'মেঘনাদবধ কাব্য' উৎসর্গ করতে গিয়ে কবি বলেছিলেন, "যখন আমি 'তিলোত্তমাসম্ভব' নামক কাব্য প্রথম প্রচার করি, তখন আমার এমন প্রত্যাশা ছিল না যে, এ অমিত্রাক্ষর ছন্দ এ দেশে ত্বরায় আদরনীয় হইয়া উঠিবেক, কিন্তু এখন সে বিষয়ে আমার আর কোন সংশয়ই নাই। এ বীজ অবসরকালেই সৎক্ষেত্রে সংরোপিত হইয়াছে। বীর কেশরী মেঘনাদ সুরসুন্দরী তিলোত্তমার ন্যায় পণ্ডিতমণ্ডলীর মধ্যে সমাদৃত হইলে, আমি এ পরিশ্রম সফল বোধ করিব।" সফল যে কবি হয়েছিলেন, তা তো সত্য ইতিহাস। এই 'মেঘনাদবধ' কাব্যের প্রকাশ কাল ১৮৬১। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এই কাব্যগ্রন্থটির ভূমিকায় বলেছিলেন, "...মাইকেল মধুসুদন দত্তের আজ কি আনন্দ! ...অমিত্র ছন্দে কাব্য রচনা করিয়া কেহ যে এত অল্প কালের মধ্যে এই পয়ার-প্লাবিত দেশে এরূপ যশোলাভ করিবে, একথা কাহার মনে ছিল, কিন্তু বোধ হয় এক্ষণে সকলেই স্বীকার করিবেন যে, মাইকেল মধুসূদনের নাম সেই দুর্লভ যশঃ প্রভায় বঙ্গমণ্ডলীতে প্রদীপ্ত হইয়াছে ।.. এই গ্রন্থখানিতে গ্রন্থকর্তা যে অসামান্য কবিত্বশক্তির পরিচয় দিয়াছেন, তদ্দৃষ্টে বিস্ময়াপন্ন এবং চমৎকৃত হইতে হয়- সমস্ত বিবেচনা করিয়া দেখিলে বঙ্গভাষায় ইহার তুল্য দ্বিতীয় কাব্য দেখিতে পাওয়া যায় না।" এই ভূমিকায় তিনি আরও বলেছিলেন, "ইন্দ্রজিৎবধ এবং লক্ষ্মণের শক্তিশেল উপাখ্যান বারম্বার পাঠ ও শ্রবণ না করিয়াছেন, বোধ করি বঙ্গবাসী হিন্দু সন্তানের মধ্যে এমত কেহই নাই, কিন্তু আমি মুক্তকণ্ঠে কহিতে পারি যে, অভিনবকায়া সেই উপাখ্যানটিকে এই গ্রন্থে পাঠ করিতে করিতে চমৎকৃত এবং রোমাঞ্চিত না হন, এদেশে এমন হিন্দু সন্তানও কেহ নাই।" কিন্তু হায়রে দুর্ভাগা দেশ। সেদিনের সেই কথা আজ কতখানি মিথ্যা হয়ে উঠেছে। সেদিন ছিল সামন্ততান্ত্রিক অন্ধকার দূর করার মহান সংগ্রাম। আজ চতুর্দিকে প্রযুক্তির বর্ণচ্ছটা। কত আলোর চাকচিক্য! কিন্তু সংস্কৃতিতে আরও উন্নত হওয়ার পরিবর্তে ঘন তমসায় আচ্ছন্ন- যেন সেই 'বাংলার (তথা ভারতের) ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা'। তাই সেদিন মোবাইল ফোনের সংকীর্ণ পর্দায় ততোধিক সংকীর্ণ মনের বিষাক্ত নির্ঘোষ প্রত্যক্ষ করতে হ'ল। তাতে লেখা "এটা বাংলার কলঙ্ক মাইকেল মধুসূদন দত্তের ছবি। বিয়ে করার মতলবে হিন্দু ধর্ম ছেড়ে দিয়ে খ্রিস্টান হয়ে যান। মিশনারীদের হয়ে হিন্দু ধর্মের বদনাম করার জন্য ইনি 'মেঘনাদবধ' কাব্য রচনা করেন। যেখানে ভগবান রামচন্দ্রকে চণ্ডাল, অধম ইত্যাদি বলে অপমান করা হয়েছে। দেশদ্রোহী মাইকেল মধুসূদনের হিন্দু বিরোধী সমস্ত লেখা নিষিদ্ধ করতে হবে।"(১) ভাগ্য প্রসন্ন যে, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বেঁচে নেই। না হলে তিনিও দেশদ্রোহী হতেন এবং হয়তো বা কারাগারেই নিক্ষিপ্ত হতেন!
বিস্মিত, আহত ও ক্ষুব্ধ-মন আধুনিক কালের হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠ নায়ক বিবেকানন্দের শিক্ষাকে স্মরণ করেছে। মার্কসবাদী দার্শনিক শিবদাস ঘোষ এদেশে নবজাগরণের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে নবজাগরণের মহান চরিত্রগুলি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, বিবেকানন্দ এদেশে এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। তাঁর মধ্য দিয়ে জন্ম এদেশের জাত্যভিমানের। সেই প্রবল জাত্যাভিমান গড়ে উঠেছিল হিন্দু ধর্মকে ভিত্তি করে। তার কারণ ছিল এদেশের নবজাগরণের আন্দোলনের সময়কাল এবং বিশ্বপরিস্থিতির প্রেক্ষাপট- সাম্রাজ্যবাদের অভ্যুত্থান। এই বিশেষ পরিস্থিতিতে বিবেকানন্দের মধ্যে বাস্তবে সংমিশ্রণ ঘটেছিল রেনেসাঁস বা নবজাগরণের মানবতাবাদী চিন্তা এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য। সেই কারণে বিবেকানন্দ হিন্দু ধর্মের প্রবক্তা হয়েও বলেছিলেন, "রামায়ণের কথা ধরুন- অলঙ্ঘনীয় প্রামাণ্য গ্রন্থরূপে ওটিকে মানতে হলেই যে রামের মত কেউ কখনো যথার্থ ছিলেন স্বীকার করতে হবে, তা নয়।... রামায়ণে বর্ণিত দশমুখ রাবণের অস্তিত্ব, একমাথা যুক্ত রাক্ষস অবশ্যই ছিল- মানতেই হবে, এমন কী কথা আছে।"(২) অথচ যারা ওই মোবাইল ফোনে প্রচার করছেন, সেই উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা 'রামায়ণে'র রামের জন্মভূমির নাম করে কত প্রাণহানি ঘটিয়েছেন। দেশজুড়ে বইয়ে চলেছে আজও কত শোণিতধারা। আরও দুর্ভাগ্য সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় ইতিহাস, যুক্তির কোনও পরোয়া না করে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর বিশ্বাসকেই প্রতিষ্ঠা করেছে। দলিত-মথিত হয়েছে রেনেসাঁসের সিদ্ধান্ত- Reason should take the place of authority। স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে কবিগুরুর দিক নির্দেশ-
"...সেই সত্য যা রচিবে তুমি,
ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি
রামের জনমস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।(৩)
নবজাগরণের শিক্ষাগুলি আজ আমরা রক্ষা করতে পারছি না। তাকে অতিক্রম করে নতুন সংস্কৃতি ও নতুন মূল্যবোধের আলোয় আলোকিত হওয়া তো দূরের কথা। সামন্ততন্ত্রের শাসনকালের ধর্মীয় অন্ধতা, গোঁড়ামি, জাতপাত-ধর্ম-বর্ণ বিভেদের জাল ছিন্ন করে মানুষ-এর একমাত্র পরিচয় হল সে মানুষ, আর কোনো পরিচয় তার নেই। স্লোগান উঠেছিল সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার। ব্যক্তির স্বাধীনতা, স্বতন্ত্রতা, অধিকার নারীমুক্তি, যুক্তির শাসন- এই ছিল রেনেসাঁসের বলিষ্ঠ চিন্তা। উইল ডুরান্ট তাঁর রেনেসাঁস গ্রন্থে বলেছেন, "বুদ্ধিগত মুক্তি ও নীতিগত মুক্তির সমন্বয়ে জন্ম হ'ল রেনেসাঁস মানবের।... সে তীক্ষ্ণমনা, সজাগ, বহুমুখী, প্রতিটি ভাব ও impresson-এর জন্য মন খোলা, সৌন্দর্যে মুগ্ধ... সর্বদাই সচল চিত্ত... আকাঙ্ক্ষা তার বিশ্বমানব হওয়ার। ধারণায় সাহসী, ধর্মে স্থিতধী, বক্তৃতায় নিপুণ, শিল্পে কুশলী, সাহিত্য ও দর্শনে আসক্ত।... তার লক্ষ্য ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ। ধর্মের আদর্শে কিংবা পরলোকের ভয়ে সে আদর্শচ্যুত হয়নি।"(৪) কবি মধুসূদনের ক্ষেত্রে ডুরান্টের এই কথাগুলি যেন প্রাণবন্ত রূপ পেয়েছে। সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি, নানান ক্ষমতায় অধিকারী, ভাব এবং প্রকাশভঙ্গিমায় উদাত্ত মন- সৌন্দর্যের বারি ধারায় মুগ্ধ এবং যশাকাঙ্ক্ষী। হোমার থেকে দান্তে মিল্টনের প্রতিভার আকর্ষণে আলোড়িত মধুসূদনের মননজগৎ। বিশ্ব সাহিত্যের তৎকালীন সৌন্দর্য্যকে উপলব্ধি করেছেন- মুগ্ধ হয়েছেন। প্রায় আটটি ভাষাতে কবির স্বচ্ছন্দ বিচরণ। রেনেসাঁসের বলিষ্ঠতার একটা রূপ। আমাদের দেশে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে এই চিন্তার প্রকাশ ঘটে। তারই একটা পর্যায়ে রামমোহনের মধ্য দিয়ে সেই নবজারণের একটা রূপ আমরা পাই। বেদান্তকে সংস্কারের মধ্য দিয়ে চিন্তা যুক্তিদা প্রয়োজনীয়তাকে মূল বিচার্য বিষয় ধরেই। এই ধারায় নানান চরিত্র সেদিন সৃষ্টি হয়েছিল। সকলের চিন্তা ঠিক একই না হলেও সমাজের অভ্যন্তরে কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছিল সেদিন। কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রামতনু লাহিড়ী, রসিককৃষ্ণ মল্লিক, প্যারীচাঁদ মিত্র, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখের কথা অবশ্যই উল্লেখ্য। তবে নবজাগরণের যে বলিষ্ঠ ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা তা জীবনে, চিন্তায় ও কর্মে পূর্বেকার চিন্তার ধারাবাহিকতার সাথে ছেদ ঘটিয়ে একটা পূর্ণ অবয়ব গ্রহণ করে বিদ্যাসাগরের মধ্য দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে সত্যিকারের 'মানুষ'- এই বলেই অভিহিত করেছিলেন। মাইকেলও একইভাবে বিদ্যাসাগরকে বলেছিলেন, first man among us. উনবিংশ শতকের নবজাগরণের বলিষ্ঠ চরিত্র বিদ্যাসাগরের পরে যে নামটি প্রবল ব্যক্তিত্বের জন্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে- তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তাঁর অসম্পূর্ণতা, সীমাবদ্ধতা, অস্থিরচিত্ততা প্রভৃতি সত্ত্বেও। তিনি রেনেসাঁসের কবি। পূর্বে উল্লেখিত গ্রন্থে শিশিরকুমার দাশ বলেছেন, "রামমোহনের ধর্ম আন্দোলন, সমাজ সংস্কার ও শিক্ষা আন্দোলন, সেইসঙ্গে দ্বারকানাথের সহযোগিতা, রাধাকান্ত দেবের প্রতিক্রিয়ার বলিষ্ঠ রূপ, বিদ্যাসাগরের সংগ্রামশীল চেতনা, দেবেন্দ্রনাথ ও অক্ষয়কুমারের দৃষ্টিগত ঐক্য ও বিরোধ সব মিলিয়ে দেখা যায় এ সময় যুক্তি ও মনীষার পথই প্রধান পথ। জাতির আত্ম-উপলব্ধির পথ এই জ্ঞান ও যুক্তির। আর দ্বিতীয়ার্ধে সৃষ্টিশীল অজস্র প্রতিভার আবির্ভাব- মধুসূদন যার সূচনা:..." ফলে একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, মাইকেল মধুসূদনের চরিত্রে রেনেসাঁসের যে চিন্তাগত আন্দোলন তারই একটি অভিব্যক্তি আমরা পাই।
এই প্রেক্ষিতেই 'মেঘনাদবধ' কাব্য সম্পর্কিত কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা। কবি এই কাব্যগ্রন্থে নিজেই বলেছিলেন,
"-তুমিও আইস, দেবি, তুমি মধুকরী
কল্পনা। কবির চিত্ত ফুলবন মধু
লয়ে রচ মধুচক্র, গৌড় জন যাহে
আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি।"
সফল তিনি হয়েছিলেন এক্ষেত্রে। রবীন্দ্রনাথ প্রথম জীবনে 'মেঘনাদবধ' কাব্যের প্রবল সমালোচনা করেছিলেন তাঁর 'মেঘনাদবধ' প্রবন্ধে। কিন্তু 'জীবনস্মৃতি'তে সেই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "ইতিপূর্বে আমি অল্প বয়সের স্পর্ধার বেগে মেঘনাদবধের একটি তীব্র সমালোচনা লিখেছিলাম। কাঁচা আমের রসটা অম্লরস- কাঁচা সমালোচনাও গালিগালাজ। অন্য ক্ষমতা যখন কম থাকে, খোঁচা দেওয়ার ক্ষমতাটা খুব তীক্ষ্ণ হইয়া উঠে। আমিও এই অমর কাব্যের উপর নখরাঘাত করিয়া নিজেকে অমর করিয়া তুলিবার সর্বাপেক্ষা সুলভ উপায় অন্বেষণ করিতেছিলাম। এই দাম্ভিক সমালোচনা দিয়া ভারতীতে প্রথম লেখা আরম্ভ করিলাম।" বঙ্কিমচন্দ্র ছন্দের বিষয়ে হেমচন্দ্রকে মাইকেলের উপরে স্থান দিয়েছেন এবং এমনও বলেছেন যে, 'তিনি দেশের প্রথা পরিত্যাগ করে ইউরোপীয় প্রথা অবলম্বন করার ফলে তাঁর নিজের কাব্যগুলির কাব্যশক্তির কিঞ্চিত হানি ঘটিয়েছেন।' কিন্তু তা সত্ত্বেও কবি হিসাবে মাইকেল মধুসূদনকে উচ্চাসনে বসিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "...এই প্রাচীন দেশে দুই সহস্র বৎসর মধ্যে কবি একা জয়দেব গোস্বামী। শ্রীহর্ষের কথা বিবাদের স্থল- নিশ্চয়স্থল হইলেও শ্রীহর্ষ বাঙ্গালী নহেন। জয়দেব গোস্বামীর পর শ্রীমধুসুদন।"(৫)
শুধু এইটুকুই নয়, রবীন্দ্রনাথ তাঁর পরিণত লেখনীতে আরও বলেছেন, "য়ুরোপের শক্তি তাহার বিচিত্র প্রহরণ ও অপূর্ব ঐশ্বর্যে পার্থিব মহিমার চূড়ার উপর দাঁড়াইয়া আজ আমাদের সম্মুখে আবির্ভূত হইয়াছে, তাহার বিদ্যুৎখচিত বজ্র আমাদের নতমস্তকের উপর দিয়া ঘন ঘন গর্জন করিতে করিতে চলিয়াছে; এই শক্তির স্তবগানের সঙ্গে আধুনিক রামায়ণ কথার একটি নূতন বাঁধা তার ভিতরে ভিতরে সুর মিলাইয়া দিল। একি কোনো ব্যক্তিবিশেষের খেয়ালে হইল? দেশ জুড়িয়া ইহার আয়োজন চলিয়াছে, দুর্বলের অভিমানবশত ইহাকে আমরা স্বীকার করিব না বলিয়াও পদে পদে স্বীকার করিতে বাধ্য হইতেছি- তাই রামায়ণ গান করিতে গিয়াও ইহার সুর, আমরা ঠেকাইতে পারি নাই।"(৬)
অথচ, বর্তমান সময়ের উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা যে আক্রমণ শাণিত করে চলেছে এবং তারই একটি প্রকাশ হিসাবে মাইকেল মধুসূদনকে দেশদ্রোহী বলেছে- যে কারণে তারা কবিকে এরূপ আক্রমণ করেছে তা কতখানি রবীন্দ্রচিন্তা-বিরোধী তার প্রমাণ এই প্রবন্ধেই আছে। রবীন্দ্রনাথ আরও বলেছেন, "মেঘনাদবধ কাব্যে, কেবল ছন্দোবন্ধে ও রচনা প্রণালীতে নহে, তাহার ভিতরকার ভাব ও রসের মধ্যে একটা অপূর্ব পরিবর্তন দেখিতে পাই। এ পরিবর্তন আত্মবিস্মৃত নহে। ইহার মধ্যে একটা বিদ্রোহ আছে। কবি পয়ারের বেড়ি ভাঙিয়াছেন এবং রাম-রাবণের সম্বন্ধে অনেক দিন হইতে আমাদের মনে যে একটা বাঁধাবাঁধি ভাব চলিয়া আসিয়াছে স্পর্ধাপূর্বক তাহারও শাসন ভাঙিয়াছেন। এই কাব্যে রাম-লক্ষ্মণের চেয়ে রাবণ-ইন্দ্রজিৎ বড়ো হইয়া উঠিয়াছে।"(৭)
বর্তমান হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরা যাই বলুন, মাইকেলের প্রতিভা চিনতে কিন্তু ভুল করেননি স্বামী বিবেকানন্দ। যে কাব্যের নায়ক রাবণ ও ইন্দ্রজিৎ- অপ্রধান চরিত্র রাম-লক্ষ্মণ, সেই কাব্যের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন তিনি। এই কাব্যের যে কোনও অংশ পাঠ করতে তিনি ভালোবাসতেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, "তোদের দেশে কেউ একটা কিছু নূতন করলেই তোরা তাকে তাড়া করিস। আগে ভালো করে দেখ, লোকটা কী বলছে। তা না, যাই কিছু আগেকার মত না হ'ল, অমনি দেশের লোক তার পিছু লাগল। এই 'মেঘনাদবধ কাব্য'- যা তোদের বাংলা ভাষার মুকুটমণি, তাকে অপদস্থ করতে কি না 'ছুঁচোবধ কাব্য' লেখা হল।(৮) বঙ্কিমচন্দ্র বললেন, "যদি কোন আধুনিক ঐশ্বর্য-গর্বিত ইউরোপীয় আমাদিগের জিজ্ঞাসা করেন, তোমাদের আবার ভরসা কি? বাঙ্গালীর মধ্যে মনুষ্য জন্মিয়াছে কে? আমরা বলিব, ধর্মোপদেশকের মধ্যে শ্রীচৈতন্যদেব, দার্শনিকদের মধ্যে রঘুনাথ, কবির মধ্যে শ্রীজয়দেব ও শ্রীমধুসূদন।(৯) মাইকেল মধুসূদন সম্পর্কে বাংলা সাহিত্যের এক প্রখ্যাত ইতিহাসকার শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় উচ্ছ্বাস সহকারে বলেছেন, "তিনি কলম্বাসের ন্যায় দুস্তর সমুদ্রপথ অতিক্রম করিয়া নূতন মহাদেশের আবিষ্কার না করিলে সেই নবাবিষ্কৃত ভূমিখণ্ডে নানা বিচিত্র ছাঁদের উপনিবেশ-পরম্পরা এত দ্রুত গতিতে গড়িয়া উঠিত না। বাংলা সাহিত্যে সেই আধুনিকতা-মহাদেশের আবিষ্কারকের জয়মাল্য চিরদিন তাঁহার কণ্ঠে অম্লান হইয়া থাকিবে।"(১০)
বাস্তবিক পক্ষে মাইকেল মধুসূদন ছিলেন রেনেসাঁসের চিন্তার মানুষ হিসাবে অসাম্প্রদায়িক। তাঁর খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ ধর্মের কারণে যে নয়, একথা বহু চর্চিত। নির্দিষ্ট কোনও ধর্মের প্রতি তাঁর পক্ষপাত ছিল না। হিন্দু কলেজে যখন তিনি ছিলেন একটি ইংরাজী প্রবন্ধে তিনি সমস্ত শ্রেণী, সম্প্রদায় ও ধর্মের মানুষের কাছে প্রকৃত শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, তা না করলে এ দেশ 'জাতপাতের এক বধ্যভূমি' হয়ে উঠবে। বর্তমানে তাই তো আমরা প্রত্যক্ষ করছি বেদনাবিদ্ধ হয়ে। 'হিন্দু ক্রনিকল' পত্রিকার ১৮৫৩ সালের ২ আগস্ট সংখ্যায় তাঁর একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল- 'মুসলমান ইন ইন্ডিয়া'। সেখানে সেই সম্প্রদায়ের ভালোকে ভালো মন্দকে মন্দ বলেই সমালোচনা করেছিলেন।(১১) নিজে তিনি খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছেন এ যেমন সত্য, তেমনি ধর্মান্তরিত করার ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগকে তিনি সমালোচনা করেছেন। শিক্ষাক্রমে বাইবেলের অন্তর্ভুক্তি তিনি সমর্থন করেন নি। মৃত্যু শয্যায় তিনি বলেছিলেন, "মানুষের তৈরী চার্চের আমি ধার ধারিনে।" ঘটনা প্রবাহ থেকে জানা যায়, খ্রিস্টান সমাজ মৃত্যুর পর তাঁকে মাত্র ছ'ফুট জায়গা ছেড়ে দিতেও রাজি হয় নি। লর্ড বিশপও তাঁকে সমাহিত করতে ছিলেন দ্বিধাগ্রস্ত।(১২)
ফলে, রেনেসাঁসের উন্নত চেতনাই তাঁর কাব্যে প্রতিফলিত হয়েছে। প্রচলিত ধারার বিরুদ্ধে তাঁর বিদ্রোহ। সাহিত্যের নানান পরিসরে তিনি বিচরণ করেছেন। মনে তীব্র আকাঙ্ক্ষা মহাকবি হওয়ার। আবার নিজের মধ্যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা যদি পূরিত না হয় তা নিয়ে দ্বন্দু। তাঁর এই দ্বন্দু পরিস্ফুট হয় তাঁরই উক্তিতে। তিনি বলেছেন- I sigh for Albion's distant shore! এটি যেন তাঁর সাহিত্যসাধনা বা কাব্যসাধনার মর্মকথা। একদিকে আকাঙ্ক্ষার দুর্নিবার তরঙ্গগতি, অন্যদিকে একটা 'আশার ছলনে ভুলি'র হাহাকার! অন্তিম সময়ে প্রশ্ন, 'আমি অমর হবত। এ কি আমাকে অমরত্ব দেবে না। মনে হচ্ছে, 'লিখিনু কি নাম মোর বিফলে যতনে।' অন্যদিকে বলেছেন, 'আমি চ্যালেঞ্জ করছি যাদের আমার দেশবাসী এতদিন ধরে পূজা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আমি বিদ্রোহ করেছি- তারা ভণ্ড, তারা পূজার অযোগ্য।" রাজনারায়ণ বসুকে এক পত্রে কবি লিখেছিলেন যে, তাঁর খুব ইচ্ছে হয় গ্রীক পুরাণের অসাধারণ সৌন্দর্যময় অংশগুলিকে আমাদেরই পৌরাণিক কাহিনীর জগতে নিয়ে এসে দৃঢ় ও গভীরভাবে রোপণ করবেন। এবং একথাও সত্য যে তিনি হিন্দু মুসলমান দুই ধর্মেরই কাহিনীকে তাঁর কাব্যের উপজীব্য বিষয় হিসাবে গ্রহণ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। Economic and Political review পত্রিকার ২০১৭ সালে মে মাসের এক বিশেষ প্রবন্ধে সজল নাগ তার উল্লেখ করে বলেছেন, "Madhusudan was aware of the liberties Madhusudan was aware of the im-plications of the liberties he took in interpreting the Hindu epics of his creations. He wrote, 'I must tell you, my dear fellow that though as a jolly Christian youth I don't care a pin's head for Hinduism, I love the grand mythology of our ancestors. It is full of poetry. A fellow with an inventive head can manufacture the most beau-tiful things out of it. Everything he wrote was devoid of traditional eulogies meant for god or goddess. What he spoke of was the struggle of a man pitched against divine power. Even when the battle was lost the poet's sympathies were with vanquished. Even then the voice did not rise to praise the gods." শুধু এইটুকুই নয়, সজল নাগ যথার্থই আরও উল্লেখ করেছেন যে "It is not just the Hindu mythology that attracted him in his cre-ation. He felt that the episode of Karbala is the history of Islam could form the theme of an-other magnificent epic. He wanted to write an epic on the theme of sita's swayambar from Ramayana. In fact Michael was the first mod-ern Bengali writer to have thought of using a Muslim source for their writing. His selection of Razia, the ruler during the Delhi Sultanate period, as subject for his writing was extremely unusual at that time. In fact in a letter to actor Keshav Ganguly he wrote'we ought to take up Indo-Musalman subjects. The mahammedans are a fierce race then ourselves and would ef-fort splendid opportunities for the display of pas-sion. Their women are more cut out for intrigue than ours."
এও মধুসুদনের বাসনা ছিল মেঘনাদবধ কাব্য রচনার ক্ষেত্রে বাল্মীকির কাছ থেকে যথাসম্ভব কম ঋণ গ্রহণ করা। যদিও চতুর্থ সর্গ তিনি শুরুই করেছেন-
''নমি আমি কবি-গুরু তব পদাম্বুজে,
বাল্মীকি! হে ভারতের শিরঃচূড়ামণি,
তব অনুগামী দাস, রাজেন্দ্র-সঙ্গমে
দীন যথা যায় দূর তীর্থ-দরশনে।"
আবার এ চিন্তাও তাঁর মধ্যে ছিল যে, গ্রীক কাহিনীর সরাসরি অনুকরণ নয়, তাদের রীতিকে আত্মস্থ করবেন তিনি। মেঘনাদবধ কাব্যে দৈবের নিয়মকে স্বীকৃতি দিতে হয়েছে, কিন্তু রাবণ-মেঘনাদের বীরত্বকে সুনিপুণ দক্ষতায় কবি উপস্থিত করেছেন। গীতিকাব্যের পরিবর্তে গ্রীক বীরত্বকে প্রকাশ করার বাসনা তাঁকে মহাকবি করে তুলেছে বাঙালির কাছে। যদিও গীতিকাব্যের প্রকাশ মেঘনাদবধ কাব্যের মধ্যেও পাওয়া যায়। তাই মেঘনাদবধ কাব্যের রাম-লক্ষ্মণ দেবতার আশীর্বাদ তথা অনুগ্রহ পুষ্ট। বলেছেন, 'রাবণ একজন মহৎ লোক। এই হতভাগা বিভীষণ না থাকলে বানর সৈন্যকে কবে পদাঘাতে সমুদ্রে ডুবিয়ে মারত।' স্পষ্ট প্রতীয়মান সেই স্পর্ধিত চিন্তা-ধার্মিকতার চেয়ে পৌরুষ বড়। ব্যক্তিত্ব বাধাহীন, গর্বিত। খ্রিস্টীয় দীনতার প্রতি ধিক্কার, দুর্বলতা, ভীরুতার প্রতি ঘৃণা, প্রাচীন নিয়মনীতি সংস্কার, পোপ- এমনকি ভগবানকেও অস্বীকার।(১৩) কাহিনীর উপাদান, কথোপকথন ও তার উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে কবি এমন একটা চেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন যেখানে বাল্মিকী কৃত্তিবাসের রামায়ণ উনবিংশ শতাব্দীর দেব অনুগ্রহ থেকে বিচ্ছিন্ন আপন শক্তির উপর নির্ভরশীল প্রত্যয়ভরা মানবিক চেতনার আলোয় আলোকিত নতুন রামায়ণ হয়ে উঠেছে। যেখানে দুর্বল মানুষও নিজের শক্তিতে দেবতার কাছ থেকে সুফলের আশা করে না। 'মেঘনাদবধ'- তাই রূপ পেয়েছে কাব্যে। ব্যক্তিত্বের এই রূপ বলে, যেন সে অহঙ্কারী। তবে সে অহঙ্কার সৌন্দর্যসৃষ্টিকারী এক অনন্যসাধারণ কর্মচেতনার। কবি নজরুল তো এই ব্যক্তিত্বের কাঠামোকে কবিতার ছন্দের প্রচলিত ব্যাকরণকে ভেঙে বলেছিলেন-
"ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া,
খোদার আসন 'আরশ' ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!...
বল বীর-
আমি চির-উন্নত শির।"
ফলে মাইকেল মধুসূদনকে নবজাগরণের প্রথম কবি হিসাবেই বুঝতে হবে। তাই তাঁর কাব্য রোমান্টিসিজমের আকুলতা, উচ্ছ্বাস, সৌন্দর্যের বেদীমূলে নিবেদিত আশা-আকাঙ্ক্ষার স্পষ্টভাব। এই বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার করে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন। দেখিয়েছেন মেঘনাদবধ কাব্য পাঠ করলে বোঝা যাবে- "মাইকেল মধুসূদনের হকি কি কুহকিনী শক্তি, তাঁহার কাব্যোদ্যানে কল্পনাদেবীর কিরূপ লীলা-তরঙ্গ, কখন তিনি ধীরে ধীরে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ বাল্মীকির পদতল হইতে পুষ্প হরণ করিতেছেন এবং কখন বা নবনিকুঞ্জ সৃজন করিয়া অভিনব কুসুমাবলী বিস্তৃত করিতেছেন। ইন্দ্রজিৎ জায়া প্রমীলার লঙ্কা প্রবেশ, শ্রীরামচন্দ্রের যমপুরী দর্শন, পঞ্চবটী স্মরণ করিয়া সরমার নিকট সীতার আক্ষেপ, লক্ষ্মণের শক্তিশেল এবং প্রমীলার সহমরণ কিরূপ আশ্চর্য্য, কতই চমৎকার, বর্ণনা করা দুঃসাধ্য।"(১৪) শুধু এইটুকুই নয়, তিনি আরও বলেছেন, "কবি দিগের মধ্যে প্রধান-অপ্রধান আছেন। কেহ বা ভাবের চমৎকারিত্বে, কেহ বা লেখার চমৎকারিত্বে লোকের চিত্ত হরণ করেন।... বিদ্যাসুন্দর এবং অন্নদামঙ্গল ভারতচন্দ্র রচিত সর্বোৎকৃষ্ট কাব্য, কিন্তু যাহাতে অন্তর্দাহ হয়, হৃদকম্প হয়, শরীর রোমাঞ্চিত হয়, বাহ্যেন্দ্রিয় স্তব্ধ হয়, সদৃশ ভাব তাহাতে কই? কল্পনারূপ সমুদ্রের উচ্ছাসিত তরঙ্গবেগ কই? বিদ্যুৎচ্ছটাকৃতি বিশ্বোজ্জ্বল বর্ণনাচ্ছটা কোথায়?"(১৪ক)
এই কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে সমালোচনা করে হেমচন্দ্র দেখিয়েছেন, এতে বাক্যের জটিলতা দোষ আছে, উপুর্যপরি উপমার বাহুল্য আছে, প্রথাবহির্ভূত ক্রিয়াপদের ব্যবহার আছে, বিরাম যদি সংস্থাপনের দোষ আছে। এতদসত্ত্বেও তিনি একথা বলেছেন, "এরূপ দোষাশ্রিত হইয়াও কাব্যখানি এত উৎকৃষ্ট হইয়াছে যে, বঙ্গ ভাষায় ইহার তুল্য দ্বিতীয় কাব্য দৃষ্টিগোচর হয় না।"(১৪খ)
যদিও একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মূল উপাখ্যান বাল্মীকি থেকে নিলেও মাইকেল মধুসূদন প্রাচীন আদর্শকে মহিমান্বিত করেননি। প্রণত হয়েছেন বাল্মীকির পদমূলে ঠিকই, কিন্তু তাঁর আদর্শকে রূপ দেননি, তাঁর কাব্যে রাবণ-মেঘনাদকেই তিনি বড় করে তুলেছেন। যদিও ভারতীয় আদর্শকে পুরোপুরি বিসর্জন দেননি। সীতার চরিত্রচিত্রণ তারই প্রমাণ। তবে রাম-লক্ষ্মণের চেয়ে রাবণ-ইন্দ্রজিতের চরিত্রগত দৃঢ়তা, ও মহত্ত্বকে প্রতিষ্ঠার প্রতি কবির আগ্রহ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কবি ইউরোপীয় সভ্যতার যে দৃষ্টিভঙ্গির সংস্পর্শে এসে নবজাগরণের নতুন মূল্যবোধকে অনুভব করেছেন- তারই প্রকাশ এই কাব্যে ঘটেছে। "রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ, অক্ষয়কুমার বা বিদ্যাসাগর তুলনামূলক বিচারের মধ্য দিয়ে তাঁদের চিন্তা, সৃষ্টি ও কর্মের মধ্যে দেশী-বিদেশী ভাবনা-চিন্তার সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন প্রয়োজনের তাগিদেই। সেই তাগিদ মাইকেলের ছিল।”(১৫) কলকাতা তখন নানা ধরনের চিন্তার দ্বন্দ্বে দোলায়িত। বহু বিচিত্র চিন্তার পারস্পরিক সংঘর্ষ। রামমোহনের চিন্তার সঙ্গে তার প্রবল বিরোধিতা। হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামির সঙ্গে ডিরোজিও-পন্থীদের তীব্র হিন্দুবিরোধী আচরণ। এরমধ্যে ইউরোপীয় রেনেসাঁসের মর্মবস্তুকে ভিত্তি করে তারই উপলব্ধিতে বিদ্যাসাগরের অভ্যুত্থান। মার্কসবাদী চিন্তানায়ক শিবদাস ঘোষ দেখিয়েছেন, নবজাগরণের আন্দোলনে ধর্মীয় চিন্তাভাবনার সঙ্গে সম্পূর্ণ ছেদ ঘটিয়ে পার্থিব মানবতাবাদের বলিষ্ঠ প্রতিভূ ছিলেন বিদ্যাসাগর। রবীন্দ্রনাথের বিদ্যাসাগর অসীম স্পর্ধায় বলতে পেরেছিলেন, হিন্দুদের কথায় তিনি ছিলেন বাইরে প্রবীণ, অন্তরে নবীন। সেই যুগে আবেগ রয়েছে বেদ-বেদান্তকে ভিত্তি করে। কিন্তু তা বর্তমান যুগকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে না। আবার সামান্য সময়ের ব্যবধানে বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তা- যার মধ্যে নবচেতনার সঙ্গে ঐতিহ্যবাদের প্রভাব। এরকম আরও অসংখ্য ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব সমগ্র ঊনবিংশ শতাব্দীর চিন্তার আকাশে দীপ্যমান। এরই প্রেক্ষাপটে "যিনি ধূমকেতুর মত বিরাট পুচ্ছতাড়নায় বাংলার আকাশ ও মৃত্তিকাকে ভীত-সংকুচিত করে তুলেছিলেন, তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্ত- যিনি স্বধর্ম ত্যাগ করেছিলেন কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতি ত্যাগ করেন নি।... তখন... নবজাগ্রত মহাক্ষুধার খাদ্য অন্বেষণ...। নব্য প্রমেথ্যুস জ্বলন্ত মশাল নিয়ে দিগ্দাহ সৃষ্টি করছিল। সেই প্রমেথ্যুস হলেন 'দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন'।"(১৬)
শুধু তাই নয়, মেঘনাদবধ কাব্য প্রসঙ্গে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেছেন, "মধুসূদন প্রাচীন ভারতীয় আদর্শের গৌরব বর্ধনের জন্য কলম ধরেননি।... সে আদর্শকে উপেক্ষা করে রাক্ষসবংশ রাবণ-মেঘনাদকে বিরাট সৃষ্টির আলোকে ভাস্বর করে তুলেছেন। যা প্রচণ্ড, তীব্র, পৌরুষাত্মক, ন্যায়-অন্যায়ে যা উদাসীন তাকেই তিনি মেঘনাদবধ কাব্যে প্রাধান্য দিয়েছেন।... এ কাব্য সেকালে (এবং একালেও) যে অগ্নিদাহ সৃষ্টি করেছিল, যার আলো ও দাহ্যিক শক্তিকে উনিশ শতকের বাঙালী ভীত হয়ে আকাশে ধূমকেতুর পুচ্ছতাড়না লক্ষ করেছিল, সেই মেঘনাদবধ কাব্য বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক কাব্য।"(১৭)
বাস্তবিক পক্ষে মেঘনাদবধ কাব্য প্রকাশ বাংলা সাহিত্যের একটা প্রবল আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখের মানবতাবাদী চিন্তার মধ্যে যে রেনেসাঁসের আলোর বিচ্ছুরণ-তার স্পর্শ মাইকেলের চিন্তা ও লেখনীতে প্রকাশিত। "উনিশ শতকীয় মূল্যবোধের প্রেরণায় আমাদের রামায়ণ কাহিনীকে নতুন করে তিনি রূপ দিয়েছিলেন। প্রাচীন কাহিনীর কিছু মূল্যবোধ যুগের প্রয়োজনে রক্ষা করেছেন ঠিকই, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আত্মনির্ভরশীল মানসিকতার একটা অনমনীয় দুঃসাহসিক রূপকেও ধরবার চেষ্টা করেছিলেন। আধুনিক যুগের মহাকাব্য রচনার যাবতীয় আয়োজনও তিনি করেছিলেন। তাতে যে মেধা ও পরিশ্রমের প্রমাণ ছিল তা বিস্ময়কর। ভাষা ও ছন্দ থেকে শুরু করে কাহিনীকে নতুন করে ঢেলে সাজাবার কৌশল পর্যন্ত সবই তাঁর নিজস্ব সৃষ্টি।"(১৮) মধ্যযুগের সাহিত্য ছিল দেবদেবী নির্ভর। এ ধারা থেকে বেরিয়ে যখন মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখকে সাহিত্যের বিষয় করা হচ্ছে তখন এই কাব্যরচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুহৃদ কুমার ভৌমিক যথার্থ উল্লেখ করেছেন, "বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূত্রপাত ঘটে মধুসূদনের দ্বারাই। চিরাচরিত পথে মধ্যযুগ থেকে মধুসূদন পর্ব পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের যে স্রোতধারা প্রবাহিত ছিল, তিনি তার মোড় ঘুরিয়ে ভগীরথের মতো আধুনিকতার দিকে সঞ্চারিত করেছিলেন। ... আঙ্গিক দিক ছাড়া আত্মিক অংশটিকেও তিনি চিরাচরিত স্রোতধারা থেকে আধুনিকতার দিকে উন্নীত করেছিলেন।"(১৯) রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাঃ অজিতকুমার ঘোষ 'মধুসুদন রচনাবলী'-র ভূমিকায় নিঃসঙ্কোচে যথার্থই বলেছেন, 'কবি মধুসূদনের পূর্ণতম প্রকাশ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য 'মেঘনাদবধ কাব্যে।... মধুসূদন ভালোভাবে জানতেন যে, মহাকাব্যের পক্ষে বিষয়বস্তুর গাম্ভীর্য ও ওজস্বীতা প্রয়োজন। ... উনিশ শতকের নবজাগরণের ফলে উদ্বুদ্ধ বাঙালী মনীষা গতানুগতিক সকল ক্ষুদ্রতার গণ্ডি অতিক্রম করে এক অলব্ধ বিরাটের ধ্যানে মগ্ন হয়ে পড়েছিল। সেই বিরাট অনিশ্চয়তার মহা অন্ধকারের দিকে আকর্ষণ করেছিল, অশান্তি ও বিপদের অনিবার্য পরিণতির দিকে অঙ্গুলি প্রসারিত করেছিল, কিন্তু তবুও জাগ্রত বাঙালী আত্মা সেই বিরাটের ধ্যান থেকে বিরত হয়নি। মধুসূদন সেই বাঙালী আত্মার মূর্ত প্রতিনিধি। তিনি পরিচিত মাটিতে পা রেখে দ্বাদশ সূর্যের আলোকে ভাস্বর অসীম নভোমণ্ডল প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছিলেন। অসূর্যস্পশ্যা নারীর ন্যায় যে বাংলা কবিতা অবরোধের অন্তরালে হীন বন্দীজীবন যাপন করছিল তাকে নিয়ে এলেন দামামাধ্বনিত উন্মুক্ত রণস্থলে।" বাস্তবিকই রেনেসাঁসের বিপ্লবাত্মক মনুষ্যত্ববোধের চেতনার সুস্পষ্ট প্রকাশ মাইকেল মধুসূদনের মধ্যে ঘটেছিল। একথা সকলেই জানেন জীবনের শেষ কয়েকটি বছর মাত্র তিনি বাংলা কাব্য সাহিত্যের জগতে পা ফেলেছিলেন। বছরের গণনায় নগন্যপ্রায় তা চার- তবু বাংলা কাব্যের জগতে তিনি অভিনবত্বের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনা করেছিলেন। বাংলা কাব্য ইতিহাসে তিনি প্রথম প্রতিস্পর্ষী বিদ্রোহী কবি।
এই কাব্যের সূচনাপর্ব থেকেই রাবণ, ইন্দ্রজিৎ সহ নানান চরিত্রচিত্রণ ঘটিয়েছেন। কাব্যের ষষ্ঠ সর্গে দেখা যায়-নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে লক্ষ্মণের প্রবেশ দেখে বিস্মিত মেঘনাদ। যজ্ঞের কোষা তুলে নিক্ষেপ করতে গিয়ে দেখলেন বিভীষণকে। বুঝতে পারলেন কীভাবে লক্ষ্মণের প্রবেশ ঘটেছে। এই ঘটনার প্রস্তুতিই পরিলক্ষিত হয় কাব্যের প্রথম থেকে। যদিও সব চরিত্রচিত্রণের মূল কেন্দ্রবিন্দু মেঘনাদ। এখানেই কাব্যের বৈশিষ্ট্য ও উদ্দেশ্যমুখীনতার সুস্পষ্টতা। বাল্মীকি বা কৃত্তিবাসের ঘটনা প্রবাহ থেকে কিছুটা সরে আসার কারণের মধ্যেই নবচেতনার আভাস আমরা পাই এই কাব্যে। "রাম-লক্ষ্মণকে দৈববলে শক্তিমান ক'রে, এবং দেবতার আশীর্বাদপূত করে রাবণকে আত্মনির্ভরশীল ও 'মানবিক' বলে বলীয়ান করতে গিয়েই মাইকেল রামায়ণ কাহিনীর বি-নির্মাণ করেছেন।"(২০)
বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ রাবণকে শোকে স্তব্ধ করেছে যেমন, তেমনি তার বীরত্বের প্রতি আবেগকেও মূল্য দিয়েছেন কবি। হৃদয়ে বেদনারস, আবার বীরত্বের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন।-
'জন্মভূমি রক্ষা হেতু কে ডরে মরিতে?
যে ডরে ভীরু সে মূঢ়; শত ধিক্ তারে।'
আবার-
'কি সুন্দর মালা আজি পরিয়াছ গলে,
প্রচেতঃ। হা ধিক্, ওহে জলদলপতি।'
অথবা,
"কোথা পুত্র, পুত্রবধূ আমার?' সুধিবে
যবে রাণী মন্দোদরী, - 'কি সুখে আইলে
রাখি দোঁহে সিন্ধুতীরে, রক্ষঃকুলপতি?'
কি কয়ে বুঝাব তারে? হায় রে, কি কয়ে?"
-এরকম নানান পর্যায়ে চরিত্রগুলিকে ফুটিয়ে তুলেছেন কবি। আবার কবিমনের সৌন্দর্যবোধও নানান স্থানে অত্যন্ত পরিষ্কার করেই প্রতিফলিত হয়েছে। একথাও আমাদের অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মাইকেল মধুসুদনের কাব্যরচনায় সৌন্দর্য্যবোধের এক অপরূপ প্রকাশ তৎকালীন সময়ের প্রেক্ষিতে বিস্মিত করে। শিশিরকুমার দাশ যথার্থ বলেছেন, "বাংলাদেশের রোমান্টিক আন্দোলনের নায়ক মধুসূদন। যে অস্থিরতা ও চাঞ্চল্য জাতির চিত্তকে আচ্ছন্ন করেছিল, তারই প্রকাশ সেখানে। সমাজের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব সেদিনের সাহিত্যচিন্তায়, দর্শনে, সমাজভঙ্গিতে দেখা দিয়েছিল- আধুনিক কাল পর্যন্ত সে ধারাই চলেছে। সেই ব্যক্তিত্ব খুঁজেছে সুন্দরকে, রহস্যময়কে, ঐশ্বর্যকে, রাবণের মতো elemental শক্তিকে।"(২১)
'সাহিত্যরূপ' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, "আধুনিক বাংলা কাব্যসাহিত্য শুরু হয়েছে মধুসূদন দত্ত থেকে। তিনি প্রথম ভাঙনের এবং সেই ভাঙনের ভূমিকার উপরে গড়নের কাজে লেগেছিলেন খুব সাহসের সঙ্গে।... একথা সত্য, বাংলা সাহিত্যে মেঘনাদবধ কাব্য তার দোহার পেল না। সম্পূর্ণ একলা রয়ে গেল। অর্থাৎ বাঙলা ভাষায় এমন একটি পথ খুলেছিলেন, যে পথে কেবলমাত্র তাঁরই একটি মাত্র মহাকাব্যের রথ চলেছিল। তিনি বাঙলা ভাষার স্বভাবকে মেনে চলেন নি।"(২২) এখানেই তাঁর সাহসিকতা। পুরাতনের জায়গায় নতুনকে আনা। নবীনের আগমনবার্তা। তারই সাথে একথাও তো মানতে হবে, মধুসুদন কবি হিসাবে ছিলেন ছন্দ-সচেতন। পয়ারের শেষের মিলকে তিনি অস্বীকার করেছেন। বীররস সৃষ্টির ক্ষেত্রে এই মিলের পরিবর্তন করেছেন। রাজনারায়ণ বসুকে অমিত্রাক্ষর ছন্দের বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি চিঠিও দিয়েছিলেন। তা থেকে কবির ছন্দচেতনা বোঝা যায়। এ নিয়ে আরও অনেককে তিনি তাঁর চিন্তা বারবার বলেছেন। রাজনারায়ণ বসুকে প্রথম সর্গ রচনার পর বলেন, "I am positive you will read with care and attention what I send you."(২৩)
কবির রচনাবলী ভূমিকায় একথা সঠিকভাবেই ডঃ অজিতকুমার ঘোষ বলেছেন, 'মধুসূদনের বিদ্রোহী প্রতিভা ভাষা, ছন্দ অলঙ্কার সহ সব বিষয়েই নতুন নতুন পথ প্রবর্তন করতে চেয়েছিল। এর ফলে তাঁর কাব্যের আত্মার স্বাধীন স্ফূর্তি এবং অদৃষ্টপূর্ব সৌন্দর্যের বিকাশ ঘটেছিল।' আবার ফিরে আসতে হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কাছে। প্রথম রচনার বিরোধিতার বেড়া নিজেই ভেঙে তিনি লক্ষ করেছেন মেঘনাদবধ কাব্যের ছন্দে, ভাবে, ভাষায় এবং রচনা-প্রণালীতেও বিদ্রোহের চিহ্ন। কাব্যে বর্ণিত শক্তির অধিকারী রাবণকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন, "যে শক্তি স্পর্ধাভরে কিছুই মানিতে চায় না, বিদায়কালে কাব্যলক্ষ্মী নিজের অশ্রুসিক্ত মালাখানি তাহারই গলে পরাইয়া দিল।"(২৪) বর্তমান যে হিন্দুত্ববাদীরা রাম-বিরোধী বলে মাইকেলকে নিষিদ্ধ করার দাবি করছেন, তারা এখন কী বলবেন? সেই সৌন্দর্যের কথাগুলি উল্লেখযোগ্য-দাহকার্য শেষ করে লঙ্কানগরের সকলে ফিরছে ঘরে। কবি বলছেন-
"করি স্নান সিন্ধুনীরে, রক্ষোদল এবে,
ফিরিলা লঙ্কার পানে, আর্দ্র অশ্রুনীরে-
বিসর্জি প্রতিমা যেন দশমী দিবসে।
সপ্ত দিবানিশি লঙ্কা কাঁদিলা বিষাদে।"
আরও একটি দিক এই কাব্যে রসসুধায় সিঞ্চিত করে। তা হল, তাঁর উপমার সৌন্দর্য্য। যেন উপমার মহাসমুদ্রতীরে আমাদের উপবিষ্ট করিয়ে দেয়। এর উদাহরণ গোটা কাব্যব্যাপী। তাই তাঁর উল্লেখ এখানে অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু কবির সৌন্দর্যচেতনা, অলঙ্কারের প্রয়োগ, শব্দের মাধুর্য আবার গাম্ভীর্য- চরিত্রচিত্রণ, অপ্রচলিত শব্দের স্রোতস্বিনী ধারা কাব্য ও সাহিত্য রসিকদের উপভোগ্য, শিক্ষামূলকও নিশ্চয়ই। অমিত্রাক্ষর ছন্দের বেগবতী সৌন্দর্যের স্রোতে মেঘনাদ-প্রমীলার সুকুমারবৃত্তিসুলভ প্রেম, আবার যুদ্ধের প্রয়োজনে বীরত্বের রূপ-এই দুয়ের সমন্বয়কেই দেখা যায়। চিত্রাঙ্গদার পুত্রশোক এবং সেই সময়ে রাজসভায় তার আগমন বর্ণনা-
"আভরণহীন দেহ, হিমানীতে যথা
কুসুম রতন হীন বন-সুশোভিনী
লতা! অশ্রুময় আঁখি, নিশার শিশির-
পূর্ণ পদ্মপর্ণ যেন।"
এই সৌন্দর্য-চেতনায় বাঙালীয়ানা পুরোপুরি বর্জিত হয়নি।-
"আহা মরি, সুবর্ণ-দেউটি
তুলসীর মূলে যেন জ্বলিল, উজলি
দশদিশ।"
পরিপূর্ণ বাঙালি সত্তার একটা কলি। এরই পাশাপাশি বাঙলা সাহিত্যে প্রমিলার বীর্যবতী রূপ- তার গম্ভীরতাপূর্ণ উক্তি-
"পৰ্ব্বত-গৃহ ছাড়ি
বাহিরায় যবে নদী সিন্ধুর উদ্দেশে,
কার হেন সাধ্য যে সে রোধে তার গতি?
দানবনন্দিনী আমি; রক্ষঃকুল-বধূ;
রাবণ শ্বশুর মম, মেঘনাদ স্বামী,-
আমি কি ডরাই, সখি, ভিখারী রাঘবে?"
বা অন্যত্র-
"সম্মুখ সমরে পড়ি, বীর-চূড়ামণি
বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে
অকালে, কহ হে দেবি অমৃত-ভাষিণি,
কোন্ বীরবরে বরি সেনাপতি-পদে,
পাঠাইলা রণে পুনঃ রক্ষঃকুলনিধি
রাঘবারি? কি কৌশলে রাক্ষসভরসা
ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদে- অজেয় জগতে-
ঊর্মিলাবিলাসী নাশি, ইন্দ্রে নিঃশঙ্কিলা?"
-এখানে বাক্যের সম্প্রসারণ ও বিস্তারের শৈলী মহাকাব্যের বৈশিষ্ট্যের অনুসারী হয়ে উঠেছে। এ আর এক কাব্যিক সৌন্দর্যবোধ।
প্রকৃতির রূপ বর্ণনাও ছন্দোবদ্ধভাবে প্রকাশিত-
'অস্তে গেলা দিনমণি; আইলা গোধূলি,-
একটি রতন ভালে। ফুটিলা কুমুদী;
মুদিলা সরসে আঁখি বিরসবদনা
নলিনী; কুজনি পাখী পশিল কুলায়ে;
গোষ্ঠ-গৃহে গাভী-বৃন্দ ধায় হাম্বা রবে।
আইলা সুচারু-তারা শশী সহ হাসি,
শব্বরী'...
এরই পাশে এঁকেছেন প্রমীলাকে। তার প্রেমকে। তার মধ্যে বীর্যের রূপ ও সৌন্দর্যের রূপের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। যদিও সহমরণের প্রশ্নটি বিতর্কিত। একদিকে যুদ্ধসজ্জা, অপরদিকে- 'ওই শুন কূজনিছে বিহঙ্গম বনে। পোহাইল বিভাবরী।' যুদ্ধসজ্জায় 'সহসা নূপুর ধ্বনি ধ্বনিল পশ্চাতে, চির পরিচিত যার, প্রণয়ীর কানে প্রণয়িনী-পদশব্দ।'
নারী চরিত্রকে তিনি এঁকেছেন ব্যক্তিত্বের মানসের স্পর্শ দিয়ে। প্রসঙ্গত তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিটি খুবই উল্লেখযোগ্য মনে হয়। Madras Hindu Chronicle পত্রিকায় তাঁর সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, নিবন্ধ ও প্রবন্ধগুলির মধ্য দিয়ে মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ মুক্তচিন্তার অধিকারী মধুসূদন দত্তকে খুঁজে পাই। বিধবা বিবাহের সমর্থক মধুসুদন নারীর স্বাধিকার রক্ষার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। মনুসংহিতার তীব্র বিরোধিতা করে তিনি লিখেছিলেন, 'In India, I may say in all the Oriental countries, women are looked upon as created merely to contribute to the grati-fication of the animal appetites of men... it not only makes them appear as of inferior mental endowments, but no better than a sort of speaking brutes." সমাজমনস্ক কবি মনে করতেন নারীদের শিক্ষিত করা ছাড়া তাদের অবস্থার উন্নতি ঘটানোর দ্বিতীয় কোন পথ নেই। তাঁর ভাষায়,- "Extensive dissemination of knowledge amongst women is the surest way that leads a nation to civilisation and refinement, for it is woman who first gives ideas to the future philosopher and the would-be poet." একথা সত্য যে, উনিশ শতকের সামাজিক সংস্কারমূলক কাজে মাইকেলের কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকার তেমন ঘটনা নেই। আবার নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে তিনি হিন্দু কলেজে থাকাকালীন সময় থেকেই স্বীকার করেছেন। মানবতাবাদী চিন্তানায়কের মত কবিও ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নারী স্বাধীনতার প্রয়োজনকে উপলব্ধি করেছিলেন। কুসংস্কারমুক্ত শিক্ষিতা রমনী, উন্নত রুচিসম্পন্না নারী সমাজদেহে জমে থাকা অন্ধকারকে দূর করবার জন্য অতিপ্রয়োজনীয় শর্ত। মানবতাবাদের এই উন্নত অভিব্যক্তি নিয়েই কবির চিন্তা বিকাশলাভ করেছে। এই প্রসঙ্গে কবির শিল্পরূপ আলোচনায় এক সাহিত্য ঐতিহাসিক বলেছেন, "কবির আগাগোড়া রচনায় নারীপ্রধান জীবন-মূল্যবোধের কেন্দ্রবর্তিনী হয়ে আছেন জননী জাহ্নবী, কোথাও ব্যক্তিত্বময়ী মর্মপীড়িতা নারীরূপে, কোথাও বা স্বাতন্ত্র্যের অধিকারপ্রার্থিনী বিদ্রোহিণী রূপেও।"(২৫) মেঘনাদবধ কাব্যে প্রমীলার সহমরণ আধুনিক মনের কবির উপস্থাপনার উদ্দেশ্য সম্ভবত সমস্ত দিক থেকে দৈবের বিড়ম্বনায় রিক্ত রাবণের হাহাকারকে পাঠক-হৃদয়ে অধিকতর বেদনাময় করে তুলতে এবং মেঘনাদের সঙ্গে তার প্রণয়ের গভীরতাকে বোঝাতে। বস্তুতপক্ষে প্রমীলার চরিত্রটি কবির মনের সন্তানসম সৃষ্টি। যেমন মেঘনাদ-এর চরিত্রচিত্রণের জন্য কাব্যের প্রথম অংশের কাব্যিক অবতারণা। যেখানে মেঘনাদের উপস্থিতি নেই। এখানেই তাঁর কাব্যশৈলীর তৎকালীন উৎকর্ষ। ডঃ শিশিরকুমার দাশ তাঁর গ্রন্থে বলেছেন, "নারীর পরিপূর্ণ মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন কবি। কিন্তু সামাজিক জীবনের চরম বন্ধনের জ্বালা সেই স্বপ্ন রচনায় বাধা দিয়েছে। তাই তিনি পৌরাণিক নারীর মধ্যে আধুনিক যুগ-সমস্যাগুলি স্থাপিত করেছিলেন।"(২৬) ফলে নারীচরিত্র সৃষ্টিতে নবজাগরণের চিন্তার সুর প্রতিধ্বনিত, আবার অন্য দিকে ভারতীয় ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ বিসর্জন-ধ্বনি নয়। সীতার চরিত্র অঙ্কনের মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন ভারতীয় নারীর বঞ্চনা-লাঞ্ছনার জীবনের বেদনার ইতিহাস। অন্যান্য গ্রন্থেও তার প্রভাব আছে। হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস ভরা বিষাদের জীবন পাঠককে পীড়িত করে। তার অশ্রু অশোককাননে স্বীয় কারণে, প্রমীলার কারণেও। নারীকে তিনি সৌন্দর্যের সঙ্গে বীরত্বের রূপে দেখতে চেয়েছেন। 'বীরাঙ্গনা কাব্য' তাই তিনি শুধু রচনা করেননি- তা উৎসর্গ করেছেন বিদ্যাসাগরকেই। বিদ্যাসাগরও কবিকে চিনতে পেরেছিলেন। একথা সত্য যে, বিদ্যাসাগর গ্রহণ করেছিলেন নবজাগরণের মর্মবস্তুকে। মাইকেল তার সঙ্গে ইউরোপীয় রেনেসাঁসের বাইরের ফর্মটিকেও অনুকরণ করেছেন। কুসংস্কারকে তিনি দূর করতে চেয়েছেন। কিন্তু এদেশের মানসিকতার ধারাবাহিকতার সঙ্গে তার সংগ্রামের রূপটি গ্রহণ করেননি। তাই গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে সম্পূর্ণ সফল হতে পারেন নি। কিন্তু মাইকেলের প্রতিভা, তাঁর অনিয়ন্ত্রিত জীবনের মধ্যেও যে রেনেসাঁসের চেতনা স্ফুরণ ঘটেছে- সেকথা বিদ্যাসাগর যেমন করে উপলব্ধি করেছিলেন, তা অন্য কারুর পক্ষে সম্ভব হয়নি তৎকালীন সময়ে। কবির মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গী, নবজাগরণের ব্যক্তিত্বের বলিষ্ঠতা সম্পন্ন কাঠামোকে বিদ্যাসাগর বুঝেছিলেন। তাই কবির প্রতি ছিল তাঁর বিশাল হৃদয়ের অফুরন্ত ভালবাসা, স্নেহ ও অকৃত্রিম প্রশস্তি। মানবতাবাদী মননের বলিষ্ঠতাকেই বিদ্যাসাগর চিনেছিলেন। বিদ্যাসাগরের অসীম ভালোবাসা পেয়েছিলেন কবি। বিদ্যাসাগর চরিত্রকেও কবি উপলব্ধির ভিত্তিতে চিনেছিলেন। তাই এক চিঠিতে বিদ্যাসাগরকে বলতে পেরেছিলেন 'the genius of an ancient sage, the energy of an Englishman and the heart of a Bengali mother' ফলে মাইকেল মধুসুদনের মধ্যে সমস্ত দিবেই পাওয়া যায় নবজাগরণের চিন্তার ছাপ। নতুন করে এই ভগবৎ ভক্তির দেশে তিনি দেখিয়েছেন- "রাবণ প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বশালী ও পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তার ব্যক্তিত্ব বিচিত্র ও বহুমুখী। সে শত পুত্রের পিতা, স্বর্ণলঙ্কার অধীশ্বর, মস্ত বড় যোদ্ধা। এরূপ পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্বশালী চরিত্র ইতিপূর্বে বাংলা সাহিত্যে অচিন্তনীয়, অভাবনীয়। কেননা ব্যক্তিত্বের কোন ধারণাই তখনও গড়ে ওঠে নি।... তার মধ্যে দেখা দিয়েছে আত্মবিকাশ ও আত্মপ্রসারের প্রবল তাগিদ। তাই মৃত্যু নয়, জীবনই তার কাম্য। এবং এই জীবনে বেঁচে থেকেই সে জীবনের সফল দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছে। সম্রাট রাবণ শত পুত্রশোকের জ্বালা অন্তরে ধারণ করেও স্বীয় কর্তব্যকর্মে নিয়োজিত রয়েছে এবং শত্রুর কবল থেকে লঙ্কাপুরী ও লঙ্কাপুরবাসীকে রক্ষার গুরুদায়িত্বভার বহন করেছে।"(২৭) কিন্তু তাই বলে রাবণের ত্রুটিকেও তিনি অস্বীকার করেননি। সেক্ষেত্রে তার সীতাহরণকে মূঢ়তাই বলতে হয়। রাঘব ঘৃণিত তার কাছে - তবু সব কিছুর মূলে সীতা। তাই সরমা বলছে, 'কে ছেঁড়ে পদ্মের প্রাণ? কেমনে হরির ও বরাঙ্গ অলংকার, বুঝিতে না পারি।'
মহাকাব্যে বিষয়কে নতুন করে উপস্থাপনাকে সেইদিনের পরিপ্রেক্ষিতে দুঃসাহসিক বলেই বলতে হয়। রাবণকে যে স্বদেশপ্রেমী এবং রামকে পরদেশ-আক্রমণকারী হিসাবে দেখানোর চেষ্টা দেখা গিয়েছে, কেউ কেউ তাতে ফরাসী বিপ্লবের আদর্শে উদ্বুদ্ধ মধুসূদনের মানসিকতাকেই দেখেছেন।(২৮)
ভাষার প্রসঙ্গে বলতে গেলে একথা স্বীকার করতেই হবে, তাঁর অসম সাহসিকতাকে। পাণ্ডিত্যের কারণে নয়- যেহেতু ভাষা চিন্তার বাহন, সেহেতু নবীন চিন্তার প্রকাশের কারণেই এসেছে নতুন ভাষার স্পন্দন। তাঁর কাব্যে ছন্দের গঠন প্রকৃতি পর্ব সৃষ্টির ভাস্কর্যের বৈচিত্র্যে। যার ফলে পাঠকের মনকে দোলয়িত করে। পর্বের পর পর সাজানোর সৃষ্টিশীলতা ছন্দের স্পন্দন এনেছে। এই পর্ব সৃষ্টির বিষয়কে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। ছন্দের নিয়মভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত তিনি প্রথম যুগে। কিন্তু এও অনস্বীকার্য যে, পরবর্তীকালে ছন্দ-ধারায় কবির প্রভাব ছিল অনেকখানি। কবির অমিত্রাক্ষর ছন্দের অনুসরণে গৈরিশ ছন্দের সৃষ্টি। নাট্যকার গিরিশচন্দ্র পৌরাণিক নাটকের ক্ষেত্রে এই ছন্দকেই শ্রেষ্ঠ মনে করতেন। মহেন্দ্রনাথ দত্ত (বিবেকানন্দের ভাই) বলেছেন 'মাইকেলের কাব্যে যেমন একটি তেজঃপূর্ণ ভাব রহিয়াছে, গিরিশচন্দ্রের কাব্যের ভিতরেও ঠিক সেইরূপ গম্ভীর, স্থির, ধীর ও তেজঃপূর্ণ ভাব আছে।... ইহাই গৈরিশ ছন্দ।'(২৯) যদিও প্রথমে কবির এই প্রভাবকে সকলে স্বীকার করেন নি। তা-ই স্বাভাবিক। কিন্তু তা অস্বীকারের উপায় ছিল না। একদিন একটি দোকানের পাশ দিয়ে যেতে যেতে শুনলেন, মেঘনাদবধ কাব্য পাঠ করছেন এক ব্যক্তি। তিনি দোকানে ঢুকে বললেন, এভাবে নয়, এই ছন্দের প্রকাশ ভঙ্গিমা অনুযায়ী পাঠ করতে হবে এইভাবে-বলে তিনি নিজে তা পড়ে শুনিয়েছিলেন। অবশ্য এর দ্বারা অন্যদিকে আর একটা কথা প্রমাণিত হয় যে, মেঘনাদবধ কাব্য শিক্ষিত সমাজের মধ্যে অনেকখানি প্রভাব বিস্তার করেছিল। প্রকৃতপক্ষে অমিত্রাক্ষর ছন্দের সৃষ্টির সঙ্গে শ্রুতিমধুরতা আর কবির শব্দচয়ন সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পেরেছিল। বিভিন্ন অনুযোগের উত্তরে মধুসূদন বলেছিলেন, "তুমি আমার স্টাইল শক্ত মনে করছ দেখে আমার ভয় হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি আজকালকার দিনে যে সব শূন্যগর্ভ মূর্খরা বই লেখে তাদের মত ইচ্ছে করে বাগাড়ম্বর করি না। শব্দগুলি খুঁজতে হয় না। তারা যেন স্রোতে ভেসে আসে। আমার প্রেরণার স্রোত বলতে পারি।... ভাবনা কিংবা চিত্র শব্দগুলিকে আকর্ষণ করে আনে। সে শব্দগুলি আগে জানতাম তাই মনে হয় না।" তিনি প্রকৃতপক্ষে ছন্দের কারণে শ্রুতিমাধুর্যের জন্য বারবার পরিবর্তনও করেছেন। এসবগুলিকে একত্রে বিচার করলে দেখা যাবে 'রামমোহন-বিদ্যাসাগরের পাশেই মধু-বঙ্কিম।' সংস্কৃত শব্দ যেহেতু জননীস্বরূপা-তাই এঁদের যেতে হয়েছে সংস্কৃত শব্দ ভাণ্ডারের কাছেই। তিনি এই কাব্যে মাত্র চল্লিশটি শব্দ ব্যবহার করেছেন- যা অপ্রচলিত।(৩০)
সর্বোপরি মনে হয়, নবজাগরণের চিন্তার ধারায় মেঘনাদবধ কাব্যে রাম-লক্ষ্মণ নিতান্তই দৈবের অনুগ্রহপ্রাপ্ত, তাই জয়ী-আর পরাজিত রাবণ-মেঘনাদরা বীর। রামের চরিত্র দৈবের সাহায্যপুষ্ট কাপুরুষতায় পরিপূর্ণ। রাবণ ভিখারী রাঘবকে হারাতে না পারলেও বীর। এ যেমন সত্য, তেমনি পূর্বে উল্লেখিত কথাটিও মনে রাখতে হবে রামমোহন-বিদ্যাসাগরের মতো তাঁর শিক্ষা-সাধনায় ও ব্যক্তিচরিত্রে সামাজিক উদ্দেশ্য সবসময় কাজ করেনি। নতুন জীবনবোধের আলো পেয়েও ব্যক্তিজীবনে নানান ঘাত-প্রতিঘাতে দীর্ণ কবির মধ্যে তা মূর্তরূপ পরিগ্রহ করতে পারেনি। মহাকাব্যের সমুদ্রের উচ্ছ্বসিত তরঙ্গের শব্দ-কলকল্লোলের মাঝেও থেকে গিয়েছে-
'নিশার স্বপন-সুখে সুখী যে, কি সুখ তার?
জাগে সে কাঁদিতে!
ক্ষণপ্রভা প্রভা-দানে বাড়ায় মাত্র আঁধার
পথিকে ধাঁধিতে।
মরীচিকা মরুদেশে, নাশে প্রাণ তৃষাক্লেশে;
এ তিনের ছল সম, ছল রে এ কু-আশার!'
বেদনার এই হাহাকারই সত্য নয়। তিনি ক্ষণপ্রভার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। বিদ্যাসাগরই একসময় তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন যে, মধু হ'ল একটি 'অগ্নিস্ফুলিঙ্গ'! তাই তিনি পথিককে অন্ধকারে নিক্ষেপ করেননি। আলোকিতই করেছেন-কিছু কিছু সীমাবদ্ধতার সঙ্গে। তবে অবশ্যই 'মেঘনাদবধ' কাব্য, তৎকালীন সময়ের উন্নত কাব্য। একথাও সত্য যে, বর্তমান সময়ে যাঁরা সাহিত্যসেবী, যাঁরা জীবনের বলিষ্ঠ সত্যকে রসের রূপে পরিবেশন করার কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন- তাঁদের কাছে 'মেঘনাদবধ' কাব্যের অন্তর্নিহিত সত্তা ও এই কাব্যের স্রষ্টা অনেক কিছুই দাবী করে। যে স্পর্ধায় কবি সেদিন প্রচলিত ধারার বিরুদ্ধে নতুন ধারার বেগবতী স্রোত সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন, আজও আমাদের এই সমাজ সেই ধরণের কিছু আশা করে আছে। সমাজের সকল ক্ষেত্রে আজ সংকটের যে ছায়া-সাহিত্য সংস্কৃতির জগতেও যার প্রভাব, তার বিরুদ্ধে নতুন সাহিত্য ও সমাজ অগ্রগতির নতুন চেতনার রসসিঞ্চিত প্রকাশ দেখতে চায় দেশের শুভবুদ্ধি। ছন্দে, কাব্যে, গদ্যে, ভাষা রীতিতে, প্রকাশ ভঙ্গিমায় বহু ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষাও চলছে। কিন্তু আজকের যুগসত্য- যা প্রচলিত সমাজ সাহিত্যের বেড়ি ভেঙে নতুন জীবনাদর্শের আলোয় আলোকিত করতে পারবে জনমানসকে- তেমন সাহিত্যের প্রতীক্ষায় থাকতে হচ্ছে। 'মেঘনাদবধ' কাব্যচর্চা সেই আশা পূরণের মধ্য দিয়েই সার্থক হতে পারবে। ফলে কবি মাইকেল মধুসূদনের চর্চাও মানবতাবাদী মনীষীদের চরিত্রের মতোই আবেগমুক্ত মন নিয়ে যথার্থ বিশ্লেষণের পথে অবশ্যই করণীয় কর্তব্য হবে আমাদের। ■
সূত্রাবলী:
১। The Wire
২। বিবেকানন্দ রচনাবলী, নবম খণ্ড, উদ্বোধন ১৯৮৬, পৃ.
২৯৭-৯৮
৩। রবীন্দ্রনাথ: ভাষাও ছন্দ
৪। উদ্ধৃত, শিশিরকুমার দাশ : মধুসূদনের কবিমানস, পুস্তক বিপণি, পৃ. ১২
৫। বঙ্গিমচন্দ্র: "মৃত মাইকেল মধুসূদন দত্ত" প্রবন্ধ
৬, ৭। রবীন্দ্রনাথ: 'সাহিত্যসৃষ্টি'
৮। শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী: 'স্বামী-শিষ্য সংবাদ'
৯। বঙ্কিমচন্দ্র: "মৃত মাইকেল মধুসূদন দত্ত” প্রবন্ধ
১০। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়: বাংলা সাহিত্যের বিকাশের ধারা
১১। সূত্র: শুভাশিস চক্রবর্তী: আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৯ জানুয়ারী ২০২৩
১২। উদ্ধৃত, সূত্র: পথিকৃৎ, আগস্ট সংখ্যা ২০২৩
১৩। সূত্র: শিশিরকুমার দাশের মধুসূদনের কবিমানস
১৪। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা, মেঘনাদবধ কাব্য
১৪ ক। ঐ
১৪ খ। ঐ
১৫। উজ্জ্বলকুমার মজুমদার: মেঘনাদবধ কাব্য চর্চা, 'সোনার তরী' প্রকাশনা
১৬। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়: মেঘনাদবধ কাব্য চর্চা, পৃ. ৮
১৭। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়: মেঘনাদবধ কাব্য চর্চা, পৃ. ৯
১৮। উজ্জ্বলকুমার মজুমদার : মেঘনাদবধ কাব্য চর্চা, পৃ. ১১
১৯। উজ্জ্বলকুমার মজুমদার : মেঘনাদবধ কাব্য চর্চা, পৃ. ৪৬৫
২০। উজ্জ্বলকুমার মজুমদার : মেঘনাদবধ কাব্য চর্চা, 'সোনার তরী' প্রকাশনা
২১। শিশিরকুমার দাশ : মধুসুদনের কবিমানস, পুস্তক বিপণি
২২। উজ্জ্বলকুমার মজুমদার : মেঘনাদবধ কাব্য চর্চা, পৃ. ৪৬৭
২৩। মধুসূদন রচনাবলী : হরফ প্রকাশনী, চিঠি, পৃ. ৩১৯
২৪। উদ্ধৃত, উজ্জ্বলকুমার মজুমদার : মেঘনাদবধ কাব্য চর্চা, পৃ. ৪৪৪
২৫। উদ্ধৃত, উজ্জ্বলকুমার মজুমদার : মেঘনাদবধ কাব্য চর্চা, পৃ. ৪৩৪
২৬। শিশিরকুমার দাশ : মধুসূদনের কবিমানস, পুস্তক বিপণি, পৃ. ৫৬
২৭। মোবেশ্বর আলী : 'নবজাগৃতি ও মধুসূদন' প্রবন্ধ। গ্রন্থ: মধুসুদন সাহিত্যপ্রতিভা ও শিল্প-ব্যক্তিত্ব। পুঁথিপত্র প্রকাশনা, ১৯৫৬
২৮। সূত্র, অশোক পাল : দ্বিশতবর্ষের আলোকে বাংলা সাহিত্যের উপেক্ষিত কাব্যপ্রতিভা, ভালো ভাষা ওয়েব পোর্টাল, ২৮ জানুয়ারী ২০২৩
২৯। মেঘনাদবধ কাব্য রচনা, পৃ ৪৭১
৩০। সূত্র, শিশিরকুমার দাশ : মধুসূদনের কবিমানস
(পথিকৃৎ-এর জানুয়ারি ২০২৪ সংখ্যা থেকে নেওয়া)
পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২
দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com