রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার ভিত্তিতে ম্যাক্সিম গোর্কি'র উপন্যাস 'মা' (দ্বিতীয় পর্ব)

সুব্রত গৌড়ী | বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

< দ্বিতীয় পর্ব >

।। দ্বিতীয় খণ্ড : মা যখন নিজেই বিপ্লবী কর্মী ।।

একটা কারখানা এবং তাকে কেন্দ্র করে শ্রমিক বস্তির একঘেয়ে জীবনের মধ্যে মে দিবসের বিশাল মিছিল নতুন জীবনের আহ্বান জানিয়ে সে উত্তাল তরঙ্গ তৈরি করল, তার মধ্য দিয়ে এক নতুন মায়ের উত্থান হতে দেখেছি প্রথম খণ্ডের শেষে। দ্বিতীয় খণ্ডে আমরা সেই মায়ের বিকাশের কাহিনী পাই। এখানে আমরা মাকে পাচ্ছি নতুন রূপে-যে মা শুধু তার ছেলে ও তার বন্ধুদের কথাবার্তা, তর্ক-বিতর্ক পাশ থেকে শোনে না, নিজেও তাতে অংশগ্রহণ করে, কিছু করবার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে।

তাই প্রত্যন্ত প্রদেশে ছোট্টবেলা থেকে যে জীবনে অভ্যস্ত ছিল, ছেলে গ্রেফতার হওয়ার পর সেই পরিচিত জীবন ছেড়ে যখন পাকাপাকি শহরে চলে এল এবং নিকলাই ইভানভিচের কাছে শুনল যে, সে কাজ পাবে, তখন তার উৎসুক জিজ্ঞাসা- 'সত্যি? সত্যি পাবো?'

সত্যি সত্যি কাজ পেল। চাষিদের কাছে বিপ্লবী দলের কাগজপত্র পৌঁছে দেওয়ার কাজ। নিকলাই-এর বড় বোন সোফিয়ার সাথে যখন দূর প্রদেশে চাষিদের উদ্দেশ্যে রওনা হল, কে বলবে এই সেই মা, যে সবসময় ভয় আর সংশয় নিয়ে দিন কাটাত? নিকলাই যখন বলল এই কাজের মধ্যে যে বিপদ আছে, তখন মা ব্যাকুলভাবে বলেছিল- "দিন, দিন আমায়। দেখবেন ঠিক পারব। যেখানে বলবেন যাব। মুসাফিরের পা থামবে না। যতদিন না কবরে গিয়ে সেঁধুই ঠিক পথ খুঁজে খুঁজে চিনে নেব। শীত-গ্রীষ্ম কোনও সময় শুধু চলব আর চলব!” বাস্তবে আমরা দেখি, উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত মায়ের পথচলা থামেনি। যে কোনও ঝুঁকির কাজ হাতে নিতে মা কখনও পিছপা হয়নি।

মায়ের এই পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে তার নিজের অন্তরেরর গভীরে। নিকলাই আর সোফিয়ার কাছে তার বিগত জীবনের কাহিনী বলতে বলতেই মা তার চেতনার উত্তরণের কথা বলে, "এখন একটু একটু বলতে পারি। নিজের কথাও বলতে পারি, অন্যের কথাও। এখন বুঝতে শিখেছি কিনা! তুলনাও করতে পারি। আগে পারতাম না। তুলনা করবার ছিলই বা কী। আমাদের সবই তো সেই থোড়-বড়ি-খাড়া আর খাড়া-বড়ি-থোড়। কিন্তু এখন দেখছি দুনিয়ার আর দশজন কেমনভাবে থাকে। কিসের মধ্যে যে ছিলাম, সেই কথাই মনে পড়ে যায়। ভাবতে মন ভারি হয়ে ওঠে।"

এই নবলব্ধ চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে মা বলতে থাকে-"আমার মাথা খালি ঘোরে। আমি নিজেকেই চিনতে পারছি না। আগে কাউকে কিছু বলতে হলে, অনেক ভেবে, অনেক পিছিয়ে, বিষম খেয়ে তবে বলতে পারতাম। আজকাল কিন্তু মনটা যেন হাঁ করেই আছে। ফস্ করে এমনি সব কথা মুখে আসে, যা আগে হয়তো ভাবতেও পারতুম না..."

মায়ের এই পরিবর্তন চোখে পড়ে আর একটা ঘটনায়। ছেলে রয়েছে জেলে। মা জানে তার কড়া সাজা হবে। এই অবস্থায় আগে হলে প্রতিটি মুহূর্ত ছেলের চিন্তাতেই মায়ের মন ছেয়ে থাকত। কিন্তু এখন এসব কথা মনে হলেই মনে পড়ে যায় আন্দ্রেই, ফিওদর এবং আরও অনেকের কথা। যারা এপথে গেছে তাদের সবার মধ্যে ছড়িয়ে আছে পাভেল। একটা বিস্তৃত সাধারণ মূর্তি মার চোখে ভেসে ওঠে। নিজের অজান্তে, অনিচ্ছায়, পাভেলের ভাবনা তাতে প্রসারিত হয়, একদিকে সরে যায়। এই ভাবনা পাতলা রশ্মির মতো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে, আলোকিত করে সবকিছুকে একটি নক্শায় গেঁথে নেবার চেষ্টায়। ফলে তার মন কোনও একটা কিছুতে, বিশেষত ছেলের জন্য ব্যাকুলতা আর ভয়ে নিবদ্ধ হতে পারে না।

এখন মা যে কাজ করে, তা করে এই নবলব্ধ চেতনার ভিত্তিতে। তাই নিকলাই-এর বোন সোফিয়ার সাথে যখন কৃষকদের জন্য সংবাদপত্র নিয়ে গেল, তখন কথাবার্তা, আচরণে মনে হয়নি যে, সে একজন শিক্ষানবিশ। কৃষকদের নেতা রীবিন মায়ের কাছে তাদের বহুদিনের ইপ্সিত কাগজপত্র পেয়ে উপস্থিত যুবকদের বলে- "দেখরে ছোঁড়ারা, দেখ... ছেলেকে মারলেও মাকে মারতে পারেনি।... ছেলেকে নিয়ে গেছে, মা এসে তার ঠাঁই নিয়েছে, কেমন?'

রীবিন ভুল বলেনি, সত্যিই তো, ছেলে জেলে যাওয়ার পর তার কাজ হাতে তুলে নিয়েছে তার মা। তাই মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়, বলে, "এই রাস্তায় এসে ছেলের কাজ মা নিজের হাতে তুলে নিয়েছে, বোধহয় এই প্রথম।"

এরপর মাকে সক্রিয় কর্মী হিসেবেই দেখি। গ্রামের হাবাগোবা বয়স্ক মহিলা নয়, সদা সতর্ক গোপন কার্যকলাপ চালানোয় দক্ষ, বুদ্ধিমান কর্মী। তাই দলের পরিচালকরা তাঁকে কোনও কাজ দিতে দ্বিধা করে না, মাও আনন্দের সঙ্গে যে কোনও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নিতে পিছপা যায়না।

মা এখন প্রদেশের নানা জায়গায় গোপনে বেআইনী বই পুস্তিকা ও খবরের কাগজ নিয়ে যায়- বেশ বদল করে কখনও সন্ন্যাসিনী, কখনও লেস আর কাটা কাপড়ের ফিরিওয়ালি, কখনও সংগতিসম্পন্ন মহিলা বা মুসাফির সেজে ঝোলা কাঁধে, নয়তো সুটকেস হাতে প্রদেশটা চক্কর দিয়ে আসে। আর এই কাজ করতে গিয়ে বাস্তব জগৎ সম্পর্কে মায়ের উপলব্ধি গভীর হয়। যে ঈশ্বরের বিশ্বাস তার মনের গভীরে রয়েছে তাতেও ধাক্কা লাগে। মা দেখে সংসারে কিছুরই অভাব নেই, তবু দুনিয়ার অজস্র ধনসম্ভারের সামনে জনগণ অর্ধাসনে অনশনে, ধুঁকে ধুঁকে জীবন কাটায়। শহরের গির্জায় গির্জায় কী অঢেল ঐশ্বর্য। সোনা রূপো দুহাতে ছড়ানো- তার কণারও দরকার নেই ভগবানের, অথচ সেই গির্জারই দরজায় অর্ধ-উলঙ্গ ভিখারীর দল অবহেলায় ছুঁড়ে দেওয়া ছিটে ফোঁটার জন্য শীতে কাঁপতে কাঁপতে হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে। আগেও এই সব দেখেছে- ধনী গির্জা ও পুরোহিতদের সোনার সুতোয় বোনা পরিচ্ছদের চোখ ঝলসানো আড়ম্বর আর সেই সঙ্গে গরিব জনগণের কুটির আর তাদের ছেঁড়া কাপড়। আগে সেটা ওর স্বাভাবিক মনে হত, কিন্তু এখন যেন আর সহ্য হয়না। মনে হয় দারিদ্রের এতবড় অপমান আর নেই। সে জানে গির্জার দরকার তো দীন-দুঃখীরই বেশি।

মায়ের মনে পড়ে যায় রীবিনের কথাগুলো-"দেবতার নামেও ব্যাটারা আমাদের ঠকিয়েছে।"

মা নিজেই টের পায় না যে, সে ভগবানের কাছে প্রার্থনা আগের চেয়ে কম করতে শুরু করেছে। কিন্তু বেশি করে ভাবতে শুরু করল যীশুর কথা, আর যারা তার নাম উল্লেখ না করেও, তাঁকেও যেন একেবারে না জেনেও তাঁরই আদর্শ মতো জীবন কাটায়, তাঁরই মতো দুনিয়াকে দীনের দুনিয়া বলে জ্ঞান করে দুনিয়ার ঐশ্বর্য সবার মধ্যে সমানভাবে বিলি করতে চায়- তাদের কথা। মায়ের আরও মনে হতে লাগল, যাঁকে সে সর্বদা অস্পষ্টভাবে ভালবেসে এসেছে এক জটিল অনুভূতি দিয়ে- ভয়ে ভরসায়, আশায় আনন্দে মিশিয়ে- সেই যীশুখৃষ্ট তার আরও নিকট হয়ে উঠেছেন- আরও উচ্চ, আরও দৃশ্য তাঁর মুখ আরও নন্দিত, যেন সত্যিই পুনরুজ্জীবিত হয়েছেন তিনি।

উপন্যাসের শুরুর দিকে পাভেল ও তার বন্ধুদের ঈশ্বরে অবিশ্বাস দেখে মায়ের মন দুঃখিত ও ব্যথিত হতে দেখেছি। হচ্ছে, তা আসলে মায়ের চেতনার উজ্জীবন। মা ধীরে ধীরে মায়ের মধ্যে যীশুখৃষ্টের পুনরুজ্জীবনের যে অনুভূতি সৃষ্টি বুঝতে পারে যে, তার ছেলেরা দীনদরিদ্রের দুঃখমোচনের জন্য যে লড়াই করছে, সেই লড়াইয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছেন যীশু যীশু যদি এখন বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনিও এই লড়াইয়ের সামনের সারিতে থাকতেন।

এখন যে মাকে দেখি, তার মধ্যে কোনও জড়তা নেই, যে কোনও কাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে যায়। ভেসভশ্চিকভ জেল থেকে পালিয়ে এলে তার জন্য ছদ্মবেশের পোষাক তৈরি বা বিপ্লবী কর্মী অসুস্থ ইয়েগরের শুশ্রূষা- কোনও কাজেই তার ক্লান্তি নেই। কোনও কাজের ভার দিলেই কাজটা একেবারে কি করে তাড়াতাড়ি এবং নিখুঁত করে করবে কেবল সেই ভাবনাই কাজ করে মায়ের। আর কোনও কথা তখন মাথায় থাকে না।

এরপর যখন ছাপাখানায় লুদমিলাকে সাহায্য করার জন্য কোনও একজন কমরেডের সাহায্যের প্রয়োজন দেখা দিল তখন মা এগিয়ে আসে, বলে, 'আমায় দিয়ে হবে না?' যখন নিকলাই ইতস্ততঃ করে বলে, "তাতো হবে না। ভারি কষ্ট হবে যে আপনার! থাকতে হবে শহরের বাইরে, পাভেলের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ তো চলবে না!" তখন মা তার প্রতিবাদ করে বলে- "পাভেলের পক্ষে তাতে সাংঘাতিক কিছু একটা এসে যাবে না।" এই মা উন্নত চেতনায় উজ্জীবিত মা। এই মা এখন চারিদিকে শুনতে পায় ধারাল ঝাঁঝাল কথা, চারিদিকে কিসের যেন উত্তেজনা... একটা ইস্তাহার বের হলে তা নিয়ে দোকানে, বাজারে, কুলি-চলে। সাধারণ মানুষও এখন ঘন ঘন বলে সমাজতন্ত্রীদের মজুর, ঝি-চাকর সবার মধ্যেই জোর আলোচনা ও তর্ক চলে। সাধারণ মানুষও এখন ঘন ঘন বলে সমাজতন্ত্রীদের বিষয়ে কিম্বা বিদ্রোহ, রাজনীতি ইত্যাদির কথা। আগে এসব কথা শুনলে মা ভরে মরে যেত।

আর এখন? ভয়ের কথা বা আপনি পারবেন তো? কষ্ট হবে না তো? এইসব কথা জিজ্ঞেস করলে মায়ের মনে হয় ওরা যেন দূরে সরিয়ে দিচ্ছে ওকে, পর পর মনে করছে ওকে। তাই দ্বিতীয়বার কৃষকদের কাছে কাগজপত্র নিয়ে যেতে পারবে কিনা কথা জিজ্ঞেস করায় মা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলে- "কেন? ভয় পাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন? কৈ নিজেদের মধ্যে তো ও কথা তোলেন না?" সোফিয়া বোঝে মায়ের এই নতুন রূপ সে চিনতে পারেনি। তাই অনুশোচনার মন নিয়ে মাকে বলে- "ক্ষমা করুন, আর কখনও বলব না।"

বাস্তবে দেখা গেল মা একাই পৌঁছে গেল কৃষকদের মাঝে। যখন তাদের নেতা রীবিন পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে, চোখের সামনে দেখেছে তার উপর অকথ্য অত্যাচার, তার জন্য মন কেঁদেছে, কিন্তু কর্তব্যভ্রষ্ট হয় নি, সামান্য অসাবধানতায়, আবেগের সামান্যতম প্রকাশেই বিপদ ঘটতে পারত, কিন্তু অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিজের কর্তব্য ঠিক ঠিক পালন করেই ফিরে এসেছে।

ছেলে এখনও জেলে। জানে তার সাজা হবে। মাঝে মাঝে ভাবনা হয়, আবার গর্বও হয়। তাই চাষীরা তার ছেলের কথা জানতে চাইলে মা সগর্বে বলে চলে- "এই নিয়ে দুবার জেল খাটা হল ছেলের। ...কারণ দেবতার সত্যকে বুঝে মানুষের বুকে বিছিয়ে দিয়েছে...এই হল তার অপরাধ।...ওই তো বার করেছে ঐ কাগজ। ওর মাথারই কাজ। মিখাইলো ইভানভিচের বয়স তো তার ডাবল। কিন্তু আমার ছেলেই তো বুঝিয়ে শুনিয়ে এই পথে টেনে আনল তাকে। আর কি, মামলা হবে- দেবে ঠেলে সাইবেরিয়ায়। কিন্তু সেখান থেকে পালিয়ে এসে আবার কাজে লেগে যাবে..."

বলতে বলতে আরও ফুলে ওঠে মায়ের বুক। কিন্তু ছেলের চিন্তাতেই আটকে থাকে না মায়ের ভাবনা। আরও যারা এই পথে এসেছে তাদের সাথে ছেলের চিন্তা একাকার হয়ে যায়- "ওর মতো অনেক মানুষ আছে; আরও জন্মাচ্ছে দিনে দিনে। যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন তারা লড়াই করে যাবে সত্যের জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য..."

একান্ত প্রিয়জন যারা তাদের কথা বলতে গিয়ে মায়ের মুখের ভাষা ভালবাসা আর আবেগে উচ্ছ্বল হয়ে ওঠে। চাষিদের উদ্দেশ্যে বলে, "নিজেদের দিকে চায়নি তারা, নিজেদের লাভের কোনও কথা না ভেবে দুনিয়ার মানুষের সুখের পথ তারা দেখিয়ে দেবে। কাউকে ঠকায়নি, ঠকাতে চায়নি। খোলাখুলি বলব- এ বড় শক্ত পথ! কাউকে তারা জোর করে টেনে আনেনি। কিন্তু একবার যে এসেছে, আর সে পেছন ফেরেনি; কেননা সে দেখেছে এখানেই সত্য, এই খাঁটি পথ, এছাড়া আর পথ নেই।"

সেই সত্যের কথা বলতেই আজ নেমেছে মা নিজেই। এতদিন শুধু শুনেছে, মা বড়জোর দু'চারটা কথা বলেছে, কখনও কখনও উপযুক্ত শব্দ না পেয়ে চুপ করে গেছে। কিন্তু আজ আর কথা হাতড়াতে হয়না, কথার দল আপনি এসে ধরা দেয়। হৃদয় নিঙড়ানো অনুভূতি ও আবেগ দিয়ে মা চাষিদের আহ্বান জানায়- "ওদের সঙ্গে যেতে ভয় পেয়োনা। খুদ-কুঁড়ো পেয়ে তুষ্ট হবার মানুষ নয় ওরা। যতদিন না সমস্ত পৃথিবী থেকে লোভ, শোষণ একেবারে শেষ হয়ে যাবে ততদিন ওরা থামবে না। কারুর কাছে মাথা নোয়াবে না। শুধু যেদিন সমস্ত জনতা এক হয়ে কণ্ঠ মিলিয়ে বলবে, আমিই রাজা, আমিই প্রভু; আমাদের আইন আমরাই করব- সেই আইন সকলের জন্য সমান হবে- সেইদিন তারা সেই গণরাজের সামনে মাথা নোয়াবে..."

কোমল একটি ছায়া যেন গভীর স্নেহের আলিঙ্গনে জড়িয়ে থাকে মাকে। অজানা সেই সর্বত্যাগী লোকেদের জন্য মা'র বুকখানা উষ্ণতায় ভরে ওঠে।

এভাবেই বিপ্লবী সংগঠনের নানা দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে মায়ের সংগ্রামী চেতনার উত্তরণ ঘটতে থাকে। তারপর এল বিচারের দিন। কবে ছেলের বিচার হবে তা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়েই এসে গেল সেই দিনটি। এর মধ্যেই মায়ের বুঝতে বাকি নেই যে, বিচার ব্যবস্থার পুরোটাই একটা প্রহসন। ভাল কিছু আশা করে যে সে বিচারালয়ে এসেছে, তা নয়। কিন্তু সেখানে এসে তার সামান্যতম যতটুকু মোহ ছিল তা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সবকিছু ছাপিয়ে সারা শরীরে অনুরণিত হতে থাকল কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তার ছেলের ভাষণ। এমন নির্ভীকভাবে কথা বলেছে ছেলে, সুখে মা গঙ্গদ। একটা প্রবল ইচ্ছে যে, মাকে পাভেলের পছন্দ হোক, মা তার আরও কাছাকাছি হোক। এক বিপুল আনন্দ যে জন্ম নিচ্ছে মায়ের ভেতরে সে খবর তার চেতনায় পৌঁছে যায়। এ সম্ভবনার জন্য প্রস্তুত ছিল না মা- তাই বড় বিব্রত বোধ করে এখন।

বিচার যা হবার তাই হল। পাভেল ও তার সাথীদের শাস্তি হল নির্বাসন। বিচারের রায় শুনে মায়ের কষ্ট হয়, কিন্তু যখন উপস্থিত জনতার মধ্য থেকে একজন বলে উঠল, 'বন্ধুগণ, এই যে, পাভেল ভাসভের মা। এবং সাথে সাথে কেউ একজন গভীর আবেগে মায়ের হাতখানা জড়িয়ে ধরে বলে, "আমাদের সামনে সাহসের আদর্শ হয়ে থাকবে আপনার ছেলে...", তখন আনন্দাশ্রুতে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে।

পাভেলের সাথীরা ঠিক করে, বিচারালয়ে তার বক্তৃতা ছেপে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিলি করবে। যখন সকলে ভাবছে এই কাগজগুলো দূর প্রদেশে নিয়ে যাবে কে, তখন দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে আসে মা। সেটাই মায়ের শেষ বড় দায়িত্ব পালন। এই দায়িত্ব পালনের জন্য বেরিয়ে যাওয়ার আগে লুদমিলাকে বলা কথাগুলো থেকে স্পষ্ট করেই বোঝা যায় মায়ের পরিবর্তন হয়েছে কত গভীরে। মা বলে, "আমার তোমার আলাদা কী করে করি যখন এ-ও- সে সবাইকে ভালবাসি! সবার জন্যই ভয়ে বুক কাঁপে। সবাই ভিড় করে থাকে কলজের মধ্যে... বলুন তো আলাদা করি কী করে?" তারপর মুহূর্তের মধ্যে গভীর চিন্তায় ডুবে যায়। ভাবে এককালে ছেলের জন্য কী ভয়ই না ছিল। যত চিন্তা ছিল ওর দেহটার জন্য। ওটাকে আগলে রাখার জন্যই ছিল যত আকুলি-বিকুলি। মায়ের এখন মনে হয় যে, সে আর আগের মানুষটি নেই। এ যেন আর এক মানুষ। পুরানো দিন, সংসারটাকে ফেলে বহু দূর চলে এসেছে। নিজেরই আবেগের আগুনে জ্বলে সেই ভস্ম থেকে পূর্নভূমিষ্ঠ হয়েছে ওর আত্মা, নতুন জ্যোতিতে জ্যোতিষ্মান হয়ে শক্তিমান হয়ে।

এই নতুন জ্যোতিতে জ্যোতিষ্মান হয়ে মা বলে, "সত্য আর ন্যায়ের পথে চলেছে আমাদের সন্তানেরা-মাথার উপর এক নতুন আকাশ রচনা করে। মাটির বুকে এক নতুন আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে তারা প্রাণের অনির্বাণ বহ্নি। যে মানব-প্রেমে দীক্ষা নিয়েছে এই ছেলেগুলি-নতুন জীবন জন্ম নিচ্ছে সেই প্রেমের আগুন থেকে। কে নেভাবে ঐ আগুন? কার সাধ্য আছে? মাটির বুক থেকে উঠেছে সেই আগুন। জয় হোক ঐ শিখার, জীবন তো তাই চায়।" এই আগুনে আলোকিত হয়ে মা বলে, "জনতার দেউলে যেন নতুন দেবতা জন্ম নেয়- সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে। এই তো আমি বুঝি। আপনারা সবাই কমরেড এক সাথে, এক প্রাণ! সত্য আপনাদের মা, আপনারা সেই মায়েরই সন্তান।"

মায়ের অন্তরের গভীরতম স্থান থেকে বেরিয়ে আসে আর একটি কথা- "কমরেড, কথাটি যখন একা একা নিজের মনেও বলি, মনে হয় আমারই বুকের মধ্যে তাদের পায়ের শব্দ শুনতে পাই।"

ছেলের বক্তৃতা ছাপা কাগজ বিলি করার জন্য বেরিয়ে পড়ল মা একাই। কোনও ভয়-ভীতি বা বিপদের আশঙ্কা নয়, একটা অনাবিল আনন্দে ছেয়ে আছে মায়ের মন। মনের সেই ভাব ফুটে ওঠে মায়ের কথাতেও। লুদমিনাকে বলে "আপনি জানেননা কত আনন্দ আমার! আমার ছেলে- আমারই রক্তমাংসে তৈরি সে- তার মুখের কথা আমি ঘরে ঘরে বিলোতে চলেছি। মনে হচ্ছে, এ যেন আমারি আত্মাকে ছড়িয়ে চলেছি।"

স্টেশনে ছেলের বক্তৃতা ছাপা কাগজ ভরা সুটকেস-সহ মা ধরা পড়ে গেল টিকটিকি এবং পুলিশের কাছে। কিন্তু কোনও এক অজানা শক্তি মায়ের মধ্যে সৃষ্টি করল এমন প্ল্যাটফর্মে তাকে ঘিরে ভীড় করে থাকা জনতার উদ্দেশ্যে একটা আবেগ ও উদ্দীপনা যে, সে ভয় পেলনা, স্টেশনের উচ্চকণ্ঠে বলতে চায় যা কিছু তার জানা আছে- যে সমস্ত চিন্তার জোর সে নিজে অনুভব করেছে। চিৎকার করে গলা ভেঙে গেছে। তবু সেই ভাঙা গলাতেই বলতে শুরু করে- "যে কথা বলে গেছে আমার ছেলে- সে এক সাচ্চা মেহনতী মানুষের প্রাণের কথা- যে মানুষ তার আত্মাকে বিকিয়ে দেয়নি কারোর পায়ে।" পুলিশের মার খেয়েও বলতে থাকে- "এক হও, এক হও, সব মানুষ এক হয়ে এক বিরাট শক্তি গড়ে তোল।" যখন দেখল, বেরোবার কোনও পথ নেই তখন স্যুটকেস থেকে বক্তৃতা ছাপা কাগজগুলো বিলিয়ে দিতে শুরু করল, যাতে সে ধরা পড়লেও ছেলের বক্তৃতাটা কিছু মানুষের কাছে চলে যেতে পারে। মায়ের শেষ কথাটা শেষ বাণীর মতো ভেসে যায় আকাশে বাতাসে- "আমার পুনরুজ্জীবিত আত্মাকে মারতে পারবে না ওরা।"

।। পাভেল ভাসভ- উপন্যাসের আর এক প্রধান চরিত্র ।।

'মা' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র নিঃসন্দেহে পেলাগেয়া নিলভনা। কিন্তু তার মা পরিচয় যার সূত্রে, অর্থাৎ তার গর্ভজাত সন্তান পাভেল ভাসভ চরিত্রটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাস্তবে উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মায়ের চরিত্র ও চেতনার যে উত্তরণ চোখে পড়ে তার সমান্তরালে তার ছেলের উত্তরণও একইভাবে ঘটতে দেখা যায়। বস্তুত মায়ের বিপ্লবী শিক্ষায় দীক্ষাগ্রহণ ছেলের হাত ধরেই।

কারখানার একজন সাধারণ শ্রমিক হিসেবেই উপন্যাসে পাভেলের আত্মপ্রকাশ। তারপর আমরা দেখেছি বিপ্লবী আদর্শের সংস্পর্শে এসে কীভাবে তার মধ্যে পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। প্রথমে চিন্তা ও আচরণের ক্ষেত্রে পরিবর্তন এবং ধীরে ধীরে কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে বিপ্লবী কাজকর্মের সূচনা ও বিস্তার। পাভেলকে আমরা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একবারও পিছন ফিরে তাকাতে বা বিচলিত হতে দেখিনি। আদর্শের প্রশ্নে অবিচল, কর্তব্য পালনে গভীর নিষ্ঠা- এটাই তার মধ্যে আমরা বারে বারে প্রত্যক্ষ করেছি।

ব্যক্তিগত স্নেহ-ভালবাসাকে কেন্দ্র করেও তাকে দুর্বল হতে দেখা যায়নি- তা মায়ের ক্ষেত্রেও হোক বা তার ভালবাসার পাত্রী সাশার ক্ষেত্রেই হোক। পয়লা মে মিছিলের আগে যখন পাভেল সিদ্ধান্ত নেয় যে, সেই রক্তপতাকা হাতে মিছিলের পুরোভাগে থাকবে, তখন মায়ের মনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। মায়ের কথায় আপত্তিকর সুর বেরিয়ে এসেছে, কিন্তু পাভেল অবিচল। মাও বুঝেছে পাভেলকে সামনে থাকতে হবে। তাই মা ছেলেকে বলে, "আমি বুঝি না-করে উপায় নেই... করতেই হবে কমরেডদের জন্য..."

পাভেল প্রতিবাদ করে- "না, কমরেডদের জন্য নয়, আমার নিজেরই জন্য।"

এখানে আমরা পাই একজন বিপ্লবীর নৈতিক অবস্থান। একজন সচেতন মানুষ যখন বিপ্লবী সংগ্রামে যোগ দেয়, তার পিছনে থাকে তার নিজের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। নিজেকে 'মানুষ' হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন। সে জানে সমাজের মধ্যে বাস করে যে মানুষ, তার নিজের মুক্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সমাজমুক্তির সাথেই। তাই সে বিপ্লবী।

আবার সাশা যখন পাভেলকে তার মিছিলের সামনে থাকার সিদ্ধান্ত বদলাতে ব'লে বলে, "ভেবে দেখুন, এদের মধ্যে থাকলে কত কাজ করতে পারবেন। আর ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে বেরুলেই তো ধরে নিয়ে যাবে। অনেক দূরে কোথাও পাঠিয়ে দেবে, আর শীগগির ছাড়বে না এবার।"

তখন পাভেল শান্ত অথচ দৃঢ়ভাবে উত্তর দেয়- "না, আমি স্থির করে ফেলেছি। আর বদলানো যাবে না।" সাশা তার প্রতি পাভেলের ভালবাসার জোর খাটিয়ে বলে-"আমি যদি বলি, তবুও না।” হঠাৎ পাভেলের গলা কঠোর হয়ে ওঠে, তাড়াতাড়ি বলে- "ও ভাবে কথা বলবেন না। আপনি কী?"

"আমিও তো মানুষ।" ধীরে ধীরে বলে সাশা। পাভেল উত্তর দেয় "হ্যাঁ। ভালো মানুষ! আমার খুবই প্রিয়। তাই... তাই বলছি অমন কথা আমায় বলবেন না আপনি...।" এখানে একজন বিপ্লবীর ব্যক্তিগত স্নেহ-ভালবাসাকে কী চোখে দেখা উচিত তার একটা আভাস পাওয়া যায়।

প্রথম খণ্ডে আরও বহু ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা দেখেছি কীভাবে ঐ এলাকায় পাভেল শ্রমিকদের নেতা হিসেবে সামনে চলে এসেছে।

দ্বিতীয় খণ্ডে আমরা দেখি পাভেলের উত্তরণের ছবি। এখানে পাভেল শুধু মফঃস্বলের ঐ কারখানায় নয়, যারা শহরে থেকে বিপ্লবী লড়াই পরিচালনা করে তাদেরও নেতা হিসেবে উঠে এসেছে। বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। দুটো ঘটনা উল্লেখ করছি। দলের কর্মীরা কেউ কেউ চেয়েছে পাভেলকে জেল থেকে বের করে আনতে। বিশেষভাবে ভেসভশ্চিকভ যখন জেল থেকে পালিয়ে এল এবং জেল থেকে পালানোর সহজ রাস্তাটা বাতলে দিল, তখন অনেকে ভেবেছে পাভেলকে বের করে আনা হোক। কারণ বাইরের কাজে তখন পাভেলকে খুব দরকার। মা এবং সাশাও চেয়েছে পাভেল বেরিয়ে আসুক। কিন্তু পাভেলের সম্মতি ছাড়া তাতো হতে পারে না। পাভেলের সম্মতি চেয়ে চিঠি পাঠানো হল, কিন্তু পাভেল রাজী হল না। পাভেল বের হয়ে এলে কঠোর শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারত। কিন্তু সে নিজের কথা না বলে রীবিনকে মুক্ত করার কথা বলে। তার সাথীরা সেটাই ভেবে কার্যকরী করে। রীবিনকে জেল থেকে বের করে আনা হয়।

পাভেল জেল থেকে পালিয়ে এল না, তার একটা বড় উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে হয়। সেটা হল, সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রচারের জন্য বিচারালয়কে ব্যবহার করা। কারণ তখন সমস্ত কাজকর্মই চালাতে হয় গোপনে, ব্যাপক জনসাধারণের মধ্যে বক্তব্য নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যেটা অন্তরায়। বিচার চলাকালীন ঘটনাবলী অনুধাবন করলে সেই সম্ভাবনাই স্পষ্ট হয়। আত্মপক্ষ সমর্থন করতে বললে, পাভেল, যে বক্তব্য রাখে তা থেকে তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। পাভেল বলে- "পার্টির সভ্য হিসেবে আমি শুধু আমাদের পার্টির রায়ই মানি। সুতরাং আমি আত্মপক্ষ সমর্থন করব না। আমারই মতো আমার কমরেডরাও আত্মপক্ষ সমর্থন করতে অস্বীকার করেছেন। কয়েকটি জিনিস আপনারা বোঝেননি, তাই তাঁদেরই অনুরোধে আমি তা বুঝিয়ে দেবার জন্য আজ এখানে এসে দাঁড়িয়েছি।...

আমরা সমাজতন্ত্রী। তার মানে আমরা ব্যক্তিগত মালিকানার বিরোধী। এই ব্যক্তিগত মালিকানা আছে বলেই সমাজ ভেঙে পড়ছে, মানুষে মানুষে চলছে হানাহানি আর অবিরাম স্বার্থ-সংঘাত। এই শত্রুতা চাপা দেবার জন্য কিংবা এরই সমর্থনে ব্যক্তিগত মালিকানা মিথ্যার আশ্রয় নেয়, আর মানুষকে টেনে নামায় প্রতারণা, ভণ্ডামি আর বিদ্বেষের পাঁকে। আমরা বলি, যে সমাজ শুধু স্বার্থসিদ্ধির উপায় হিসেবে মানুষকে ব্যবহার করে, সে সমাজ বর্বরের সমাজ এবং জনতার স্বার্থবিরোধী। তার মিথ্যা আর দুমুখো নৈতিকতাকে আমরা কখনওই স্বীকার করে নিতে পারি না। মানুষকে এ সমাজ বেহায়া চোখে দেখে এবং মানুষের প্রতি তার আচরণও নির্মম। আমাদের পক্ষে এটা ন্যক্কারজনক। এরকম সমাজব্যবস্থার দৌলতেই দৈহিক, নৈতিক যত রকমের দাসত্ব সব চেপে বসে আছে মানুষের ওপর। স্বার্থপর লোভী মানুষের স্বার্থসিদ্ধির জন্য যত রকমের শোষণ ব্যবস্থা আছে, তারি বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করতে চাই আর করব।... আমাদের শ্লোগান খুবই সহজ, "ব্যক্তিগত মালিকানা দূর হোক, উৎপাদনের সমস্ত উপায় আসা চাই শ্রমিকের হাতে, জনতার হাতে ক্ষমতা চাই, সবাইকে খেটে খেতে হবে।"

বিচারকের নিষেধ সত্ত্বেও পাভেল শান্ত, অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে বলে চলে "আমরা বিপ্লবী। একদল শুধু কর্তৃত্ব করে যাবে, আর একদল খেটে যাবে মাথার ঘাম পায়ে আমাদের ভূমিকা।... আমাদের আপসহীন লড়াই চলবে ফেলে- যতদিন এই ব্যবস্থা বজায় থাকবে ততদিন এই রফা সম্ভব নয়। এবং জেনে রাখুন মেহনতী জনতারই জয় যতদিন না আমরা চূড়ান্ত জয়লাভ করি। মাঝামাঝি কোনও হবে।...সত্যি কথা বলতে গেলে, আপনারা মালিকরা আমাদের চেয়ে আরও বেশি বাঁধা। আপনাদের দাসত্ব আরও বেশি। আমাদের দাসত্ব শুধু দৈহিক। আপনাদের অভ্যাসের ফাঁস লেগে আপনাদের আত্মার মৃত্যু ঘটেছে। ঐ দাসত্ব মনের, চিন্তারও। নানারকমের কুসংস্কার আর ফাঁস থেকে মুক্ত হওয়ার ক্ষমতা আপনাদের নেই। কিন্তু আমাদের আত্মা মুক্ত। তাকে বাঁধতে পারে এমন সাধ্য কার? ...যে ঐতিহাসিক ন্যায়ের দাবি উঠেছে আজ আকাশে বাতাসে, তার নিদারুণ চাপ থেকে আত্মরক্ষা করার মতো যুক্তি নেই আপনাদের ভাণ্ডারে। সব নিঃশেষ হয়ে গেছে। মতাদর্শগত ক্ষেত্রে নতুন কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতাও দেখুন। নতুন চিন্তাধারা, নতুন নতুন আদর্শ জনতার বুকে আপনাদের নেই। আপনাদের ভেতর ফাঁকা। কিন্তু আমাদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে প্রতিদিন বেড়ে চলেছে, বাড়ছে তার তেজ, বাড়ছে দীপ্তি। শ্রমিকরা জানে তাদের ভূমিকা কত মহান। তা জেনেই তো সারা দুনিয়ার শ্রমিক এক হয়ে হাত পুনরুজ্জীবন ঘটাচ্ছে ওরাই। কোন শক্তি দিয়ে ঠেকাবেন মেলাচ্ছে। কি বিরাট সে প্রক্রিয়া। পৃথিবীর বুকে এই যৌবন জলতরঙ্গকে?- আপনারা যা করেন মানুষকে শুধু দাসত্ব শৃঙ্খলে বাঁধবার জন্যই কাজেই তা হচ্ছে অপরাধ, পাপ। আপনাদের লোভ, মিথ্যা আর ক্রোধ দিয়ে আপনারা এক দানবের দুনিয়া তৈরি করে রেখেছেন মানুষকে ভয় দেখাবার জন্য। তা থেকে মানুষকে মুক্ত করা আমাদের কাজ। জীবনের মূল ছিন্ন করে দিয়ে আপনারা মানুষকে খতম করেছেন। আপনাদের ধ্বংস করা পৃথিবীটাকে সমাজতন্ত্র নতুন করে গড়ে তুলবে এক অখণ্ড মহান রূপে। এ হবেই হবে।"

এই হল বিচারালয়ে পাভেলের বক্তৃতার অংশবিশেষ। আর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে পরিস্ফুট হয়েছে বিপ্লবীদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। পাভেলের চরিত্রের দৃঢ়তা, আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান এবং চিন্তার স্বচ্ছতা অন্যদের চেয়ে তাকে একটু আলাদা করে দেয়। বাস্তবে পাভেলই সকলের কাছে নেতা হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। উপন্যাসের ঘটনাবলী পাভেলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।

।। মা উপন্যাসে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ।।

আন্দ্রেই বা খখল চরিত্রটি উপন্যাসের অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে। পাভেলের ঘনিষ্ঠ সাথীদের মধ্যে অন্যতম, যে সবসময় পাশে থেকে পাভেলকে সাহায্য করে গেছে। মে দিবসের মিছিলে বা কারাগারের অন্তরালে তাকে আমরা পাভেলের পাশে দেখতে পাই। মায়ের সাথে তার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। খখলও মায়ের সন্তান হয়ে যায়। অথচ তাদের মধ্যে ভাষা, জাত- কোনও কিছুতেই মিল নেই, একমাত্র আদর্শের মিল ছাড়া, মায়ের বিপ্লবী হওয়ার সাথে পাভেলের মতো খখলেরও অবদান কম নয়। আদর্শের আলোকিত পথেই যে খখলের যাত্রা, তা বোঝা যায় মায়ের কাছে বলা এই কথাগুলো থেকে "এখনই হয়েছে কী! অনেক দুঃখ সইতে হবে মানুষকে। অনেক রক্ত ঝরবে। কিন্তু আমার বুকের মধ্যে আর মগজটার মধ্যে যে দৌলত আছে তার তুলনায় সে দুঃখ আর রক্ত কতটুকু! আলোর ধনে ধনী ঐ আকাশের নক্ষত্রের মতো আমি। অফুরন্ত আনন্দ আমার মধ্যে। কেউ কিছুতেই তা নষ্ট করতে পারবে না। সেই তো আমার শক্তি। তাই আমি সবকিছু বইতে পারি, সব কিছু সইতে পারি।"

বিপ্লবীদের বিপ্লবী হওয়ার সংগ্রাম কষ্টসাধ্য, কিন্তু আনন্দময়- এই উপলব্ধিই ব্যক্ত হল খখলের কথায়- "কখনও কখনও এগিয়ে যাবার পথে নিজের বিরুদ্ধেও যেতে হয়। সবকিছু দিতে হয়- নিজের হৃদয় পর্যন্ত। যে ব্রত গ্রহণ করেছি, তার জন্য জান দেওয়া তো সহজ কথা। তার অনেক বেশি দিতে হয়- প্রাণের চেয়েও যা বেশি দিতে হয় তাই দিতে পারলে দেখবে তোমার কাছে যা সবচেয়ে বড়, যে সত্যের জন্য লড়ছ, তা কত বিশাল, কত জোরদার হয়ে উঠেছে।"

খখল যেন মানসচক্ষে দেখতে পায় আগামীর সেই সুন্দর দিনের ছবি। দৃঢ় প্রত্যয়ে বলে- "আমি জানি, সময় আসবে যখন প্রতিটি মানুষ আর সকলের কাছে তারার মতো হয়ে উঠবে।... পৃথিবীর বুকে থাকবে মুক্ত মানুষ। কারোর মনে দ্বেষ হিংসা থাকবে না। জীবন রূপ পাবে মানুষের সেবায় মানুষের মূর্তি পাবে স্বর্গের দেউল। কিছুই মানুষের আয়ত্তের বাইরে নয়। মানুষ সেদিন সুন্দর হবে, সত্য আর সুন্দরের মুক্তিতে পাবে সে বীজমন্ত্র। আর যে মানুষ সারা পৃথিবীকে কোল দিতে পারবে, তাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসবে, সব বন্ধন মুক্ত সে মানুষ হবে নরোত্তম, কারণ সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ঐ মুক্তিতে। এই নবজীবনের মানুষই রচনা করবে মহাজাতি..."

আগামীর এই স্বপ্নকে বুকে নিয়েই খখলের পথ পরিক্রমা- সুদূর ইউক্রেন থেকে রাশিয়ার আর এক প্রান্তে অজানা, অচেনা মানুষের কাছে চলে এসেছে। সেই মানুষগুলোকে আপন করে নিয়েছে। এই স্বপ্নই আজও বিপ্লবীদের সর্বস্বপণ করে লড়াই-এর শক্তি দেবে।

এবার নিকলাই ইভানভিচের কথায় আসি। পয়লা মে’র মিছিল থেকে পাভেল গ্রেফতার হওয়ার পর মা যাঁর বাড়ীতে এসে আশ্রয় নেয়। অত্যন্ত সহজ সাদাসিধে অনাড়ম্বর জীবন। অথচ নিজে টাকা রোজগার করে কম নয়। কিন্তু সেই টাকার প্রতি তার একটা নির্লিপ্ত মনোভাব মাকে আকৃষ্ট করে। তাই মা বলে- "সবকিছুই সৃষ্টি ছাড়া। আপনার কাছে দেখছি টাকা টাকা নয়, খোলামকুচি। কত মানুষ একটা পয়সার জন্য আত্মাটাকেও বিকিয়ে দেয়। আর আপনি? কানাকড়িও দাম দেন না টাকার। অন্যদের খাতিরেই যেন দয়া করে পয়সাটা পকেটে ফেলে রাখেন..."

এই মানুষটি নীরবে কাজ করে যায়। দলের প্রচারপত্র ও পত্রিকায় লেখার দায়িত্ব তার। লেখার অদ্ভুত ক্ষমতা। যে সরকারি অফিসে চাকরি করে, সেই সূত্রে শ্রমিকদের মধ্যেই থাকতে হয়। পেটিবুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের মতো শ্রমিকদের সম্পর্কে নাক সিটকানো মনোভাব নেই। বরং শ্রমিকদের প্রতি রয়েছে গভীর ভালবাসা। তাই একদিন কাজ থেকে ফিরে বেশ উচ্ছ্বাসের সাথেই মাকে নিকলাই বলে-"শ্রমিকদের মধ্যে কেটেছে সারা দিন পড়ে শুনিয়েছি, ওদের সঙ্গে কথা কয়েছি, আর এই নিরীক্ষণ করেছি যে, আশ্চর্যরকম পবিত্র খাঁটি একটা কিসে আমার মনটা কানায় কানায় ভরে গেছে।"

বিপ্লবী জীবন সম্পর্কে নিকলাই-এরও রয়েছে গভীর উপলব্ধি। নিজের জীবনের কাহিনী বলতে গিয়ে মাকে সে বলে- "সবার চেয়ে আগে আগে আমাদের চলতে হবে, কারণ আমরা শ্রমিক- পুরনো পৃথিবীটাকে ভেঙে নতুন পৃথিবীর পত্তন করার কাজ এসেছে আমাদের কাছে। আমরা অলস হয়ে বা সামান্য একটু পেয়ে অনেক পেলাম বলে আত্মতৃপ্ত হয়ে যদি পেছনে পড়ে থাকি তবে মস্ত ভুল করব- এবং সে ভুল আদর্শের প্রতি প্রায় বিশ্বাসঘাতকতারই সামিল হবে। আদর্শের হানি না ঘটিয়ে এক সঙ্গে চলতে পারি, এমন সঙ্গিনী তো নেই। ক্ষুদ্র লাভআমাদের নয়- আমাদের লক্ষ্য পূর্ণ বিজয়, একথা ভুললে চলবে না আমাদের।"

নিকলাই নিজের প্রতি নির্লিপ্ত মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায় সাশার কথাতেও। সাশা বলে- "যমের বাড়ী যেতে হলেও মানুষটা এমনি করেই বিনা হৈচৈ-এ সহজভাবে চলে যাবে। বরঞ্চ একটু তাড়াতাড়িই করবে। আর খোদ যমরাজ যখন সামনে এসে দাঁড়াবেন- তখনও ও নিজে এমনি করে চশমা ঠিক করে 'খাসা!' বলে চোখ বুজবে!” এই মানুষটির জন্য একটা মাতৃসুলভ বাৎসল্যে মার বুক ভরে ওঠে।

এরকমই আর একজন মানুষের কথা এখানে আছে। সে হল ইয়েগর। উপন্যাসে তার অবস্থান স্বল্প পরিসরে। কিন্তু পাঠকের মনে গভীর ছাপ ফেলে যায়। উপন্যাসে তাকে আমরা দেখি যক্ষ্মারোগে শয্যাশায়ী, অল্প কিছুদিন পরে আমরা দেখেছি, তার মৃত্যু। তার নিজের কথা খুব কম আছে। তার পরিচয় পাই অন্যদের কথা থেকে। তার সহযোগী লুদমিলা বলে- "কী হাসিখুশিই ছিল সর্বদা। যত কষ্টই হোক ভেতরে, সেসব চেপে রেখে হাসি ঠাট্টায় আসর জমিয়ে রাখত- দুর্বল চিত্ত লোকেদের সাহস দিতে চেষ্টা করত। কত দরদ, সহানুভূতি, মায়া মমতা যে ছিল ওর- ওখানে সাইবেরিয়ায় বেশিরভাগ লোকে খারাপ হয়ে যায় কাজকর্ম না থাকার জন্য। লোকের মন্দ দিকটা তখন বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু ও জানত কি করে মানুষকে মানুষ রাখতে হয়। যদি জানতেন, কী কমরেড ছিল। ব্যক্তিগত জীবনে কত দুঃখ কষ্ট ভোগ করতে হয়েছিল। কিন্তু ওর মুখ থেকে কেউ কোনওদিন এতটুকু নালিশ শোনেনি। কোনওদিন না। আমিই ছিলাম ওর বড় বন্ধু। ওর কাছে আমি খুব ঋণী। ওর বিরাট মনের দৌলতের যতখানি পারে ও আমায় দিয়ে গেছে। আমাকে সবকিছু দিয়েছে, কিন্তু একলা পড়ে থেকে ক্লান্ত হয়ে এতটুকু কিছু আমার কাছে চায়নি, না আদর, না মনোযোগ..."

একই মনোভাবে প্রকাশ পায় সাশার কথাতেও- "কি আশ্চর্য মানুষ ছিল ইয়েগর। হাসি-ঠাট্টা ছাড়া এক মুহূর্তও দেখিনি মানুষটাকে। কাজ করতে জানত! লোকটা ছিল বিপ্লবের শিল্পী। বিপ্লবী চিন্তাধারার অতবড় স্রষ্টা আর কোথায় পাওয়া যাবে। কী সহজ করে, অথচ কী জোরাল ভাষায় মানুষের অন্যায়, অত্যাচার, মিথ্যের কাহিনী বলে যেত।"

সাশার বুকে ইয়েগরের স্মৃতি যে কত গভীরে রয়েছে তা বোঝা গেছে, তার পরের কথাগুলোতে- "চলে গেছে? কী বলছেন, মারা গেছে তার মানে? কী মারা গেছে? ইয়েগরের প্রতি আমার শ্রদ্ধা, কমরেডের প্রতি আমার ভালাবাসা, তার চিন্তাধারার বিষয়ে স্মৃতি, তার কাজ- সব কি চলে গেল? আমার মনে ও যে অনুভূতি জাগিয়েছিল, ওকে যে-রকম সাহসী সৎ লোক বলে জানতাম, সে সবই কি ফুরিয়ে গেল? আমি জানি, আমার কাছে ওর মৃত্যু নেই।... নীরব হয়েছে সে, কিন্তু যে কথা সে রেখে গেছে তা অমর হয়ে থাকবে যারা বেঁচে রইলো তাদের বুকে।"

সত্যি কত মানুষের ওপর যে ইয়েগর প্রভাব ফেলেছিল, তা বোঝা যায় তার মৃতদেহ নিয়ে শেষযাত্রায় লোক সমাগম দেখে। পুলিশ ও সেনাদের বাধা দেওয়া সত্ত্বেও তারা প্রিয় কমরেডের কফিন নিয়ে এগিয়েছে কবরখানার দিকে।

এই উপন্যাসের আর একটি উজ্জ্বল চরিত্র হল রীবিন। একটা দৃঢ়চেতা, অকুতোভয় মানুষ। যে মুহূর্তে বুঝেছে চাষিদের মধ্যে কাজ করা দরকার সেই মুহূর্তে সে চলে গেল দূরবর্তী গ্রামে। চাষিদের সংগঠিত করল। অচিরেই অনুভব করল, বিপ্লবী আদর্শের প্রচারপত্র চাই। তখন হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায়। পাভেলের কাছে আসে, ১লা মে পাভেল ধরা পড়ার পর শহরের কমরেডরা প্রচারপত্র, বই পাঠায়। মা ও সোফিয়া বইপত্র নিয়ে গেলে তাদের সে কী আনন্দ! সেইসব প্রচারপত্র সে ও তার সাথীরা চাষিদের মধ্যে বিলি করে। এলাকায় একটা আলোড়ন পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত রীবিন ধরা পড়ে যায়।

পুলিশের অকথ্য অত্যাচার সহ্য করেও সে কারোর কথা বলেনি। এই জোর সে কোথায় পেল? তার নিজের কথাতেই শুনুন পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে এলে বহু মানুষ তাকে ঘিরে জড়ো হয়ে যায়। তখন সে তার শরীরের সমস্ত শক্তি নিয়ে বলতে শুরু করে- "চাষি ভাইরা, যে ইস্তাহারের কথা বললাম, তাতে যা লেখা আছে বিশ্বাস করো... কারণ বইয়ের প্রতিটি অক্ষর সত্য- প্রতিটি অক্ষর। নিত্যিকার রুটির চাইতে সত্যের কিমত বেশি। বুঝেছো?
...পালাব না আমি, কোথায় পালাব? সত্যের হাত থেকে নিস্তার পাব না, সে যে আছে আমার ভেতরে..."
পুলিশ তাকে নিয়ে যাওয়ার সময়ও সে চিৎকার করে বলতে থাকে- "ভাইসব, চোখ খোলা রাখো। হদিস রেখো। কাগজ আসবে। পড়ো, ভাল করে পড়ো। পাদ্রী সাহেব আর কত্তারা যখন সত্যের প্রচারকদের কাফের, বিদ্রোহী বলবে তখন বিশ্বাস করো না ওদের ।... সত্য, ওদের দুষমন, কিন্তু তোমার আমার মতো মানুষের সে দোস্ত।...
বিদায় বন্ধুগণ! সত্যকে তালাশ করো! যত্ন করে রেখো! খাঁটি কথা যে নিয়ে আসবে তাকে বিশ্বাস করো। সব ডালি দিয়েও সত্যকে রেখো ভাইসব!"

বিপ্লবী আদর্শের প্রভাব মানুষ কিভাবে পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে তার একটি দৃষ্টান্ত হল নিকলাই ভেশভশ্চিকভ চরিত্রটি। পাভেলের শ্রমিক বস্তিতে দাগী চোর হিসাবে পরিচিত দানিলের ছেলে এই ভেসভশ্চিকভ। পাভেলের বাড়ীতে মা যখন প্রথম ভেসভশ্চিকভকে দেখে, তখন চমকে গিয়েছিল। শুধু তার পিতৃপরিচয়ের জন্য নয়, সে নিজে চুরি না করলেও একগুঁয়ে স্বভাবের, সমস্ত কিছুর প্রতি বিতৃষ্ণার মনোভাব নিয়ে চলে। সবসময় একটা অস্থিরতা, যেন এই মুহূর্তে সবকিছু ভেঙেচুরে ফেলবে। একদিন সে অধৈর্য্য হয়ে জিজ্ঞেস করে- "লড়াই শুরু হবে কবে?"
হেসে জবাব দেয় খখল, "তা জানিনে, তবে এটুকু জানি যে, তার আগে বহুবার হারতে হবে আমাদের এবং যতদূর বুঝি হাতে হাতিয়ার তোলার আগে মগজগুলোকে সশস্ত্র করতে হবে..."

জেল থেকে পালিয়ে আসার পর আত্মগোপন করে থাকার সময় তার আরও পরিবর্তন হয়। কমরেডদের সংস্পর্শে থেকে তাদের চরিত্রের প্রভাবে সেও পাল্টাতে শুরু করে। তাই সাশা বলে- "সারা রাত বসে ভেসশ্চিকভের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। আগে দু'চক্ষে দেখতে পারতাম না লোকটাকে। মনে হত, যেমন জঙ্গ লী, তেমনি আকাট মূর্খ। অবশ্য সে রকম লোকইও ছিল। ওর ভেতরে ছিল সবার প্রতি একটা অন্ধ বিরক্তি, নিজেকে সর্বদা সবকিছুর একেবারে মাঝখানটায় দাঁড় করাত আর সর্বক্ষণ আমি। আমি! আমি করত!"

"কিন্তু এখন সে সবাইকে ডাকে কমরেড বলে। আর কী সেই ডাক। লাজুক লাজুক, অত্যন্ত নরম, প্রীতিতে ভরা। বলে বোঝাতে পারব না। আশ্চর্য সহজ, অকপট হয়ে উঠেছে। কাজের কী আগ্রহ। ও নিজেকে খুঁজে পেয়েছে। ভালয় মন্দয় নিজেকে চিনেছে আজ স্পষ্ট করে। সব থেকে বড় কথা কী জানেন- খাঁটি বন্ধুভাব জেগেছে ওর মধ্যে..."

মা’কে বাদ দিয়ে আরও তিনটি মহিলা চরিত্র এই উপন্যাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। তাদের মধ্যে প্রথম সাশার কথায় আসি। সাশা এই উপন্যাসে অনেকটা পরিসরে আছে। বাইরে থেকে দেখলে তাকে কঠোর ও রুক্ষ্ম বলে মনে হয়। তাই প্রথম দর্শনে সাশাকে মায়ের ভালো লাগেনি। কিন্তু যত ওর সাথে মিশেছে, ততই পেয়েছে কোমল মনের পরিচয়। বিপ্লবের কাজে আবার দেখি সে অত্যন্ত কর্তব্যপরায়ণ, দৃঢ়চেতা। আর এক দিক থেকে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন।

সাশা এসেছে জমিদার পরিবার থেকে। বাবার সম্পর্কে বলে, "জমিদার মানুষ তিনি, এখন জেলার কর্তা, চাষীদের লুট করেন।”

সাশা বলে, "আমার বাবার চাইতেও আমার কাছে ন্যায় বড়।" বিপ্লবী সংগ্রামে তার একাত্মতা, কর্তব্যপরায়ণতা পাভেলকে আকৃষ্ট করে। দুজনের মধ্যে ভালবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়। কিন্তু সেই ভালবাসা দুজনের কাউকেই কর্তব্যভ্রষ্ট করেনি। পয়লা মের মিছিলের আগে সাশার মধ্যে যখন মুহূর্তের দুর্বলতা তৈরি হয়, তখন পাভেলের দৃঢ়চেতা মনোভাবে সাশার ভুল ভাঙতে দেরি হয়নি। দুজন দুজনকে কর্তব্যকর্মে উদ্বুদ্ধ করে।

পাভেল সম্পর্কে প্রবল আবেগ, আবার কতর্ব্যকর্মে সদাসতর্ক সাশা বলে- "আমার কথা ভাবলে ওর চলবে না। আমি ওর পথের বাধা হব না। অবশ্য খুব কষ্ট হবে আমার ওর কাছ থেকে দূরে সরে যেতে তা সে ব্যবস্থা করে নেবখন যা হয়। বাধা আমি ওর হব না।"

লুদমিলা চরিত্রটিও খুব আকর্ষণীয়। তাকে আমরা প্রথম দেখি রোগশয্যায় শায়িত ইয়েগরের শুশ্রূষায়। বিপ্লবের প্রয়োজনে যে কোনও কাজে তার নিষ্ঠা ও কর্তব্যপরায়ণতা দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। রোগীর সেবা-যত্নের ক্ষেত্রে সে যেমন পারদর্শী, একইভাবে তৎপর ছাপাখানার কাজে। রাত নেই, দিন নেই, পরিশ্রম করে যেতে পারে। কর্মক্ষেত্রে তাকে খুব কঠোর মনে হয়। কিন্তু মা যখন তার কাছাকাছে যায়, রোগীর শুশ্রূষায় বা ছাপাখানার কাজে সাহায্য করতে গিয়ে তার আপাত কাঠিন্যের মধ্যে মা খুঁজে পায় আর এক মানুষ। পাভেলের বক্তৃতা ছাপার জন্য যেদিন মা লুদমিলার কাছে যায় সেদিন মায়ের এই অনুভূতি আরও গভীর হয়। মায়ের মনে হয় লুদামিলা যেন আর এক মানুষ আজ। অনেক সহজ সরল, আরও ঘনিষ্ঠ। ওর ছিমছাম সুন্দর দেহখানির নড়াচড়ার লীলায়িত ছন্দে মাধুরী আর বলিষ্ঠতা মিশে আছে, তাতেই ওর ফ্যাকাশে মুখখানার কাঠিন্যে ঢেলে দিয়েছে কোমলতা।

মায়ের কাছেই সে বলে তার জীবনের কষ্টের কথা। তার সবচেয়ে বড় কষ্ট তার ছেলে বিপ্লবের পথ থেকে অনেক দূরে। মাকে সেই দুঃখের কথা বলে- "আমারও একটি ছেলে আছে, বছর তের বয়স হয়েছে। থাকে তার বাপের কাছ। আমার স্বামী সহকারী সরকারী উকিল- আর ছেলে থাকে তার কাছে। কি দশা হবে তার, প্রায়ই ভাবি সে কথা..." গভীর দুঃখ-ব্যথায় সে বলতে থাকে- “কে তাকে বড় করছে? যে মানুষকে ভালবাসি আমি- দুনিয়ার মধ্যে যাদের জুড়ি নেই আর, সেই মানুষেরই শত্রু, জেনে শুনে শত্রু। আমার সন্তান হয়তো বড় হয়ে আমার শত্রু হবে। আমার কাছে তার থাকার উপায় নেই। ছদ্মনামে আছি আমি। আট বছর তাকে দেখিনি! আট বছর! ওঃ কতদিন..."
"ও আমার কাছে থাকলে বুকে বল পেতাম। অন্তত কলজের মধ্যে এই যে কাঁচা ঘা-টা দগদগ করছে- তার জ্বলুনিটা তো থাকত না... ও মরে গেলেও আমার পক্ষে বেশি সহজ হত..."

এখানে আর এক মায়ের পরিচয় পাই। বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ যে মা শত্রু শিবিরে বড় হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে ছেলে মৃত্যুকামনা করে। ছেলের প্রতি রয়েছে গভীর আবেগ, আবার ছেলের পরিণতি নিয়ে রয়েছে অন্তহীন বেদনা। কিন্তু এই বেদনা তাকে কর্তব্যভ্রষ্ট করতে পারে না।

আর একটি নারী চরিত্র যে উপন্যাসে অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে, সে হল সোফিয়া। নিকলাই-এর বড় বোন। বিপ্লবী দলের একনিষ্ঠ কর্মী। মায়ের জীবনের পুরানো দিনের কাহিনী শুনে অভিভূত সোফিয়া তার বিপ্লবী জীবনের কাহিনী শোনায়। সেখান থেকেই আমরা সোফিয়ার সম্পর্কে জানতে পারি। সে বলে যে, বারে বারে তাকে কত নতুন নামই না নিতে হয়েছে। শুধু কি তাই! পরিচয়পত্র অবধি জাল করতে হয়েছে রকম বেরকমের বহুরূপী সেজে টিকটিকিদের চোখে ধুলো দিয়ে রাশি রাশি নিষিদ্ধ বই সব এ শহর থেকে ও শহরে পাচার করেছে; নির্বাসিত কমরেডদের পালাবার পথ করে দিয়েছে, সঙ্গে করে অন্য মুলুকে নিয়ে পৌঁছে দিয়েছে। একবার নিজের বাসায় গুপ্ত ছাপাখানা বসিয়েছিল। পুলিশ জানতে পেরে তল্লাশী করতে হানা দিল। ওদের আসার এক মুহূর্ত আগে খবর পেয়ে বাড়ীর কাজের মহিলার সাজ করল। তারপর পুলিশের চোখের সামনে দিয়েই সে বেরিয়ে পড়েছিল। শীতের দিন। কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে পাতলা একটা জামা গায়ে, আর মাথায় সুতীর রুমাল বাঁধা অবস্থাতেই শহর পাড়ি দিয়েছিল।

এরকম আরও নানা বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে কেটে গেছে তার অতীতের দিনগুলো। নিজের নির্বাসনের দিনগুলোর অভিজ্ঞতা সে মাকে বলে, তাতে বোঝা যায় ছোটবেলায় বাবাকে ভীষণ ভালবাসত। অথচ তার সাথেই ঝগড়া হল। অপমান করে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। এক ঘনিষ্ঠ কমরেডের সাথে জেলে যেতে হয়। স্বামীও ধরা পড়ে। আবার জেল আর নির্বাসন। তারপর স্বামীও মারা যায়।

সোফিয়া ভাল পিয়ানো বাজায়। স্বামীর কথা স্মরণ করে সোফিয়া বলে, "বড় ভালবাসত আমার কস্তিয়া। কী ভালই বাসতাম ওকে বাজিয়ে শোনাতে। অদ্ভুত নরম মন ছিল ওর। সবকিছু নাড়া দিত ওর মনকে ভরাট বুকটা ঠেলে উপচে উঠত সবসময়..."
"ও যখন ছিল, কত সুখই না আমাকে এনে দিয়েছে! কী চমৎকারভাবে বাঁচতে জানত..." বোঝা যায় স্বামীকে কী গভীরভাবে ভালবাসত সোফিয়া। স্বামীর মৃত্যু তাকে কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু কর্তব্যভ্রষ্ট করেনি। সমানতালে সে তার দায়িত্ব পালন করে গেছে। সেখানে তার কোনও ক্লান্তি নেই।

।। উপসংহার ।।

এতক্ষণ আমরা মা উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র 'মা' এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলো সম্পর্কে আলোচনা করলাম। রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী সংগ্রামের পটভূমিতে রচিত উপন্যাসে সাম্যবাদী ভাবাদর্শ নিয়ে গড়ে ওঠা সংগ্রামের সংস্পর্শে এসে কীভাবে মানুষ পাল্টে যেতে পারে তার একটা জীবন্ত চিত্র উপস্থাপনা করেছেন। বিভিন্ন চরিত্রের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ সম্পর্কে একটা সামগ্রিক ধারণাও পাওয়া যায়। আজকের দিনে যারা বিপ্লবী সংগ্রামে নিয়োজিত তাদের কাছেও বহু শিক্ষণীয় দিক পাওয়া যায় এই উপন্যাসটিতে। ব্যক্তিগত সুখ দুঃখকে তুচ্ছ করে কীভাবে বিপ্লবীরা মন প্রাণ ঢেলে শোষণমুক্তির সংগ্রামে আনন্দের সাথে অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে তার কর্তব্য সম্পাদন করে, আছে তার ঘটনা। এখানে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে একজন বিপ্লবীর ঘনিষ্ঠ জন যখন তার সংগ্রামের সাথী হয়, তখন তা যেমন তাকে অপরিসীম তৃপ্তি দেয়, আবার সে যদি তার পথের কাঁটা হয়ে যায়, তাহলে তা একজন বিপ্লবীর কাছে কত গভীর যন্ত্রণার হয়ে ওঠে। এরকম আরও বহুদিক এই উপন্যাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। <>
(পথিকৃৎ পত্রিকার মার্চ ২০২২ সংখ্যা থেকে নেওয়া)

আপনার মতামত অন্যান্য পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করুন
মতামত দিন
মতামতসমূহ
কোনো মতামত নেই

পথিকৃৎ

আমাদের পত্রিকা ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত থাকুন এবং সর্বশেষ খবর ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট নিয়মিত পান

যোগাযোগ

পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২

দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com

গুরুত্বপূর্ণ লিংকসমূহ

© Pathikrit. All Rights Reserved. Designed By GenxByte