১৪ই ফেব্রুয়ারি২০২৫, সঙ্গীত জগতের, বিশেষ করে বাংলা গানের বিরল প্রতিভা, প্রতুল মুখোপাধ্যায় প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর প্রয়াণে এপার এবং ওপার বাংলার তো বটেই, সারাদেশে এবং বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা তাঁর অসংখ্য গুণমুগ্ধ মানুষ গভীরভাবে শোকাহত। তাঁকে নিয়ে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছু বিশিষ্ট মানুষ সংবাদপত্র ও সামাজিক মাধ্যমে অন্তরের শোক ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে সঙ্গীতের জগতে তাঁর অনন্য অবদানের কথা বলেছেন। তাঁর গায়কির বিশিষ্টতা, জনমনে তার প্রভাব, প্রগতিশীল বামপন্থী মহলে তাঁর গানের কদর, গীতিকার, সুরকার এবং শিল্পী হিসেবে তাঁর অনন্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে নানা দিক থেকে কিছু কিছু আলোচনা ব্যাপকভাবে না হলেও হচ্ছে নতুন করে।
তবে একথা মনে রাখা উচিত যে, বাজার ও বিপণনের বিপরীতধর্মী তাঁর শিল্পকলা মিডিয়ার দাক্ষিণ্য পায়নি কখনো। একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার, শিল্পী এই প্রতিভাবান মানুষটি পাদপ্রদীপের আলোয় যতটুকু এসেছেন সেই বাজারের সর্বব্যাপক প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করেই।
বস্তুতপক্ষে শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক, ক্ষেত মজুর, নারী, শিশুশ্রমিক- এক কথায় শোষিত মানুষের জীবনের সমস্যা সংকট, যন্ত্রণা, আবার এসব থেকে মুক্তির সংগ্রাম ও স্বপ্নকে প্রতুল মুখোপাধ্যায় তাঁর গানে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তাঁর প্রায় প্রতিটি গান মানুষের, বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষের আত্মমর্যাদা, মূল্যবোধ, সত্যনিষ্ঠা এবং প্রতিবাদী চেতনাকে তুলে ধরে। 'আলু বেচো ছোলা বেচো', 'সাপের মাথায় পা দিয়ে সে নাচে', 'ছোট ছোট দুটি হাত ছোট দুটি পা', 'কী আমাদের জাত আর ধর্মই বা কী', 'ডিঙ্গা ভাসাও সাগরে সাথীরে', 'প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা', কিম্বা 'কিসের ভয় সাহসী মন লাল ফৌজের' ইত্যাদি গান সেই মনোভাব এবং চেতনার সাক্ষ্য বহন করে। তিনি নিজের এবং অন্য কবির কবিতায় সুরারোপ করেছেন। বহু বিখ্যাত কবির বিখ্যাত কবিতা তাঁর সুরে ও পরিবেশনায় অন্যতর মাত্রা পেয়েছে। কবিতা পড়েন না এমন অসংখ্য মানুষ কবিতার কথাগুলির সাথে সুর, কণ্ঠ এবং শারীরিক বিভঙ্গ সহ এক সামগ্রিক উপস্থাপনায় গভীরতর রস আস্বাদনের সুযোগ পেয়েছেন তার গানের মাধ্যমে।
বাবরের প্রার্থনা, ছোকরা চাঁদ জোয়ান চাঁদ, মে দিবসের গান... ইত্যাদি সকলেরই মনে পড়বে। দেশ-বিদেশের বহু কবির কবিতায় সুর দেওয়া শুধু নয়, গদ্য, এমনকি রাজনৈতিক প্রবন্ধের বিষয়বস্তুকে নিয়ে গান বেঁধেছেন সুর দিয়েছেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়। চীন বিপ্লবের মহান নেতা মাও সে তুং বিপ্লবের দীর্ঘস্থায়ী কষ্টকর সংগ্রামে মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য তাদের দেশের এক পৌরাণিক উপকথাকে উপস্থাপন করেছিলেন। সেই উপকথার গল্পটি হল বোকা বুড়োর পাহাড় সরানোর গল্প। কী অসাধারণ শিল্প নৈপূণ্যে পাঁচালীর সুরে সেই কাহিনীকে তিনি উপস্থাপন করেছেন!
মানুষের সমাজে কোনও কোনও মৃত্যু অতি তুচ্ছ তার ওজন পালকের চেয়েও হালকা। অন্যদিকে কিছু কিছু মৃত্যুর অভিঘাত অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। সে মৃত্যু পাহাড়ের চেয়েও ভারী। মাও সে তুং-এরই এরকম আরেকটি বক্তব্যকে প্রতুল মুখোপাধ্যায় তুলে ধরেছেন গানের মাধ্যমে।
জন্মিলে মরিতে হবে জানে তো সবাই/মরণে মরণে অনেক তফাৎ আছে ভাই রে/সব মরণ নয় সমান। রক্তচোষার উস্কানিতে/জনতার দুশমনিতে/সারা জীবন গেলে কেটে মরণ যদি আসে/সেই মরণের ভার দেখে ভাই পাখির পালক হাসে।
অন্যদিকে-'জীবন উৎসর্গ করে/সব হারা জনতার তরে/মরণ যদি হয়/তাহার ভারে হার মানে ওই পাহাড় হিমালয়'।
স্লোগান, মিছিল, প্রভাত ফেরি উপলক্ষে গণসংগীত গাওয়া হয় আমরা জানি। কিন্তু রাজনৈতিক এই প্রকরণগুলিকে নিয়েই এক একটি গান হতে পারে, প্রতুল মুখোপাধ্যায় ছাড়া আর কোথাও এরকম উদাহরণ বোধহয় পাওয়া যাবে না। বামপন্থা এবং সমাজ পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিত থেকে স্লোগানের মর্যাদাকে তিনি তুলে ধরেছেন।
স্লোগান দিতে গিয়েই যে এক ব্যক্তি মানুষ আত্মকেন্দ্রিক পথ চলা ছেড়ে একসাথে চলতে শেখে, সবার সাথে নিজের দাবি প্রকাশ্যে তোলার অবকাশ পায়। স্লোগান দিতে গিয়েই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো উল্টো স্বভাব দুঃসাহসী যৌবনের সাথে তার সখ্য। সে বুঝতে পারে সাবাশ যদি কাউকে দিতে হয় তাহলে বুনো মোষের ঘাড় ভাঙার সাহস যে দেখায় তাকেই দিতে হবে।
এই যে লড়াই মৃত্যুর সম্ভাবনা এর প্রতিপদে। পথে পথে গুপ্ত সর্প গুঢ় ফনা। এই সব জেনেও সব কিছু কে তুচ্ছ করে জীবনের জন্য তার সংগ্রাম সাপের মাথায় পা দিয়ে নাচার মতোই। কিন্তু কেন? প্রাণের তাগিদ। খরা বন্যা দুর্ভিক্ষ মহামারী তার মাথায় তবু বাঁচার জন্য তার না লড়ে উপায় নেই। কিন্তু শুধুই কি তাই? না, এই জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সংগ্রামে তাকে অনুপ্রাণিত করে শোষণ অত্যাচার থেকে মুক্ত শান্তি, সমৃদ্ধি ও আনন্দময় এক জীবনের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন সফল করতে মূল্য দেওয়ার বোধ তথা মূল্যবোধই তার গানের প্রেরণা 'লড়াই করো লড়াই করো যতদিন না বিজয়ী হও।' এই বলিষ্ঠ বার্তা পৌঁছে দিতেই অসংখ্য গান পরিবেশন করেছেন তিনি মাঠে, ময়দানে, পথসভায়, আড্ডায়, বৈঠকে।
ঘটনাক্রমে তাঁকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখার, তার গান শোনার এবং আড্ডার মেজাজে কিছু আলোচনা শোনার সুযোগ আমার হয়েছিল ২০১৬ সালে মার্চ মাসের শেষ দিকে। বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক শিবদাস ঘোষের বিপ্লবী মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী)-এর ছাত্র শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে উপলক্ষে প্রতিবেশী দেশের ছাত্র সংগঠনের আমন্ত্রণে ভারতবর্ষ থেকে এআইডিএসও-র যে প্রতিনিধি দল এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল তাতে আমিও ছিলাম। আগে থেকে প্রতুলদার সাথেই আমার যাওয়া ঠিক হয়েছিল। আমাদের অন্য কয়েকজন দেশের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে সরাসরি ঢাকা পৌঁছেছিলেন নিজেদের মতো করে। ঢাকা এয়ারপোর্টে নামবার পর একটা ছোট্ট ঘটনায় আমি বুঝতে পারি বাংলাদেশে প্রতুল মুখোপাধ্যায় মানুষটি কতটা জনপ্রিয়।
আমরা দুজন ইমিগ্রেশনে লাইন দিয়েছি। ভিসা পাসপোর্ট দেখিয়ে সই স্বাক্ষর ইত্যাদির রুটিন ভেরিফিকেশনের জন্য। হঠাৎ অফিসের একজন তার টেবিল ছেড়ে প্রতুল দার কাছে এসে খুবই বিনয়ের সাথে তাকে লাইন থেকে বেরিয়ে আসতে বলেন। একটু হতচকিত হয়ে প্রতুল দা কারণ জানতে চান। অফিসার ভদ্রলোক সহাস্যে বলেন, অন্য কিছু না স্যার অত বড় লাইনে দাঁড়িয়ে আপনার কষ্ট করার দরকার লাগবে না।
-তাতে কী, সকলেই তো লাইনেই দাঁড়িয়ে।
-সেজন্য কেউ কিছু মনে করবেন না। আপনি আসুন।
-আপনি কি আমাকে চেনেন।
-বাংলাদেশের মানুষ, শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়কে চিনবো না!
এবার প্রতুল দাও হাসলেন। বললেন- আমার সাথে আর একজন কিন্তু আছেন। ভদ্রলোক আমাকেও ডেকে নিলেন। তারপর মিনিট কয়েকের মধ্যেই অফিসিয়াল কাজগুলো সেরে আমরা এয়ারপোর্টের বাইরে বেরিয়ে এসেছিলাম।
সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশের পরে শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায় গান গাইবেন আগে থেকেই তার ঘোষণা ছিল। তিনি যখন গান গাইতে শুরু করলেন তখন রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশের সমাবেশ আর ছাত্র সমাবেশ ছিল না। ছাত্রদের সাথে সাথে জড়ো হয়েছিল কয়েক হাজার সাধারণ মানুষ। কিন্তু ততক্ষণে ঢাকা শহরের আকাশ জুড়ে সেজে উঠেছিল কালবৈশাখীর মেঘ। কয়েকটি গান গাওয়ার পরেই যখন বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হল বোঝা গেল আর বেশিক্ষণ চালানো যাবে না। তখন সেই বৃষ্টির মধ্যে চারিদিক থেকে 'আমি বাংলার গান গাই' গানটির জন্য অনুরোধ আসছিল। শিল্পী যখন সে গান গাইছেন তখন সমগ্র জনসমাবেশ বৃষ্টির মধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে গলা মিলিয়েছে- 'আমি বাংলায় গান গাই/আমি বাংলার গান গাই/আমি আমার আমি কে চিরকাল এই বাংলায় খুঁজে পাই'...
আমরা সকলে জানি, একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ গড়ে ওঠার পেছনে বাংলা ভাষার দাবি কত বড়ো ভূমিকা পালন করেছিল। এই বাঙালি অস্মিতাকে প্রতুল মুখোপাধ্যায় প্রকাশ করেছেন তাঁর গানে। স্বাভাবিকভাবে তা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছে গভীরভাবে। যদিও নিজের ভাষার প্রতি এই আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে অন্য ভাষাকে ছোট করার সামান্য কোনও চেষ্টা এই গানে নেই এবং সে কারণেই যে কোন দেশপ্রেমিক মানুষের কাছে এই গানের আবেদন অত্যন্ত গভীর না হয়ে পারে না।
এ কথা ঠিক, বাংলাদেশে তার এই গান ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। কিন্তু এই গানটিতেই তাঁর সঙ্গীত প্রতিভার সম্পূর্ণ পরিচিতি নিহিত আছে বা কেবল ওই গানটির জন্যই বাংলাদেশ প্রতুল মুখোপাধ্যায় কে চেনে মনে করলে ভুল ভাবা হবে। সেদিন মাঝ পথে গানের আসর ভেস্তে যাওয়ার পর ওই সন্ধ্যেবেলায় উদ্যোক্তারা ঠিক করেন একদিন পরে ঢাকা শহরের বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তন নামক একটি প্রেক্ষাগৃহে একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। অনুষ্ঠানটির নাম দেওয়া হয় 'আড্ডায় ও গানে প্রতুল মুখোপাধ্যায়'। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সুবাদে আমার সুযোগ হয়েছিল শ্রোতাদের নানা প্রশ্নের উত্তরে উঠে আসা গান সম্পর্কে সমাজ সম্পর্কে প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের চিন্তাভাবনার কথা শুনবার। দেখেছি কীভাবে শ্রোতারা নানা প্রশ্ন করছেন আর একের পর এক গান উল্লেখ করে গাওয়ার জন্য আবদার করছেন। আর সেই গান শুনে গোটা হল ফেটে পড়ছে উচ্ছ্বাসে।
প্রতুল মুখোপাধ্যায় মঞ্চে একা গান করেছেন যন্ত্রানুসঙ্গ ছাড়াই। কেন তিনি অন্যান্য শিল্পীর মতো হারমোনিয়াম-তবলা সহ অন্যান্য যন্ত্র তাঁর গানের সঙ্গত করার কাজে ব্যবহার করলেন না? গানের আবহ রচনা কিম্বা তাল মাত্রা ঠিক রাখতে তাঁর দুটি হাত এবং কণ্ঠকেই অভিনব ভাবে ব্যবহার করে যন্ত্রাণুসঙ্গের অভাব পূরণ করার ব্যাপারটা কীভাবে এলো?
সেদিন এই প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন-'সব গানেই বিনোদনের একটা ব্যাপার থাকে। আমার গানে ও সেটা আছে। কিন্তু সেটা আরামে থাকা মানুষদের ড্রয়িংরুমের বিনোদন নয়। আমি যে যন্ত্র ব্যবহার করিনি সেটা প্রথম থেকেই যন্ত্র ব্যবহার করব না ভেবে করিনি এরকম ব্যাপার নয়। পরিস্থিতির কারণেই সেটা সম্ভব ছিল না। রাজনৈতিক মিটিংয়ে আড্ডায় আমার গান গাওয়া যাদের জন্য, লোক-লস্কর নিয়ে তাদের কাছে গান শোনাতে যাওয়ার উপায় ছিল না। খালি গলায় একা গিয়েই তাদের গান শোনাতাম। আমার একার ভাড়াটাও তারা দিতে পারতোনা অনেক সময়। যখন চাকরি পাইনি একটু অসুবিধাই হতো। আরো পাঁচটা লোককে নিয়ে যাওয়ার খরচ পাব কোথায়? গান গাওয়ার ডাক পেয়েছি। কাদের ঝোলায় গানের খাতা নিয়ে লোকাল ট্রেনে গিয়ে গান শুনিয়ে লোকাল ট্রেনেই ফিরে এসেছি। যন্ত্র আর যন্ত্রী জোগাড় করা আমার সাধ্যের বাইরে। আমি তাই চেষ্টা করেছি যন্ত্র ছাড়া কীভাবে গানটাকে উপস্থাপন করা যায়। তালটা ঠিক রাখা দরকার, হাতকে ই ব্যবহার করেছি। একটু আবহ রচনা করার যেখানে দরকার, গলাকেই অন্যভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি। এর জন্য আমাকে খাটতে হয়েছে, শিখতে হয়েছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে'। পরবর্তীকালে দু-একবার আমার গানের সাথে সঙ্গত করার চেষ্টা করেছেন কেউ কেউ। পরে রেকর্ডিং শুনে আমার নিজের মনে হয়েছে ঐ সংগতের খুব প্রয়োজন কিছু নেই।'
আধুনিক বিজ্ঞাপন ও বিপণনের স্রোতের বিপরীতে তাঁর যন্ত্রানুসঙ্গহীন এই গানের মাধ্যমে অর্থাগম তথা কেরিয়ার নির্মাণের কথা ভাবা যায় না। বাণিজ্যিক বিনোদনের সে ভাবনা তিনি ভাবতেও চাননি। আসলে তিনি চেয়েছেন সমাজ সচেতন, মননশীল শ্রোতার কাছে পৌঁছোতে। একই সাথে তার সঙ্গীত শ্রোতার মননশীলতা, সমাজ সচেতনতা গড়ে তুলবার একটা মরিয়া চেষ্টাও বটে। প্রথমের দিকে একটা নির্দিষ্ট বৃত্তের বাইরে তার গানের খুব বেশি শ্রোতা জোটেনি। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের নিজের ভাষায় বলতে গেলে সে সময়ে তাঁর গান ছিল, কিন্তু কান ছিল না। সেই গান শুনবার মতো কান তৈরি করতেও তিনি লড়ে গিয়েছেন অক্লান্ত।
অনেকে তাঁকে গণসঙ্গীত শিল্পী বলেন। কিন্তু তিনি তাঁর গানকে গণসঙ্গীত বা নিজেকে সেই অর্থে গণসঙ্গীত শিল্পী বলতে চাননি, কেন? সে দিনকার আড্ডায় গল্প করতে করতে বলেছিলেন, গণসঙ্গীত মানে যদি গণ বা জনগণের মনে আলোড়ন সৃষ্টিকারী গান ধরা হয় তবে একটি স্বার্থক প্রেমের গানও সে কাজ করতে পারে। সাধারণভাবে লড়াই সংগ্রাম রাজনৈতিক স্লোগানধর্মী গানকেই বোঝানো হয়। কিন্তু তিনি মনে করেন যে গণসঙ্গীত যদি গণ বা জনগণের জন্য হয় তাহলে জীবনে যা স্বাভাবিক সেই জীবনের প্রতি ভালোবাসা প্রেম-এ সবকে বাদ দিয়ে, সৌন্দর্যকে বাদ দিয়ে জনগণের সঙ্গীত কি করে হবে? আবার উল্টো দিক থেকে বলতে গেলে প্রেমে যদি বলিষ্ঠতা না থাকে, নারীর যন্ত্রণার প্রতি প্রেমিক যদি উদাসীন হয়, তার ভাগ নিতে না পারে, তার সংগ্রামের পাশে না দাঁড়ায় তবে সেই প্রেম কি প্রেম? কিছুটা কম প্রচলিত কয়েকটি গান পর পর সেদিন গেয়েছিলেন-
মায়ের জাত মেয়ের জাত
দেবির সামনে জোড় হাত
মেয়েছেলে মেয়েমানুষ
এ সব বুলি থাক।
ওদের মানুষ বলে ভাবছে কারা
সেটাই দেখা যাক।
খালি আহা উহু নয়
অশ্রু মুহুর্মুহু নয়
কিংবা কুহু কুহু নয়
ওসব তোলা থাক
কেউ কি নিতে রাজি ওদের যন্ত্রণারই ভাগ
নারী তো বেচারি নয়
দয়ার ভিখারী নয়,
গড়তে যেমন জানে
তেমন লড়তে জানে নারী
থাকতে সাথে রাজি কারা জানাটা দরকারি।
প্রতিবাদের সংস্কৃতির সাথে সঠিক প্রেমের ধারণার সম্পর্ক কতটা গভীর সেটা বোঝাতে গিয়ে আরেকটি গান সেদিন তিনি গেয়েছিলেন প্রেমের নামে নারীকে হাতে চুড়ি নাকে নোলক উপহার দিয়ে বন্দী করে রাখার যে হীন স্বার্থপরতা তাকে উপহাস করে এটি একটি বিদ্রূপাত্মক উপস্থাপনা 'একটি নোলক পাঠাইলাম পরিও/বাক্সে ভরিয়া রাখিও না।' সেই গানে হাসি আর হাততালিতে ফেটে পড়েছিল সেই প্রেক্ষাগৃহ। শ্রোতারা মুগ্ধ। ২০১৬ সালে তাঁর বয়স বোধহয় ৭৫-এর কাছাকাছি। এই বয়সেও গায়ক তার গানের বিষয়বস্তু সুর ও পরিবেশনার মুন্সিয়ানায় সকলকে আপ্লুত করে তুলছেন অবাক হয়ে দেখেছি।
আরেকটা বিষয় উল্লেখ করা দরকার ভারতবর্ষে বা বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় উন্মাদনা সম্পর্কে প্রতুল দার একই সাথে বিতৃষ্ণা এবং উদ্বেগ ছিল। হিন্দু বা মুসলমান যে ধর্মেই হোক সবকিছু ভগবানের ইচ্ছাতেই ঘটছে, ধর্মপ্রাণ মানুষের এই বিশ্বাস যে সমাজে শোষক পরোপজীবিদেরই সুবিধা করে দেয় ঢাকায় সেদিন এমনই একটি গান অনবদ্য ভঙ্গিতে তিনি গেয়েছিলেন।
'কেউ কথা বোলো না কেউ শব্দ কোরো না/ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন/গোলযোগ সইতে পারেন না।/ একদা ঊষা কালে মরিয়া লীলাছলে ভগবান বিশ্ব গড়িলেন'...
বিশ্বে তার কৃপাধন্যরা বিলাসব্যসন ব্যভিচারে রসে বসে থাকে। সমাজের সমস্ত সম্পদের মালিকানা কুক্ষিগত করে। আরাম-আয়েশ আর কর্মহীন জীবন যাপনে দেহে তাদের 'ফ্যাট গ্যাদার' করে। গরিব মেহনতী কথা বলার উপায় নেই শব্দ করার অধিকার নেই। তাতে ভগবানের নিদ্রা টুটে যাবে।
এই অনুষ্ঠানের শেষ হয়ে যাওয়ার পরে আমরা আমাদের থাকার জায়গা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউসে ফিরে আসি। আপ্লুত দর্শকরা যাদের মধ্যে কিছু অনাবাসী বাংলাদেশীও ছিলেন, নিজেদের মধ্যে থেকে কিছু অর্থ সংগ্রহ করে বেশ কয়েকশো ডলার তখনকার ভারতীয় টাকায় ৩০-৩৫ হাজার টাকা হবে, প্রতুল দার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য কয়েকজনকে পাঠান। প্রতুল দা কিন্তু কিছুতেই নিতে রাজি হলেন না যারা এসেছিলেন হতোদ্যম হয়ে, কিছুটা দুঃখ পেয়ে ফিরে গেলেন। পরের দিন দেখা করতে এলেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী)র সাধারণ সম্পাদক মুবিনুল হায়দার চৌধুরী। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে আড্ডা দিলেন ওরা। হায়দার ভাই ফিরে যাওয়ার পর প্রায় স্বগতোক্তির মতো বলছিলেন- 'কত বড় মানুষ! কত ঝড় ঝাপটা জীবনে! অথচ কত শান্ত কত সুন্দর! পাশে বসে কথা কইলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। এবারের ঢাকা আসাটা আমার স্মরণীয় হয়ে রইল'। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে আবার বললেন- হায়দার ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম বুঝলে, শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারাকে গভীরভাবে জানি না, মার্ক্সবাদে বিশ্বাস করি, বামপন্থীদের ভালোবাসি তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়ুক চাই, কিন্তু যেহেতু আপনাদের সম্পর্কে বিশেষভাবে জানি না সে ভারতে হোক বা বাংলাদেশে, তাই আলাদা করে আপনাদেরকে সমর্থন করার প্রশ্ন নেই, কিন্তু তা সত্ত্বেও আপনি, আপনারা আমাকে এত ভালবাসেন কেন? হায়দার ভাই কী উত্তর দিলেন জানো? বললেন-আপনি তো নেতা, তাত্ত্বিক বা দার্শনিক নন। সে হিসেবে আপনাকে ভালোবাসি তা তো নয়। আপনি গুণী শিল্পী। প্রতিবাদের জন্য যে মূল্যবোধ দরকার তারও যে সৌন্দর্য আছে সেটা পাওয়া যায় আপনার গানে, তাই আপনাকে ভালোবাসা। এক্ষেত্রে তো সকল বামপন্থীই আপনাকে ভালবাসবে।
আমি তাকিয়ে ছিলাম প্রতুল বাবুর দিকে। নিজেই বললেন, কাল ছেলেগুলিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। হায়দার ভাই বললেন ওরা ভালোবেসে শ্রদ্ধার সঙ্গে দিতে চেয়েছেন। কথাটা অস্বীকার করতে পারলাম না।
রাজনৈতিক ভাবে বামপন্থায় বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও শেষ জীবনে শাসকদলের অন্যায় অত্যাচার সম্পর্কে কিছুটা নীরবতা পালন করা সহ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। তার মৃত্যুর পর এই প্রসঙ্গ তুলে সংখ্যায় অল্প হলেও কিছু মানুষ তার অরুচিকর কঠোর সমালোচনা করেছেন। কেউ কেউ সে কাজ করতে গিয়ে প্রয়াত মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা সৌজন্য শালীনতার সীমা অতিক্রম করে স্রেফ কাদা ছুড়েছেন। কিন্তু তাঁরা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের নিন্দা ও ধিক্কার কুড়ানো ছাড়া কিছু করতে পারেননি। মানুষও তাদের কথায় সায় দেয়নি।
সরাসরি রাজনীতির লোক না হলেও গোড়া থেকেই প্রতিষ্ঠানবিরোধী রাজনীতির সাথে তার সম্পর্ক। সত্তরের দশকে নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কারও অজানা নয়। সেই সময় এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে যাঁদের প্রাণ গিয়েছিল তাদের প্রতি তার গভীর মমত্ব আজীবন ধারণ করেছেন। এক সময় সেই আদর্শের পথনির্দেশ সম্পর্কে তাঁর গভীর সংশয় জন্ম নিয়েছে। সেই আন্দোলনের ব্যর্থতা, পরবর্তীতে নেতৃত্বের আপস, সুবিধাবাদ নৈতিক অধঃপতন ইত্যাদি দেখে যার পর নাই যন্ত্রণা বোধ করেছেন। কিন্তু তিনি সিনিক হয়ে যাননি কোনও দিন। বামপন্থায় আস্থাও হারাননি আমৃত্যু। বরঞ্চ তার মতো করে উত্তর খুঁজবার চেষ্টা করেছেন বহু প্রশ্নের। বয়সের ভার, শারীরিক শিথিলতা, পারিবারিক টানা পোড়েন, শেষের দিনগুলিতে নির্ঝঞ্ঝাট থাকার ইচ্ছার মধ্যে সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে পেয়েছেন, কোনও বিভ্রান্তির শিকার হননি, এ কথা বলা যাবে না। তবে এ কথা অবশ্যই বলা যাবে সঙ্গীত সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে কিংবা সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে তাঁর অবস্থানে কোনও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। লক্ষ যদি করাও যেত তাতেও তাঁর লেখা, সুর করা গাওয়া গানগুলির আবেদন কি শেষ হয়ে যেত?
সঙ্গীতকে হাতিয়ার করে সমাজ পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় যে সাংস্কৃতিক মান গড়ে তোলা জরুরী। গানের মধ্যে সেই কাজটি করে যাওয়ার আন্তরিকতা বা চিন্তাভাবনায় কোনও ফাঁক বা আপস করেছেন- একথা বোধ হয় কেউ বলতে পারবেন না। সেজন্যই তার গান থেকে যাবে তার মৃত্যুর পর বহুকাল। অন্যায় অত্যাচারের প্রতিবাদের শক্তি খুঁজে পাবেন প্রতিবাদী মানুষ।
যতক্ষণ শরীর চলেছে যেখানেই গান গাওয়ার ডাক পেয়েছেন ছুটে গেছেন। সমাজের প্রয়োজনে সঙ্গীত চর্চা করার এই ধারায় পরবর্তী প্রজন্মকেও যত দূর পারা যায় উৎসাহিত করেছেন। এমনকি শিশু শিল্পীদের সাথেও মিশেছেন অনায়াসে। সামান্য সম্ভাবনা দেখলে আনন্দে উদ্বেল হয়েছেন।
লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে বাধার পাহাড়কে যত অনড়, বিশাল বা দুর্লঙ্ঘ্য মনে হোক, তাকে সরানোর স্বপ্ন নিয়ে তাঁর মতো করে তার সঙ্গীতের হাতিয়ারটি নিয়ে আমৃত্যু কাজ করে গিয়েছেন এই কঠোর পরিশ্রমী 'বোকা বুড়ো'! ¤
(২০২৫ সালের মার্চে পথিকৃৎ প্রকাশিত "জনগণের শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়" পুস্তিকা থেকে নেওয়া।)
অসাধারণ একজন ব্যক্তিত্ব... লেখাটা আগে পড়েছি, আবারও পড়লাম। ধন্যবাদ।
পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২
দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com