। আত্মসমীক্ষায় তিনি প্রকাশ করেছেন তাঁর যথার্থ মানুষ না হতে পারার ব্যথা। কিন্তু তা সত্য নয়। নারী হিসাবে তদানীন্তন সময়ে জ্ঞানসাধনার যে দৃষ্টান্ত এবং যুক্তিবিজ্ঞানের চর্চা আর তারই সাথে জীবন চর্চায় সেই যুক্তিবাদকে রূপায়িত করবার যে প্রচেষ্টা আমরা দেখি, তা যথার্থই একটি বিরল দৃষ্টান্ত। যথার্থ নারী স্বাধীনতার দাবীতে যারা আজ সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন- তাদের এগিয়ে চলবার পথে সুকুমারী ভট্টাচার্য্যের সাধনা অনুপ্রেরণা যোগাবে।
ছাত্র অবস্থাতেই তাঁকে প্রচলিত সংস্কারের বিরুদ্ধে প্রবল সংগ্রাম করতে হয়েছে। খ্রীষ্টান পরিবারের মধ্যে থাকলেও তিনি সংস্কৃত সাহিত্য পড়ার অনুরাগী ছিলেন। পিতার সাথে এই প্রসঙ্গে কথোপকথনে তিনি সংস্কৃত পড়তে চাওয়ার কারণ জানিয়েছিলেন। সরসীকুমার দত্তের ইচ্ছা ছিল তাঁর কন্যা সুকুমারী যাতে একজন দার্শনিক হয়। তাই সংস্কৃত পড়তে চাইলে তিনি কিছুটা অপ্রসন্ন হন। পিতা হিসাবে তিনি অবশ্য জোর করে কিছুই চাপিয়ে দিতেন না। সুকুমারী ভট্টাচার্য্য পরে বলেছিলেন, 'পাশ করে যখন বললাম সংস্কৃত পড়ব তখন বাবার মুখটা বিষাদে মলিন হয়ে উঠল। দু-তিন মিনিট চুপ করে থেকে বললেন, 'কেন পড়তে চাস?' বললাম প্রাচীন-ভারত কীভাবে চিন্তা করত, যে আদর্শের নিরিখ তাঁরা রেখে গেছেন সেটা কেন কোন প্রয়োজনে বা উদ্দেশ্যে, তা জানবার জন্য সংস্কৃত পড়তে চাই। অর্থাৎ প্রাচীন ভারতের চিত্তের বিবর্তন শিখতে চাই। তুমি কিন্তু আমাকে কিছু কিছু দর্শন পড়িয়ো, কারণ দর্শনও প্রাচীন ভারতের চিন্তাকে পুষ্ট করেছিল।'
অথচ সংস্কৃতে অনার্স পাশ করা সত্ত্বেও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি খ্রীষ্টান পরিবারের মেয়ে হওয়ার জন্য সংস্কৃতে এম এ পড়ার সুযোগ পাননি। প্রবল অভিমানে শেষ পর্যন্ত ইংরাজীতে এম এ পাশ করেন। নিজস্ব উদ্যোগে দশ বছর পরে প্রাইভেটে সংস্কৃতে এম এ করেন। প্রচলিত এই অচলায়তনের বিরুদ্ধে পথ চলতে গিয়ে তাঁর মধ্যে যে সংগ্রামী মানসিকতার জন্ম হয়, তা পরবর্তী জীবনে জ্ঞান সাধনার পথেও ছায়াপাত করে। তিনি সংস্কৃত সাহিত্য সাধনা করতে গিয়ে পরিবারসূত্রে পাওয়া মন এবং এম এ ক্লাসের ছাত্রী থাকাকালীন সময়ে মার্কস এর রচনার সঙ্গে পরিচিত হন। এ দেশে ভগবৎভক্তির অন্ধতায় বেদ, উপনিষদ পাঠের যে রীতি তাকে বর্জন করে বস্তুনিষ্ঠ ও যুক্তিবিজ্ঞানের ভিত্তিতে তা গ্রহণ করলেন। তিনি মনে করতেন, সংস্কৃত চর্চার ধারাকে গতিশীল করতে হবে। কয়েক সহস্র বছর ধরে এদেশের ইতিহাসকে সঠিকভাবে জানতে গেলে অন্ধতায় অজর-অনড় কোন ধারণার বশবর্তী হলে হবে না। প্রকৃত ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করে তিনি বলিষ্ঠতার সঙ্গে বলেছেন, 'চোখ বুজে বেদরচয়িতাদের বিশ্বাস মেনে নেওয়ার মত মানসিকতা অনেকেরই ছিল না। প্রতিবাদী বা অবিশ্বাসীকে সব দেশেই চিরকাল সমাজের শক্তিমান গোষ্ঠী অবজ্ঞা করেছে। ভারতবর্ষেও বারবারই বলা হয়েছে নাস্তিক, চার্বাকপন্থী, লোকায়ত, বার্হস্পত্যপন্থী ইত্যাদি মানুষের পরিণতি শোচনীয়। সমাজের শৃঙ্খলা, যজ্ঞনিষ্ঠ ধর্মবোধে যাদের অন্তরাত্মা শান্তি পায়নি, যারা সৃষ্টিতে, বিশ্বচরাচরে এবং সমাজে কার্যকারণ সম্পর্ক খুঁজেছে পায়নি, তাদের প্রতি অতি পরুষ অভিষাপবাণী উচ্চারিত হয়েছে শাস্ত্রে। তারা প্রকাশ্যে প্রতিরোধী, অন্তরে প্রচ্ছন্ন বিপ্লবী। শাস্ত্রকর্তারা যে শৃঙ্খলা রচনা করেছেন সমাজে, তাদের কাছে তা শৃঙ্খল বলে প্রতিভাত হয়েছে, কারণ তার মধ্যে কার্যকারণ পরম্পরায় শৃঙ্খলা নেই।'
□ বেদ-উপনিষদ সম্পর্কিত অন্ধ বিশ্বাস ও সমাজে বিদ্যমান বাস্তব প্রশ্ন □
প্রকৃতির শক্তির কাজে মানুষের ক্ষমতা যখন পরাজিত হয় যখন তার সীমিত ক্ষমতা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের তৎকালীন সীমাবদ্ধতার ফলে সমস্ত কিছুকে উপলব্ধি করতে পারে না তখন শাস্ত্রকাররা 'দেব মণ্ডলী' নির্মাণ করে উপস্থিত করে মানুষের সামনে, তার সমাধানের পথ হিসাবে। এগুলির মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা যে 'বোধ ও বিশ্বাস' তার পুরোটাই গড়ে ওঠে কার্যকারণ সম্পর্ককে অস্বীকার করে বা তাকে দূরে সরিয়ে রেখে। এই কার্যকারণ সম্পর্ক-রহিত যে বিশ্বাস তা মানুষের চেতনা ও সমাজ অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করে। সমাজের অধিপতিরা অন্যদিকে এই বিশ্বাসহীনতাকে অভিহিত করে নাস্তিক্য বলে। আমাদের দেশে বিশাল অংশের মানুষের মধ্যে 'বেদ' সম্পর্কে যে অন্ধ-বিশ্বাস এবং ধারণা রয়েছে তাতে বস্তুনিষ্ঠ সত্য খুঁজে পাওয়া বাস্তবে খুবই দুষ্কর। অধ্যাপিকা ভট্টাচার্য্য সেই সত্যকে তুলে ধরেছেন। তিনি বৈদিক সাহিত্যের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে বলেছেন- 'বিশ্বাসে যেমন সন্দেহ অন্তর্লীন থাকে, তেমনই সন্দেহের অন্তরেও একটি বিশ্বাস থাকে। কী সেই বিশ্বাস? কার্যকারণ-পরম্পরা, আজ এখনও আমরা না বুঝতে
পারলেও সেটা যে আছে এমন বিশ্বাস। সন্দেহ ও নাস্তিক্যের ভিত্তিভূমি মানুষের অবচেতনে এই প্রত্যয় যে, সংসারে নিষ্কারণ কিছুই ঘটে না, সবকিছুই কার্যকারণ পরম্পরায় গ্রথিত, তার কতক আমাদের জানা। কিছু বা অজানা। কিন্তু সত্যকার আকস্মিক বলে কিছুই নেই। কোনো না কোনোদিন সেইসব কারণ জানা যাবে, যা এখনও মানুষের অজানা। এই প্রত্যয় সন্দেহের ভিত্তি বলেই সন্দেহ সমাজ। যখনই কেউ অভিজ্ঞতার ব্যাপারে কার্যকারণ সম্পর্ক খোঁজ করে কিছুরই সন্ধান পায় না, তখনই অন্যান্য মানুষ সেই প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করে, হয়তো পৃথিবীর জ্ঞানবিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণ। সন্দেহকে শাস্ত্র পুরোহিত শাপ দেয় কারণ তা প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থার ভিত্তিমূলে আঘাত করে। তারা চায় স্থিতিশীল সমাজ। সংশয়ীর প্রশ্নের উত্তর জোগাতে নির্মিত হয়েছে গতিশীল একদিন কারও চিন্তা, মনন বা গবেষণার মধ্যে তার উত্তর বেরিয়ে আসে, এক ধাপ এগিয়ে যায় মানুষের জ্ঞান।"
বেদ-উপনিষদ-এর ঘটনা পরম্পরাকে উপলব্ধি করে তিনি আরও বলেছেন, 'এর ফলে চিন্তাশীল মানুষ নতুন করে চিন্তা করেছেন, কখনও উত্তর পেয়েছেন, তখন সমাজের জ্ঞানের জগতের পরিসর বেড়েছে। রাহুকেতুর গ্রাসে সূর্য-চন্দ্র গ্রহণ মানুষ ততদিনই বিশ্বাস করেছে যতদিন তার চেয়ে সঙ্গততর কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেলেই জ্ঞান বেড়েছে, মানুষ পুরাতন কুসংস্কার ত্যাগ করে কার্যকারণ-পরম্পরার সন্ধান পেয়ে জ্ঞানের জগতের দিচক্রবালকে প্রসারিত করেছে। দেখা যাচ্ছে, জ্ঞানের বুদ্ধির জন্য, ঐতিহ্যবাহিত কুসংস্কারের পরিবর্তে কার্যকারণ-সংবলিত যথার্থ তথ্য জানবার জন্য প্রাথমিক প্রয়োজনই হল সন্দেহ অস্বীকার করা, প্রচলিত ধারণার বিরোধিতা করা, শাস্ত্র-পুরোহিতের দেওয়া ব্যাখ্যাকে পরিহার করা, তাকে ভুল, অযথার্থ বলে ঘোষণা করা। এর পরে যদি কেউ সঙ্গততর, বেশি যুক্তিপূর্ণ কার্যকারণ-পরম্পরায় গ্রথিত কোনো সমাধান পেশ করেন যা সমাজপতিরা তাদের স্বার্থহানি না হলে স্বীকার করে, আর তাদের স্বার্থহানি হলে সরাসরি নাস্তিক, পাষণ্ড, পাপী বলে ব্যাখ্যাতা ও প্রশ্নকর্তা দুজনকেই শাপশাপান্ত করে। কিন্তু যখন সমাধান পাওয়া যায়, তখন সমাজ জ্ঞানের জগতে এক ধাপ এগিয়ে যায়।'
অন্ধ বিশ্বাসের চোরাগলি থেকে বৈদিক ইতিহাসকে যেভাবে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন তাতে তাঁর সম্পর্কে একটি কথা মনে আসে। তাঁর এক অনুরাগীও যেই কথাটিকে উদ্ধৃত করেছেন। বলেছেন, ছাত্রী জীবনে তিনি মার্কসবাদের চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। মার্কস্-এর একটি কথা- 'doubt everything' কে তিনি গ্রহণ করেছিলেন ঘটনা পরম্পরাকে বিশ্লেষণের ভিত্তি হিসাবে। এই 'doubt' কথাটির যথার্থ অর্থ হ'ল পরীক্ষা করে নেওয়া পরীক্ষার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। শ্রীমতি ভট্টাচার্য্যের বেদ অধ্যয়নে পার্থিব চিন্তা এবং মানুষের সামাজিক প্রয়োজনের প্রশ্নটি সকল সময়ে যুক্ত হয়ে থেকেছে। 'বেদবাক্য' বলে যে বেদকে এদেশের মানুষ সাধারণভাবে জানে তা যে একমাত্র সত্য নয় এবং সে যুগের মানুষের মধ্যেও যে সংশয়, সন্দেহ বা অন্ধত্বের বিরোধিতার ইতিহাসও আছে - সেই সংশয়, প্রশ্ন ও বিরোধিতা যে অগ্রগতির দিগন্তকে প্রসারিত করে - এবং সেই কারণেই যে উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাকে বিলুপ্ত করে দেওয়ার প্রচেষ্টা হয়েছে- সেই সত্যকে সুকুমারী ভট্টাচার্য্য তুলে ধরেছেন। বলেছেন, 'মনে রাখা প্রয়োজন যে ভারতীয় আর্যদের প্রথমতম রচনা ঋগ্বেদের প্রথম পর্যায় থেকেই এত সংশয়। একটি সজীব জনগোষ্ঠীই পারে, পদে পদে সংশয় বোধ করতে। এ কথা অনায়াসেই ধরে নেওয়া যায় যে, তদানীন্তন মানুষের মনে যত সন্দেহ এসেছিল, তার সবই রক্ষিত হয়নি। হয়তো বহু প্রশ্ন সমাজপতিদের কাছে অত্যন্ত অস্বস্তিজনক ছিল বলে সেগুলিকে লুপ্ত করে দেওয়া হয়েছিল, যে কারণে চার্বাকের মতবাদ পূর্ণাঙ্গভাবে রক্ষিত হয়নি। চার্বাকের প্রভাব যে জনমানসে খুবই বিস্তৃত ছিল তার প্রমাণ, এ মতকে খণ্ডন না করে কোনো দর্শন প্রস্থান-রচয়িতাই জলগ্রহণ করেন নি। তাও চার্বাকমতের যেটুকু রক্ষিত হয়েছে তার মধ্যে শাস্ত্রসুলভ সংহতি নেই। শুধু সেইটুকুই চার্বাকের কৃতি হলে চার্বাকের জনপ্রিয়তা এত বাড়ত না এবং চিন্তাশীল মানুষ তাঁর অনুগামী হতেন না। তেমন মানুষ যে চার্বাকপন্থী হয়েছিলেন তার প্রমাণ হল, এ মতের খণ্ডনে এত গরজ এত ঔৎসুক্য ও চিন্তাশ্রম। শুধু নির্বোধরা চার্বাকপন্থী হলে শাস্ত্রকাররা এত ভয় পেত না। বহু বুদ্ধিমান মানুষ তাঁর মতের অনুসরণ করছিলেন বলেই তাঁর সম্বন্ধে এত আতঙ্ক। এবং চার্বাকের মত ধর্মের মূল ধরে টান দিয়েছিল আত্মা পরলোক ঈশ্বর অস্বীকার ক'রে।'
আমরা জানি ব্যাপক অংশের মানুষের মধ্যে যে সন্দেহ তীব্র ছিল তারই নাম লোকায়ত। অধ্যাপিকা ভট্টাচার্য বলেছেন, 'নিরীশ্বর সাংখ্য, যোগ বা বৈশেষিক দর্শন সম্পর্কে বেদ ও উত্তরবৈদিক শাস্ত্রে এত প্রতিহিংসাপরায়ণতা ছিল না, যা ছিল চার্বাক, বার্হস্পত্য বা লোকায়ত সম্পর্কে।' প্রাচীনভারতের এই ইতিহাস অনুসন্ধান প্রাচীন ভারতীয় সমাজ ও সভ্যতার প্রতি তাঁকে শ্রদ্ধাশীল করে তুলেছিল। অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে সংশয়, সন্দেহ যাচাই সমাজকে ধাপে ধাপে এগোতে সাহায্য করেছে। এই সুচিন্তিত ধারণার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর স্বীকারোক্তিতে 'অত প্রাচীনকালে অত মৌলিক সংশয় ও নাস্তিক্য যে জাতের মধ্যে উদ্গত হতে পেরেছিল, সে জাত নিঃসংশয়ে একটি অত্যন্ত সজীব, নিয়ত মননশীল জাত, যারা প্রশ্ন সমস্যাসঙ্কুল চিন্তাজগতে আপস করতে অস্বীকার করেছিল। প্রচলিত মত ও পথে তাদের চিত্ত তৃপ্তি পায়নি, তাদের চাই ভূমাস কারণ তাদের 'নাল্পে সুখমস্তি'। ঐতিহ্যধারায় প্রাপ্ত বিশ্বাস, শাস্ত্র ও আপ্তবাক্যকে আজ থেকে সওয়া তিন হাজার বছর আগে যে ভারতীয়রা সন্দেহ করে জীবন সম্বন্ধে নানা মাত্রার, নানা যন্ত্রণাদীর্ণ জিজ্ঞাসাকে এত তীব্রভাবে উচ্চারণ করতে পেরেছেন, তাঁরা অবশ্যই নমস্য। কারণ তাঁরাই যুক্তিতর্কের সূত্রে নবতর সত্যের পথে এ জাতিকে রওনা করে দিতে পেরেছেন। তাঁদের সংশয় ও নাস্তিক্য আমাদের গর্বের বস্তু, এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার।'
বস্তুবাদী চিন্তার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে তাঁর চিন্তা এবং লেখনী। তাই একথা তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ে উপস্থিত করেছেন যে, 'ভারতীয় ধর্মশাস্ত্রকররা সমগ্র বেদকেই অর্থাৎ সংহিতা-ব্রাহ্মণ-আরণ্যক-উপনিষদ চারটি অংশকেই অপৌরুষেয় বলেছেন। যার অর্থ পুরো শাস্ত্র সম্ভার সবটাই দৈব আদেশ বা প্রকাশ, মানুষের রচনা নয়। কিন্তু একথা আজ আমরা জানি, এর সবটাই মানুষের রচনা।' অপৌরুষেয় বলে বেদকে অভিহিত করার মধ্যে নিহিত উদ্দেশ্যটিকেও তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। বলেছেন, 'আর্যসমাজ বিরোধী মতবাদকে খণ্ডন করে আত্মসাৎ করে এবং প্রাগার্যদের বিরুদ্ধে লড়াই করে একটা সংহতি নির্মাণের চেষ্টা করেছে। জীবনযাত্রার যন্ত্রণাবিদ্ধ মানুষের সমাজের বিবর্তন, অনিবার্য সামাজিক উৎপাদনব্যবস্থা ও সম্পর্কের ক্রমান্বয় পরিবর্তনকে 'দৈব প্রকাশ', 'অপৌরুষ' আখ্যা দিয়েই মানুষকে গ্রহণ করানোর প্রয়াস করেছে ধর্মশাস্ত্রকাররা। তা না করতে পারলে বহু বিচিত্র জনগোষ্ঠীর মতবাদের ধর্মবোধের ও আচরণের দ্বারা গঠিত সমাজের অধিগঠন সম্ভব হত না।'
□ আর্যদের আগমন - শ্রেণীবিভাজন ও মানুষের অগণিত প্রশ্ন □
এদেশে একদল শিক্ষিত মানুষও গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে মনে করেন যে আর্যসভ্যতাই ভারতীয় সভ্যতা-আর্যরাই এভূমির আদিতম বাসিন্দা। প্রাগার্য সভ্যতাকে অস্বীকার অথবা হীন প্রমাণ করার প্রয়াসও চালিয়ে যাচ্ছে একটা সম্প্রদায়। অধ্যাপিকা ভট্টাচার্য্য বস্তুনিষ্ঠ চিন্তার ভিত্তিতে তাকে খণ্ডন করেছেন। দেখিয়েছেন কীভাবে বৈদিক আর্যরা ভারতবর্ষে সঙ্গে নিয়ে আসে যাযাবর সময়ের পশুচারিতা। শুধু তাই নয়, এদেশে এসে তারা সম্মুখীন হয়েছিল কৃষিজীবী এক সুস্থিত নাগরিক সভ্যতার। তিনি বলেছেন, 'এই সময়ে উৎপাদন ব্যবস্থা যা ছিল তা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত ছিল না। প্রাগার্যদের কাছ থেকে হরণ করা এবং নিজেরা দখল করে পাওয়া জমি, ফসল, গোধন, লুণ্ঠন, মৃগয়া এসব মিলেও প্রয়োজনের অনুপাতে যথেষ্ট খাদ্যসম্পদ জুটত না। নিরন্তর খাদ্যাভাব অনাহার ও দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনায় উৎপীড়িত ছিল জনসমাজ। এর উপর শীতের দেশ থেকে অপেক্ষাকৃত গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে আসায় নতুন কিছু রোগ ব্যাধির আক্রমণও ছিল। এছাড়াও প্রাগার্যদের সঙ্গে সংঘর্ষও একটি আতঙ্কের ব্যাপার ছিল। দুর্ভিক্ষ, মহামারি, প্রাগার্যদের কাছে পরাজিত হওয়ার আশঙ্কা এবং অভিজ্ঞতা দুটিই বাস্তব ব্যাপার ছিল।'
জীবনযাপনের ও সমাজের এই বস্তুগত উপাদানেই এসেছে প্রতিবিধান স্বরূপ বিভিন্ন যজ্ঞের অনুষ্ঠান। এবং এদেশের অধ্যাত্মবাদীদের চিন্তার উপর কষাঘাত হেনে দেখিয়েছেন পৃথিবীর সব প্রাচীন সমাজের কোনো না কোনো আকারে যজ্ঞ ছিল। বেদের নানান পর্যায়ে মানুষের অবস্থান তার বাস্তব চরিত্রকে ভিত্তি করেই বৈদিক সাহিত্যের নানান পর্যায়কে উপলব্ধি করার দিকে তিনি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় দেখিয়েছেন, 'শ্রেণীবিভেদ ঘটল ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে, তার পরে মানসিক শ্রম প্রাধান্য পেল কায়িক শ্রমের ওপরে। এও আর-একটা বিভাজন। এই সঙ্গেই আর একটা বিভাজন ঘটেছিল সমাজে পাকাপাকি একটি পুরোহিত শ্রেণীর অভ্যুত্থান, এরা পরোপজীবী, এই সঙ্গে ধর্ম বা শাস্ত্র হয়ে উঠল প্রাথমিক ভাবে জ্ঞানলভ্য'। যখন নগরসভ্যতা বিভক্ত হয়ে পুরোহিতশ্রেণীকে অন্তর্ভুক্ত করল এবং মানসিক শ্রম করা পুরোহিত শ্রেণী সম্ভ্রমের পাত্র হয়ে উঠল- তার ফল স্বরূপ ঘটল ধর্মতত্ত্বের উদ্ভব। ব্যাখ্যা করে বললেন, 'এই যুগে দেহ ও আত্মার পৃথক সত্তার স্বীকৃতিও নতুন একটি বিভাজন। এই বিভাজনটি এ যুগের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিভাজন। আত্মাই সত্য এবং গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে লাগল। এরপর থেকে দেহ গৌণ, নশ্বর ও হীন বলে গণ্য হল পুরোহিত শাস্ত্রকারদের সমস্ত ঝোঁকটা পড়ল আত্মার ওপরে। ফলে কায়িক শ্রমের ন্যূনতা, হীনতাও সমর্থিত হল মানসিক শ্রমের তুলনায়। সমাজে এ সময়ে অর্থাৎ খ্রীষ্টপূর্ব অষ্টম থেকে ষষ্ঠ-পঞ্চম শতকের মধ্যে লিপি, মুদ্রা, জ্যোতিষ ও বেদাঙ্গে আলোচিত নানা নতুন বিদ্যার চর্চার সূত্রপাত হয় এবং এর পশ্চাতে সমাজে মৌলিক কতকগুলি স্থায়ী পরিবর্তনও ধীরে ধীরে ঘটছিল। তার মধ্যে প্রধান একটি হল প্রাচীন গোষ্ঠীগুলি ভেঙে প্রথমে কৌম ও পরে কুলের উদ্ভব। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রাচীন এককগুলি কৃষিভূমি ও গোচারণভূমিনির্ভর ক্রমশ ছোটো ছোটো খণ্ডে বিভক্ত হচ্ছিল। এইসব প্রক্রিয়া যখন সমাজে চলছে তখন মানুষ তার আশপাশের জগৎকে যেভাবে আগে দেখত সে দেখা বদলাতে লাগল। সমাজে এই যে নানা বিভাজন ঘটছিল এর একটা দৃঢ় ও স্থায়ী প্রতিক্রিয়া মানুষের মনজগতে অনিবার্যভাবেই ঘটছিল। এতে প্রতিফলিত হচ্ছিল প্রকৃতি সম্বন্ধে মানুষের চেতনায় একটা বিভাজন, যেটির উৎস সমাজের অনুরূপ একটি বিভাজন।' তিনি বিশ্লেষণ করে এও দেখালেন, 'যে সমাজে ধনী দরিদ্র শ্রেণীবিভাগ ঘটেছে, সেখানে অধিকাংশ দরিদ্রের ওপরে ধনীর পীড়ন আছে। যেখানে মননশ্রমিক প্রভুত্ব করে কায়িক শ্রমিকের ওপরে, সেখানেও মুষ্টিমেয় কিছু লোকের প্রতাপের অধীন সংসারের বহুসংখ্যক লোক। আত্মা নিয়ে পুরোহিত-শাস্ত্রকাররা যখন আলোচনায় মগ্ন, তখন দেহটার পুষ্টি, ক্ষুধার খাদ্য, পরনের বস্ত্র, রোগের ওষুধ, বিপদের সমাধান, ঋণের বোঝা ও শোধ না করতে পারার যন্ত্রণা কমাতে পারছে না সাধারণ মানুষ। এ জীবন ক্রমেই তাদের পক্ষে দুঃসহ হয়ে উঠছে। এই আবহাওয়াতে, এইসময়ে দেশের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে জন্মান্তরবাদ কী ব্রাহ্মণ্য, কী বৌদ্ধ, কী জৈন, কী আজীবিক সব ধর্মমতই জন্মান্তরকে স্বীকার করে নিয়েছে।'
এককথায় বলা যেতে পারে বস্তুগত জীবনের ভিত্তিতেই সমাজের মধ্যে দেবমণ্ডল, জন্মান্তরবাদ, অলৌকিক ধ্যান ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। এবং তার প্রতিফলন হিসাবে এই সব সাহিত্য-সংহিতার পরিবর্তন ঘটেছে। তারজন্যই সমাজ মানসের গঠনে ক্রমান্বয়ে সংশয়, প্রশ্ন জিজ্ঞাসু মনের পরিচয় আমরা পাই। তিনি বলছেন, 'আর প্রশ্নই বা কত। শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, মানসক্রিয়া, বহির্বিশ্ব, জীবনমৃত্যুপরলোক, দেবতার ভূমিকা, উৎপত্তি, সংখ্যা, জীবনের পরিণাম, লক্ষ্য, নানান বিষয়ে প্রশ্ন এদের মনে জাগরুক। তা-ও তো আমরা সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের - দীন-দুঃখী চাষিমজুর, অন্ত্যজ, প্রাগার্য, নারী ও শূদ্রের বিশিষ্ট সংশয় ও প্রশ্নের কোনো চিহ্নই পাই না উপনিষদে। কিন্তু যা পাই তাতে একটি সজীব মানসিকতার প্রকাশ দেখি। প্রশ্ন-পরম্পরা চলে, পরিণামে কখনও ধিক্কার কখনও বা পুরস্কার - কিন্তু যে মনে প্রশ্ন জাগরুক তাকে সহজে নিরস্ত করা যাচ্ছে না এটা বেশ লক্ষ্য করা যায়।' সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কিত প্রশ্নকে কেন্দ্র করে অতিপ্রাকৃত শক্তির অস্তিত্বকে প্রমাণ করার চেষ্টার বিরুদ্ধে খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের গ্রীসের তার্কিক সম্প্রদায়ের একটি কথাকে অধ্যাপিকা ভট্টাচার্য্য মানুষের মধ্যে গভীর আত্মবিশ্বাস তৈরীর জন্য উদ্ধৃত করেছেন- 'পৃথিবীটা সকলের পক্ষেই একই রকমের। সেটি কোন দেবতা বা মানুষ সৃষ্টি করেনি, সেটি বরাবরই ছিল। এখনও আছে এবং চিরকালই থাকবে।' তাই বেদকে তিনি জনসাধারণের ধর্মাচরণ ও তার বিশ্বাস অবিশ্বাসের পটভূমিকার একটি প্রতিনিধিমূলক সাহিত্য হিসাবেই অভিহিত করেছেন। এও বলেছেন, 'বিশ্বাস ও তত্ত্বের নিজস্ব ক্রম থাকে- তবু মোটের উপর জীবন ও জীবিকার ভিত্তি - উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার সঙ্গে তার অঙ্গাঙ্গী যোগ থাকে। কারণ উৎপাদন অর্থাৎ সমাজের অবগঠন বহুলাংশে নিরূপণ করে সমাজের মানসিক অধিগঠনকে।' আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে কতখানি বস্তুবাদী চিন্তা শ্রীমতি ভট্টাচার্য্য তাঁর জ্ঞানার্জনের পন্থা হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন, তা সত্যিই বিস্ময় সৃষ্টি করে। তিনি এই প্রসঙ্গের অবতারণার অন্তিম পর্যায়ে এসে বলেছেন 'কিন্তু পুরাকাল থেকে দেবতা মানুষ সকলে মৃত্যুর পর কিছু থাকে কি না সে নিয়ে সংশয় পোষণ করতেন। ঈশ্বরের অস্তিত্বও প্রামাণ্য, অর্থাৎ ঈশ্বরবচন বলে সব কিছু মেনে নেওয়াতে প্রথম থেকেই মানুষের আপত্তি ছিল। পরে আপত্তি বা সংশয়ের সীমা প্রসারিত হল, বেদে প্রামাণ্য অস্বীকার করায়। দুটি অতিলৌকিক প্রমাণই অস্বীকৃত হচ্ছে, ঈশ্বর তো অলৌকিকই বটে। আর বেদকে অপৌরুষেয় বলা মাত্রই বেদও অতিলৌকিক হয়ে গেল। মানুষ যখন এ দুটি প্রমাণ মানতে অস্বীকার করল তখন সে যা মানল তা প্রত্যক্ষলোকে এবং মানুষের জগতে সীমাবদ্ধ রইল, তা হল লোকায়ত দেবায়ত বা লোকাতিগ নয়। বেদ যদি পুরুষ অর্থাৎ মানুষের রচনা না হয়, তাহলে তা অপৌরুষেয়। এই অপৌরুষেয়তা যারা অস্বীকার করল তারা বেদের প্রামাণ্যতা স্বীকার করল না এবং সেই বেদ যে সব দেবতাকে উপস্থাপিত করছে তাদেরও অস্বীকার করল। তৎকালীন ধর্মবোধের দুটি ভিত্তিপ্রস্তর ভেঙে গেল, বাকি রইল মানুষের বোধ, বুদ্ধি, প্রত্যক্ষজ্ঞান।'
□ প্রাচীন ভারতে অন্নাভাব না থাকার মিথ্যা ও অন্ধবিশ্বাসকে খণ্ডন □
শুধু অধ্যাত্মবাদীরাই নন- বিরাট অংশের ধর্মবিশ্বাসী জনসাধারণের মধ্যে একটা ধারণা এদেশে প্রচলিত আছে যে, বেদের যুগে গোলা ভরা ধান ছিল, সকলে সুখে জীবনযাপন করত- ছিল না অন্নাভাব। কিন্তু এ যে কতবড় মিথ্যা ও অন্ধবিশ্বাস, অধ্যাপিকা সুকুমারী ভট্টাচার্য তা বিশদভাবে বেদকে উদ্ধৃত করেই দেখিয়েছেন। দেখিয়েছেন, সেই যুগে ক্ষুধার অনুপাতে খাদ্যের অভাব। ক্ষুধা ও খাদ্যের ব্যবধান শুনতে অপ্রিয় হলেও নির্মম সত্য। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসকে কল্পিত মহিমার দ্বারা কীভাবে নির্লজ্জ মিথ্যায় পর্যবসিত করা হয়েছে- তা তিনি দেখিয়েছেন। বলেছেন - 'এটাই তথ্য। বিজ্ঞান তখন খুবই পশ্চাৎপদ ছিল, শস্য উৎপাদনের কৃৎ-কৌশল ছিল অনুন্নত, শস্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না, প্রাকৃতিক দুর্যোগে শস্যহানি ঘটত এ সবের জন্য যে অভাব, তা ছিল সার্বত্রিক এবং তার মধ্যে গ্লানির কিছু নেই।' মার্কসবাদে যারা বিশ্বাস করেন, তাদের মতই তিনি দেখিয়েছেন, 'বৈদিক ইতিহাস অনুধাবন করতে করতে দেখি, আর্যরা আসার চার পাঁচ শতাব্দীর মধ্যেই উৎপাদন ব্যবস্থায় কৌশলগত প্রকরণে বিপ্লব এসে যাওয়ায় উৎপাদনে বৃদ্ধি ঘটেছে, প্রয়োজনকে ছাপিয়ে কিছু উদ্বৃত্তও থাকছে। কিন্তু ঠিক তার সঙ্গে সঙ্গেই সমাজে শ্রেণীবিভাগও দেখা দিয়েছে এবং উদ্বৃত্ত জমা হচ্ছে মুষ্টিমেয় ধনীর হাতে। তারা তা নিরন্ন মানুষের মধ্যে বণ্টন না করে ব্যক্তিগত সমৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য পণ্য হিসাবে ব্যবহার করল স্বদেশে ও বিদেশে। ফলে নিচের তলার সংখ্যা গরিষ্ঠ জনসাধারণের ক্ষুধার অন্ন কোনো দিনই মিলল না। পুরাকালে মানুষের অবস্থা ভালো ছিল, বেদের যুগে মানুষ বেশীভালো খেতে, পরতে পেত এমন একটা কল্পকথা সমাজে চালু আছে এ গ্রন্থে বৈদিক সাহিত্যের প্রত্যক্ষ নজিরে এ কল্পকথাই যাচাই করতে গিয়ে ঠেকে গেছি। উত্তর-বৈদিক তত্ত্বের যুগেও যাঁরা ব্রাহ্মণ্য ও ব্রাহ্মণ্যেতর প্রস্থানের বড় বড় তত্ত্বের প্রবক্তা, তাঁরা ইহকাল, পরলোক, জন্মান্তর, কর্ম, কর্মফল নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। কিন্তু যে মানুষগুলো দিনভর খেটে তাঁদের অন্ন জুগিয়ে নিশ্চিন্তে রেখেছে, ওই সব তত্ত্ব আলোচনার অবকাশে সেই হতভাগ্যরা দু'বেলা পেট ভরে খেতে পেল কি না তা নিয়ে তাঁরা কেউই মাথা ঘামাননি। ফলে সমাজে ধর্মচর্চাও চলল, পাশাপাশি ক্ষুধার প্রকোপও রইল অব্যাহত। ক্ষুধা এক তীব্র অভিজ্ঞতা, তার দাবিও তেমনই অপ্রতিরোধ্য। তার মুখোমুখি হতে গেলে কেবলমাত্র খাদ্যসংস্থান দিয়েই তা সম্ভব। নীতিকথা, ধর্মাচরণ, তত্ত্ব-উপদেশ সেখানে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। এই যে সরাসরি খাদ্য দিয়ে ক্ষুধার মোকাবিলা করা, তা বেদের যুগেও হয়নি, আজও হয়নি।'
আরও দেখিয়েছেন, 'আর্যদের আসবার সঙ্গে সঙ্গে কিছু প্রাগার্য দূরে পূর্ব-দক্ষিণ অঞ্চলে সরে গিয়েছিল, তাদের ক্রমে ক্রমে দাস হিসাবে গ্রহণ করল আর্যসমাজ। লোহার লাঙলের ফলার কল্যাণে চাষেও কম মানুষ নিযুক্ত করা হচ্ছিল। কাজেই এই উদ্বৃত্ত শ্রমিকদের নিযুক্ত করা হল কুটিরশিল্পে। কাঠ, ধাতু, চামড়া, পাথর, মাটি, রত্ন, সোনা রূপো ও অন্যান্য ধাতু দিয়ে প্রয়োজনীয় ও সুদৃশ্য বস্তু নির্মাণ করবার কৃৎকৌশল আয়ত্ত ছিল প্রাগার্য জনগোষ্ঠীর। কৃষির উদ্বৃত্ত এবং শিল্পে নির্মিত বস্তু দুই-ই রপ্তানিযোগ্য। শিল্পে এখানে উদ্বৃত্ত সৃষ্ট হয়েছিল। এ উদ্বৃত্ত এখন নৌবাণিজ্যের পণ্যদ্রব্যে পরিণত হল। কারা এই বাণিজ্যের কর্তা ছিল? রাজারা ও রাজন্যরা। অর্থাৎ সমাজের মুষ্টিমেয় একটি ধনিক গোষ্ঠী। এরা বাহ্বলে এবং লোকবলে বেশি জমির মালিক হয়েছিল। ফলে প্রথমে আমদানি করা ও পরে স্থানীয় লোহা ব্যবহার করে লাঙলের ফলা তৈরী করে চাষিদের নিযুক্ত করে চাষের উদ্বৃত্ত ফসল এদেরই হাতে আসত এবং টাকার জোরে কুটির শিল্পের উপাদান কাঠ, ধাতু, মণিরত্ন, ইত্যাদির জোগান দিয়ে শিল্পদ্রব্য নির্মাণ করিয়ে দেশে রাজা রাজন্যদের ও বিদেশে বণিকের কাছে তা বিক্রি করবার একচেটিয়া অধিকার ছিল সমাজের উপরতলার সেই মুষ্টিমেয় ধনিক সম্প্রদায়েরই।' এরই প্রতিফলন হিসাবে দেখা যায়, 'ঋগ্বেদে যারা স্বার্থপরের মত নিজেদের অন্ন নিজেরাই খায়, অন্নের ভাগ দেয় না, তাদের নিন্দা করা হয়েছে। কিন্তু ঋগ্বেদ সেই অর্থে নীতিনির্দেশক গ্রন্থ নয়। তাই তখন গৃহী ইচ্ছে করলে অন্নপ্রার্থীকে যে বিমুখ করতে পারত তার নিদর্শন ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে দেখেছি। কিন্তু তার তিন চারশ বছর পরে ভিক্ষু, ব্রহ্মচারী, পর্যটক, প্রায়শ্চিত্তকারী বা ব্রতধারীর জন্য সমাজ একটা ভিন্ন ব্যবস্থা করল। তখন পাশাপাশি দু'টি সম্প্রদায় গৃহী ও ভিক্ষু-একই সঙ্গে সমাজে বিরাজ করছে। ধনীরা চিরদিনই ধনের বিজ্ঞাপন হিসাবে কিছু পরগাছার মত আশ্রিত, নিষ্কর্মা মানুষকে অন্নদান করত- আবার খেয়ালখুশি মত প্রার্থীকে প্রত্যাখ্যানও করত। কিন্তু ওই দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি শ্রমবিমুখ, উৎপাদনবিমুখ অংশ যখন আহারের জন্য সম্পূর্ণভাবে গৃহীর উপরে নির্ভরশীল, তখন সন্ন্যাসীকে ভিক্ষা দেওয়াকে পূণ্য কর্ম বলে প্রচার না করলে তারা খেতে পাবে না, বাঁচতে পারবে না। তাই ধর্মবোধের মধ্যেই ভিক্ষুকে অন্নদান অনুপ্রবিষ্ট হল।' বর্তমান সময়ের অন্নাভাবের যন্ত্রণাকে তিনি তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে গভীর মর্মবেদনায় অনুভব করেছেন তাঁর ইতিহাস চর্চার মধ্যেই। তাই উন্নত হৃদয়বৃত্তির অধিকারী হিসাবে বলেছেন, 'এই সমাজে ক্ষুধার তুলনায় খাদ্য অপ্রতুল। সাধারণ মানুষ তা বোঝে এবং যজ্ঞে প্রার্থনায়, কৃষিকর্মে নিরন্তর খাদ্যের প্রাচুর্যের সন্ধান করে ফেরে, কারণ ক্ষুধা ও খাদ্যের মধ্যে সমান্তরাল ব্যবধানটা রয়েই গেছে। রাষ্ট্র ব্যবস্থাতেও এমন কোনও বিধান ছিল না যে উৎপন্ন শস্যের একটা অংশ মজুত রেখে অকালে, দুর্ভিক্ষে দুঃস্থ প্রজাদের মধ্যে তা বিতরণ করা হবে। এটা অনেক শতক পরে ধীরে ধীরে আসে এবং কখনওই পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ফলে এ দেশে বেদের সময় থেকেই খাদ্যাভাব ব্যাপকভাবে বর্তমান ছিল, অর্থাৎ সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাং ইত্যাদি ইচ্ছাপুরক স্বপ্নের প্রকাশমাত্র। বৈদিক যুগ থেকে আজ পর্যন্ত দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটিয়েছে, দেশে ফসল বেশি হলেও তার ভাগ পায়নি, কম হলে তো অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে দিন কাটাতে বাধ্য হয়েছে, না হলে মৃত্যু এসেছে অশনায়াপিপাসের চেহারায়। সে দিন যজ্ঞে যে সব দেবতাকে মাথা খুঁড়ে মিনতি জানিয়ে ক্ষুধিত মানুষ বিফল হয়েছে তাদেরই উত্তরপুরুষেরা আজ সরকারের পায়ে মাথা খুঁড়ে আবেদন নিবেদন করে বিফল-মনোরথ হয়ে উপোস করছে।' ক্ষুধার্ত মানুষের এই হাহাকার সমাজের নিপীড়িত শ্রেণীর মর্মযন্ত্রণা তাঁর বেদ-চর্চা বা ভারতচর্চার পথ এবং পন্থাকে প্রভাবিত করেছে বস্তুনিষ্ঠ করে তুলেছে। একথা অনস্বীকার্য।
□ নিয়তিবাদের ইতিহাস ও মানুষের আপনশক্তির প্রত্যয় □
বাড়ীর পরিচারিকার দু বছরের শিশু 'বসন্ত' রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর যখন পরিচারিকাটি বলল যে, বসন্ত রোগে মারা যাওয়াটাই ছিল তার কপালে তখন মৃত্যুর বেদনার চেয়ে সুকুমারী ভট্টাচার্য্য বেশী আঘাত পেয়েছিলেন এই মৃত্যুকে সহজে মেনে নেওয়ার জন্য। জন্ম, দুর্ঘটনা, মৃত্যু- এই তিনটি বিষয় থেকে নিয়তি সম্পর্কিত ধারণার উৎপত্তি। জন্ম অতীতে, মৃত্যু ভবিষ্যতে - কিন্তু দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে। ভারতবর্ষে ঋগ্বেদে অবশ্য নিয়তিবাদের উল্লেখ পাওয়া যায় না। তিনি দেখিয়েছেন, 'নিয়তিবাদ ঠিক কবে তার বর্তমান রূপে সমাজ ও সাহিত্যে দেখা দেয় তা বলা যায় না, সে যুগের কোনো দলিল এখনও পাওয়া যায়নি। অনেক পরে মানুষ যার হেতু বা কারণ খুঁজেছে তখন মানুষের কল্পনায় নিয়তি, দৈব, ভাগ্য, ইত্যাদি নানা নামে একটি শক্তির অবতারণা ঘটে। সেটি ক্রমে ক্রমে পল্লবিত হতে থাকে। ফলে যুক্তি ও কার্যকারণ সম্পর্ক যত পিছু হটে, ততই অযৌক্তিক শক্তি মানুষের জীবনে এক চালিকা শক্তি হিসাবে দেখা দেয়। অসংখ্য দেবতার অস্তিত্বের কল্পনার সঙ্গে মিলিত হয়ে কখনও বা তাদের ওপর স্থান পেল ওই অলৌকিক শক্তি। পুরাকাল থেকে এ ঘটনা পৃথিবীর সর্বদেশে ঘটে আসছে। যদিও ক্রমে ক্রমে এর নানা রূপ ও ক্রিয়াকলাপ বাড়তে থাকে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে সহজ বুদ্ধিতে এর কোনো রূপান্তর ঘটেনি। বরং তার আকৃতি প্রকৃতির নানা বিস্তার আজও ঘটে চলেছে।' ইতিহাস বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি মন্তব্য করেছেন, 'সামাজিক ভাবে নগরের পত্তনের একটি অপরিহার্য অঙ্গ নিয়তিবাদ। ভারতবর্ষে খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের কাছাকাছি প্রথম নগরায়নের সূত্রপাত হয়েছিল। সে সময়কার কোনও দলিল আমাদের নেই, কিন্তু অন্যান্য দেশের থেকে তা মৌলিক ভাবে ভিন্ন হওয়ার কোনও কারণ নেই। বর্তমানে যতটা নজির পাওয়া যায় শস্য, কৃষি, লাঙল, কুমোরের চাক, পালতোলা নৌকো, হাতে বোনা তাঁত, তামা গলানোর পদ্ধতি, ধাতুবিদ্যা, অপ্রায়োগিক গণিত, অভ্রান্ত জ্যোতির্বিদ্যার সমীক্ষণ, ঋতুপঞ্জি, লিপির ব্যবহার ও বুদ্ধির ক্ষেত্রে অন্যান্য আদান প্রদানের বিধি- এ সবই প্রায় একই সময়ে, অর্থাৎ খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের উদ্ভাবন, দু-এক শতক আগে পরে হতে পারে।'
এই নগরায়নের পরিপ্রেক্ষিতে এবং তারই সঙ্গে একটা বিরাট অংশের মানুষের অজ্ঞতা, জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়তির প্রতি তাদের বিশ্বাসকে সুদৃঢ় করত। পরিবেশের এই বস্তুতান্ত্রিক উপাদানকে উপস্থিত করে তাই তিনি বলেছেন, 'প্রাথমিক উৎপাদকরা নিষ্ঠুর দারিদ্র্যে দিন কাটাতো, আর সংখ্যালঘু অবসরভোগী শ্রেণী, পুরোহিতরা বা বুদ্ধিজীবীরা যারা উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে, কায়িক শ্রম থেকে মুক্ত তারা এখন কায়িক শ্রম সম্বন্ধে শ্লেষ বিদ্রূপ করতে শুরু করেছে। নিজেরা পরজীবী হয়ে অন্নদাতাদের প্রতি বিদ্রূপ ও তাচ্ছিল্য প্রকাশ করছে। কর্মবাদ ও নিয়তিবাদের প্রসারের পক্ষে এই অবস্থাটি বিশেষ অনুকূল হয়ে দেখা দেয়।'
যদিও এরই পাশাপাশি ইতিহাসে আমরা দেখি, নিয়তিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থিত মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা। পাশ্চাত্যে নিয়তিবাদকে বলা হয়েছে নৈতিকভাবে পলায়নের মনোভাব। ভারতীয় সাহিত্যে রয়েছে দ্বিধান্বিত মানসিকতা। এতসত্ত্বেও 'মানুষের অন্তঃস্থিত শৌর্য নিয়তির রায় মানতে প্রস্তুত ছিল না। এবং ওইসব শাস্ত্রই আলোচনা ও কাহিনীর মাধ্যমে প্রতিকূল দৈবের বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রামের সাক্ষ্য দেয়। মানুষ সদম্ভে ঘোষণা করে যে, শুধু স্বাধীন ভাবে ইচ্ছা করাই নয়, সে ইচ্ছাকে কার্যে পরিণত করার শক্তিও সে রাখে এবং এভাবে দৈবকে প্রতিহত করতে পারে।' তিনি আরও দেখিয়েছেন, 'খ্রীস্টপূর্ব চতুর্থ তৃতীয় সহস্রাব্দে মানুষ যাকে নিয়তি বলত, যদি লক্ষ্য করি তার কতখানি আজ মানুষের জ্ঞান ও শক্তির আয়ত্তের ভেতরে এসে গেছে, তা হলে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। প্রতি প্রজন্মে মানুষের সমবেত চেষ্টা কত তথাকথিত দুরারোগ্য রোগকে পরাজিত ও নির্বাসিত করেছে, ব্যক্তির ইচ্ছা ও প্রয়াস মানুষের জীবনের কত অঞ্চলে যে অসাধ্য সাধন করেছে তার ইয়ত্তা নেই। এখন মুখ্যত যা দুর্লঙ্ঘ্য নিয়তি রূপে মানব সমাজের কাছে প্রতিভাত, তা হল সারা পৃথিবীর ওপরতলার শাসনকর্তারা নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করবার জন্যে ও সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকে পরাজিত করবার জন্যে বিজ্ঞানের নবতম, যুগান্তকারী উদ্ভাবনগুলিকে জেনেশুনে সুপরিকল্পিত ভাবে সাধারণ মানুষের ধ্বংসের জন্যে ব্যবহার করছে। একদিকে তা যেমন ভোগ্যপণ্যে দৃষ্টিকটু অথচ সর্বাত্মক আসক্তি জন্মাচ্ছে, তেমনি অস্ত্র নির্মাণে, রোগজীবাণু সৃষ্টিতে, স্বাস্থ্যহানিকর পরিকল্পনায়, পরিবেশ দূষণে, পরিকল্পিত মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার প্রবর্তনায় পৃথিবীর সম্পদ বিনিয়োগ করছে, যাতে ওপরতলার মুষ্টিমেয়রা সব দেশে ক্ষমতায় আসীন থাকতে পারে ও সংখ্যা গরিষ্ঠরা অসহায় ভাবে মরে। এ পর্যায়ে সংগ্রামটা রাজনীতিতে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। অথচ এই রাজনীতিতে-রাষ্ট্রনীতিতেই তো লক্ষ্য করি শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের একাগ্র ও সংহত প্রচেষ্টা হিটলারের মতো আপাত-অজেয় মূর্তিমান দুর্দৈবের মতো মন্ত্রশক্তিকে পরাহত করেছে। ধুমকেতুর মতো বহু মন্দ শক্তি রাষ্ট্রগগনে বার বার উদিত হয়ে বহু ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমবেত শুভ চেষ্টার কাছে হার মেনেছে।'
অতীতের ইতিহাসে তো বটেই বর্তমানের সামাজিক অবস্থানকেও বিচারে নিয়ে অধ্যাপিকা ভট্টাচার্য্য বলিষ্ঠভাবে বলেছেন, 'তত্ত্ব হিসাবে নিয়তিবাদের মূল প্রোথিত আছে ওই কায়েমী স্বার্থেরই মধ্যে সমাজশাসকদের, পুরোহিত ও শাস্ত্রকারদের মধ্যে, যাদের ধমক ও প্রতারণা অজ্ঞান মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো করে রাখে এবং এই সংগ্রামে তারা জেতে। মানুষের দুর্বলতর ভীরু সংস্কারাচ্ছন্নকে লালন করে, এ সব সংস্কার ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে বিভিন্ন অঞ্চলে, বিভিন্ন যুগে এবং ক্রমেই বহুগণিত হতে থাকে। অতএব জ্ঞান যদি কোথাও শক্তি হয়ে যায়, তবে তা এখানেই শুভ ইচ্ছাই সে জ্ঞানের ফল, সুসংহত শুভ ইচ্ছাই অপরাজেয় শক্তি।'
(এর পর দ্বিতীয় অংশ দেখুন)
পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২
দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com