রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

নিবেদিতার চোখে বিবেকানন্দ - (প্রথম অংশ)

চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য | শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ-নিবেদিতা। তিনটি নাম এদেশে প্রায় একই সঙ্গে উচ্চারিত হয়। একটি নামের সাথে আর একটি নাম ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ এদেশেরই মানুষ। আমাদের দেশের নবজাগরণের কালেই তাঁদের জীবন ও কর্মসাধনা। আর নিবেদিতা জন্মসূত্রে আয়ারল্যান্ড বাসী এবং কর্মসূত্রে ইংলন্ডে বেশ কিছু সময়ের বসবাসকারী হলেও ভারতবর্ষের ইতিহাসের সাথে তাঁর নাম মিশে রয়েছে। শুধু তাই নয়, এদেশের ব্রিটিশ বিরোধী গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের প্রবাহেও তাঁর ভূমিকা সর্বজনবিদিত। ভারতবর্ষে তাঁর আগমনকাল থেকে জীবনের অন্তিমকাল পর্যন্ত চৌদ্দ বছরের ইতিহাস ভারতবাসীর মনের গভীরে আঁচড় কেটে গিয়েছে। সে ইতিহাস আমাদের প্রাণিত করে। এই অর্থে নিবেদিতার জীবন এবং তাঁর কর্মকাণ্ড একটা ভিন্ন ধরনের সাক্ষর রেখে গিয়েছে আমাদের দেশে।
তাঁর আসল নাম মিস এলিজাবেথ মার্গারেট নোবল। পরবর্তীকালে বিবেকানন্দের কাছে দীক্ষা গ্রহণের পর তিনি হলেন 'নিবেদিতা'- 'ভগিনী নিবেদিতা'। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে অভিহিত করেছেন 'লোকমাতা' নামে। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু তাঁকে বলতেন 'লেডি উইথ দি ল্যাম্প'। অরবিন্দের চিন্তায় তিনি 'শিখাময়ী'। মহামতি গোখলে এবং বালগঙ্গ াধর তিলকের তিনি 'ফিলজফার অ্যান্ড গাইড'। আর অবনীন্দ্রনাথ-নন্দলালের কাছে তিনি 'মহাশ্বেতা'। এভাবেই আমরা চিনি নিবেদিতাকে। ভারতবর্ষে আসার পর সংঘ জীবনে তিনি ছিলেন 'নিবেদিতা অফ রামকৃষ্ণ অর্ডার'। পরে লিখতেন, 'নিবেদিতা অফ রামকৃষ্ণ'। তারও পরে তিনি নিজে লিখতেন, 'নিবেদিতা অফ রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ'। বস্তুতপক্ষে তদানীন্তনকালে বাংলার বিশিষ্ট মানুষের মধ্যে নিবেদিতার প্রতি ছিল গভীর শ্রদ্ধাবোধ। তাঁদের অনেকের কাছে 'কখনও তিনি লোকশিক্ষয়িত্রী, কখনও স্নেহময়ী জননী, কর্তব্যকর্মে একনিষ্ঠ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কর্মী, কখনও বিনীতা ছাত্রী, কখনও সেবিকা, আবার কখনও অধ্যাত্মসাধনায় বিভোর।' একটা স্তরে সেই অধ্যাত্মসাধনার কর্মস্থল হল এই দেশ। এখানে তাঁর কর্ম পরিণত হয়েছে উপাসনায় এবং সেই উপাসনার ক্ষেত্রে অধিষ্ঠিত হয়েছে ভারতভূমি বা 'ভারতমাতা'। মিশে গিয়েছে অধ্যাত্মসাধনা আর ভারতের প্রতি ভালোবাসা। বিভিন্ন ভাবের এক অদ্ভুত সন্নিবেশ ঘটেছে নিবেদিতার চরিত্রে।

।। জীবনের তিনটি অধ্যায় ।।

নিবেদিতার জীবনের মূল পর্ব প্রধানত তিনটি। প্রথমটি জন্মগ্রহণ করার পর থেকে তাঁর শৈশব, কৈশোর অতিক্রম করে যৌবনের একটা পর্যায়ে এসে স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎকাল পর্যন্ত বিস্তৃত। দ্বিতীয়টি হল বিবেকানন্দের সঙ্গে সাক্ষাতের পর থেকে বিবেকানন্দের প্রয়াণ পর্যন্ত। তৃতীয়টি নিবেদিতার কর্মময় জীবনের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়- অর্থাৎ জীবনের শেষ ন'টি বছর।
পারিবারিক সূত্রেই নিবেদিতার জীবনের সূচনা পর্ব থেকে ছিল একদিকে অধ্যাত্মবাদের প্রভাব এবং অপরদিকে স্বদেশপ্রেম। তাঁর পিতামহ রেভারেন্ড জন নোব্ল যেমন গীর্জার এক ধর্মযাজক, তেমনি ইংলন্ডের অধীনতা থেকে আয়ারল্যান্ডকে মুক্ত করার সংগ্রামেও তিনি ছিলেন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। আয়ারল্যান্ড তখন ইংরেজদের অধীনে। নাগরিকদের সাধারণ বহু অধিকার সেখানে স্বীকৃত ছিল না। তখন এমন নিয়ম ছিল যে, যারা শাসকদের বিরোধিতা করবে, তারা জমি কিনতে পারবে না, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে না, স্কুলে, আদালতে তাদের চাকরি জুটবে না। অস্ত্র নিয়ে চলা তো দূরের কথা তারা ঘোড়ায় পর্যন্ত চড়তে পারবে না। এর বিরুদ্ধে প্রবল ক্ষোভ ধীরে ধীরে পুঞ্জীভূত হয়েছে। অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছিল আয়ারল্যান্ড ধাপে ধাপে। পিতা স্যামুয়েলও ধর্মযাজকের পদে আসীন হয়েছিলেন। ধর্মযাজকের বৃত্তির সাথে সাথে তিনি দরিদ্র মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। পাশাপাশি তিনি একদিকে ধর্ম ও অন্যদিকে দরিদ্র মানুষের সেবার আদর্শবোধের দ্বারা জীবনকে পরিচালিত করবার সংগ্রামে নিয়োজিত ছিলেন। আবার, নিবেদিতার শৈশবের একটা বড় অংশ অতিবাহিত হয়েছিল তাঁর পিতামহীর সান্নিধ্যে। তাঁর নিষ্ঠা, নিরলস কর্মপ্রচেষ্টা এবং ধর্মীয় উপাসনার প্রভূত প্রভাব পড়েছিল নিবেদিতার মধ্যে। পিতার মৃত্যুর পর যখন মা মেরী ইসাবেল তাঁর পিতা হ্যামিল্টনের কাছে আয়ারল্যান্ডে ফিরে এলেন, সেখানে হ্যামিল্ট নের সংস্পর্শে এসে নিবেদিতার মনে দেশাত্মবোধ গড়ে ওঠে। আসলে হ্যামিল্টন ছিলেন 'আইরিশ হোমরুল' বা স্বায়ত্বশাসন আন্দোলনের এক বিশিষ্ট নেতা। ফলে শৈশবাবস্থা থেকেই ধর্মভাবের সঙ্গে একটা অদম্য স্বাধীনতা-স্পৃহা নিবেদিতার চরিত্রের ভিত্তি হিসাবে গড়ে উঠেছিল - যার প্রভাব আমরা গভীরভাবে দেখি তাঁর জীবনের শেষ কয়েক বছরের কর্মে। কর্মসূত্রে যখন তিনি লণ্ডনে তখন লেডি রিপন ও লেডি মার্জেসনের সঙ্গে পরিচয় সূত্রে এক সাহিত্য আসরে যুক্ত হন যেটি পরবর্তীতে বিখ্যাত 'সিসেম ক্লাব'-এ পরিণত হয়। নিবেদিতা হ'ন তার সম্পাদক। এখানে সাহিত্য, শিল্প, রাজনীতি, নারী সমাজের সমস্যা সম্পর্কে বিতর্ক, আলাপ-আলোচনা চলত। গভীর চিন্তাশীল ব্যক্তি বার্নার্ড শ, হাক্সলি সহ নানা বিদ্বজ্জন আলাপ-আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন। নিবেদিতা নিজেও ছিলেন একজন লেখিকা। শিক্ষাপ্রণালী সম্পর্কে তাঁর কৌতূহল ছিল অপরিসীম। শিক্ষা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য নানান স্তরে একসময় খুবই সমাদৃত হয়েছিল। তাঁর জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্যও ছিল শিক্ষয়িত্রী হওয়া। সেইমত তিনি কাজও শুরু করেছিলেন। ১৮৯২ সালে আয়ারল্যান্ডের পার্লামেন্টে আবার 'হোমরুল' বিল পেশ হয়। নিবেদিতাও সেই সময় এ সম্পর্কে তাঁর সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করেছিলেন। এইভাবে ধারাবাহিক গতিপ্রবাহে একজন স্বাধীনচেতা আত্ম-মর্যাদাবোধসম্পন্ন নারী হিসাবে তিনি নিজেকে বিকশিত করেছিলেন।
পরিবারের পরিমণ্ডলের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই নিবেদিতার মধ্যে ধর্মবিশ্বাস তথা অধ্যাত্মসাধনার প্রতি একটা গভীর শ্রদ্ধাবোধ গড়ে উঠেছিল। জন্মমুহূর্তে মা মেরী সরল ধর্মবিশ্বাসের কারণে তাঁকে দেবতার চরণে উৎসর্গ করেছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ এই উৎসর্গের কথা জানতেন না। পরবর্তীকালে মিস ম্যাকলাউড্ নিবেদিতার মা-এর কাছ থেকে এই কথা শোনেন গোপনে। জানা যায়, ছোটবেলায় বাইবেলে বর্ণিত কাহিনী শুনতে নিবেদিতা খুবই ভালবাসতেন। সেই কাহিনীগুলি তাঁর মধ্যে গভীর আবেগের সঞ্চার করত। একসময় তাঁর পিতার এক ভারত ফেরৎ ধর্মযাজক বন্ধু নিবেদিতার ধর্মের প্রতি নিষ্ঠা দেখে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, 'ভারতবর্ষ একদিন তোমাকে ডাকবে'। ছোট্ট নিবেদিতার মনে তখনই একটা কৌতূহল জন্মেছিল যে, ভারতবর্ষ দেশটা কোথায়? একথা সত্য তাঁর সমগ্র জীবনে অধ্যাত্মসাধনার দিকটি প্রবলভাবেই উপস্থিত ছিল। কিন্তু, তা সত্ত্বেও নিবেদিতার জীবনে ধর্মবিশ্বাসের প্রশ্নে যে দ্বন্দ্ব আবর্তিত হয়েছে তাকেও আমাদের মনে রাখা দরকার।

।। বিশ্বাস, যুক্তি ও সত্যানুসন্ধিৎসার দ্বন্দ্বে আবর্তিত হয়েছে তাঁর মনন জগৎ ।।

তিনি যখন হ্যালফক্স বিদ্যালয়ে পাঠরতা তখনই কংগ্রিগেশনালিস্ট চার্চের বিধিনিষেধ এবং যান্ত্রিকতা নিয়ে তাঁর মনে নানান প্রশ্ন জাগে। উনবিংশ শতাব্দীতে চার্চের উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে ট্রাক্টেরিয়ান আন্দোলন, যার ফলে চার্চের রূপান্তর ঘটেছিল তার প্রতি নিবেদিতার মনোযোগ আকর্ষিত হয় এবং এই প্রভাব তাঁর বৈচিত্র্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডের মধ্যেও জাগরুক ছিল জীবনের অন্তিম লগ্ন পর্যন্ত। কিন্তু ধর্মজীবনের মধ্যে অসহিষ্ণুতা তাঁকে পীড়িত করত। তাঁর সত্যান্বেষী মনে যীশুখ্রীষ্টের মহৎ আত্মোৎসর্গ সম্পর্কে গভীর শ্রদ্ধা থাকলেও খ্রীষ্টধর্মের সত্যতা সংশয় জাগে। তা সত্ত্বেও তদানীন্তন সময়ের নাস্তিবাদ এবং সংশয়পূর্ণ চিন্তাধারাকেও তিনি গ্রহণ করতে পারেননি। সিসেম ক্লাবে শিশু মনস্তত্ত্ব, নারীর অধিকার প্রভৃতি আধুনিক চিন্তাসম্বলিত নানান বিষয়ে তিনি আলাপ-আলোচনায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন। সেই সময় আইরিশ জাতীয়তাবাদের উষ্ণ স্পর্শেও তিনি সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। রাজনীতি সম্পর্কিত তর্ক-বিতর্কে তিনি গভীরভাবে লিপ্ত থাকতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখালেখি শুরু করেছিলেন। 'ডেলি নিউজ', 'রিভিউ অফ রিভিউজ', 'রিসার্চ' প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর চিন্তাসম্বলিত বহু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। জীবনের এই পর্যায়ে তাঁর ব্যক্তিজীবনেও ঘটে এক অপ্রত্যাশিত বিড়ম্বনা। যৌবনের প্রারম্ভে ব্যক্তিজীবনে সংসার রচনার স্বপ্ন ভেঙে যায় দু'বার দু'ভাবে। মনের জগতের এই নির্মম ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে পরাজয়ের বেদনায় বিদ্ধ করে। ভবিষ্যৎ ব্যক্তি জীবনের স্বপ্নের নিষ্ঠুর মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে। যদিও কিছুদিনের মধ্যে নিজের আদর্শবোধের ভিত্তিতে নিজেকে সামলে নিয়ে আবার কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর চরিত্রের এই দিকটি অনুসরণযোগ্য। সিসেম ক্লাবে যুক্ত থাকাকালীনই নিবেদিতার জীবন খানিকটা ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়েছিল। এই সময়ে তিনি আয়ারল্যান্ডের পার্নেল এবং রাশিয়ার প্রিন্স ক্রপ্টকিন-এই দুই বিপ্লবীর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। প্রিন্স ক্রপ্টকিন তখন রাশিয়া থেকে নির্বাসিত হয়ে সস্ত্রীক লন্ডনের ছোট্ট শহরতলী ঈলিং-এ দিনযাপন করছিলেন। স্বাধীনচেতা এই বিদ্রোহীর সাথে দেখা করার প্রবল আগ্রহ নিবেদিতার মধ্যে ছিল। কেননা নিবেদিতা সেই সময় ইংলন্ডে অবস্থিত আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। ক্রপ্টকিনের সাথে দেখা হওয়ার পর তাঁর কাছে নিবেদিতা বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত করার সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি ক্রপ্টক্রিনের 'The Mutual Aid' নামে একটি বই পড়ে খুবই অনুপ্রাণিত হন। বিশেষত এই সময় থেকেই একদিকে আইরিশ বিপ্লবের মতবাদে এবং অপরদিকে রাশিয়ার নিহিলিজম এই দুই মতবাদের সংমিশ্রণে তাঁর মানসিক বিকাশ পরিস্ফুট হতে থাকে।
এই সংশয় ও সংঘর্ষের আবর্তের মধ্যে তাঁর সত্যানুসন্ধিৎসা বিজ্ঞানের দিকে তাঁকে নিয়ে যায়। সমসাময়িক সময়ে তাঁর হাতে আসে বুদ্ধের একটি জীবনীগ্রন্থ- 'Light of Asia'। বুদ্ধের জীবন তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। মনে তাঁর প্রশ্ন জাগে, ধর্মই কি সত্য? নাকি ধর্ম সত্য থেকে পৃথক? নিজের মনের এই দ্বন্দ্বকে পরবর্তীকালে তিনি ১৯০২ সালে বম্বের (বর্তমানে মুম্বই) 'হিন্দু লেডিস সোস্যাল ক্লাব'-এ এক আলোচনায় সুন্দরভাবে পরিস্ফুট করেছেন। তিনি লিখেছেন, "I am a born and bred English woman and unto the age of eighteen, I was trained and educated as English girls are. Christian religious doctrines were of course early instilled into me… But after the age of eighteen, I began to harbour doubts as to the truth of the Christian doctrines...
During the seven years of wavering it occurred to me that in the study of natural science I should surely find the truth I was seeking. So, ardently I began to study how this discovered that in the laws of Nature at least world was created and all things in it and I there was consistency, but it made the doctrines of the Christian religion, seem all the more inconsistent. Just then I happened to get a life of Buddha and in it I found that here, alas also was there a child who lived ever so many centuries before the child Christ, but whose sacrifices were no less self-abnegating than those of the other. This dear child Gautama took a strong hold on me and for three more years I plunged myself into the study of the religion of Buddha, and I became more and more convinced that the salvation he preached was decidedly more consistent with the truth than the preachings of the Christian religion."

।। পাশ্চাত্য নবজাগরণের বলিষ্ঠতা ধীরে ধীরে হারানোর প্রেক্ষাপটে
নিবেদিতার চিন্তাজগৎ-এর ভিত্তি গড়ে উঠেছে ।।

প্রসঙ্গত একটি বিষয় এখানে প্রণিধানযোগ্য। ধর্মীয় বিশ্বাস ও ব্যক্তিজীবনের ঘটনাস্রোতকে ভিত্তি করে নিবেদিতার এই মানসিক অবস্থা যখন গড়ে উঠেছে জীবনের দ্বন্দ্ব সংঘাতে তখন সমগ্র পাশ্চাত্য জুড়ে নবজাগরণের সূচনা পর্বের দিনগুলিতে যে বলিষ্ঠ মানবতাবাদ অধ্যাত্মবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আপসহীন ছিল, তার পথ থেকে সে কিছুটা সরে আসতে চাইছে। তার প্রভাবও সমাজ জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে। যে ফরাসী বিপ্লবকে একসময় মার্কস বলেছিলেন, 'Irreligious, exclusively political form which alone was suited to a developed bourgeoisie' বা 'radical bourgeoisie rationalism', সেই বুর্জোয়া বিপ্লবের বলিষ্ঠতা তখন হারিয়ে গিয়েছে ধনতান্ত্রিক দেশগুলিতে। ইতিমধ্যেই পুঁজিবাদী দেশ ফ্রান্স ও জার্মানীর শ্রমিকরা বুর্জোয়া শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। তারা সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে উঠছে। এই সময়ে ফরাসীদের irreligious কাজটিকে তারা আর তাদের স্বার্থরক্ষাকারী বলে মনে করতে পারছে না যা একসময় রাজতন্ত্র বা সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়বার ক্ষেত্রে বিপ্লবী ভূমিকা পালন করেছিল। ক্ষমতাসীন বুর্জোয়ারা পূর্বের অবস্থান পরিবর্তন করে তখন বলছে, 'Religion must be kept always for the people - that was the only and the last means to save society from utter ruins.' শুধু তাই নয়, জার্মান ও ফ্রান্সের বুর্জোয়াদেরকে এতদূর পর্যন্ত বৃটিশ পুঁজিবাদ শয়তানি করে বলছে যে, এই সময় 'irreligious' কাজটি একটি জীবন্ত মুর্খামি। এঙ্গেলস-এর কথাতেও এ সত্য পরিস্ফুট And it was turn of British bourgeoisie to sneer and to say 'why you fools, I could have told you that two hundred years ago.
এই সময়েই নিবেদিতার মানসপট তৈরি হচ্ছে তাঁর পরিবার পরিবেশের আধারে। ফলে, জীবনের ঘটনাস্রোতে তাঁর মধ্যে বহু সামাজিক-রাজনৈতিক গুণাবলীর সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবির সঙ্গে এই ধর্মীয় চিন্তার প্রভাব আসার সামাজিক পটভূমি তৈরি হয়েছিল। সৃষ্টির আদি কারণ সম্পর্কে হাক্সলি, টিন্ডেল, স্পেন্সর এর ধারণা মতবাদের ঘূর্ণিপাকে আবর্তিত হয়েছে নিবেদিতার মানসপট। অ্যাংগ্লিকান চার্চের 'ফ্রি থিঙ্কার' সম্প্রদায়ের নেতার সঙ্গে আলাপ করে মুহূর্তের জন্য তাঁর মনে হয়েছিল, 'এতদিনে লক্ষ্যবস্তুর সন্ধান মিলল বুঝি। কিন্তু সেখানেও পরম অসহিষ্ণুতার দেয়ালে ধাক্কা খেতে হল শেষপর্যন্ত। গোঁড়ামিতেই যে মানুষের সত্যদৃষ্টি আবিল হয়ে ওঠে। এ জগতে সত্য কোথায়'?
নানান বিশ্বাসের দ্বন্দ্বে আবর্তিত নিবেদিতার মানসিক এই অবস্থাকে নিজে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বললেন, আমাদের অনেকের কাছেই স্বামী বিবেকানন্দের বাণী তখন তৃষ্ণার্তের কাছে সুশীতল পানীয়ের মত উপস্থিত হয়েছিল। ধর্ম সম্বন্ধে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা এবং হতাশা বিগত শতাব্দী ধরে ইউরোপের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। গত কয়েক বৎসর হতে আমাদের অনেকেই এ বিষয়ে বিশেষ সচেতন হয়েছেন। খ্রীষ্টীয় অনুশাসনে আস্থা রাখা আমাদের পক্ষে ছিল অসম্ভব, আবার এখনকার মত আমাদের কাছে এমন কোন অস্ত্র ছিল না যার সাহায্যে ধর্মের অন্তর্নিহিত প্রকৃত তত্ত্বের মর্ম উদঘাটন করা যেত।'

এইরকম একটি সময়ে জনৈক বন্ধু এবেনজার কুক চিত্রবিদ্যার পাঠ দিতে এসে বললেন, 'লেডি ইসাবেল মার্গসন্ তাঁর বাড়িতে কয়েকজন বন্ধুকে যেতে বলেছেন, এক হিন্দু সন্ন্যাসী কিছু বলবেন ওখানে তুমি যাবে?' সময়টা ১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাস। কৌতূহলবশেই গিয়েছিলেন নিবেদিতা। সেখানে ছিলেন মাত্র জনা পনের শ্রোতা। আমন্ত্রিতদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন কোনরকম ধর্মে বা ধর্মমতে আস্থা স্থাপনের বিরোধী। নিবেদিতার জীবনীকারের কথায় 'ধূপের চড়া সুগন্ধ বাতাসে মিশেছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী হয়ে। পুরোমাপের আলখাল্লা আর খুন খারাপি রং-এর কোমরবন্ধ পরা স্বামী বিবেকানন্দ বসলেন ঠিক মুখোমুখি। বহু সময় ধরে বিবেকানন্দ শ্রোতাদের বহু ধরনের প্রশ্নের জবাব দিলেন। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের ধর্ম সংক্রান্ত প্রশ্ন, বৌদ্ধ ধর্ম ও হিন্দুধর্মের মধ্যেকার পার্থক্য, অনন্ত স্বরূপ মানুষকে কী দিতে পারে, সুখ, দুঃখ নয় মুক্তি অবন্ধন মুক্তির তপস্যা, ইত্যাদি বহু বিষয় আলোচনা করেন তিনি ধীর শান্ত কণ্ঠে। মাঝে মাঝে সংস্কৃত শ্লোক ও তার ইংরেজি তর্জমা করেন তিনি। সবশেষে গীতার শ্লোক আবৃত্তি করে বললেন, 'যখনই ধর্মের গ্লানি ও অধর্মের অভ্যুদয় ঘটে, তখনই আমি আপনাকে সৃষ্টি করি। সাধুগণের পরিত্রাণ, দুষ্কৃতকারীগণের বিনাশ এবং ধর্মস্থাপনের জন্য যুগে যুগে আমি অবতীর্ণ হই।' এই প্রথম সাক্ষাৎ সম্পর্কে নিবেদিতা লিখেছেন, 'নভেম্বর মাসের রবিবাসরীয় হিমেল সন্ধ্যা। ওয়েষ্ট এন্ড-এর বসার একটি ঘরে আগুনের দিকে তিনি পিছন ফিরে ছিলেন। সামনে অর্ধবৃত্তাকার শ্রোতাগণ। তিনি যখন প্রশ্নের পর প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন, মনে হচ্ছিল তিনি সংস্কৃত গ্রন্থ থেকে আবৃত্তি করছেন, যা গীতধ্বনির সঙ্গে তুলনীয়। তাঁর মুখমণ্ডলে অপূর্ব কোমলতা ফুটে উঠেছে, যার সঙ্গে র্যাৃফায়েল চিত্রিত মিস্টিক চাইল্ডের ললাট লিপি তুলনীয়'।
বিবেকানন্দের আলোচনা পর্ব সমাপ্ত হওয়ার পর শ্রোতাদের মধ্যে কয়েকজন মহিলা মন্তব্য করেছিলেন যে, এই হিন্দু সন্ন্যাসীর মতবাদে নতুনত্ব কিছু নাই। নিবেদিতার মানসিকতাও সেই সময় ছিল খানিকটা একইরকম। কিন্তু তিনি আলোচনার সময়ে কোনও প্রশ্ন তোলেননি। এরপরে বিবেকানন্দের আরও দুটি ভাষণ ১৬ নভেম্বর ও ২৩ নভেম্বর শোনেন তিনি। তার সারাংশও লিখে রেখেছিলেন- 'অতি উচ্চাঙ্গের সঙ্গীত আমাদের মনে যে অনুভূতির সৃষ্টি করে, বার বার শুনলে তা বর্ধিত ও গাঢ় হয়। সেইরূপ বক্তৃতাগুলির সারাংশ এখন পড়তে পড়তে তখনকার থেকে বহুগুণ বিষ্ময়কর মনে হচ্ছে।'

।। বিবেকানন্দের অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ থাকলেও চিন্তার সংঘাতও ছিল তাঁর সঙ্গে ।।

কিন্তু তা সত্ত্বেও একথা সত্য যে, নিবেদিতা বিবেকানন্দের সমস্ত মতবাদকে এককথায় স্বীকার করে নেননি। বিবেকানন্দের বহু আলাপ আলোচনা বা ক্লাসের নিয়মিত অংশগ্রহণকারী হওয়া সত্ত্বেও একের পর এক প্রশ্নের উত্থাপন করতেন তিনি। প্রতিটি প্রশ্নের সঙ্গে মিশে থাকত সংশয়। কারণ, কোন কথাকে কেবলমাত্র বিশ্বাসের দোহাই দিয়ে স্বীকার করা নিবেদিতার পক্ষে সম্ভব ছিল না। নিজের মধ্যেকার শৈশবের সরল ধর্মবিশ্বাসকে ত্যাগ করলেও একটা মানবিক আদর্শবোধের ভিত্তিতে তাঁর জীবনের গতি এগিয়েছে একটু একটু করে। সেসব ধারণা তাঁকে নতুন আদর্শের পরিমণ্ডলে আসতে সাহায্য করেছে। তবে একথা সত্য যে, জীবনের কর্মপ্রবাহের নানান ক্ষেত্রে নানান সময়ের প্রায় প্রতিটি স্তরে তাঁর ধর্মবিশ্বাসের মূল সুরটি নিহিত ছিল। এই জন্যই 'প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সমন্বয়', 'মায়ার বন্ধন ভাঙাটাই মুক্তি', 'অসত্য থেকে আমরা সত্যের দিকে যাই', 'অজ্ঞানতাই পাপ' ইত্যাদি যে ব্যাখ্যা বিবেকানন্দ উপস্থিত করতেন এবং 'ধর্মকেও শুধুমাত্র বিশ্বাস নয় পরীক্ষা করে নেওয়া দরকার' বলে বলতেন - তার দ্বারা নিবেদিতা আপ্লুত হয়ে পড়লেন। এই নূতন অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে এল নবজীবনরূপে। বিবেকানন্দকে গ্রহণ করলেন 'আচার্যদেব' বলে। নিজেকে স্বীকার করলেন তাঁর শিষ্যারূপে। লিখলেন, "And now came the turning point for my faith... The Swami I met here was none other than Swami Vivekananda who afterwards became my Guru and whose teachings have given relief my doubting spirit had been longing for so long."
বিবেকানন্দের এই প্রভাব স্মরণ করে পরবর্তী জীবনে নিবেদিতা লিখেছিলেন, 'সে সময় যদি উনি লন্ডনে না আসতেন! এ জীবনই তাহলে একটা কন্ধকাটা স্বপ্ন হয়ে থাকত।' আবার এও নিবেদিতা বলেছেন, 'বিবেকানন্দের বাণীতে যুক্তির অসঙ্গতি সম্পর্কে নিঃসংশয় হওয়ার জন্য - খুব মন দিয়ে বার বার সে সব পড়েছি। কিন্তু নিজের অনুভবের স্বীকৃতি না পাওয়া পর্যন্ত তার যথার্থতা আমি মন থেকে মেনে নিতে পারিনি।' বিবেকানন্দ সম্পর্কে নিবেদিতা একথা বলতেন যে, তিনি যে কোনরকম বন্ধনের বিরোধী ছিলেন। তবে এই বন্ধন থেকে মুক্তি বা নিষ্কৃতিলাভের জন্য হিন্দুরা যে আকাঙক্ষা করতেন সে প্রসঙ্গে নিবেদিতার সুস্পষ্ট বক্তব্য ছিল। তিনি বলতেন, 'এই আকাঙক্ষা আমি বোধ করি না। আমার মনে হয় নিজের মুক্তি সাধনের চেয়ে যে সকল মহৎ কাজ আমার কাছে প্রীতিকর, তাতে সহায়তা করতে আবার জন্মগ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয়।'
একথা আমাদের মনে রাখা দরকার, বিবেকানন্দের চরিত্রের অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্বের দ্বারা নিবেদিতা গভীরভাবে আকৃষ্ট হলেও কিছু প্রশ্নে দ্বন্দ্বও ছিল। কিন্তু পরবর্তী জীবনে সেগুলি স্মরণে রাখেননি। কোথাও কারুর কাছে তার উল্লেখও করেননি। রমা রোল্যা এই বিষয়টির উল্লেখ করে বলেছেন, 'সেন্ট ক্লারার সঙ্গে সেন্ট ফ্রান্সিসের নাম যেমন জড়িয়ে আছে, তেমনি তাঁর দীক্ষাকালীন গ্রহণ করা 'ভগিনী নিবেদিতা' নামটি প্রিয় গুরুদেবের সঙ্গে চিরদিন জড়িত থাকবে। অবশ্য এটা সত্য যে, বিবেকানন্দের মধ্যে পভেরেলোর সেই দীনতা ছিল না। কাউকে গ্রহণ করার আগে বিবেকানন্দ তাঁকে কঠিন অন্তঃ-পরীক্ষার সম্মুখীন করতেন। কিন্তু নিবেদিতার ভালবাসা এত গভীর ছিল যে, যে রূঢ়তা একদিন তাঁকে পীড়িত করে ভয়াবহ নৈরাশ্যরূপে দেখা দিয়েছিল, তার কোন স্মৃতিই তিনি রাখেন নি।' নিবেদিতার এক চিঠিতে এই সময়কার এই দ্বন্দ্ব পরিস্ফুট হয়েছে, 'আমার ব্যক্তিগত জীবন দাঁড়িয়ে কোথায়? হারিয়ে গেছে। পরিত্যক্ত পরিচ্ছদের মত ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে তাকে, যাতে করে এই মানুষটির চরণতলে নতজানু হতে পারি। ভুল হয়ে দাঁড়াবে কি তা? মরীচিকা? না কি তা হবে পরম নির্বাচন?' নিবেদিতার এই মনকে বিবেকানন্দ বুঝতে পেরেছিলেন। নিবেদিতাকে একসময় তিনি একান্তে বলেছিলেন, 'আমিও দীর্ঘ ছ বছর ধরে আমার গুরুদেবের সঙ্গে লড়াই করেছি।' নিবেদিতা এ প্রসঙ্গে নিজেই একসময় লিখেছেন, 'My relation to our Master at this time can only be described as one of clash and conflict."
এমনকি এদেশে আসার পরও স্বামী বিবেকানন্দের ব্রিটিশ সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্যকে নিবেদিতা সহজে মেনে নেননি। নিবেদিতা বলতেন, 'ইংরেজ জাতির পতাকাকে আমি ইষ্ট দেবতার মত প্রগাঢ় ভক্তি ও শ্রদ্ধা করি।' তাঁর এক জীবনীকারের ভাষায়, "She continued to be very proud of her English Nationality and She declared her allegiance to the British national flag. There also a clash between her and Swami Vivekananda when the latter made some disparaging remarks about the British." যদিও বিবেকানন্দের ইউরোপীয় অন্যান্য শিষ্যদের হস্তক্ষেপে এই বিরোধের নিষ্পত্তি ঘটে।

।। ভারতবর্ষকে গভীরভাবে ভালবাসলেও নিবেদিতা এদেশে যখন এসেছিলেন
তখন তিনি ছিলেন ব্রিটিশ রাজানুগত্য নাগরিক ।।

প্রকৃতপক্ষে, নিবেদিতার পরবর্তী জীবনে এদেশের জন্য যত নিষ্ঠাই আমরা দেখি না কেন, তিনি এখানে এসেছিলেন 'রাজানুগত্যসম্পন্ন ব্রিটিশ নাগরিক' হিসাবেই। বান্ধবীকে লেখা চিঠিতে- 'ব্রিটিশ সরকারের সাথে একাত্মতা'র আভাসও দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, নিবেদিতার মনে এমন বিশ্বাসও বাসা বেঁধেছিল যে, 'স্বামীজী যতক্ষণ ভারতে আছেন ততক্ষণ হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজদ্রোহের ছায়া পর্যন্তও থাকবে না।' এর অন্যতম কারণ হল ইংল্যান্ডে থাকার সময় তিনি বিবেকানন্দের ধর্মীয় রূপটুকুকেই দেখেছেন- তাঁর ব্রিটিশ বিরোধী মননকে উপলব্ধি করতে পারেননি। বিবেকানন্দও নিবেদিতা সম্পর্কে এইটুকু জেনেছিলেন যে, তিনি ছিলেন আইরিশ জাতীয়তাবাদের অনুরাগী। ফলে তিনি নিশ্চয়ই ভারতীয়দের আশা-আকাঙক্ষার প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হবেন। নিবেদিতা ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে বিবেকানন্দের যেসব চিঠিপত্র পেয়েছিলেন তাতে ভারতবর্ষের দুঃখ-দারিদ্র্যের বর্ণনা ছিল। স্বভাবতই বিবেকানন্দ প্রত্যাশা করেছিলেন যে, নিবেদিতা ইংরেজ শাসনের অত্যাচার সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু বাস্তবে নিবেদিতার মনে সেই সময়ে ইংল্যান্ডের প্রতি আনুগত্য ছিল অটুট।
নিবেদিতার এই অটুট ইংল্যান্ডপ্রীতি ধীরে ধীরে ভাঙতে থাকে। একের পর এক ঘটনা প্রবাহে তিনি উপলব্ধি করেন স্বামীজীর স্বদেশপ্রেমকে। বিবেকানন্দের কাজের পেছনে গোয়েন্দা লাগানোতে নিবেদিতা খুবই বিস্মিত ও হতচকিত হন। এক চিঠিতে তিনি লিখলেন, 'নির্ঘাত সরকারের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। যদি স্বামীজীকে কোনভাবে বাধা দেওয়া হয় তাহলে সরকার সত্যি প্রমাণ করে দেবে- তার মাথা খারাপ। তাতে অগ্নিশিখা জ্বলে উঠবে যা ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশে। আর আমি- এদেশের মাটিতে শ্বাস নিয়েছি এমন সর্বাধিক রাজানুগত্য সম্পন্ন ইংরাজ রমণী আমি- এদেশে আসার আগে নিজের রাজানুগত্যের গভীরতা বুঝতে পারি এমন আমি- আমিই প্রথম জ্বলে উঠব।' কিন্তু তা সত্ত্বেও দীক্ষাদানের পর বিবেকানন্দ নিবেদিতাকে যখন প্রশ্ন করলেন, 'তুমি কোন্ জাতিভুক্ত?' তখন নিবেদিতা জানিয়েছিলেন যে, তিনি ইংরেজ জাতিভুক্ত। বিবেকানন্দ তখন বুঝেছিলেন, 'ইংরেজ জাতীয় প্রতীকের প্রতি নিবেদিতার অপরিসীম আনুগত্যর অর্চনা।' এই প্রসঙ্গে নিবেদিতা স্পষ্ট করেই লিখেছেন, 'দীক্ষাদানের পূর্ব পর্যন্ত তাঁর ইংরেজ হওয়ার মননগত তাৎপর্য, ভারতের স্বরূপ অনুধাবনের ক্ষেত্রে ইংরেজদের বদ্ধমূল ধারণার প্রকৃতি, নিজ জাতির ইতিহাস ও কীর্তির প্রতি তাঁর ইংরেজ সুলভউচ্চ ভাবাবেগ সম্পর্কে স্বামীজীর কোন ধারণাই ছিল না'। দীক্ষাদানের পর নিবেদিতার উত্তরে আহত বিবেকানন্দ কিছুদিন পরে এমনও বলেছিলেন যে, তার দেশপ্রেম পাপ ছাড়া আর কি? নিবেদিতার মন থেকে এই ইংরেজ প্রীতিকে অপসারণ করবার জন্য বিবেকানন্দ দীর্ঘদিন ধরে কঠিন প্রয়াস চালিয়ে যান। এবং নিবেদিতাও সহজে তা স্বীকার করতে চাননি। যার জন্য একসময় তিক্ততাও এসেছিল-যাকে নিবেদিতা বলেছেন তাঁর জীবনের এই পর্যায়ের 'ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা' হিসাবে।

।। ধীরে ধীরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অত্যাচারী রূপ নিবেদিতার কাছে স্পষ্ট হয়েছে ।।
এই 'ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা'-র পাশাপাশি নিবেদিতা এদেশের মাটিতে প্রত্যক্ষ করলেন অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসনের জাতিবিদ্বেষের রূপ। তাঁর বান্ধবীকে এক চিঠিতে লিখলেন, 'ইংল্যান্ড থেকে তুমি বুঝতেই পারবে না-জাতিবিদ্বেষ কাকে বলে। তিনজন শ্বেতাঙ্গিনীর সঙ্গে স্বামীজী ও অন্যান্য 'নেটিভ'রা যখন ভ্রমণ করেন, তখন তাদের জঘন্য ধরনের অপমান সহ্য করতে হয়।' নিবেদিতার ইংরেজপ্রীতি এতে আহত হয়। কিন্তু পুরোপুরি অপসৃত হয়নি। এই মানসিক অবস্থায় তিনি মিসেস হ্যামন্ডকে এক চিঠিতে লেখেন, 'ইংল্যান্ড ও ভারতকে পরস্পরকে ভালবাসতে পারব এই আমার জীবন স্বপ্ন। ইংল্যান্ডের প্রতি সুবিচারের প্রয়াসে একথা আমাকে বলতেই হবে-ইংল্যান্ডের সন্তানরা অনেকক্ষেত্রেই ভারতকে ভালভাবে এবং বিশ্বস্ততার সঙ্গে সেবা করছে। কিন্তু যেভাবে তারা সে কাজ করছে, তা ভারতবাসীর মধ্যে সত্যিকারের ভাবাবেগমূলক সাড়া জাগাতে পারেনি। অপরদিকে প্রতিটি জাতিই স্বাধীনতা দাবী করে-অস্ট্রিয়া থেকে ইতালি, তুরস্ক থেকে গ্রীস, ইংল্যান্ড থেকে ভারত।'

এই প্রেক্ষাপটেই ঘটল কাশ্মীরের ঘটনা। কাশ্মীরের মহারাজা সংস্কৃত কলেজ স্থাপনের জন্য বিবেকানন্দকে যে জমি দেবেন বলে ভেবেছিলন, তা শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল না মিশনারীদের বিরোধিতায়। এর পেছনে ছিল ব্রিটিশ সরকারের কৌশল- গোপনে এই জমি না দেওয়ার নির্দেশ। এমনকি ভেটো প্রয়োগ করে এই সম্পর্কিত আলোচনাটুকুও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই ঘটনা নিবেদিতার মানসিকতায় বিরাট পরিবর্তন সূচিত করে। তিনি এ নিয়ে ইংল্যান্ডে আবেদন করেও কোনওরকম সাড়া পাননি। তাঁর বন্ধু অক্টোভিয়াস বীটাও এই ঘটনা সংবাদপত্রে প্রকাশ করতে চাইলেন না। শুধু তাই নয়, গুরুর সঙ্গে শিষ্যার একত্র ভ্রমণের সময়ে নিবেদিতার প্রত্যক্ষ অনুভূতিতে আসে গুরুর নিবিড় দেশপ্রেম। তিনি তাঁর আচার্যদেবের মুখে শুনেছেন, 'সবল দুর্বলের উপর অত্যাচার করলে, দুর্বলের কর্তব্য-ঐ সবলকে চেপে দেওয়ার চেষ্টা করা।' তিনি বারবারই আহ্বান জানিয়েছেন, 'একথা ভুলো না, বিদ্রোহে তোমার চির অধিকার।' ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে নিবেদিতা দেখেছেন তাঁর আচার্যদেব বিবেকানন্দ সবসময়ই চির পরাজিত যারা, তাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।
অন্যদিকে নিবেদিতা দেখলেন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর বিজ্ঞান সাধনার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ রাজকর্মচারীদের অমূলক বাধাদানের ঘটনা। এই ধরনের ঘটনাপ্রবাহে নিবেদিতার মধ্যে পুরাতন স্বদেশপ্রেম অর্থাৎ 'ইংরেজ রমণী' হিসাবে তাঁর ইংল্যান্ডপ্রীতি প্রায় ধূলিসাৎ হয়। তিনি নিজেই বললেন, 'ইংল্যান্ড নীচ কাজ করে যাবে এটা সহ্য করা যায় না।' সুস্পষ্টভাবে তিনি মিসেস ওলি বুলকে এক চিঠিতে জানালেন, 'আমি আমার দেশবাসীকে ঘৃণা করি। তারা এত নীচ। এক সময় স্বামীজীকে আমি বলেছিলাম, আমি কখনও ইংরেজের পতাকা অবনমিত করতে পারব না। তবে, এখন আমি আর ইংরেজের পতাকার সঙ্গে একাত্ম হতে পারব না। দেখতে পাচ্ছি, এদেশে ইংরেজের প্রতিপত্তির দিন এখনও শেষ হয়নি। সেইদিন কবে আসবে সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে তারই কামনা করছি। প্রার্থনা করি, পুনর্জন্ম নিয়ে আমি যেন আমাদের কাছ থেকে ভারতের স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়ার দিনটিতে ধ্বনি তুলতে পারি, জয় তরুণ ভারত! যেমন ধ্বনি তুলেছিল ইতালির-স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলিতে মাৎসিনীর পাশে দাঁড়িয়ে তরুণতম, ব্যগ্রতম, নবদলভুক্তরা।' এইভাবেই পরদেশের স্বাধীনতা হরণকারী ইংল্যান্ডের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র তাঁর কাছে স্পষ্টরূপে ধরা পড়ে।
যাই হোক, ১৮৯৬-এ যখন বিবেকানন্দ ফিরে এলেন লন্ডনে তখন নিবেদিতার মানসিকতার অনেক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। তিনি যেন প্রতীক্ষা করে আছেন কবে স্বামীজীর কাছে নিজেকে সমর্পিত করবেন। রেক্সহ্যামের খনি জীবনে শ্রমিকদের করুণ কাহিনী, দারিদ্র্যের জ্বালা, ছোট ছোট শিশুদের পুরোপুরি ফুটে উঠবার অধিকার, আর মনের বিকাশের স্বাতন্ত্র্য দেওয়ার অঙ্গীকারের কাহিনী তুলে ধরেন স্বামীজীর কাছে। বিবেকানন্দও বলে ওঠেন, 'আমাদের দেশের দীন দরিদ্র অভাগা ছেলেরা, ঘোর অন্ধকারে ওরা ডুবে রয়েছে। এমনি শোচনীয় ওদের অবস্থা যে ধনীর হাতের লাঞ্ছনা ভুগতে ওদের জন্ম, এই ওদের ধারণা। ব্যক্তিত্ববোধ জিনিসটা ওদের নাই বললেই চলে।' বিবেকানন্দ বললেন শিক্ষা চাই- 'গরীবের ছেলেরা যদি স্কুলে না আসতে পারে তাহলে স্কুলই যাবে তাদের কাছে- মাঠে-কারখানায় সর্বত্র।' নিবেদিতার স্কুল দেখে তাই বিবেকানন্দ মুগ্ধ হয়েছিলেন।

আবার অন্যদিকে তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিবেদিতা যখন সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন করতে চেয়েছেন, তখন কিছুটা বিস্মিত হয়েছিলেন বিবেকানন্দ। নিবেদিতার ভারতে আসার মানসিক প্রস্তুতি সম্পর্কে তিনি তখনও অবহিত ছিলেন না। কিছু সময় চুপ করে থেকে বিবেকানন্দ যে কথা কয়টি বলেছিলেন তা নিবেদিতাকেও স্পর্শ করে। স্পর্শ করে বিবেকানন্দের অকৃত্রিম স্বদেশপ্রেম। তিনি বলেছিলেন, 'আমার কথা বলতে গেলে, স্বদেশবাসীর উন্নতিকল্পে যে কাজে নিজেকে নিযুক্ত করেছি, তা সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজন হলে এদেশে দু'শ বার জন্মগ্রহণ করতে রাজী আছি।' মিস ম্যাকলাউডকে একপত্রে নিবেদিতা বিবেকানন্দ সম্পর্কে গভীর শ্রদ্ধায় বলেছিলেন, 'স্বামীজী অতীতের লুথার বা মহম্মদের মত। জাতীয় হ্যনির্মাণে তাঁর বিশ্বাস রূপ নেবে। সর্ব মত ও জাতির ত্রিশ কোটি নর-নারীর জীবনের উপরই তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হবে। সেই মন্দিরভবন নির্মাণে আমি যেন একটা ইটেরও যোগ্য হই।'
একদিনের কথপোকথনের সময় বিবেকানন্দ নিবেদিতাকে আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন- 'স্বদেশে স্ত্রীশিক্ষার একটা পরিকল্পনা করেছি, মনে হয় তোমার কাছ থেকে সাহায্য পাব।' সেদিনের সেই আলোচনা প্রসঙ্গে বিবেকানন্দ তাঁর এক বোনের শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে আত্মহত্যার কাহিনী শুনিয়েছিলেন। বেদনাহত বিবেকানন্দ আহ্বান করেছিলেন, 'ভারতবর্ষের হাজার হাজার মেয়ে প্রতীক্ষা করে আছে পশ্চিমের একটি মেয়ে যদি পাশে দাঁড়িয়ে তাদের জন্য যোঝে, তাদের পথ দেখিয়ে দেয়, তারা মাথা তুলে সাড়া দেবে।' এই আহ্বান নিবেদিতার মন ছুঁয়ে গিয়েছিল সেদিন। 'ভারতী' সম্পাদিকা শ্রীমতী সরলা ঘোষালকে লিখিত এক চিঠিতে পাওয়া যায়, যেখানে বিবেকানন্দ বলছেন, 'কেবল শিক্ষা, শিক্ষা, শিক্ষা। জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষা প্রচার এবং ওই উদ্দেশ্যে ভারতের প্রধান শহরগুলিতে কেন্দ্র স্থাপন পুরুষদের জন্য নয়- নারীদের জন্যও অনুরূপ ব্যবস্থার প্রয়োজন।' আবার এই চিঠিতেই তাঁর আক্ষেপ! -'মৈত্রেয়ী, খনা, লীলাবতী, সাবিত্রী ও উভয়ভারতীর জন্মভূমিতে কি আর কোনও নারীর এই সাহস হবে না?' এখানে বিবেকানন্দের দৃষ্টি এদেশের প্রাচীন ঐতিহ্যের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। স্বদেশপ্রেমের সঙ্গে প্রাচীন গৌরবের এক অনন্য সংযোগ বিবেকানন্দের মধ্যে আমরা দেখতে পাই। কেবল নিবেদিতার মানসিকতা, নিষ্ঠা, ত্যাগের মনোভাবকে তিনি শ্রদ্ধা করতেন। নিবেদিতাকে তিনি আলমোড়া থেকে লিখলেন, 'তোমার প্রত্যেকটি কথার দাম আছে আমার কাছে। আমায় নিয়ে যত উৎসবই হোক, ভারতবর্ষ থেকে কোনও সাহায্য পাওয়ার আশা রাখি না। বড় গরীব এরা।' নিবেদিতার কাছে প্রত্যাশা ছিল বলেই অন্যান্য পশ্চিমী শিষ্য-শিষ্যাদের থেকে একটা ভিন্নতর সুর থাকত নিবেদিতার কাছে লেখা চিঠিতে। এক চিঠিতে নিজের মনোভাব ব্যক্ত করে তিনি এমনও লিখেছিলেন, 'এক একটা সময় আসে যখন মানুষের মন একেবারে ভেঙে পড়ে বিশেষত একটা আদর্শের পিছনে সারা জীবন খেটে তাকে অংশত সার্থক করবার ক্ষীণ আশার মুখে হঠাৎ যদি আকাশ ভেঙে পড়ে। মুশকিল হল টাকার অভাব।' নিবেদিতা তার জন্য প্রবল চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। সেই সময় লন্ডনের সংবাদপত্রে রিপোর্ট প্রকাশিত হল- 'এক অভিনব ধর্ম প্রতিষ্ঠান খ্রীষ্টান, মুসলমান ও হিন্দুর সমবায়ে গড়া এমন সংঘ বুদ্ধের পর থেকে আর হয় নি। মুক্তহস্তে দান করুন আপনারা।' এই সময় নিবেদিতার ইচ্ছা থাকলেও বিবেকানন্দ তাঁকে নির্দেশ পাঠালেন, 'ভারতবর্ষে না এসে লন্ডনে থাকলে তুমি আমাদের হয়ে অনেক বেশি কাজ করতে পারবে।' কিন্তু নিবেদিতা চাইছেন ভারতবর্ষে আসতে। তিনি স্পষ্ট করে জানতে চাইলেন, 'আমি কি ভারতবর্ষের কোন কাজে লাগব? আমি ওখানে যেতে চাই। কেমন করে নিজেকে ভরিয়ে তুলতে হয় ভারতের কাজে সেই শিক্ষাই পেতে চাই।'
বিবেকানন্দ লিখলেন, 'ভারতবর্ষের জন্য যে বিরাট কাজ তুমি করবে তার সম্ভাবনা সম্পর্কে আমি নিঃসংশয়। ভারতবর্ষ আজও মহীয়সী নারী সৃষ্টি করতে পারেনি। তোমার শিক্ষা, আন্তরিকতা, পবিত্রতা, বিপুল মানবপ্রেম, সংকল্পের দৃঢ়তা সবচেয়ে বড় কথা তোমার কেল্টিক রক্তের তেজই তোমাকে উপযুক্ত নারীরূপে গঠন করেছে।' তবু তিনি নিবেদিতার সামনে ভারতবর্ষের বাস্তব অবস্থাকে তুলে ধরে বললেন, 'ভাববার আছে অনেক কিছু। এখানে এলে যে দারিদ্র্য, কুসংস্কার আর দাস মনোবৃত্তি দেখতে পাবে ওখানে তা কল্পনাতেও আনতে পারবে না। ঝাঁপিয়ে পড়বার আগে অবশ্যই ভাল করে ভেবে দেখবে।' শুধু তাই নয় এও বললেন, 'তুমি এদেশের কাজ করতে পার বা না পার, বৈদান্তিক হতে পার বা নাই পার, আমরণ তোমার পাশে থাকব। 'মরদ কী বাত হাতী কী দাঁত'-একটা কথা আছে। আমি তোমার পাশে থাকব। তবে একটু সাবধান করে দিই, তোমাকে তোমার নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।' আহ্বান জানালেন, 'সব কিছু সত্ত্বেও যদি তুমি কর্মে প্রবৃত্ত হতে সাহস কর, তাহলে তোমাকে স্বাগত সম্ভাষণ জানাচ্ছি।' পরে আবার লিখে পাঠালেন, 'মানুষের প্রাণ ঢালা ভালবাসা যত পাই তত ভাল, নইলে কাজ চলবেই না। কিন্তু আমাকে থাকতে হবে সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক। ... অত্যন্ত গভীরভাবে কাউকে ভালবাসতে পারি। কিন্তু যদি দরকার হয়, 'বহুজন হিতায় বহুজন সুখায়' নিজের হৃৎপিণ্ড নিজের হাতে উপড়ে ফেলার শক্তি রাখি। পাগলের মত ভালবাসা, কিন্তু কোন বন্ধন থাকবে না।'
বিবেকানন্দের সংস্পর্শে এসে তাঁর চরিত্রের মহত্ত্বকে নিবেদিতা উপলব্ধি করেছেন। সেই প্রভাব ফুটে ওঠে তাঁর চিঠিতে। তিনি লিখছেন, 'স্বামীজীর চরিত্রের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল। তাঁর কাছে যাঁরা থাকতেন তাঁদের সকলকে তিনি বড় করে তুলতেন। তাঁর সান্নিধ্যে মানুষ যেমন তাঁর জীবনের অনভিব্যক্ত মহৎ উদ্দেশ্যকে স্পষ্টভাবে দেখতে পেত এবং তাকে ভালবাসতে শিখত তেমনি দোষত্রুটিগুলির কালিমা অনেকটাই মুছে যেত।' নিবেদিতার শ্রদ্ধাবোধের মূলে ছিল বিবেকানন্দের চরিত্রের এই অনির্বচনীয় গুণটি। তিনি এও অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করেছিলেন, 'ব্যক্তিগত ব্যাপারে স্বামীজীর নির্ভীক উপদেশ ছিল, ব্যক্তিত্বের সীমাকে অতিক্রম করতে হবে। নৈর্ব্যক্তিক অবস্থা লাভই হবে তোমার লক্ষ্য।'
এই প্রেক্ষাপটেই নিবেদিতা এলেন ভারতবর্ষে। নিবেদিতার প্রতি মা মেরীর স্নেহের দুর্নিবার আকর্ষণ থাকলেও এই ভারতযাত্রায় কোন বিরোধিতা করেন নি। তিনি তাঁর প্রয়াত স্বামীর অন্তিম অনুরোধকেই সেদিন স্মরণ করেছিলেন- 'যেদিন মার্গারেটের (নিবেদিতার) আহ্বান আসবে মেরী যেন তাঁকে সাহায্য করেন'। নিবেদিতার অন্যতম বন্ধু মির হ্যামন্ড বললেন, 'তিনি আইরিশ জাতির উত্তরাধিকার লাভে গর্বিত, আবার আবেগ ও উৎসাহে পূর্ণ। ব্যক্তিত্বের মাধুর্য্য, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব প্রভৃতি কেল্টিক জাতির শ্রেষ্ঠ গুণগুলির যেন প্রতিমূর্তি। আর এ সবই তিনি মণিময় দ্বীপ আয়ারল্যান্ড থেকে ইংল্যান্ড এবং সেখান থেকে তাঁর নবলব্ধ মাতৃভূমি ভারতবর্ষে বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন।' সত্যিসত্যিই ভারতভূমি নিবেদিতার কর্মসাধনায় হয়ে উঠেছিল তাঁর মাতৃভূমি।...

।। বিবেকানন্দ সম্পর্কে নিবেদিতার উপলব্ধির সামগ্রিক দিকটি চর্চিত হয়েছে খুবই কম ।।

নিবেদিতা যে বিবেকানন্দকে আচার্যদেব হিসাবে গ্রহণ করেই জীবনের যাত্রাপথে চলেছেন, সেই বিবেকানন্দ সম্পর্কে তাঁর সম্যক ধারণার চর্চা হয়েছে অপেক্ষাকৃতভাবে অনেক কম। এ কথা সত্য যে, বিবেকানন্দের অধ্যাত্মবাদী চিন্তার প্রভাবে নিবেদিতা প্রভাবান্বিত ছিলেন। তবু একথাও মনে রাখা দরকার এটাই সব নয়। আমাদের দেশে এ প্রসঙ্গে ধর্ম, উপাসনা সংক্রান্ত বিষয় নিয়েই চর্চা হয়েছে বেশি। অথচ নিবেদিতা বলেছেন, 'পাশ্চাত্যে আমাদের কাছে স্বামীজী শুধু ধর্মাচার্যরূপেই প্রকাশিত হয়েছিলেন। ত্যাগ, মুক্তিপিপাসা, অগ্নিতুল্য পবিত্রতা, নিরাকারে সাকারের পর্যবেক্ষণ- এইগুলিই ছিল আলোচনার বিষয়। একথা সত্য সেখানে চকিতের ন্যায় এক আধবার আমরা তাঁকে মহাদেশপ্রেমিকরূপে দেখেছি। তবু সেখানে তিনি ছিলেন হিন্দুধর্মের প্রচারক। কিন্তু আমার ভারতে পদার্পণের মুহূর্ত থেকেই এইসবের অন্তরালে নিহিত সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটা বস্তুকে দেখতে পেলাম। ধর্মাচার্য হিসাবে স্বামীজী গৌরবোজ্জ্বল অনাবিলতা ও শিশুসুলভশান্তির দ্বারা পরিবৃত থাকলেও, স্বদেশে এসে সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম, তিনি সম্পূর্ণ মানবভাবাপন্ন।' বিবেকানন্দের এই চরিত্রটিকে উপস্থাপিত করে নিবেদিতা আরও বলেছেন, 'সর্পিল কুণ্ডলীর বেড়গুলি যেমন ঘুরে ঘুরে ছোট হ'তে হ'তে অবশেষে একটা বিন্দুতে পর্যবসিত হয়, স্বামীজীর স্বদেশভক্তির আবেগও ছিল সেই ধরনের এক মহৎ বস্তু। আলোচনার সময় কতবারই মনে হয়েছে, তাঁর সন্ন্যাসীর পরিচ্ছদ খসে পড়েছে এবং ভেতরের যোদ্ধার বর্ম প্রকাশ হয়ে পড়ছে।'

যখন বিবেকানন্দ দেশের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত তাঁর কর্মসাধনায় ব্যাপৃত- যখন প্রতিদিন খুব সকালে উঠে সকলকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন, সম্মিলিতভাবে কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন- তখনও চলত স্তবপাঠ ও ভজনসাধনা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই স্তবপাঠ আর ভজনের মধ্যেও প্রায়শই চলে আসত ইতিহাস প্রসঙ্গ। নিবেদিতা বলেছেন, 'কখনও ইগ্নেশিয়াস লায়োলার গল্প, কখনও জোয়ান অফ আর্ক, আবার কখনও ঝান্সীর রাণীর গল্প হত। কখনও স্বামীজী কার্লাইলের 'ফরাসী রাষ্ট্র বিপ্লব' থেকে দীর্ঘ আবৃত্তি করতেন। স্বপ্নাবিষ্টের মত বলে উঠতেন, 'সাধারণতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক।' বিবেকানন্দ সম্পর্কে এই অনুভূতি নিবেদিতার জীবনের অসংখ্য পত্রে, লেখায় প্রকাশিত।
ধর্মাচারণের সঙ্গে বিবেকানন্দের প্রকৃতিতে ছিল দেশের প্রতি ভালবাসা এবং দারিদ্র্যক্লিষ্ট অগণিত মানুষের দুর্গতির জন্য ক্ষোভ। স্বামীজী বলেছিলেন, 'এদেশের দরিদ্রদের কথা কেউ চিন্তা করে না। তারাই জাতির মেরুদণ্ড, তাদের শ্রমেই খাদ্য উৎপন্ন হয়। কিন্তু তাদের প্রতি সহানুভূতি জানাবার কেউ নেই, তাদের দুঃখে সান্ত্বনা দেবার লোকও নেই।' নিবেদিতা এ প্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন, 'স্বামীজী নিজেই কখনও কখনও চিন্তা করতেন কীভাবে এই দু'এর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করবেন'। নিবেদিতা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে একথা বলেছেন যে, 'তাঁর আরাধ্য দেবতা ছিলেন জননী-জন্মভূমি। ভারতের চিন্তা তাঁর কাছে ছিল শ্বাস-প্রশ্বাস স্বরূপ। জন্মভূমি সংক্রান্ত সকল ব্যাপারেই তাঁর হৃদয় ঝংকৃত হয়ে উঠত। তিনি বলতেন, তাঁর কাজ হল মানুষ তৈরি করা। এইটুকুই নয়, ভারতবর্ষের চতুর্দিকের মধ্যে উত্থিত যে কোন আর্ত ধবনি বা কাতর আবেদন তাঁর হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হত।'
স্বামী বিবেকানন্দের জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাঁর বিশ্লেষণধর্মী দিকটিও সকলে তেমন গুরুত্ব সহকারে হয়ত লক্ষ্য করেননি। তিনি বলছেন, 'স্বামীজীর জীবন গঠনের মূলে ছিল ত্রিবিধ প্রভাব। প্রথমত, তাঁর ইংরাজী ও সংস্কৃত সাহিত্যে শিক্ষালাভ। দ্বিতীয়ত, সমস্ত শাস্ত্র যে জীবনকে একবাক্যে আদর্শ বলে ঘোষণা করে সেই জীবনের উদাহরণ ও প্রমাণস্বরূপ রামকৃষ্ণের চরিত্র এবং তৃতীয়ত, বিপুল প্রাণধর্মী অধ্যাত্মশরীরের অঙ্গরূপে ভারত ও ভারতবাসী সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ জ্ঞান।' বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা সম্পর্কে বলতে গিয়েও একই কথা বলেছেন-'এই তিনটি সুর, শাস্ত্র, গুরু ও মাতৃভূমি একত্রে মিলিত হয়ে সৃষ্টি করেছে তাঁর রচনাবলীর মহান সঙ্গীত।' বিবেকানন্দের জন্মের সার্ধশতবর্ষে এবং নিবেদিতার প্রয়াণের শতবর্ষে এই বিষয়গুলির যথাযথ আলোচনা খুবই জরুরি। ভগবদ্ ভক্তির এই ভারতভূমিতে অধ্যাত্মসাধনার দিকটির প্রাবল্য আজও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশের যুগেও কখনও পরোক্ষে ফল্গুধারার মত আবার কখনও বা প্রত্যক্ষভাবে বিরাজমান। নিবেদিতা যেমন তাঁর এই আচার্যদেব সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন যে, 'আমি বিশ্বাস করি জড়বস্তুর ন্যায় কোনও অভিজ্ঞতাও কতকগুলি সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীন' বা বলেছেন যে, 'স্বদেশের জনগণকে ইউরোপীয় প্রভাব যা কিছু দিতে পারে তা তিনি আত্মীকরণ করেছেন'- এই প্রসঙ্গের অবতারণা এবং তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বিশ্লেষণে ঔদাসীন্য বা অনীহা আমাদের পথ দেখাবে না বা তার যথার্থ কার্যকারিতাকে তুলে ধরতে পারবে না। সেক্ষেত্রে আমাদের অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন যথাযথ হবে না।

।। এদেশে বিবেকানন্দের অভ্যুত্থানের পটভূমি ।।

প্রকৃতপক্ষে বিবেকানন্দের অভ্যুত্থান ঘটেছে এদেশে এমন একটা সময়ে যখন বণিকী পুঁজি এবং ব্রিটিশের সাথে গাঁটছড়া বাঁধা দালাল পুঁজি শিল্পে বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে 'জাতীয় পুঁজি' একটু একটু করে গড়ে উঠেছে। আর তারই উপরিকাঠামো হিসেবে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও বিকাশ। নবজাগরণের সূচনার পর্বে আমরা পাই রামমোহনকে। পরে বিদ্যাসাগর। যাঁর মধ্য দিয়ে নবজাগরণের বলিষ্ঠ ভাবনা ধারণা অর্থাৎ ধর্ম নিস্পৃহ মানবতাবাদ প্রতিফলিত হয়েছে। আর ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পাদে এসে দেখা গেল একদিকে এদেশে জাতীয় পুঁজি ও জাতীয়তাবাদের সূচনা আর অন্যদিকে গোটা বিশ্বে মানবতাবাদের বলিষ্ঠরূপের পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এই যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্যকে এঙ্গেলস দেখালেন এই বলে যে, 'The people must be kept in order by moral means and the first and foremost of all moral means of action upon the masses is and remains religion. Hence the increasing of Self Taxation of the bourgeoise for the support of all sorts of revivalism, from ritualism to Salvation Army.' প্রথম যুগের বলিষ্ঠতা হারিয়ে প্রতিটি সংগ্রামে সে আপসকামী।
এই পরিস্থিতে বিদ্যাসাগরের কার্যকালকে অতিক্রম করে বিবেকানন্দ এলেন। বিদ্যাসাগরের চরিত্রের বহু মানবতাবাদী মহৎ গুণ বিবেকানন্দের চরিত্রের মধ্যেও প্রতিফলিত। বিশেষ করে মানুষের প্রতি, নিপীড়িত মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালবাসা। ধর্মের আড়ম্বর, ধর্মের সাধনা-ভজনা সেখানে অনেক সময়েই পেছনে চলে গিয়েছে। এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি নিবেদিতা এখানে এসে লক্ষ্য করতে পেরেছিলেন। পশ্চিমে অবস্থানের সময় তা সম্ভব হয়নি। উচ্চশ্রেণীর লোকজনদের দ্বারা অভিহিত ঋকবেদের 'দেবী সুক্ত' প্রসঙ্গে তাই বিবেকানন্দ ধর্মীয় প্রবক্তা হওয়া সত্ত্বেও বলেছিলেন, 'যে দেশের লক্ষ লক্ষ লোক মহুয়া ফুলের রস খেয়ে জীবন ধারণ করে সেখানে এ কি ধর্ম, না শয়তানের তাণ্ডব নৃত্য?' তিনি আরও বলেছিলেন, 'যে ধর্ম গরীবের দুঃখ দূর করে না, মানুষকে মানুষ করে না, তা কি আবার ধর্ম?'
আমরা জানি ধর্মীয় আরাধনায় বিবেকানন্দ সবসময় বিভোর থাকতেন না। এদেশের অশেষ প্রবঞ্চিত মানুষের জীবনের যন্ত্রণা তাঁকে অস্থির করে তুলত। বিবেকানন্দ বার বার এই প্রশ্নকে উত্থাপন করেছেন, 'ভারতের চিরপতিত বিশকোটি নরনারীর জন্য কার হৃদয় কাঁদছে? তারা অন্ধকার থেকে আলোয় আসতে পারছে না। কে তাদের কাছে আলো নিয়ে যাবে?'
এই আবেদনই প্রতিফলিত তাঁর জ্বলন্ত দেশপ্রেম, মানবপ্রেম। আবার এও মনে রাখতে হবে, হিন্দুধর্মের পুনরুত্থানের পথেই সেই মানবপ্রেম এবং স্বদেশপ্রেম রূপ পরিগ্রহ করেছে। এই প্রসঙ্গে মার্কসবাদী চিন্তানায়ক শিবদাস ঘোষের একটি শিক্ষা প্রণিধানযোগ্য। এদেশের নবজাগরণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন যে, রামমোহনের ধর্মীয় সংস্কারের পথে নবজাগরণের সূচনার পর বিদ্যাসাগরের বলিষ্ঠ মানবতাবাদী যুগকে অতিক্রম করে নবজাগরণের আন্দোলন আবার ধর্মীয় সংস্কারের পথে এগিয়েছে। ব্রাহ্মধর্মের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে হিন্দুসমাজকে সংস্কারমুক্ত করার জন্য। অন্যদিকে এই সময়ে হিন্দুধর্মের পুনরুজ্জীবনের ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। শিবদাস ঘোষ গভীর প্রজ্ঞায় এই ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, 'হিন্দুধর্মের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার ভিত্তিতেই হিন্দুসমাজকে জাতপাত ও কলুষতা থেকে মুক্ত করার জন্য হিন্দুধর্ম সংস্কারকরা এলেন এবং এই পর্বেই রামকৃষ্ণের আবির্ভাব। বিবেকানন্দ এই হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনের একটি বিষ্ময়কর সৃষ্টি। তিনি রেনেসাঁসের আন্দোলনকে শুধু ধর্মীয় সংস্কারের গণ্ডীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলেন না। তিনি উপাসনা ও সাধনার পরিবর্তে কর্মযোগের উপর জোর দিলেন এবং সারা দেশে এক প্রবল জাত্যভিমানের জন্ম দিলেন, তা দিলেন বেদান্ত ও ভারতীয় অতীত আধ্যাত্মিক গর্বের ভিত্তিতে।'
ধর্ম ও অধ্যাত্মবাদের সঙ্গে বিবেকানন্দের মধ্যে এই প্রবল জাত্যভিমানের জন্যই স্বজাতীয়দের কাছে ছিল বিবেকানন্দের উদাত্ত আহ্বান 'হে ভারত, এই পরাণুবাদ, পরাণুকরণ, পরমুখাপেক্ষা এই ঘৃণিত জঘন্য নিষ্ঠুরতা এই দিয়ে তুমি উচ্চ অধিকার লাভ করবে? এই দাস সুলভ দুর্বলতা, এই লজ্জাকর কাপুরুষতা দিয়ে তুমি স্বাধীনতা লাভ করবে?' বিবেকানন্দের এই দিকটি নিবেদিতা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। নিবেদিতা তাই যথার্থই বলেছিলেন, 'এই উপলব্ধিই বিবেকানন্দকে চানন্দকে কর্মযোগের মহান প্রচারক করেছে। ভগবানের সাথে মিলবার জন্য তাঁর কাছে কারখানা, পড়াশুনো, ক্ষেতখামার, সাধুর কুটির ও মন্দিরের দরজার মতই সত্য এবং উপযুক্ত। তাঁর কাছে মানবসেবা ও ঈশ্বরের উপাসনায়, পৌরুষ ও বিশ্বাসে সদাচার ও আধ্যাত্মিকতায় কোন ভেদাভেদ নেই'।

।। ধর্মীয় প্রবক্তা হলেও দেশপ্রেমে জারিত বিবেকানন্দের তেজোদ্দীপ্ত আহ্বান
স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রভাবিত করেছিল ।।

বস্তুত, স্বামীজীর এই আহ্বান শুনলে পরবর্তীকালে কবি নজরুলের একটি কবিতা মনে পড়ে 'ঝুট শাসনে করতে শাসন, শ্বাস যদি হয় শেষও, কে আছ বীর এসো।' সেই বীর কোথায়? বিবেকানন্দের কথায় যে বলতে পারবে- 'আমার কাপুরুষতা দূর কর, আমায় মানুষ কর।' বিবেকানন্দ সম্পর্কে বলতে গিয়ে নজরুল একসময় বলেছিলেন, 'সেনাপতি কোথায়? সে পুরুষ বিবেকানন্দ, সে সেনাপতির পৌরুষ হুঙ্কার গর্জে উঠেছিল বিবেকানন্দের কণ্ঠে।' যথার্থই আমাদের দেশে নবজাগরণের ইতিহাসে বিবেকানন্দের যে ভূমিকা স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছিল, কবির কথাতে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিবেকানন্দ এদেশে জাতীয় সম্মানবোধের জন্ম দিয়েছেন এবং অবশ্যই তা দিয়েছেন হিন্দুধর্মের ভিত্তিতে। যার জন্য পরবর্তীকালে যে স্বাধীনতা আন্দোলন দেশ জুড়ে বিস্তৃতিলাভ করল, তা হিন্দু ধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি। তার ফলশ্রুতিতে আমাদের দেশে জাতিগঠনের প্রক্রিয়াতে সীমাবদ্ধতা থেকে গেল। আমরা জাত-পাত-ধর্ম-বর্ণ-প্রাদেশিকতার বিভেদ থেকে মুক্ত হতে পারিনি। এর বিষময় প্রভাব আমরা এই স্বাধীন ভারতবর্ষে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি। সেটি অন্য আলোচনা। কিন্তু একথা স্বীকার করতেই হবে সেদিন দেবসাধনার চেয়ে দেশসাধনা বিবেকানন্দের চিন্তায় গুরুত্ব পেয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। ধর্মীয় প্রভাব থেকে মুক্ত না হলেও বা হিন্দুধর্মের সীমার মধ্যে সীমায়িত হলেও বিপ্লবীরা বিশেষ করে বাংলার বিপ্লবীরা বিবেকানন্দের চরিত্রের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন এবং অনুপ্রাণিত হয়েছেন। রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের একটা কথা ছিল। বলতেন, 'জন্মেছ যখন একটা দাগ রেখে যেও- তুমি যে এ ধরার ধূলিতে এসেছিলে, ধরার ধূলি যে তোমার চরণ স্পর্শ করেছে তার একটা দাগ তুমি রেখে যেও।' এই কথাগুলি অনুরণিত হত স্বাধীনতা সংগ্রামের অমর বিপ্লবী যোদ্ধাদের মনে। সেই অমিত তেজে উদ্দীপ্ত বিপ্লবীরা আমাদের দেশের জনমানসে সত্যিই আঁচড় কেটে গিয়েছিলেন। সে দাগ বীরত্বের, মনুষ্যত্বের। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু বলছেন, 'আদর্শের সন্ধান দিলেন বিবেকানন্দ। মানবজাতির সেবা বলতে বিবেকানন্দ স্বদেশের সেবাও বুঝেছিলেন'। তাঁর প্রধান শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতা বলেছেন, 'The queen of his adoration was his Motherland' অর্থাৎ তাঁর আরাধনার দেবতা ছিল তাঁর মাতৃভূমি। দেশের এমন কোন আন্দোলন ছিল না যা তাঁর মনে সাড়া জাগায়নি।' গভীর শ্রদ্ধায় বলেছেন, 'বিবেকানন্দ সম্পর্কে বলতে গেলেই আমি আত্মহারা হয়ে যাই। আপনারা যাকে ভণ্ডামি বলতে পারেন স্বামীজীর মধ্যে তার বিন্দুমাত্র আভাসও ছিল না। তাঁর চোখে এসব অসহ্য বোধ হত। বকধার্মিকদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলতেন, 'Salvation will come through football and not through Gita."
(এর পর দ্বিতীয় অংশ দেখুন)

আপনার মতামত অন্যান্য পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করুন
মতামত দিন
মতামতসমূহ
কোনো মতামত নেই

পথিকৃৎ

আমাদের পত্রিকা ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত থাকুন এবং সর্বশেষ খবর ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট নিয়মিত পান

যোগাযোগ

পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২

দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com

গুরুত্বপূর্ণ লিংকসমূহ

© Pathikrit. All Rights Reserved. Designed By GenxByte