রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

নিবেদিতার চোখে বিবেকানন্দ - (দ্বিতীয় অংশ)

চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য | শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

(প্রথম অংশের পর)
জাতীয় আন্দোলন সম্পর্কে বিবেকানন্দের মনোভাবকে স্পষ্ট করে আরও জানা যায় তাঁর সঙ্গে এক প্রশ্নোত্তরের আসরে। জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করেন, 'আপনি কি জাতীয় কংগ্রেসের দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন?' উত্তরে বিবেকানন্দ বলেছিলেন, 'খুব বেশি দৃষ্টি দিইনি। আমার কাজ অন্য ক্ষেত্রে। কিন্তু এই আন্দোলনকে আমি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করি এবং আন্তরিকভাবে এর সাফল্য কামনা করি।' শুধু তাই নয়, মিস মেরী হেলকে লেখা এক চিঠিতে তিনি সুষ্পষ্টভাবে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে বলেছিলেন, 'রক্তশোষণই যেখানে প্রধান উদ্দেশ্য, সেখানে মঙ্গলকর কিছু হতে পারে না। শিক্ষার প্রসারও আর হতে দেওয়া হচ্ছে না। মুদ্রণযন্ত্রের স্বাধীনতা আগেই বন্ধ করা হয়েছে। আমরা তাকিয়ে আছি আরও কি হয় দেখার জন্য। গুটিকতক নির্দোষ সমালোচনাত্মক কথার ফল লোকের সঙ্গে সঙ্গে যাবজ্জীবন নির্বাসন, কারও বিনা বিচারে কারাদণ্ড; তাছাড়া কেউ জানে না, কখন তার মাথা কাটা যাবে। ভারতবর্ষে কয়েক বছর ধরে সন্ত্রাসের রাজত্ব চলছে। ইংরেজ সৈনিকদের হাতে আমাদের পুরুষেরা প্রাণ হারাচ্ছে। মেয়েরা অত্যাচারিত হচ্ছে।' রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে এই যে উপলব্ধি তা কত বড় স্বদেশপ্রেমিক এবং রাজনৈতিক চেতনার অধিকারী হলে তা সম্ভব- ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, নিবেদিতা ধর্মীয় উপাসনা, ধর্মীয় সাধনায় বিবেকানন্দকে আচার্যদেব বলে গ্রহণ করলেও শুধু তার মধ্যেই তাঁর দৃষ্টি আবদ্ধ হয়ে থাকেনি। তিনিও উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন স্বামীজীর দেশপ্রেমকে। এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য- যাকে ভগবৎপ্রেমী বহু মানুষ অস্বীকার করতে চান।
আমরা জানি, বিবেকানন্দের চিন্তায় ধর্মের সঙ্গে, ধর্মীয় আচরণের সঙ্গে মানুষ এবং স্বদেশ যুক্ত ছিল বলেই ধর্মকে তিনি দেখেছেন নতুন দৃষ্টিতে; দেখিয়েছেনও নতুন করে। কুসংস্কারকে ত্যাগ করে তিনি বলেছেন, 'ধর্ম যেন সমাজের বিধানদাতা না হয়।' ধর্মকে তিনি যুক্তি বিচারের ভিত্তিতে গ্রহণ করার কথাও বলেছেন। বলেছেন, 'যুক্তিবিরোধী কোন কিছু বিশ্বাস করা পাপ। ধর্ম যা কিছু বলে তার সবই যুক্তির কষ্টিপাথরে ফেলে বিচার করা দরকার।' ধর্মের মধ্যে বিশ্বাস এবং যা মূলত অন্ধ বিশ্বাস তারই স্থান সর্বাগ্রে। কিন্তু বিবেকানন্দ এই বিশ্বাসকে যুক্তির আলোকে আলোকিত করেছেন। তিনি এমনও বলেছেন, 'আমি অবশ্য বেদের ততটুকু মানি, যতটুকু তা যুক্তির সাথে মেলে। বেদের অনেক অংশই তো স্পষ্টতই স্ববিরোধী।' তাঁর এই ধর্মীয় ভাবধারাকে নিবেদিতা গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন। নিবেদিতা বলছেন, 'আমাদের সামনে যা কিছু আসুক বিচার করে তাকে বোঝার চেষ্টা সবসময় থাকা চাই। কারুর অলৌকিক দর্শনের কথা শুনলে তাকে বলতে হবে, নিজে ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করলে তবেই আমি তাকে সত্য বলে গ্রহণ করব।' একসময় আমেরিকার একটি ভূত নামানোর ব্যাপারে স্বামীজী দর্শকরূপে উপস্থিত ছিলেন। ঐ সময়ে অলৌকিক ব্যাপারের যে প্রদর্শন হচ্ছিল তা দেখে তিনি বলেছিলেন- 'সর্বত্রই অতি সহজ উপায়ে কত জুয়াচুরি চলে।' নিবেদিতা এক চিঠিতে মিস ম্যাকলাউডকে বলছেন, 'স্বামীজীকে কোষ্ঠিগণনার কথা বললাম। তিনি ফেটে পড়লেন- কুসংস্কারের আর একটি শব্দ যেন না শুনি।' যদিও কোষ্ঠিগণনায় নিবেদিতার বিশ্বাস ছিল। তাঁর চিঠিপত্রে একথা জানা যায়। বিখ্যাত হস্তরেখাবিদ কিরোর সঙ্গে নিবেদিতার পরিচয় ছিল। কিন্তু স্বামীজী একে কুসংস্কার বলে মনে করতেন।
নিবেদিতার ব্যক্তিত্বের আর একটা পরিচয় এই প্রসঙ্গে আমরা দেখতে পাই। তিনি বিবেকানন্দের কুসংস্কারমুক্ত যুক্তিবাদকে শ্রদ্ধা করলেও নিজের সত্য অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরে একথাও বলেছিলেন, 'পরীক্ষা না করে কোন জিনিস গ্রহণ করা যাবে না বললেও স্বপ্ন, আগে থেকে ভাবী ঘটনা দর্শন করা বা সেই সম্পর্কে ভবিষ্যত বাণী ইত্যাদির প্রশ্নে দেহত্যাগের দিন পর্যন্ত বিবেকানন্দের কাছে এসব আতঙ্কের বিষয় ছিল।' তিনি এও বলেছিলেন, 'চট করে কোন সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার অনিচ্ছা থাকলেও স্বামীজী শেষের দিকে পরলোকগত আত্মার পুনরাগমন সম্পর্কে বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছিলেন।' এই কথাগুলি তিনি তাঁর আচার্যদেবের প্রতি কোনরকম অশ্রদ্ধা থেকে বলেননি। এখানে নিবেদিতার ধর্ম ও ঐতিহ্যবাদী চিন্তার সীমানার মধ্যেই সত্যাশ্রয়ী বলিষ্ঠ মনোভাবের একটি দিককে আমরা দেখতে পাই।

।। বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীষ্ট, মহম্মদ-এর প্রতি বিবেকানন্দের শ্রদ্ধা ।।

নিবেদিতা বিবেকানন্দের ধর্মমতের মধ্যে সহিষ্ণুতা, অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধকে তুলে ধরেছেন। হিন্দুধর্মের প্রবক্তা হয়েও তিনি বুদ্ধ, যীশুখ্রীষ্ট ও মহম্মদ সম্পর্কে যে শ্রদ্ধাবোধ পোষণ করতেন তা নিবেদিতার বহু রচনায় পরিস্ফুট। সানফ্রান্সিসকোতে এক প্রশ্নের উত্তরে বিবেকানন্দ বলেছিলেন, 'মহম্মদকে আমি প্রণাম করি। তিনিই প্রথম সাম্যের বাণী এনেছেন।' নিবেদিতা বলছেন, 'বিবেকানন্দ কোন ধর্মে বিশ্বাসী না জেনে ভুলবশত একজন যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, 'স্বামীজী আপনি কি বৌদ্ধ?' এর উত্তরে কম্পিত কণ্ঠে তিনি বললেন, 'বৌদ্ধ! আমি বুদ্ধের দাসানুদাসের দাস।'
ঠিক একইরকমভাবে এক জনৈকা মহিলার প্রশ্নের উত্তরে তিনি যা বলেছেন তাকে নিবেদিতা উদ্ধৃ ত করেছেন। তিনি বলছেন, 'যদি আমি ন্যাজারেথবাসী ঈশার সময়ে প্যালেস্টাইনে বাস করতাম, তাহলে চোখের জলে নয়, হৃদয়ের শোণিত দিয়ে আমি তাঁর পা-দুখানি ধুয়ে দিতাম।' বিবেকানন্দের এই চিন্তা নেতাজী বার বার তুলে ধরেছেন।
ধর্ম সম্পর্কে এই উদারতা ছিল বলেই এমন কথাও বিবেকানন্দ বলতে পেরেছিলেন, 'এটা খুবই স্বাভাবিক যে একই সময়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এবং নির্বিরোধে আমার ছেলে বৌদ্ধ, আমার স্ত্রী খ্রীষ্টান এবং আমি মুসলমান হতে পারি।' যারা হিন্দুত্বের দোহাই দিয়ে অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ান, তারা যে বিবেকানন্দের শিক্ষা-বিরোধী তা অস্বীকার করা যায় না।
ধর্মমতের যে সহিষ্ণুতা স্বামীজীর মধ্যে নিবেদিতা প্রত্যক্ষ করে আকর্ষণ অনুভব করেছিলেন ভারতে পদার্পণ করে বিবেকানন্দের মধ্যে তাকে তিনি বুঝতে পেরেছেন আরও স্পষ্ট করে। হিন্দুধর্মের প্রবক্তা হয়েও বিবেকানন্দ যেভাবে ইসলাম ধর্মকে দেখেছেন, সে প্রসঙ্গে নিবেদিতা লিখেছেন, 'মোগলগণের গরিমা স্বামীজী শতমুখে বর্ণনা করতেন। প্রায়শই আকবরের কথা বলতেন এবং আকবরের কথা বলতে বলতে স্বামীজীর কণ্ঠ যেন অশ্রু গদগদ হয়ে উঠত।' ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা বিদেশী এই সমস্ত ধর্মবিদ্বেষী কথা প্রসঙ্গে বিবেকানন্দের বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে নিবেদিতা বলেছেন, 'জনৈক শিষ্যকে স্বামীজী বলেছিলেন, শাজাহান নিজেকে বিদেশী নামে অভিহিত হতে শুনলে কবরের ভিতর থেকে ফিরে দেখতেন, কে তাঁকে ওইরকম বলছে।' সর্বোপরি মাতৃভূমির কল্যাণকল্পে স্বামীজীর শ্রেষ্ঠ প্রার্থনা ছিল, ভারত যেন ইসলামিক দেহ ও বৈদান্তিক মস্তিষ্ক এই দ্বিবিধ আদর্শকে প্রকাশ করতে পারে।' তবে একথা সত্য যে, দুই ধর্মের মিলনের মধ্য দিয়ে এভাবে জাতীয় ধর্ম সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হলেও বাস্তবে ধর্মকে জাতীয়তাবাদের আধার হিসাবে স্থাপনা করতে গিয়ে তা হয়ে উঠেছে উদারনৈতিক হিন্দুধর্ম। আর অপরদিকে জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুধর্মের পুনরুজ্জীবনের মধ্য দিয়ে মূলত হয়ে দাঁড়িয়েছে হিন্দু ধর্ম ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। নবজাগরণের ঊষালগ্নে ধর্ম নিস্পৃহ মানবতাবাদের বলিষ্ঠতার সুর হারিয়ে তা নতুন করে ধর্ম এবং ঐতিহ্যবাদের সাথে আপস করেছে। তার অন্যতম কারণ নিহিত ছিল তদানীন্তন সময়ে এদেশের এবং বিশ্বের সামগ্রিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে।

।। নারী স্বাধীনতা সম্পর্কে বিবেকানন্দের চিন্তার দ্বন্দ্ব ও নিবেদিতা ।।

মানবতার সঙ্গে সনাতন ঐতিহ্যবাদের সংমিশ্রণের ফলে আমরা বিবেকানন্দের মধ্যে আপাতবিরোধী কিছু কথাকে নানান পরম্পরায় পাই। নিবেদিতা স্মরণ করেছেন স্বামীজীর আহ্বান- 'কখনও ভুলো না নারীজাতি ও নিম্ন শ্রেণীর লোকেদের উন্নতি সাধনই আমাদের মূল মন্ত্র।' নিবেদিতাকে তিনি বলেছেন, স্ত্রী শিক্ষার পরিকল্পনায় তাঁর সাহায্য চাই। একথা সত্য যে, তিনি পাশ্চাত্যের নারীদের দেখে এবং তাঁদের স্বাধীনতাবোধ প্রত্যক্ষ করে বলেছেন, 'এরা কেমন স্বাধীন।' বলেছেন, 'এদের দেখে আমার স্ত্রীলোকই বোধ হত না- ঠিক যেন পুরুষ মানুষ।' কিন্তু স্ত্রী শিক্ষার কথা বললেও তিনি স্ত্রী শিক্ষা কীরকম হবে, সে সম্পর্কে বলেছেন, 'ধর্মপরায়ণতা, ত্যাগ, সংযম হবে ছাত্রীদের অলঙ্কার। সেবা হবে তাদের জীবন ধর্ম। দেশের স্ত্রী লোকদের জীবন এইভাবে গঠিত হলে তবে তো দেশে সীতা, সাবিত্রী, গার্গীর আবার অভ্যুত্থান হবে।' নিবেদিতা তাঁর এই চিন্তাকে দেখিয়েছেন যে, 'শিক্ষাকালে প্রত্যেক নারীকে একাধারে ভারতের অতীত যুগের নারীজাতির শ্রেষ্ঠ গুণগুলির বা মহত্ব বিকাশে সহায়তা করতে সমর্থ, তাই আদর্শ শিক্ষা।'

আবার অন্যদিকে, নিবেদিতার মতে, পত্নীত্বের পূর্বে নারীত্ব ও নারীত্বের পূর্বে মানবত্বের আরূঢ় হওয়ার বৈশিষ্ট্য অর্জন প্রত্যেক যুগেই নারী শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ। স্বামীজীর প্রয়াণের পর নিবেদিতা এমনও বলেছিলেন যে, 'দশ বারোটি মেয়ের মধ্যে প্রচার ও শিক্ষাটাই বড় কথা নয়। হতে পারে আমার এ সকল যুক্তি ভ্রান্ত। কেবল আমি জানি আমার কাজ জাতিকে উদ্বুদ্ধ করা, কয়েকটি মেয়েকে প্রভাবিত করা নয়।' বস্তুত নারী শিক্ষা এবং নারী প্রগতির প্রশ্নে রেনেসাঁস-এর বলিষ্ঠ ধারাটি এখানে দ্বিধাদ্বন্দ্বে দীর্ণ হয়েছে। এখানেই আমরা বিদ্যাসাগরের পরবর্তীকালের মানবতাবাদী আন্দোলনের ঐতিহ্যের সাথে আপসের সুরকে পাই। একদিকে মানবতাবাদের চিন্তা আর অপরদিকে সনাতন ঐতিহ্যবাদ- এই দু'এর সংমিশ্রণের রূপকে প্রত্যক্ষ করি। যখন মানবতাবাদ সামনে এসেছে তখন যে বাণী শুনি, আর যখন সনাতন ঐতিহ্যবাদী চিন্তার প্রভাব সামনে আসে তখন যে বাণী শুনি দুটি আলাদা। এখানেই এক বিচিত্র দ্বন্দ্ব। মহৎ চরিত্রের মধ্যেকার এই দ্বন্দ্বকে যথাযথ অনুধাবন না করতে পারলে আমাদের শ্রদ্ধা সত্যভিত্তিক হবে না।
নিবেদিতা স্বামীজীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেছেন, 'He could not foresee Hindu woman of the future, entirely without the power of meditation. Modern science women must learn, but not at the cost of the ancient spirituality.' নিবেদিতা বিবেকানন্দের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল হয়েও শিক্ষার প্রশ্নে একথাও বলেছেন, 'এখন আর অতীতকালের পৌরাণিক সমাজের সংস্কৃতি অনুশীলনের ন্যায় শিক্ষার্থীকে কোন বিষয়ের কেবল ধর্মীয় বা ভাব প্রবণতার দিকটি উল্লেখ করলেই চলবে না। সে এখন কোন বিকৃতির ত্রুটি-বিচ্যুতি, সমজাতীয় ভাবধারার সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং কোন উপায় অবলম্বনে জাতি এই বিশেষ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে, তার সন্ধান করবে।' নিবেদিতার মধ্যে ব্যক্তিত্বের যে কাঠামোটি ছিল তার জন্যই নিবেদিতাকে স্বামীজী শিষ্যারূপে গ্রহণ করলেও সংঘের বিধিনিষেধের মধ্যে তাঁকে কখনও বাঁধবার চেষ্টা করেন নি। বিবেকানন্দ এমনও বলে গিয়েছিলেন যে, 'নিবেদিতা যদি মঠের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নাও রাখে, তোমরা ওকে সম্পূর্ণ স্বাতন্ত্র্য দিও।'
আবার যখন তিনি নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করেছেন তাকে আটকানোর চেষ্টা সাধারণভাবে না করলেও বিবেকানন্দ একসময় তাঁকে অবরোধবাসিনী হওয়ার জন্য বলেওছিলেন। বিজ্ঞানী জগদীশ বসুর স্ত্রী অবলা বসুর সঙ্গে নিবেদিতার খুবই নিবিড় সম্পর্ক স্থাপিত হয়। নিবেদিতা একসময় ব্রাহ্মসমাজেও মেলামেশা করতেন। স্বামীজী চাইতেন এই সংসর্গ থেকে তাঁকে একটু দূরে সরিয়ে রাখতে। বিবেকানন্দের এই মানসিকতা নিবেদিতার অগোচরে ছিল না। বসুর গবেষণাকে ইংরেজরা সহায়তা করবে না, তাই তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে নিবেদিতা সাহায্য করতে চেয়েছেন। করেওছেন সেই কাজ। জগদীশ বসুকে তিনি বলতেন 'man of science', তাঁর তিনটি বই 'Living and nonliving', 'Plant response', 'Comperative Electrophysiology' নিবেদিতা শুধু সম্পাদনাই করেননি, প্রকাশনায় সমস্ত রকম সাহায্য 'করেছিলেন। বাধাগ্রস্ত হয়ে কোন কাজে হতাশ হয়ে পড়লে নিবেদিতা এই বিজ্ঞানাচার্যকে জোর করে কাজে টেনে নিয়ে যেতেন। এই সমস্ত কাজে নিবেদিতা ছিলেন স্বাধীনচেতা নারী। আসলে, নিবেদিতার জীবনে স্বামী বিবেকানন্দের শ্রদ্ধা, আবেগ যেমন সারা জীবন অটুট ছিল, তেমনি আমাদের মনে রাখা দরকার ভারতবর্ষ এবং তার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা সংক্রান্ত প্রশ্নে বিবেকানন্দ-নিরপেক্ষ সম্পূর্ণ স্বাধীন চিন্তাও ছিল। মিস ম্যাকলাউডকে লিখিত বিভিন্ন পত্রে তার হদিস পাওয়া যায়। এক চিঠিতে তিনি লিখছেন, 'আমার কাছে স্বাধীনতার একটা কদর আছে, যার জন্য আমি অত্যন্ত ভয় পাই। কারণ আমার জীবনে এমন কতকগুলো ঘটনা জড়িয়ে গেছেযা স্বামীজীর অনুমোদন লাভ করবে না'। এই পত্রগুলির বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বিবেকানন্দের দ্বারা অনুপ্রাণিত নিবেদিতার কর্মধারা ছিল স্বাধীনচেতনা সম্পন্ন। এখানে নিবেদিতার চরিত্রের এক মাহাত্ম্য রয়েছে যা অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নিবেদিতার জীবনের একটি অভিমান। বিবেকানন্দ তাঁকে ব্রহ্মচারিণী করেছিলেন, সন্ন্যাসিনী করেননি। মিস ম্যাকলাউডকে লেখা এক চিঠিতে নিবেদিতা বলেছেন, 'আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম সন্ন্যাসিনী হতে গেলে কি ধরনের উন্নতি প্রয়োজন?' উত্তরে দ্রুত বললেন, 'তুমি যেমন আছ তেমনই থাক। ফলে আমার ইচ্ছা রুদ্ধ হয়ে গেল চিরতরে।' এ নিয়ে তাঁর নিগূঢ় অভিমান ছিল। পরবর্তী জীবনে নিবেদিতা যখন রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তখন তিনি উপলব্ধি করেন, হয়তো বা এই ভবিষ্যৎ ভেবেই তাঁকে সন্ন্যাসিনী করেননি তাঁর আচার্যদেব।

।। নিবেদিতার শিল্পবোধ ও বিবেকানন্দ ।।

নিবেদিতার জীবনে তাঁর যে শিল্পবোধকে আমরা দেখতে পাই সেখানেও বিবেকানন্দের প্রভাব অনস্বীকার্য। শিল্পরস নিবেদিতার জীবনে কৈশোর-যৌবনের প্রারম্ভিক দিনেও ছিল। প্রথম পর্বের লেখায় আমরা পাই খ্রীষ্ট সম্পর্কে তাঁর বিবরণ, ছবির মতই তা প্রতিফলিত-যেন সুমহান 'ইতিহাসের উপরে স্থাপিত বেথলিহেম সমরপট্ট-তাতে খোদিত পবিত্র নারী ও পবিত্র শিশু।' বিবেকানন্দের মুখমণ্ডলে তিনি তো দেখেছিলেন যিশু খ্রীষ্টের ছবির কোমলতা ও মহিমা।' ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে তিনি নারীর অধিকারের প্রসঙ্গে ঠিক যেন শিল্পীর মতই বলেছিলেন, 'ফ্যাশনের পুতুলের দল বোঝে না আর্টের সাথে ফ্যাশনের তফাৎ কোথায়? আর্ট দিয়েছে গ্রীক দেবদেবীর স্থায়ী লাবণ্য। রাফায়েলের সেন্টদের নারী মডেল, দিয়েছে রুবেন্সের সৃষ্টি সন্ততিদের। আর ফ্যাশান থেকে পাওয়া গিয়েছে ভিক্টোরিয়া যুগের কোমরে দড়ি বাঁধা পোশাকের ক্ষ্যাপামিকে'। এই নিবেদিতা ভারতে এসে বিবেকানন্দের কাছ থেকে শুনেছেন ধর্ম ও শিল্পের জড়িত মনোভাবনা। একটা অংশের ঐতিহাসিকদের দ্বারা একথা স্বীকৃত যে, বিবেকানন্দ এদেশের শিল্প আন্দোলনের নবীন চেতনায় একটা ভূমিকা পালন করেছেন। আমরা জানি ভারত ভ্রমণের সময় গভীর অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে তিনি স্থাপত্য ভাস্কর্যকে উপলব্ধি করতে চেয়েছেন। মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় নিবেদিতা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, 'তিনি শিল্পের উত্তম সমঝদার ছিলেন। অজন্তার ছবি তাঁকে আত্মহারা করে দিত। অজন্তার ভিত্তিচিত্রে তিনি খাঁটি ভারতীয় শিল্পের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করেছেন এবং এলিফ্যান্টার ত্রিমূর্তির মধ্যে হিন্দুধর্মের সমন্বয় ভাবনার প্রস্তর রূপায়ণ রয়েছে।' বিশ শতকের গোড়ায় শিল্প আন্দোলনে নিবেদিতার যে ভূমিকা রয়েছে তা বহুক্ষেত্রেই থেকে গিয়েছে অনালোচিত। ভারতবর্ষে আসার পরে নিবেদিতার জীবনে ভারতবর্ষের প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে প্রথম শিক্ষা বিবেকানন্দের কাছ থেকে শুরু হয়েছিল কাশ্মীরে প্যান্ডেস্থান মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে। নিবেদিতা লিখেছেন, 'স্বামীজীকে বাদ দিলে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বের মধ্যে আমাদের সকলের সেই অনুপ্রেরণা। তাই স্বামীজী তাঁর দেখা শেষ করার পরে আমরা তাঁর কাছ থেকে লিখে নিলাম কীভাবে অভ্যন্তরভাগ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করতে হয়।' নিবেদিতা বিবেকানন্দের মধ্য দিয়ে ভারতীয় শিল্পের ইতিহাস থেকে পেয়েছেন, প্রাচীন ও মধ্যযুগের শিল্প ছিল হিন্দু ধর্মকেন্দ্রিক। আবার দেখেছেন, শিল্পের প্রকাশভঙ্গিমা অতি-প্রতীকী হওয়ায় তা হয়েছে কোথাও কোথাও দুর্বোধ্য ও উদ্ভট। একদিকে যেমন তিনি দেখেছেন হিন্দুশিল্প ভারতীয় সভ্যতারই সৃষ্টি, তেমনি অপরদিকে একথাও বলেছেন, ভারতশিল্প কেবল হিন্দু শিল্প নয়-মধ্যযুগের মোঘল শিল্পও তার অন্তর্গত। মোঘল শিল্প নিছক বাইরের থেকে আসা ইসলামী বিষয় নয়-তার মধ্যে প্রাচীন ভারতের ভাবধারাগুলির অনুপ্রবেশও ঘটেছে। বিবেকানন্দের কাছ থেকে এই উপলব্ধি অর্জন করার পথে নিবেদিতা অজন্তা, ইলোরা, আগ্রা, কাশী বা চিতোরের শিল্প সৌন্দর্যের শুধুমাত্র ব্যাখ্যা করেছেন তাই নয়, তিনি তাঁর রচনাশৈলীতে বহু শিল্প সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন ভারতীয়তার প্রেক্ষাপটে। বিবেকানন্দের শিল্পমনকে নিবেদিতা যেভাবে অনুভব করেছিলেন, তা যে শিল্পরস সমৃদ্ধ অন্য আর এক মননেরই শিল্পক্রিয়া, এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। যদিও এরই সাথে আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, বিবেকানন্দের প্রভাবের জন্য নিবেদিতার শিল্পধারণার মধ্যেও revivalism-এর প্রভাব পরোক্ষভাবে হলেও পড়েছিল। এ প্রসঙ্গে তাঁর চিন্তার মধ্যে কিছু বৈপরীত্যের নিদর্শনও পাওয়া যায়। যে কারণে একসময় গ্রীক ভাস্কর্যের চেয়ে ভারতীয় ভাস্কর্যকে তিনি সুন্দর বলতেন, তার ঠিক বিপরীতভাবে আবার রদ্যার শিল্পকে উন্নত বলে অভিহিত করেছেন।

।। বিবেকানন্দের দেশপ্রেমের উত্তাপ তাঁর প্রয়াণ পরবর্তী সময়ে
নিবেদিতার কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে ।।

সমস্ত দিক থেকে বিচার করলে আমরা দেখতে পাই, নিবেদিতা তাঁর আচার্যদেবের মধ্যে যে স্বদেশ প্রেমের উত্তাপকে অনুভব করেছিলেন, তা প্রায় সর্বব্যাপক। এই অনুভূতির ফলেই এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে আমরা পাই নিবেদিতার অসামান্য অবদান। প্রখ্যাত বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষ বিবেকানন্দ সম্পর্কে তাঁর স্মৃতিচারণে বলেছেন, 'আমরা তাঁকে বলেছিলাম- আমাদের কিছু ধর্ম উপদেশ দিন।' উত্তরে তিনি বজ্রের মত গর্জন করে উঠেছিলেন। বলেছিলেন, 'পরাধীন জাতির কোন ধর্ম নেই। তোদের একমাত্র ধর্ম হচ্ছে মানুষের শক্তি লাভ করে আগে পরস্বাপহারীদের দেশ থেকে তাড়ানো।' বলেছিলেন, 'আমাদের দরকার পলিটিক্যাল ফ্রিডম। তাই সর্বপ্রথমে ইংরেজকে এদেশ থেকে তাড়াতে হবে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে। বুলি কপচিয়ে নয়। সংঘবদ্ধ, সংগঠিত আক্রমণের দ্বারা। তারা দস্যু, আমাদের মায়ের রক্ত চুষে খাচ্ছে। ওই রাক্ষসদের তোদের বিনাশ করতে হবে।'
রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন, 'বিবেকানন্দের আহ্বানে এদেশের বিপ্লবীরা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে মুখে বন্দেমাতরম্ শ্লোগান আর হৃদয়ে বিবেকানন্দের শিক্ষা নিয়ে'। বিপ্লবীজীবনের স্মৃতিতে যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায় বলেছেন, 'আশা ভরসা উদ্দীপনা নতুন যুগের পাগল করা আগমনী বার্তা বিবেকানন্দ যুব সমাজে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন' এই প্রভাব নিবেদিতার জীবনেও যে গভীরভাবে বিদ্যমান ছিল- সে ইতিহাসও আমাদের স্মরণ রাখা প্রয়োজন। নিবেদিতার প্রথম জীবনের চিন্তা, প্রভাব, কর্মকাণ্ড যেমন তাঁর রাজনৈতিক এক সত্তাকে প্রকাশ করে, তেমনি ধর্মীয় সাধনার পথে এসে, উপাসনার পথে এখানে জীবনের বেশ কয়েকটি বছর অতিক্রান্ত করলেও তাঁর রাজনৈতিক সত্তার বলিষ্ঠ রূপও প্রত্যক্ষ করেছি আমরা। এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলিতে তাঁর ভূমিকাকে তাই অস্বীকার করা যায় না।
বিবেকানন্দের প্রয়াণের পর খণ্ডগিরিতে তাঁর কয়েকজন শিষ্যের সঙ্গে বাইবেল থেকে যীশুখ্রীষ্টের উত্থানের গল্প পর্ব শুনে বিহ্বল নিবেদিতা তার বর্ণনা করে বলেছিলেন, 'May God grant that this living presence of own Master of which death itself had not had power to rob us, become never, to us his deciples, as a thing to be remembered but remain with us always in its activity, even unto the end."
এই সময়ই নিবেদিতা বলেছিলেন, 'তাঁর কাজ জাতিকে জাগ্রত করা'। বিবেকানন্দের মরদেহ এবং জ্বলন্ত চিতার দিকে নীরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা নিবেদিতা ধীর, গম্ভীর, নির্বাক। জ্বলন্ত আগুনের মধ্য থেকে তাঁর প্রার্থিত বস্ত্রখণ্ডের একটি টুকরো এসে পড়ে তাঁর গায়ে। সেইটি সংগ্রহ করে নিবেদিতা ধীর পদক্ষেপে চলে গিয়েছিলেন, আর তাঁর ডায়েরীতে শুধু লিখেছিলেন, 'স্বামীজী মারা গিয়েছেন।' এই না থাকা যে কী তা অনুভব করাও বোধ করি অন্য কারোর পক্ষে সম্ভব নয়।
রাত্রিতে যখন স্বামীজীর অনুগামীরা প্রার্থনায় রত হলেন নিবেদিতা বলে উঠলেন, 'সন্ন্যাসীরা প্রার্থনা করছে, কিন্তু আমার সময় নেই। স্বামীজী আমাকে একটি কাজের ভার দিয়ে গিয়েছেন, আমাকে সেটাই করতে হবে।' নিবেদিতার পরবর্তী জীবনের ঘটনাই বলে দেয় কী কাজের ভার তিনি তাঁর আচার্যদেব বিবেকানন্দের কাছ থেকে পেয়েছিলেন বলে উপলব্ধি করেছিলেন। নিবেদিতা খুব স্পষ্ট করেই সে কথা বলেছেন, 'দেশপ্রেমিক বিবেকানন্দকে দেশ পেয়ে গিয়েছে এখনই- তাঁর মৃত্যুর শংখধবনিতে। আচার্য যখন শিষ্যবৃন্দের কাছ থেকে বিদায় নিলেন, শ্মশানের অগ্নিশিখার সামনে সমালোচকদের গুঞ্জন যখন স্তব্ধ হয়ে গেল তখন শোনা গেল-স্বাধীনতার বিশাল কণ্ঠ অব্যাহত মহিমায় নিবেদিত-আর সারা জাতি সাড়া দিল এক স্বরে।' বিবেকানন্দ সম্পর্কে এই উপলব্ধি নিবেদিতার চরিত্রকে অনন্য করেছে।
বিবেকানন্দের স্বদেশপ্রেমের দ্বারা অনুপ্রাণিত নিবেদিতা স্বামীজীকে উদ্দেশ্য করে তাঁর প্রয়াণের পরের এক সভায় বললেন, 'তিনি আমাদের মহান জাতীয় নেতা।' বললেন, 'What was the idea that caught Vivekananda? He saw before him a great Indian Nationality. Young vigorous, fully the equal of any nationality on the face of the carth.' আশ্চর্যের বিষয়, এখানে তিনি তাঁর আচার্যদেবকে কিন্তু বেদান্তকেশরী বা হিন্দু ধর্মপ্রচারক বলেননি।

।। নিবেদিতার মঠত্যাগ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ ।।

বিবেকানন্দের মৃত্যুর পর পরই মঠের সঙ্গে নিবেদিতার দ্বন্দ্ব বাধে। মৃত্যুর পর নিবেদিতা যথেষ্ট পরিমাণ অশ্রু বিসর্জন করেননি বলেও মঠের জনৈক সন্ন্যাসী তাঁকে কটাক্ষ করেন। নিবেদিতা তাঁর আচার্যদেবের বিয়োগ-বেদনাকে কর্মে রূপ দিতেই বদ্ধপরিকর ছিলেন। নিবেদিতার মনে সর্বাগ্রে রাজনৈতিক স্বাধীনতার যে আকাঙক্ষা স্বামীজী ব্যক্ত করতেন, তা স্থান পেয়েছিল। কিন্তু মঠের কর্মাধ্যক্ষরা তা মানতে অপারগ। তাঁরা তুলে ধরলেন মঠের বা সংঘের কার্যপ্রণালী বিবেকানন্দই যা স্থির করে দিয়েছিলেন। 'The aims and ideals of the Mission being purely spiritual and humanitarian, it shall have no connection with politics.' কিন্তু নিবেদিতার কর্মকাণ্ড তখন মঠের সীমানা পেরিয়ে স্বদেশী সংগ্রামের রাস্তা পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে মঠের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিল। বিবেকানন্দ যে স্বাতন্ত্র্য নিবেদিতাকে দিয়েছিলেন তা বর্তমান আধিকারিকদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। এই দ্বন্দ্বের কালে নিবেদিতা স্বয়ং মঠের কর্মাধ্যক্ষদের বললেন, 'আর কিছু আমার দ্বারা হবে না। ভারতমাতার সাধনার সঙ্গে আমি নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছি। দেশের ভাবনা আর আমি এক হয়ে গেছি। এ পথ ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে মরা আমার পক্ষে অনেক বেশি সহজ কাজ।' বললেন, 'মঠ ছাড়তে পারি, কিন্তু রাজনীতি ছাড়তে পারব না।'
দৃঢ় প্রত্যয়ে মঠ ত্যাগ করার পরে নিবেদিতা যখন অন্যতম উদ্যোগী হিসাবে 'বিবেকানন্দ সোসাইটি' গঠন করলেন তখন তিনি তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বললেন, 'এই সোসাইটির উদ্দেশ্য হবে মানুষ বিবেকানন্দকে জানা। ভারতবর্ষ এবং পৃথিবীর অপরাপর দেশ পর্যবেক্ষণ করে স্বামীজীর জাতীয়তাবোধ গড়ে উঠেছে। বিবেকানন্দের গ্রন্থ পড়ার সাথে সাথে ইতিহাস পড়ে মনের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে হবে ইতিহাসবোধ। তবেই আমরা মানুষ বিবেকানন্দকে জানতে পারব।'
এই প্রশ্নকে সামনে রেখে তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে একটু একটু করেই যুক্ত হয়েছেন। বারীন্দ্র কুমার ঘোষ বলেছেন, 'নিবেদিতা বাংলায় গুপ্তচক্রের সঙ্গে ছিলেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নিবেদিতা প্রদত্ত লাইব্রেরিই ১০৮ নং আপার সার্কুলার রোডের চক্রের ছিল প্রাণ ও প্রেরণার উৎসমূল।' 'ডন সোসাইটি'-তে এক বক্তৃতায় নিবেদিতা গীতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে সরাসরি বললেন, 'এক হাতে গীতা অপর হাতে তলোয়ার নিয়ে কবে আমাদের মধ্যে দেশ উদ্ধারের জন্য আসবেন।' এর থেকে বোঝা যায়, তিনি এদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামের আপসহীন ধারার সশস্ত্র সংগ্রামের পথকেই মূলতঃ সমর্থন করেছিলেন এবং প্রত্যক্ষভাবে সেই পথের অনুসারী হয়েছেন যুব সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছেন। এবং এই কাজকে তিনি বিবেকানন্দের কাজ বলেই তিনি মনে করতেন।
বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষ এ প্রসঙ্গে লিখছেন, 'একজন এহেন ইংরাজ মহিলাকে আমরা ইংরাজ তাড়ানোর সহায় হিসাবে পেলাম মনে করে আমাদের মিইয়ে যাওয়া উদ্যম ও আগ্রহ তাজা হয়ে উঠল। ভগিনী নিজে তলোয়ার খেলে, মুণ্ডর ভেজে, লাঠি ঘুরিয়ে ও অন্যান্য কসরত করে আমাদের অনুপ্রাণিত করেছিলেন।'
ডঃ ভূপেন্দ্র নাথ দত্ত বলেন, বিবেকানন্দের প্রয়াণের পর ঘটনা পরম্পরায় ভগিনী নিবেদিতাকে বরোদায় অরবিন্দ ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে হয়। তিনি অরবিন্দকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির কথা বলেন। অরবিন্দ কলকাতায় এসে বিপ্লবী আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। যে বিপ্লববাদী সমিতি প্রতিষ্ঠা করা হয় তার পাঁচ কার্যকরী সদস্যদের মধ্যে অরবিন্দ ও নিবেদিতাও ছিলেন। একথা অরবিন্দ স্পষ্ট করেই বলে গিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, '...my collaboration with her was solely in the secret revolutionary field'.

বিবেকানন্দের আকস্মিক প্রয়াণ নিবেদিতার জীবনকে আন্দোলিত করেছিল প্রবলভাবে। কিন্তু এই আন্দোলন ও বেদনা তাঁকে কর্তব্যবিমূঢ় করেনি। তিনি মনে করতেন, এখন শুধুই শোকের সময় নয়। স্বামীজী তাঁর জীবনধারণে যে দায়িত্ব অর্পণ করে গিয়েছেন তা পালন করাই একমাত্র কর্তব্য। মিসেস লেগেটকে এক চিঠিতে লিখলেন, 'আমাদের প্রিয় আচার্যদেব চিরদিনের জন্য চলে গিয়েছেন। জীবনের সান্ধ্য বন্দনা সমাপ্ত। পৃথিবীর নীরবতা, মুক্তির সম্ভাবনা শেষ। তাঁর প্রকৃত সেবা করার জন্য আমার হৃদয় অধীর। তাঁর কাজ করবার জন্য যেন শক্তি, বিশ্বাস ও জ্ঞানলাভ করতে পারি- কেবল কাজ করে যেতে চাই।'

।। জীবনের শেষ অধ্যায়ে নিবেদিতার সংগ্রামে 'বিবেকানন্দের প্রভাবের পাশাপাশি
তাঁর স্বাধীনচেতা মন প্রতিফলিত ।।

জীবনের শেষ ন'টি বছর সেই কাজই তিনি করে গিয়েছেন। তবে চলবার পথে তিনি চলেছেন স্বাধীনভাবে। স্বামীজীর প্রয়াণের কিছুপূর্বে এক চিঠিতে তিনি তাঁর এক বান্ধবীকে যেমন বলেছেন, 'তুমি কি ভাব, আমি জানি না যে, স্বামীজীর বাণী অতুলনীয়? আমার পক্ষে তা ভুলে যাওয়া অসম্ভব।' তেমনি আবার এও বলেছেন, 'হিন্দু ধর্ম এখন সবচেয়ে বেশী করে আমার ধর্ম, কিন্তু সেই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রয়োজন খুব স্পষ্ট করে দেখতে পাচ্ছি।' সেই রাজনৈতিক প্রয়োজনকে বুঝতে পেরে নিজেই বলেছেন, 'ভারত এবং ভারতীয়দের জন্য আমার কিছু করণীয় আছে।'
এরই পাশাপাশি নিবেদিতা এক অন্য অনুভূতিকেও আমরা তাঁর লেখা চিঠিপত্রে পাই। তিনি বলেছেন, 'কিছুদিন ধরে তিনি এমন সব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন যা বিবেকানন্দ তাঁর জন্য যে পথ নির্দিষ্ট করে গিয়েছেন, তার বাইরে'। বলেছেন, ভারতবর্ষ সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তিনি নিজেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অর্জন করেছেন। নিবেদিতার এক জীবনীকার তাই যথার্থই বলেছেন, 'নানান অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিবেদিতা ভারতকে দেখবার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি লাভকরেছিলেন। ঐ দৃষ্টিভঙ্গি স্বামীজী-নিরপেক্ষ নয়, কিন্তু কার্যধারা স্বামীজী-নিরপেক্ষ।' এখানেই তাঁর স্বাধীনচেতা মনের পরিচয়।

প্রয়াণের মাত্র ছয়দিন আগে এক আলোচনায় বিবেকানন্দ যেখানে শিক্ষার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন, সেখানে গভীর শ্রদ্ধায় নিবেদিতা শিক্ষার গুরুত্বকে স্বীকার করেও তাঁকে বলেছেন, সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে। গুরু-শিষ্যার সম্পর্কে এই যুক্তির আদান-প্রদান অন্ধবিশ্বাস থেকে বেশ কিছুটা মুক্ত ছিল। এখানেই আমরা এক অনির্বচনীয় সুন্দরকে প্রত্যক্ষ করি। একথা তো সত্য যে, মঠের সঙ্গে বিচ্ছেদের মর্মযাতনা অনুভব করেছেন নিবেদিতা। এই সময়ে ছিল তাঁর মধ্যে তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব। সিস্টার দেবমাতা বলেছেন, 'ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার জন্য তাঁর রাজনৈতিক উৎকণ্ঠা এবং রামকৃষ্ণ মিশনকে সেবা করার জন্য তাঁর আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা-এই উভয়ের মধ্যে তীব্র সংগ্রামের কথা নিবেদিতা যখন বলেছিলেন তখন তাঁর কণ্ঠে গ্রীক ট্রাজেডির সুর ঘনিয়েছিল। স্বামীজী তাঁকে সতর্ক করে বলেছিলেন, যে কোন একটি বেছে নিতে হবে। মিশনকে রাজনৈতিক কাজে জড়ানো চলবে না। তা সত্ত্বেও নিবেদিতার এই অন্তঃসংঘাত দীর্ঘ হয়েছিল। শেষে তিনি বেছে নিয়েছেন- ভারতকে স্বাধীন করতেই হবে।' তবে তাঁর স্বদেশসেবার সব কাজটিকেই তিনি মনে করতেন তিনি যেন 'তাঁর পিতার নিজস্ব কর্মভার গ্রহণ করেছেন।'
এই উদ্দেশ্যে ভারতের বহুস্থানে তিনি গিয়েছেন। জনসংযোগ করেছেন। দেশপ্রেমকে জাগ্রত করার ঐতিহাসিক প্রয়োজনকে উপলব্ধি করেছেন। নাগপুরে ছাত্রদের বলেছেন, 'দেশ চায় দেহে মনে বলিষ্ঠ দেশপ্রেমিকদের। দেশ চায় না সেইসব লোকদের, যারা বিদেশী সরকারের সেবা করে, সেই সঙ্গে স্বদেশীদের উপর চড়াও হয়। বিদেশী সরকারের দাসত্ব করে তাদের স্বৈরতন্ত্রী শাসনকে বলবৎ করার কাজ করতে তোমাদের মনে ঘৃণা আসা উচিত।' তারই বছর দুই পরে পাটনার ছাত্রদের বলছেন, 'বালকদের মুখে অপরিমেয় শান্তি দেখলে আমি দুঃখিত হব। বীর হতে হবে। সেই বীর, যে লড়াই করে, লড়তে ভালবাসে। কিন্তু নীচতা যেন না থাকে।'
আমরা জানি, একটা সময় পর্যন্ত নিবেদিতা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে 'জাতীয়তাই জ্ঞান' এই চেতনার প্রচারে বক্তৃতা, সফর-এর মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। এই পর্বে তিনি বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর সাথে পরিচিত হন। তারপর গড়ে ওঠে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলুন। এই আন্দোলনে যখন গোটা বাংলা আলোড়িত সেই সময় মিসেস বুলকে নিবেদিতা লিখলেন, 'এখন সারা ভারত যেন জেগে উঠছে। কার্জনী দুঃস্বপ্নের আকারটা সরে গিয়েছে।' 'স্বদেশী আন্দোলনের একটা পর্বে যখন বয়কট আন্দোলনে মানুষ সামিল হয়েছেন ব্যাপক সংখ্যায় সেই বয়কট আন্দোলনের সাফল্য জুগিয়েছে প্রেরণা'। তিনি নিজে এক অদ্ভুত ধরনের স্বদেশী পেয়ালায় চা খেতেন। ১৯০৬ সালে কলকাতায় যে স্বদেশী মেলা হয়, সেখানে তাঁর উৎসাহ ও উদ্যম ছিল প্রবল। নিবেদিতা সেই সময় লিখলেন, 'বয়কট এমনকি নারী পুরোহিতদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে-আত্মত্যাগের পরিমাণ সত্যিই অসাধারণ।' লর্ড কার্জন সম্পর্কে প্রথম দিকে নিবেদিতার যে ধারণা ছিল, তা অচিরেই বদলে যায়। কার্জন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনে প্রাচ্যদেশীয় মানুষদের মিথ্যাবাদী বলে অভিহিত করেন। তাঁর এই দাম্ভিকতা এবং ঔদ্ধত্যকে যখন উপস্থিত বহু শিক্ষিত ব্যক্তি নীরবে শুনতে থাকেন, তখন ওই সভা থেকে নিবেদিতা উত্তেজিত অবস্থাতেই গুরুদাস ব্যানার্জীকে বের করে চলে আসেন। শুধু তাই নয় অমৃতবাজার পত্রিকায় সম্পাদকদের সামনে পরদিন প্রকাশিত সংবাদ ও কার্জনের উক্তি তুলে ধরে কার্জনই যে মিথ্যাবাদী ও তোষামোদকারী তা প্রমাণ করেন। যদিও ভারতবর্ষেই স্বদেশপ্রেমের এহেন সত্যটি অনেকেরই অগোচরে রয়েছে। শুধু তাই নয়, কার্জনকে তিনি সর্বনিকৃষ্ট সাম্রাজ্যবাদী বলে মনে করতেন। বলতেন, 'তিনি এক নম্বর স্বৈরাচারী। গণতন্ত্রে তাঁর বিশ্বাস নেই এবং মানুষ বা জাতির স্বায়ত্তশাসনের অধিকার নামক... ধারণার প্রতি কোন সম্ভ্রমও নেই।'
কার্জনের শাসনকালে তাঁর শিক্ষানীতি সম্পর্কেও তিনি প্রবল বিরোধিতা করেছিলেন। শিক্ষা সম্পর্কে স্বচ্ছ স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গীই ছিল নিবেদিতার আদর্শ। তিনি এ প্রসঙ্গে লিখলেন, 'জনগণকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার চাপ ক্রমে বেড়ে উঠছে।' বিবেকানন্দকে সাধারণভাবে তিনি বলেছেন, 'লর্ড কার্জনই জনগণকে বুঝিয়ে ছেড়েছেন যে, শিক্ষার ব্যাপারে সরকারে অভিপ্রায় মিত্রোচিত নয়'। পরবর্তীকালে সরাসরিই ভারতীয় মননের প্রাণোদীপ্ত আলোয় নিবেদিতা এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন, 'কার্জন ভারতে বিজ্ঞানকে ধবংস করতে চেয়েছিলেন'। তারই সঙ্গে নিবেদিতার স্পষ্ট স্বীকারোক্তি 'সকলেই জানে, বয়কট ও বিজ্ঞানই ভবিষ্যতের নিয়ামক।'

।। স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবীর প্রতি হৃদয়ের অকুণ্ঠ ভালবাসা-
নিবেদিতা চরিত্রের উজ্জ্বল একটি দিক ।।

বৃটিশ পদানত ভারতবর্ষে জনসাধারণের দুর্দশাকে নিবেদিতা বিশ্লেষণ করেছেন। বলেছেন, অগণিত মানুষ যাদের শহরে আনা হচ্ছে, তারা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে বস্তু উৎপাদন করবে, কিন্তু তার দ্বারা হাজার হাজার শ্রমিক লাভবান হবে না-সব লাভ লুটে নেবে কারখানার মালিক। দুর্ভিক্ষের মর্মান্তিক ছবিকেই তিনি তুলে ধরেছেন -বলেছেন, 'এ বস্তু অবধারিত। দুর্ভিক্ষ হবেই কারণ, সাম্রাজ্যবাদ দুর্ভিক্ষ বাদ দিয়ে চলতে পারে না।' প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, 'ডন সোসাইটি, বা 'বিবেকানন্দ সোসাইটি' সম্পর্কে যে স্বপ্ন নিবেদিতার ছিল, তা পরবর্তীকালে সোসাইটির নানান কার্যকলাপের ফলে প্রায় ধূলিসাৎ হয়ে পড়ে। তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য এবং কেবলমাত্র অধ্যাত্মবাদের চর্চার উপর গুরুত্ব আরোপের ক্ষেত্রে তাঁর বিরোধিতা নিবেদিতা চরিত্রের সামাজিক বৈশিষ্ট্যের একটি দিককে তুলে ধরে। তিনি ভারতের সর্বত্র জাতীয়তার প্রচারের জন্য পত্রিকা প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা করে উঠতে পারেননি। তার জন্য গভীর বেদনা অনুভব করতেন তিনি। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের প্রচারের কালে তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, 'এই ধরনের সভা তখনই মূল্যবান যখন তা দেশের জন্য আত্মদানে জ্বলন্ত প্রেরণা সৃষ্টি করতে পারে।' বিবেকানন্দের দীক্ষাপ্রাপ্ত এই শিষ্যা তাঁর স্বাধীনচেতা মনের জন্যও নির্দ্বিধায় বলতে পেরেছেন, 'সংকটে ভীত, নিরাপত্তার জন্য লালায়িত আধ্যাত্মিকতা হল, কপট আধ্যাত্মিকতা। আধ্যাত্মিকতার ছদ্মবেশ পরে ঘৃণ্য স্বাচ্ছন্দ্যের সন্ধানী। জীবনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কাপুরুষের মত পলায়িত 'যে দেশপ্রেম সে হল কপট দেশপ্রেম।' তিনি এমনকী সরকারি চাকরি বয়কটেরও আহ্বান জানিয়েছেন- 'The first advice to young men... should be at all costs shun Government Service!... Government Service has the baneful effect of degrading the national character and sowing seeds of dissention among brother-among the Hindus and Mahamedans for instance.' বাস্তবিকপক্ষে এই ধরনের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় মঠ, মিশন, সোসাইটিতে নিরুপদ্রব জীবনের ব্যবস্থাপনার সুবন্দোবস্তকে নিবেদিতা গ্রহণ করতে পারেননি। ফলে, মঠের মধ্যে থেকে কেবলমাত্র আধ্যাত্মিকতা দিয়ে বিবেকানন্দকে উপলব্ধি করা যে সম্ভব নয়-এ সত্যকে হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন তাঁর শিষ্যা নিবেদিতা।
এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলিতে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে নিবেদিতার ভূমিকার কথা India Review পত্রিকাতেও উল্লেখ আছে। 'Sister Nivedita contributes to the Indian Review for March a glowing defence of the Swadeshi Movement in Bengal', ফলে ব্রিটিশ শাসককূল তাঁর পেছনে গোয়েন্দাও লাগিয়েছিল। তাঁর চিঠিপত্র খুলে পড়বার নির্দেশ ছিল পুলিশ দপ্তরের।
আর একটি বিষয় প্রসঙ্গত আলোচনাযোগ্য। তা হল, স্বদেশী আন্দোলনের তদানীন্তন পর্যায়ে নরমপন্থী ও চরমপন্থী দুইভাগে তা বিভক্ত হয়েছিল। ১৯০৬ সাল জুড়ে এই বিতর্ক ও বিভাজনে নিবেদিতা ক্লান্তিবোধ করতেন। বহু বিপ্লবী ও স্বাধীনতা আন্দোলনের যোদ্ধার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ঘটে জীবনের শেষ কয়েকটি বছরে।
বিস্তৃত ইতিহাস এখানে আলোচ্য নয়। তবে বিপ্লবী কানাইলাল দত্তের আত্মোৎসর্গকে নিবেদিতা যেভাবে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন, তা আমাদের প্রাণিত করে। এই বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ বাংলা তথা ভারতবর্ষে বৃটিশ অধীনতায় তন্দ্রালু ভারতবাসীর ঘুম ভাঙিয়েছিল। কানাইলাল দত্তের মৃত্যুবরণ প্রসঙ্গে নিবেদিতা লিখেছেন,
'কি অপূর্বভাবে ছেলেটি মৃত্যুদণ্ড গ্রহণ করল! ঠিক হোক, ভুল হোক বীরত্ব, যা সত্যিই বিশাল বীরত্ব-তা ইতিহাস সৃষ্টি করে।' এই শ্রদ্ধাবোধ তার অটুট ছিল জীবনের অন্তিম সময় পর্যন্ত। প্রয়াণের মাত্র একমাস আগে তিনি লিখেছেন, 'এই তো সেদিন! কানাইলাল দত্ত! (জোয়ান অব আর্ক-এর তুলনায়) আরও বৃহৎ সে বস্তু।'
বিবেকানন্দ বলতেন, এমন সময় আসবে যখন শূদ্রের প্রাধান্য হবে। শূদ্ররা সমাজে একাধিপত্যলাভ করবে বা শূদ্ররাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। '-The only hope of India is from the massess. The upper classes are physically and morally dead.' এই কথার অন্তর্নিহিত বক্তব্যে ছিল, নিপীড়িত মানুষের রাজ একদিন আসবে। মানবতাবাদী বিবেকানন্দের আকাঙক্ষা-যা ধর্ম বা অধ্যাত্মবাদের সংমিশ্রণে একীভূত হয়েছে তাঁর এই কথার মাধ্যমে। নিবেদিতাও মনে করতেন, শূদ্রশক্তিতে আছে সরলতা। আর ধনিক শ্রেণীর মধ্যে রয়েছে পচনশীল বিকৃতি। এর হাত থেকে যথার্থ মুক্তির সুনির্দিষ্ট পথ স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়নি তাঁর চিন্তায়। কারণ-পুঁজিবাদ বিরোধী সর্বহারা বিপ্লবের পথেই একমাত্র এই মুক্তি যে যথার্থ রূপ পেতে পারে- একথা মার্কসবাদী ছাড়া উপলব্ধি করা সম্ভবও নয়। শোষিত মানুষের প্রতি-ভালবাসা থাকলেও সমাজবিপ্লবের সুনির্দিষ্ট পথ ছাড়া মুক্তি অর্জন সম্ভব নয়। দ্বান্দ্বিক বাস্তববাদীরাই এ সত্যকে যথার্থভাবে উপলব্ধি করেছেন। একে অস্বীকার করা যায় না। শোষিত মানুষের প্রতি আবেগে তিনি একথা যেমন বলেছেন, "বেকার লোকেরা সর্বত্র সোস্যালিস্ট বাগ্মীর চারপাশে সাগ্রহে ভিড় করছে,' তেমনি একথাও সত্য যে, তার কথায় 'সোস্যালিজম' শব্দটির অর্থ ও তাৎপর্য অস্পষ্ট। ১৯১১ সালের ইংল্যন্ডে লেবার ওয়ার দেখে একদিকে আনন্দ উচ্ছ্বাস অন্যদিকে কী ঘটতে পারে তার গভীর আশঙ্কায় এক চিঠিতে লেখেন, 'হ্যাঁ, ধর্মঘট! ফরাসি বিপ্লবের তুল্য শুরু হয়ে যাবে না কি? শূদ্র জাগছে, শৃঙ্খল ছিঁড়ে ফেলছে। কি দেখব আমরা? অপেক্ষা করে আছে কোন বস্তু?' একই দিনের লেখা আর একটি চিঠিতে লিখেছেন 'ভাবছি তাহলে কি শূদ্রসমস্যা সম্বন্ধে স্বামীজীর ভবিষ্যৎবাণী সফল হওয়ার পথে।' কিন্তু এই কথাগুলি পুঁজিবাদবিরোধী শ্রমিক বিপ্লবের চিন্তার অনুসারী নিশ্চয়ই নয়।
র্যা টক্লিফকে লেখা তাঁর প্রয়াণের একমাস আগেকার এক চিঠিতে তিনি এও বলেছেন, 'শ্রমিকদের মধ্যে প্রচারক চাই যাঁরা তাদের দৃষ্টি প্রসার ঘটাবেন, মানবতাবোধ তাদের মধ্যে জাগাবেন, পথ দেখাবেন আত্মোৎসর্গের।' এইখানে তাঁর আধ্যাত্মচিন্তার এক রূপ যা মানবতাবাদের সঙ্গে খাদ হিসেবে মিলেছিল তার প্রতিফলন পাওয়া যায়। তিনি একই চিঠিতে বললেন, 'যদি এমন ঘটে, যদি বিশাল অধ্যাত্ম উৎস থেকে শক্তি আহরণ করা হয়, যদি ত্যাগধর্মী মানুষ সৃষ্টি করা যায়, তবেই তাদের মধ্যে অর্থাৎ শ্রমিক জনতার মধ্যে পূর্ণ শক্তিমান নেতার জন্ম ঘটবে।' এই বক্তব্যের দ্বারাও শ্রমিক বিপ্লবের ধারণা তাঁর ছিল তা বলা যায় না। এবং সেখানে ভাবাটাও হবে অবৈজ্ঞানিক ও অনৈতিহাসিক। তবে একথা সত্য, নিবেদিতার মধ্যে তাঁর জীবনের এই তৃতীয় বা অন্তিম পর্বে আমরা পাই মূলত রাজনৈতিক-সামাজিক কর্মসূচি ও চিন্তাকে।




।। 'আমার উদ্দেশ্য রামকৃষ্ণ নয়, বেদান্ত নয়, আমার উদ্দেশ্য সাধারণের মধ্যে মনুষ্যত্ব আনা'
--- বিবেকানন্দের এই বাণীই অনুরণিত নিবেদিতার শেষ অধ্যায়ের কাজে ।।

প্রকৃতপক্ষে নিবেদিতা যে শপথ নিয়েছিলেন, 'আমার কাজ জাতিকে উদ্বুদ্ধ করা'- সে কাজকে তিনি মনে করতেন বিবেকানন্দেরই কাজ। স্বাধীন সত্ত্বার সঙ্গে এই অনুভূতিও তাঁর সদা জাগরূক ছিল। তাঁর মনে কেবলই অনুরণিত হত স্বামীজীর সেই কথা- 'আমার উদ্দেশ্য রামকৃষ্ণ নয়, বেদান্তও নয়, আমার উদ্দেশ্য সাধারণের মধ্যে মনুষ্যত্ব আনা।'
এই কাজে তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিবেদিত ছিলেন। তাই তিনি বিবেকানন্দের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের আদর্শগত প্রশ্নে বিরোধ থাকা সত্ত্বেও বিদ্যাসাগর স্মরণ দিবসে ভাষণ দিয়েছিলেন। যেখানে রমেশচন্দ্র দত্ত ছিলেন সভাপতি। আমাদের দেশে এই দুই মহান মনীষীর চিন্তার পার্থক্য আমরা সকলেই জানি। দুজনেই অসাধারণ বড় মানুষ। বিদ্যাসাগরের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে ধর্মনিস্পৃহ মানবতাবাদের বলিষ্ঠতা। আর বিবেকানন্দের মধ্যে প্রতিভাত হয়েছে মানবতাবাদের সঙ্গে ঐতিহ্যবাদের সুর। বিদ্যাসাগর বললেন, সাংখ্যবেদান্ত ভ্রান্ত দর্শন, অন্যদিকে বিবেকানন্দ বেদান্তের চিন্তার অনুসারী হলেন। বিদ্যাসাগর বললেন বিধবাবিবাহ চাই। বিবেকানন্দ বললেন সীতা, সাবিত্রী দময়ন্তী হচ্ছেন আমাদের নারীজাতির আদর্শ। এই মতপার্থক্য সত্ত্বেও বিবেকানন্দ বিদ্যাসাগরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। বিবেকানন্দ একসময় বলেছিলেন, 'যখন শুনলাম ১৮৬৪ খ্রীস্টাব্দের দুর্ভিক্ষে অনাহারে এবং রোগে এক লক্ষ চল্লিশ হাজার মানুষ কালগ্রাসে পতিত হওয়ায় এই মহাপুরুষ (বিদ্যাসাগর) মর্মাহত হয়ে 'আর ভগবান মানিনা' বললেন, তখন আমরা যারপরনাই অভিভূত হয়ে পড়লাম'। নিবেদিতা স্বামীজীর এই কথাকেও তুলে ধরে বলেছেন, 'মৃত্যুর মাত্র দুদিন আগে বলেছিলেন, রামকৃষ্ণের পর আমি বিদ্যাসাগরকে অনুসরণ করি'। এমন প্রশ্নও তিনি মিস ম্যাকালাউডকে লিখেছিলেন যেখানে বিবেকানন্দ বলেছেন, 'আহা যদি তুমি বিদ্যাসাগরকে দেখতে পেতে।' নিবেদিতা মনে করতেন, জাতীয় আদর্শের প্রতি পূর্ণ প্রাণের আনুগত্য বিদ্যাসাগরের মধ্যে দেখা গিয়েছিল। নিবেদিতা এর আগে স্বামীজীর একটি কথা প্রায়ই বলতেন, 'উত্তর ভারতে এমন কেউ নেই যার উপরে বিদ্যাসাগরের প্রভাব পড়েনি।' মানুষের প্রতি ভালবাসাকে আনন্দের অশ্রুর সঙ্গে স্মরণ করেছেন। আদর্শে ভিন্নতা-তবু শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত বিদ্যাসাগরের কথাকে নিবেদিতা উত্থাপন করেছেন।
একেবারে জীবনের অন্তিম মুহূর্তে নিবেদিতার একটি ব্যথা প্রকাশ পায় তাঁর এক চিঠিতে। যেখানে তিনি বলেছিলেন, 'আমি মরতে চাই। জীবনটায় ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছু নেই।' আর এক বন্ধুকে লিখেছিলেন 'নারী শিক্ষা, বিজ্ঞানের অগ্রগতি, শিল্পকলা সব নিরর্থক মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে।' যে নিবেদিতাকে গোল্পের মত মানুষ বলেছেন, 'অত্যাশ্চর্য নারী সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানবগণের অন্যতম,' তাঁর শেষ পর্বের বেদনাবিদ্ধ অবস্থা আমাদেরও ব্যথিত করে- 'Oh yum, I would be glad to die life has in many ways been such a faliure and I can not feel that I am realy essential. Everything would it seems to me go better, if I could be left out!' কোথায় তিনি প্রতিহত হয়েছেন, এ হয়ত সকলের জানা নেই। তবু মনে ব্যথা জাগে এ চিঠির ছত্রে ছত্রে। কেন তাঁর এই মর্মযন্ত্রণা, তা গবেষণা সাপেক্ষ বিষয় বলেই আমরা মনে করি।

এই বেদনার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে তাঁরই আচার্যদেব সম্পর্কে তাঁর মানসিকতার বলিষ্ঠ কথাটিকেই মনে হয় আমাদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য মনে জাগরুক রাখা দরকার। স্বামীজীর আকাঙক্ষা ছিল-'নতুন করে ভারত বেরুক। বেরুক লাঙল বীর, চাষার কুটির ভেদ করে, জেলে, মালী, মুচি, মেথর, ঝুপড়ির মধ্য হতে, বেরুক মুদির দোকান থেকে, হাট থেকে বাজার থেকে। বেরুক জঙ্গল, পাহাড় পর্বত থেকে।' এখানে প্রকাশিত বিবেকানন্দের নিপীড়িত মানুষের প্রতি অশেষ মমত্ববোধ। তিনি একথা বলতেন, 'কোথায় ইতিহাসের কোন যুগে ধনী ও অভিজাত সম্প্রদায়, পুরোহিত ও ধর্মধ্বজীগণ দীন দুঃখীর জন্য চিন্তা করেছে?' এই মানুষগুলির জন্য যে হৃদয়বৃত্তি নিবেদিতা বিবেকানন্দের মধ্যে এই মানবপ্রেমকে প্রত্যক্ষ করেছেন। সেই উপলব্ধির ভিত্তিতে নিবেদিতা বলেছিলেন, 'ভারতের মধ্যে এমন কোন আর্তধবনি নেই যা বিবেকানন্দের হৃদয়ে সাড়া জাগায়নি'।

আজ বহু বছর অতিক্রান্ত। দেশের ইতিহাসের বহু পট পরিবর্তন ঘটেছে। তবু সেই হাহাকার- অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি-সর্বক্ষেত্রে সেই ধ্বনি আজও ধ্বনিত আকাশে বাতাসে। পুঁজিপতি শ্রেণীর মুনাফালোভী শাসন জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসেছে আমাদের জীবনে। সর্বাত্মক মুক্তির প্রহর গুনছি আমরা। মুক্তির পথও এখন নিশ্চয়ই অতীতের মত নয়। স্বাধীনতা আন্দোলনের যুগের যে আদর্শ আমাদের উজ্জীবিত করেছিল- আজ ব্রিটিশ শাসনমুক্ত দেশের অগণিত জাতীয় মুক্তির পথ সেই আদর্শ দিয়ে হবে না। চাই নতুন আদর্শ এবং তার ভিত্তিতে নতুন চরিত্র। এই আদর্শ হল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শ। সেই আদর্শ অর্জনের ক্ষেত্রে এঁদের চরিত্রের যুগভিত্তিক মূল্যায়ন এবং তার থেকে নির্যাস গ্রহণ খুব জরুরী। একথাও সত্য, এদেশে নবজাগরণের যে ধারাটি ধর্ম নিস্পৃহ ও আপসহীন ছিল তারই ধারাবাহিকভাবে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদ ও শ্রমিক বিপ্লবের আদর্শ সমাজ জীবনে গড়ে উঠবে। তা সত্ত্বেও মানবতা বা মূল্যবোধের যে ধারাটি অধ্যাত্মবাদের সঙ্গে মিলেমিশে ছিল- সেখান থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে আমাদের। বিদেশিনী হয়েও এই দেশে আসা, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে চাষীর কুঁড়ে ঘরে দিন যাপন করা, মানুষের প্রতি ভালবাসা সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ- এগুলি আমরা সঞ্চয় করতে পারি নিবেদিতার জীবন থেকে। এই গুণগুলি আমাদের আয়ত্ত করতে হবে এ যুগের সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষিত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। এটিই যথাযথ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। শিবদাস ঘোষ এই আহ্বানই রেখেছেন বর্তমান দিনের সমাজ বিপ্লবীদের কাছে। আমাদের কাছে সেই প্রয়াস আকাঙিক্ষত। নিবেদিতা স্বামীজীর মানবপ্রীতি সম্পর্কে সংহত আকারে লিখে গিয়েছেন-'সর্বোপরি মানবের পক্ষ সমর্থন! কখনো পরিত্যক্ত হয়নি, কখনো দুর্বল হয়নি সে সমর্থন- সর্বদা, উত্থিত হয়েছে অরক্ষিতের পক্ষে নূতন সংগ্রামে, দুর্বলের পক্ষে মহান বীরত্বে। আচার্য আমাদের এসেছিলেন এবং চলেও গিয়েছেন; তাঁর পরিচিতজনদের মধ্যে যে অমর স্মৃতি রেখে গেছেন, তার মধ্যে মানবের প্রতি তাঁর ভালবাসার তুলনায় বড় আর কিছু নয়।'

।। বিবেকানন্দ সম্পর্কে শরৎচন্দ্রের উপলব্ধি আর নিবেদিতার আহ্বানে সম্পৃক্ত হোক
আমাদের অন্তরের শ্রদ্ধা ।।

আর এরই সাথে সমসুরে অনুরণিত হয় নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সভাপতিত্বে ১৩৩৭ সালে বেলুড় মঠে স্বামীজীর 'ঊনসপ্ততিতম জন্মতিথি উৎসব'-এ এদেশের নবজাগরণের বলিষ্ঠ প্রতিভূ সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের দিক নির্দেশক গুটিকয়েক কথা। গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে বিবেকানন্দ সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, 'আমার বিশ্বাস, স্বামীজীর আদর্শ যদি আমরা অন্তরের সহিতই লইয়া থাকিতাম তবে দেশ আরও আগাইয়া যাইত। আমরা তাহা করি নাই বলিয়া তিনি তাঁহার জীবনের সামান্য দিনের মধ্যে যে প্রকাণ্ড ব্যাপার করিয়া গিয়াছেন, তাহাই আমাদিগকে ভাঙিয়া খাইতে হয়। তাঁহার বন্ধু-বান্ধব ও শিষ্যেরা যে আধ্যাত্মিক দিকটারই উপর সম্পূর্ণ জোর দিতেছেন, তাহার চাইতে বড় জিনিস তিনি দিয়া গিয়াছেন, তাহা দেশকে ভালবাসা-আত্মত্যাগ। আমি নিজে পরকালের জন্য ব্যস্ত নই। দেশের স্বাধীনতার মধ্যেই আমার চরম মুক্তি পাইব।' বিবেকানন্দের সার্ধশতবর্ষে কেবলমাত্র তাঁর ধর্মীয় চিন্তার প্রচার না করে করতে হবে তাঁর যুগভিত্তিক মূল্যায়ন। আজকের সমাজবিপ্লবের প্রয়োজনীয় চরিত্র গঠনে সাহস, তেজ, সত্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা ও আনুগত্যের শিক্ষাগ্রহণ করাই হবে যথার্থ কর্তব্য। আজকের দিনে মানবপ্রেম নিপীড়িত মানুষের প্রতি আমাদের হৃদয়াবেগ, যথার্থ মূর্ত হয়ে উঠতে পারে পুঁজিবাদবিরোধী শ্রমিকবিপ্লবের কর্মপ্রবাহে। এই পথেই বিবেকানন্দের প্রতি আমরা যথার্থ শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে পারি।
বিবেকানন্দ সম্পর্কে এই ধরনের একটা উপলব্ধি ছিল নিবেদিতার ধর্ম সাধনার ক্ষেত্রে তাঁর জীবনের বিচিত্র গতিধারায় স্বামীজীকে আচার্যপদে গ্রহণ করার পরও একেবারে জীবনের অন্তিম লগ্ন পর্যন্ত। স্বামীজীর প্রয়াণের পর মিস ম্যাকলাউডকে প্রেরিত চিঠিতে নিবেদিতা যে আকাঙক্ষা ফুটে উঠেছিল, তার মধ্যে বিবেকানন্দকে উপলব্ধি করার আর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিককে আমরা দেখতে পাই। যথার্থ তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। সেই চিঠিতে নিবেদিতা বলেছিলেন, 'এখানকার মানুষের মনের মধ্যে 'সেক্যুলার' জীবন ও কর্ম সম্বন্ধে ঘৃণা কী গভীরে প্রবেশ করে আছে কী বলব! আধ্যাত্মিক অহমিকা এদের চিন্তা করতে উৎসাহ দেয় .. জীবন পথের প্রতি পদক্ষেপে প্রাণপণে প্রচণ্ডভাবে কাজ করার প্রয়োজন যেন নেই। সন্ন্যাসী বেশধারী যে কেউ, তার থেকে অনেক সাহসী ও মহৎ যে কোন মানুষ সম্বন্ধে ঘৃণাভরে কথা বলবে, যেহেতু অন্য মানুষটি সন্ন্যাসী নয়।... হাজার হাজার শিষ্য যদি জোগাড় করতে পারতাম! ভবিষ্যতে আত্মত্যাগে সমর্থ সেই হাজার হাজার আত্মাকে হাটে বাজারে, বিদ্যালয়ে, ল্যাবরেটরিতে ছড়িয়ে দিতে পারতাম শিষ্যরূপে এবং যদি দেশের সেক্যুলার জীবনকে গঠন করতে পারতাম।" বিবেকানন্দের আধ্যাত্মিক চিন্তায় গভীরভাবে প্রভাবিত নিবেদিতা সেই প্রভাবের সীমানাকে নিজস্ব ব্যক্তিত্বে যতটুকু অতিক্রম করে এসেছেন, তা আমাদের দেশে চর্চিত হয়নি। এমনকী নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু বিবেকানন্দের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েও বলেছিলেন, 'বনে, জঙ্গলে তপস্যা করে দেশের স্বাধীনতা আসবে না। ইউরোপীয়রা যখন ভারতীয়দের পেটে লাথি মারে, তখন শংকরাচার্যের মায়া দিয়ে তাকে প্রতিহত করা যাবেনা' তার চর্চা থেকে শাসকরা আমাদের দূরে সরিয়ে রেখেছে। যেমন করে চর্চিত হয়নি নেতাজীর সেই মানসিকতা যেখানে তিনি অরবিন্দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েও তাঁর আশ্রমে চলে যাওয়াকে সমর্থন করতে পারেননি। তাই আজকের যুগের প্রেক্ষিতে ধর্মীয় প্রবক্তা সত্ত্বেও বিবেকানন্দের মধ্যে যে মানবপ্রেম, নির্যাতিত মানুষের প্রতি যে অকৃত্রিম ভালবাসা, নিবেদিতার মধ্যে সেই চিন্তার যে প্রতিফলন এবং তার নিজস্বতা সেই বিবেকানন্দ-নিবেদিতা হোক আমাদের চর্চার বিষয়-এইভাবেই নিবেদিত হোক আমাদের শ্রদ্ধা।

তথ্যসূত্র:
১. স্বামীজীকে যে রূপে দেখিয়াছি - ভগিনী নিবেদিতা ২. স্বামী বিবেকানন্দ - ডঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত
৩. নিবেদিতা লোকমাতা - শঙ্করীপ্রসাদ বসু, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড ৪. দেশ ৬৫ বর্ষ, ২৬ সংখ্যা, ৩১.১০.৯৮
৫. ভগিনী নিবেদিতা ও বাংলায় বিপ্লববাদ - গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী
৬. Sister Nivedita and the Indian Renaissance - Dr. Biplab Ranjan Ghosh
৭. লিজেল রেম কর্তৃক নিবেদিতার জীবন চরিত- অনুবাদক নারায়ণী ভট্টাচার্য
৮. ভগিনী নিবেদিতা - প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা ৯. শরৎ মূল্যায়ন প্রসঙ্গে - শিবদাস ঘোষ
১০. Socialism Utopian and Scientific - Fredreic Engles
১১. পথিকৃৎ - দশম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা, ৩১ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা ১২. বিবেকানন্দ বাণী ও রচনা
১৩. বিশ্ববিবেক - সম্পাদনা - অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, শঙ্করীপ্রসাদ বসু, শঙ্কর
১৪. নিবেদিতা রচনা সংগ্রহ - প্রথম খণ্ড ১৫. The life of Vivekananda - Romain Rolland
১৬. কাজী নজরুল ইসলাম রচনাবলী

(পথিকৃৎ পত্রিকার জানুয়ারি ২০১৩ সংখ্যা থেকে নেওয়া)

আপনার মতামত অন্যান্য পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করুন
মতামত দিন
মতামতসমূহ
কোনো মতামত নেই

পথিকৃৎ

আমাদের পত্রিকা ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত থাকুন এবং সর্বশেষ খবর ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট নিয়মিত পান

যোগাযোগ

পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২

দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com

গুরুত্বপূর্ণ লিংকসমূহ

© Pathikrit. All Rights Reserved. Designed By GenxByte