রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার ভিত্তিতে ম্যাক্সিম গোর্কি'র উপন্যাস 'মা' (প্রথম পর্ব)

সুব্রত গৌড়ী | বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

বর্তমান প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় 'মা' উপন্যাস। তার আগে দু'চার কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে সংগঠিত বিপ্লবী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম অগ্রণী লেখক। তাঁর পূর্ববর্তী বহু সাহিত্যিক শ্রমিক জীবন নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন, একথা ঠিক। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ অত্যন্ত হৃদয়শালী লেখা লিখেছেন। শ্রমিক জীবনের দুঃখ যন্ত্রণার মর্মস্পর্শী বিবরণ পাওয়া যায় এমন লেখাও বিরল নয়। কিন্তু শ্রমিক জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরার মধ্যেই মূলত সেগুলি সীমায়িত, পচা-গলা বুর্জোয়া সমাজের অত্যাচারে শ্রমিকদের ক্লেদাক্ত জীবন থেকে মুক্তির সঠিক রাস্তা তাঁরা দেখাতে পারেননি। যদিও মানবতাবাদী আদর্শের পরিমণ্ডলে তা সম্ভবও ছিল না।

মানবতাবাদী সাহিত্যিকদের সেই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার জন্য প্রয়োজন ছিল আদর্শগত উত্তরণের। মানবতাবাদী চিন্তা-চেতনার ধারাবাহিকতায় এবং তার সাথে ছেদ ঘটিয়ে উত্তরণের পথেই উদ্ভব হয়েছে উন্নততর আদর্শ মার্ক্সবাদ। তাই মার্ক্সবাদী চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হতে না পারলে মানবতাবাদী চিন্তা-চেতনার আদর্শগত পরিমণ্ডল অতিক্রম করা সম্ভব নয়।

ম্যাক্সিম গোর্কি সেই সুযোগ পেয়েছিলেন। মহান মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক লেনিনের সংস্পর্শে এসেছিলেন। লেনিনের কাছেই তিনি মার্ক্সবাদের শিক্ষা পান। তাই তাঁর পক্ষে বঞ্চিত-নিপীড়িত ক্লেদাক্ত পরিবেশে মনুষ্যেতর জীবনে অভ্যস্ত শ্রমিকের মননে সুপ্ত বিপ্লবী চেতনাকে উন্নত শিল্পশৈলীতে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছিল।

।। ম্যাক্সিম গোর্কি সর্বহারা সাহিত্যের প্রথম অগ্রণী লেখক ।।

সর্বহারা সাহিত্য অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার ভিত্তিতে সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে গোর্কি প্রথম অগ্রণী লেখক। প্রশ্ন হল, সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা বলতে কী বোঝায়? আমরা জানি, আধুনিক সাহিত্যের উদ্ভব রেনেসাঁসের হাত ধরে। অর্থাৎ পুঁজিবাদী বিপ্লবকে কেন্দ্র করে যে বিপ্লব সামন্ততন্ত্রকে ভেঙেছে, ব্যক্তিকে সামন্ততান্ত্রিক শাসন-শোষণের যাঁতাকল থেকে মুক্ত করেছে। কিন্তু সেই বিপ্লব যে সমাজের পত্তন করল সেই সমাজে এক ধরনের শোষণের পরিবর্তে আর এক ধরনের শোষণ প্রতিষ্ঠিত হল। ফলে সমাজের মুক্তি বা ব্যক্তির মুক্তি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হতে পারল না। বর্তমানে শ্রমিক শ্রেণিই একমাত্র এই শৃঙ্খলকে ভেঙে ব্যক্তিকে পুরোপুরি মুক্ত করতে পারে, সমাজে এক শ্রেণির দ্বারা আর এক শ্রেণির শোষণ শাসন বন্ধ করতে পারে। এই সত্যকে মূর্ত করতে হবে সাহিত্যে, জীবনবোধে, রসবোধে, প্রেম-ভালোবাসায়, মনের সূক্ষ্ম আদান-প্রদানে। এই ভিত্তিভূমির উপর দাঁড় করিয়েই সাহিত্য রচনা। একেই বলা হয় সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা। এই ধারণা আকাশ থেকে পড়েনি। রেনেসাঁস সাহিত্যে এক সময় realisim-এর যে ধারণা এসেছিল তার বিকাশের পথেই socialist realisim-এর ধারণার জন্ম। প্রথমে realisim-এর ধারণায় বলা হয়েছিল, বিদ্যমান বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে সাহিত্য রচনা করতে হবে।

অবাস্তবকে ভিত্তি করে বা কতগুলো মনগড়া কল্পনার উপর নির্ভর করে সাহিত্য হয় না। বাস্তবে যে ঘটনাগুলো ঘটে, সমাজে যে দ্বন্দ্বগুলো আমরা প্রত্যক্ষ করি, নরনারীর সম্পর্ক এবং সমাজ অর্থনীতি রাজনীতির সাথে সেই সম্পর্কের সংযোগ- এগুলোকে ভিত্তি করে একটা সামাজিক চিত্র উপন্যাসে আসবে। সেইজন্য দেখা যায় যে, একটা মহৎ উপন্যাস থেকে সেই সমাজের ইতিহাস জনাতে পারা যায়। যদিও এ কথা মনে রাখতে হবে যে, সাহিত্য ইতিহাস নয়। মহৎ সাহিত্যের মধ্যে সেই সময়ের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে মানুষ, মানুষের সমাজ, তাদের আশা-আকাঙক্ষা-দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং উৎপাদন থাকতে পারে, কিন্তু তা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস হতে পারে না। আবার সেই সাহিত্য পাঠকের মনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে, তা নির্ভর করে লেখকের রসসৃষ্টির ক্ষমতার উপর।

Realism-এর পরে এসেছে critical realism। এই মতবাদের প্রবক্তারা বললেন, বিদ্যমান বাস্তব মানেই সত্য নয়। critically বিচার করতে হবে। সেখান থেকে সত্যকে খুঁজে বের করতে হবে, তিনি সত্যের পক্ষে যাবেন না মিথ্যার পক্ষে যাবেন। অর্থাৎ এই প্রশ্নে একজন সাহিত্যিক নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না। সত্যের পক্ষে থাকলে তাঁকে পার্টিজান হতে হবে। মিথ্যাকে নির্দেশ করতে হবে সত্যকে পরিষ্কার করার জন্য। অন্ধকারকে দেখাতে হবে আলোকে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য। একেই বলা হয় critical realism |

এরপর প্রশ্ন উঠল, সত্যের পক্ষে পক্ষপাতিত্বকে আমরা বুঝব কেমন করে? কারণ, সত্য তো শাশ্বত নয়, যুগে যুগে তা পাল্টায়। তাই আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে আমরা জানি, সত্যের রূপ হল বিশেষ ও আপেক্ষিক। তা হলে, বিশেষ সমাজের বিকাশের যে গতিপথ, সেই ক্রমবিকাশের ধারাকে চিহ্নিত করে তার প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকবে সাহিত্যিকের। এই পরিপ্রেক্ষিতেই socialist realism-এর ধারণাটি এল।

আমরা জানি, সমাজের ক্রমবিকাশের ধারাকে প্রথম সঠিকভাবে অনুধাবন করেছে এবং তার মধ্যে অন্তর্নিহিত সুনির্দিষ্ট নিয়মকে আবিষ্কার করেছে মার্ক্সবাদ। তাই social-ist realisim-এর উন্নত ধারণার ভিত্তিতে সাহিত্য রচনা করতে হলে সাহিত্যিককে মার্ক্সবাদী দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গি উপলব্ধি করতে হবে। না হলে শুধু শ্রমিক জীবনের যন্ত্রণাকে যতই আবেগের সাথে একজন সাহিত্যিক উপস্থাপিত করার চেষ্টা করুন না কেন, তা socialist realisim-কে প্রতিফলিত করতে পারবে না।

কারণ শ্রমিক জীবন নিয়ে সাহিত্য রচনা মানবতাবাদী সাহিত্যিকরাও করেছিলেন। কিন্তু সেই সাহিত্যে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা রূপ পায়নি। আসলে সাহিত্যের বাস্তবতা সম্পর্কে মানবতাবাদীদের পুরনো ধারণার সাথে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার মূলগত পার্থক্য আছে। বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার অভ্যন্তরে শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্ব যে বাস্তব সত্যরূপে অবস্থান করছে, সেই দ্বন্দ্বের তীব্রতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে একদিন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ঘটবে এবং সমাজতন্ত্রের পথে সাম্যবাদে উত্তরণের মধ্য দিয়ে সেই দ্বন্দ্বের অবলুপ্তি ঘটবে- এই বাস্তবতাকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করে তাকে শিল্প সম্মত রূপ দেওয়া এবং এরই মাধ্যমে জনমানসে বিপ্লবমুখী মানসিকতার সৃষ্টি করার লক্ষ্য নিয়ে সাহিত্য রচনাকেই বলা হয় সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা বা socialist realisim. Socialist realisim-এর এই ধারণাকে প্রথম সার্থকভাবে রূপদান করেছিলেন ম্যাক্সিম গোর্কি তাঁর 'মা' উপন্যাসে।

লেখকের পরিচয় সম্পর্কে বলা যায়, ম্যাক্সিম গোর্কি হল তাঁর ছদ্মনাম। তাঁর প্রকৃত নাম আলেক্সেই মাক্সিমোভিচ পেশকভ। ম্যাক্সিম গোর্কি ছদ্মনামে স্বাক্ষরিত রচনার প্রথম প্রকাশ ১৮৯২ সালে। বাস্তবে লেখককে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। প্রথম জীবনে তাঁকে অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি জীবন্ত অভিজ্ঞতা এতটাই লাভ করেছিলেন যে, তাঁর সমসাময়িক বা পূর্ববর্তী সাহিত্যিকদের সাথে তার যেন তুলনাই চলে না।

উনিশ বছর বয়সে তিনি যখন একটা রুটি কারখানায় জোগাড়ের কাজ করতেন, তখন একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। এর অনেক আগে থেকেই এই তরুণ কাজ করেছেন কুলি হিসেবে। তাই রোজকার হাড়ভাঙা খাটুনি আর দারিদ্র্য তাঁর ছেলেবেলা থেকেই জানা ছিল। তাহলে হঠাৎ আত্মহত্যার চেষ্টা কেন? সেই গল্পটা অন্য গল্প। যখনকার ঘটনার কথা বলা হচ্ছে তার কিছুদিন আগেই তিনি কিছু বই পড়েছিলেন- যার মধ্য দিয়ে তিনি জানতে পেরেছিলেন যে, মানুষ স্বাধীনতা অর্জনে সক্ষম। তিনি ভেবেছিলেন, তাঁর এই নতুন আবিষ্কৃত উপলব্ধি তিনি তাঁর মতোই যারা ভূগর্ভস্থ কারাগারে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে, তাদেরকে বোঝাতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ঘটনা ঘটল তাঁর মনোবাসনার বিরুদ্ধে। সেইসময় কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে শক্তিশালী ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, যে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন, গোর্কির ভবিষ্যৎ বন্ধু লেনিন। গোর্কি এই আন্দোলনের সমর্থক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গীরা এই আন্দোলনকে ভাঙার জন্য উৎসাহ দেখায়, তারা তাঁকে বোঝায় যে, ছাত্রদের পেটানো দরকার। এই ঘটনায় গোর্কি এক তীক্ষ্ম আত্মিক যন্ত্রণায় মর্মাহত হন। কিন্তু তা প্রকাশ করার মতো কাউকে পাননি। এই সময়েই তিনি হতাশ হয়ে ওঠেন এবং কাজনকা নদীর উঁচু পাড়ে উঠে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।

কিন্তু নিজের বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে যে গুলিটি করেছিলেন তা তাঁর একটা ফুসফুস বিদীর্ণ করলেও হৃৎপিণ্ড ফুটো করতে পারেনি। তবে গুলির আঘাতে জ্ঞান হারিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। জ্ঞান ফিরলে দেখতে পান, তাঁর শয্যার চারপাশে ঘিরে আছে রুটি কারখানার সেই একই সঙ্গীরা, যারা অমন ব্যথিত করেছিল তার মনকে। এবার কিন্তু তিনি তাঁর সঙ্গীদের অন্য পরিচয় পেলেন- তিনি তাদের মুখে দেখলেন গভীর উদ্বেগ, তিনি যা করেছেন তার জন্য সস্নেহ ভর্ৎসনা। তিনি বুঝলেন যে, হতাশ হওয়া লজ্জার কথা, ঢেলে সাজানো সম্ভব, ঢেলে সাজাতে হবে জীবনকে।

এই ঘটনার পরেও লেখককে কম পরীক্ষা দিতে হয়নি, ক্লেশভোগ ও বিপদও কম দেখা দেয়নি। ১৮৯১-৯২ সালে রাশিয়ায় যে আকাল দেখা দিয়েছিল- যার পরিণামে লক্ষ লক্ষ পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছিল, সেই দুর্ভাগ্য পীড়িতদের মধ্যে গোর্কিও একজন ছিলেন, তাদের সঙ্গেই পাড়ি দিয়েছিলেন ইউক্রেন, ক্রিমিয়া, ককেশাস। বহুবার তাঁকে পিটিয়ে আধমরা করা হয়েছে, 'সন্দেহভাজন' ব্যক্তি হিসেবে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সাধারণভাবে এত কিছুর মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে যে, একসময় এই কথা ভেবে নিজেই অবাক হয়েছেন- তিনি টিকে রইলেন কেমন করে। কিন্তু এখন এইসব দুঃখ-যন্ত্রণা তাঁকে আর আগের মতো হতাশ করত না, বরং বেড়ে উঠত প্রতিবাদের মনোভাব।

১৮৯২ সালেই লেখক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ। প্রথম দিকে তাঁর লেখা ছাপা হত প্রধানত ভলগা তীরের মফঃস্বলের কাগজপত্রে। তখনকার দিনের নামকরা সাহিত্যিকরা কেউ কেউ তাঁর লেখার প্রশংসাও করেছিলেন। কিন্তু তখনও তিনি মূলধারার প্রচারের বাইরেই থেকে গিয়েছিলেন। তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন ১৮৯৮ সালে, তাঁর একটি ক্ষুদ্র সংকলন গ্রন্থ 'রেখা চিত্র ও কাহিনী' প্রকাশের পর। তিনি সে সময়কার খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের পঙক্তিতে উঠে আসেন। এক বছর পরে প্রকাশিত হয় গোর্কির উপন্যাস 'ফোমা গর্দেয়েভ', যা লিও টলস্টয়ের একই সময় প্রকাশিত 'পুনরুজ্জীবন' উপন্যাসের মতোই সমান আগ্রহ সৃষ্টি করে।

গোর্কির প্রথমদিকের লেখাগুলোতে অতুলনীয় বাস্তব দৃষ্টির সঙ্গে মিলেছিল নিপীড়িত মানুষের প্রতি দরদবোধ। কিন্তু তখনও সমাজতান্ত্রিক চেতনা গোর্কি পাননি। প্রলেটারিয়েটের ঐতিহাসিক ভূমিকা তাঁর জানা ছিল না। শ্রমিকশ্রেণিকে তখনও তিনি আঁকছিলেন কেবলমাত্র শোষিত, নিপীড়িত এক জনগোষ্ঠী হিসেবে, নিজেদের এবং সমস্ত মেহনতী মানুষের দাসত্বমোচনে সক্ষম এক পরাক্রান্ত শক্তি হিসেবে নয়।

চেতনার এই স্তর থেকে সমাজতান্ত্রিক চেতনায় উত্তরণ ঘটে মহান লেনিনের সংস্পর্শে এসে। প্রথমে তাঁর রচনা ও আদর্শের সাথে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্ব এবং নেতা হিসাবে গ্রহণ। মার্ক্সবাদী চিন্তাধারার সাথে পরিচয়ের পরেই শ্রমিকশ্রেণি সম্পর্কে এবং শোষণমুক্তির সংগ্রামে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে সম্যক ধারণা গড়ে ওঠে। ১৯০১ সালে প্রকাশিত 'কূপমণ্ডুক' নাটকটি সমাজতান্ত্রিক চেতনার ভিত্তিতে গোর্কির প্রথম রচনা। এই চেতনা আরও ব্যাপকতা নিয়ে দেখা যায় ঐ বছরই প্রকাশিত 'তলদেশ' নাটকে। প্রচলিত জীবনকে মেনে নেওয়ার নিষ্ক্রিয় মানবতার বিরুদ্ধে এই নাটকে গোর্কি হাজির করেছেন বিপ্লবী সংগ্রামের মানবতা, যা জীবনের সমস্ত সত্যকে আত্মস্থ করতে ডাক দেয় এবং মানুষের জীবনকে বদলে দেওয়ার জন্য, বাইরে থেকে এবং ভেতর থেকে তাকে মুক্ত করার আহ্বান জানায়। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯০৬ সালে 'মা' উপন্যাসটি রচনা করেন।

।। এ দেশের বিদ্বজ্জনদের মধ্যে গোর্কি'র ও মা উপন্যাসের প্রভাব ।।

গোর্কির প্রভাব ছিল বিশ্বব্যাপী। এ দেশও তার ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে বাংলার বিদ্বজ্জনদের মধ্যে তাঁর পরিচিতি ঘটে ১৯০৫ সালেই। যখন 'মা' উপন্যাস, প্রকাশিত হয় নি, সেই সময়েই সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত তৎকালীন ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত দৈনিক 'বেঙ্গলী'তে গোকি এক সাড়ম্বর অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন। ঐ বছরই ১৭ ফেব্রুয়ারি বের হয়েছিল 'ম্যাক্সিম গোর্কি-ঔপন্যাসিক, কবি এবং বিপ্লবের অগ্রদূত' শিরোনামের একটি প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধের মাধ্যমেই বাংলায় তাঁর পরিচিতি ঘটে।

এর কয়েকদিন পরে গোর্কি যখন কারারুদ্ধ হলেন, তখন কারান্তরাল থেকেই লিখতে শুরু করলেন মস্কো বিপ্লবের উপর তাঁর বিখ্যাত চিঠি। রুশ স্বৈরতন্ত্রের অত্যাচারের ভয়াবহ বর্ণনা ছিল চিঠির মূল কথা। ইংরেজি অনূদিত চিঠিগুলি বেঙ্গলী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ১৯২০ সালে 'কল্লোল' পত্রিকায় নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় যার শিরোনাম ছিল 'ম্যাক্সিম গোর্কি'।

বাংলা সাহিত্যের জগতে গোর্কির সরাসরি প্রবেশ ১৯২৫ সালে। নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় অনূদিত 'মা' উপন্যাস প্রকাশিত হতে শুরু করে সাপ্তাহিক 'লাঙল' পত্রিকায়। এই পত্রিকার প্রধান পরিচালক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম।

বাঙালি বিপ্লবীদের উপরও গোর্কির প্রভাব কম ছিল না। দীনশে গুপ্ত, ফাঁসিতে যাবার আগে মাকে বলেন, 'কেঁদোনা, গোর্কির মা পড়, সান্ত্বনা পাবে।' গোর্কির মৃত্যুতে কলকাতা কফি হাউসে শোকসভা হয়, যাতে শোকবার্তা পাঠান রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের 'শেষের কবিতা' উপন্যাসে আছে "লাবণ্য তার ঘরের সোফায় হেলান দিয়ে পায়ের উপর শাল মেলে গোর্কির 'মা' বলে গল্পের বই পড়ছে।”

শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, 'এখানকার সাহিত্য যেদিন রুশ সাহিত্যের ন্যায় সমাজের আরও নিচের স্তরে নেমে গিয়ে তাদের সুখ দুঃখ বেদনার মাঝখানে দাঁড়াতে পারবে, সেদিনই বাংলা সাহিত্য দেশের সীমা ছাপিয়ে বিশ্ব সাহিত্যেও স্থান করে নিতে পারবে”। শরৎচন্দ্রের উল্লেখিত সাহিত্যিকদের মধ্যে গোর্কি ছিলেন অন্যতম। পরবর্তীকালে তাঁর 'পথের দাবী' উপন্যাস 'বঙ্গবাণী'তে ছাপা হতে থাকে। তিনি নিজে বলেছিলেন যে, এই উপন্যাসে তাঁর প্রেরণা গোর্কি।

।। 'মা' শ্রমিকশ্রেণিকে নিয়ে এবং শ্রমিকশ্রেণির জন্য লেখা উপন্যাস ।।

সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার আদর্শগত অবস্থানকে সামনে রেখে প্রথম সফল রচনা হিসেবে 'মা' উপন্যাসটিকে চিহ্নিত করা যায়। এই উপন্যাসে লেখক তুলে ধরেছেন বিপ্লবী মানবতার সমস্যা, তুলে ধরেছেন সাহিত্যিক রসসৃষ্টির মধ্য দিয়ে। একথা নিঃসংশয়ে বলা যায়, এই উপন্যাসটি যে বিপুল সংখ্যক পাঠক লাভ করেছিল এবং সমসাময়িক সামাজিক আন্দোলনে যেভাবে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলতে পেরেছিল, আর কোনও বইয়ের ক্ষেত্রে তা হয়নি। ইতিহাসের দিনলিপি থেকে অমরা জানি, বিংশ শতাব্দীর সূচনা ছিল শ্রমিক জাগরণের সময়। সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র অর্জন করে পুঁজিবাদ তখন প্রবেশ করেছে তার ক্ষয়িষ্ণু যুগে। আবার তারই পাশাপাশি শ্রমিকরা সংগঠিত হচ্ছে- বিশ্বের দেশে দেশে শক্তি সঞ্চয় করেছে শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন। মার্ক্সবাদী দর্শনকে হাতিয়ার করে রাশিয়ার বুকে এই আন্দোলনকে পথ দেখালেন লেনিন এবং তাকে সাহিত্যে রূপ দিলেন গোর্কি।

লেখক এই উপন্যাসটির মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন, রাশিয়ায় বিপ্লবের পথ কত কঠিন এবং জটিল ছিল, আবার এটাই ছিল একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ। সংগ্রামের সেই পথের নেতা হিসেবে 'মা' উপন্যাস প্রতিষ্ঠিত করল শ্রমিকশ্রেণিকে। এই উপন্যাস লেখা হয়েছিল বিপ্লবী সংগ্রামকে সর্বস্বপণ করে ঝাঁপিয়ে পড়া শ্রমিকশ্রেণিকে নিয়ে, আবার গণসংগ্রামে সামিল হতে শ্রমিকশ্রেণিকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য। রাশিয়ার শ্রমিক বিপ্লবের ক্ষেত্রে এই উপন্যাসটি অভূতপূর্ব ভূমিকা পালন করেছিল। তাই 'মা' উপন্যাস সম্পর্কে লেনিন বলেছিলেন, "এটি দরকারি বই, বহু মজুর বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল অসচেতন ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে, এবার 'মা' পড়ে তাদের মহা উপকার হবে... খুবই যুগোপযোগী বই।"

মা উপন্যাসে আমরা আদ্যোপান্ত পেয়েছি বিপ্লবী সংগ্রামের কথা- আমরা দেখেছি কীভাবে সেই সংগ্রামের প্রক্রিয়ায়, তার মধ্যে বহমান উন্নত আদর্শের সংস্পর্শে এসে মানুষের ভেতরটা বদলে যায়, তার আত্মিক নবজন্ম ঘটে। গোর্কির আগেও এই পুনরুজ্জীবনের প্রশ্ন নিয়ে তাঁর পূর্বজ রুশ সাহিত্যকরা ভেবেছেন। এই প্রশ্ন নিয়ে বিতর্কও উঠেছে। কিন্তু এক এক জন সাহিত্যিক উপলব্ধির ভিত্তিতে এক এক ভাবে বিষয়টিকে দেখেছেন। এই উপলব্ধির ক্ষেত্রে তাঁর পূর্বসুরীদের সাথে গোর্কির চিন্তার একটা বিভাজন রেখা ছিল। যেমন দস্তয়েভস্কির যেখানে আশঙ্কা ছিল যে বিপ্লবী সংগ্রামে মানুষে মানুষে শত্রুতাবোধ তীব্র হয়ে উঠতে পারে, সেখানে এর বিপরীতে গোর্কি দেখালেন যে, কেবল বিপ্লবী সংগ্রামেই মানুষ তার সমস্ত পাশবিকতা এবং স্বার্থপরতা থেকে ভেতরটা শুদ্ধ করে নিতে পারে। আবার টলস্টয় যেখানে মানুষের 'পুনরুজ্জীবন' দেখেছিলেন তার আভ্যন্তরীণ আত্ম উন্নয়নের পথে, সেখানে মা উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র নিলভনার 'পুনরুজ্জীবন' ঘটতে পেরেছে কেবলমাত্র সংগ্রামের পথে, যে সংগ্রামের লক্ষ্য কোনও বিশেষ মানুষের উন্নয়ন ছিল না, ছিল সমস্ত নিপীড়িত শ্রেণির উন্নয়ন, তাদের মুক্তি। এই সংগ্রামের উষ্ণতায় উজ্জীবিত মা'কে তাই বলতে শুনি- "আমার পুনরুজ্জীবিত আত্মাকে মারতে পারবে না ওরা।”

।। পেলাগেয়া নিলভনা ওরফে 'মা'- উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ।।

এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা প্রবাহ আবর্তিত হয়েছে এর প্রধান চরিত্র পেলাগেয়া নিলভনার চেতনা ও চরিত্রের উত্তরণের কাহিনীকে কেন্দ্র করে। উপন্যাসের শুরুতে আমরা পাই শ্রমিক বস্তিতে মালিকের শোষণ-নিপীড়নে নিষ্পেষিত শ্রমিক জীবনের অবর্ণনীয় অবস্থার বিবরণ দিয়ে। কিন্তু এর জন্য লেখক বেশি কথা খরচ করেননি। অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে দু'চারটে ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি শ্রমিকদের উপর মালিকদের শোষণ-নিপীড়ন এবং মেয়েদের উপর পুরুষতন্ত্রের নিপীড়নের ছবি এঁকেছেন।

এই দুই নিষ্পেষণের শিকার নিলভনার জীবন আরও অনেক মায়ের জীবন থেকে আলাদা ছিল না- যারা কলকারখানায় মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রমে মাতাল মারপিটে এবং নিজের সংসারেই একটা সদাশঙ্কিত অস্তিত্ব নিয়ে দিন কাটাত। নিলভনার কাছে তার বিবাহিত জীবন ছিল অস্তিত্বহীনতার সংকটে নিমজ্জিত। স্বামীর সেবায় হাড়ভাঙা খাটুনি। পান থেকে চুন খসলেই স্বামীর হাতে মার খাওয়া ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। তখন সে আলোকে ভয় পেত, সবসময় জায়গা করে নিত অন্ধকারে, তাই তার আস্তানা ছিল ঘরের এক কোণে, আড়ালে, বাড়িতে যে আছে অনেক সময় তা বোঝাই যেত না।

সেই নিলভনা অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল আলোর দেশে, বেরিয়ে এল তার ছেলে পাভেল ভলাসভের হাত ধরে। এই উপন্যাসটি আসলে নিলভনার অন্ধকার থেকে মুক্তির কাহিনী, পাভেলের মায়ের সকলের মা হয়ে ওঠার কাহিনী।

পাভেলের জীবনও শুরু হয়েছিল শ্রমিক বস্তির আর পাঁচটা যুবকের মতোই- সেই একই দিনপঞ্জী, কারখানায় উদয়াস্ত পরিশ্রম করা, হাড়ভাঙা খাটুনির পর সুঁড়িখানায় যাওয়া, মাতাল হয়ে বাড়ি ফেরা। মায়ের কাছে এ দৃশ্য পরিচিত, তবু ভয় হয়, স্বামীর অত্যাচারে দমিত, নিষ্পেষিত জীবনে একমাত্র আশা তার সন্তান। সেও কি তার বাবার মতো অমানবিক হবে? এই সংশয় তাকে ভাবিয়ে তোলে। একদিন পাভেল মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরলে মা বলে, "হ্যাঁরে, এমনি করে মদ খাস যদি, আমায় কী করে খাওয়াবি বল তো?" এর উত্তরে পাভেল অর্ধ অচেতন অবস্থায় বলে-"সব্বাই তো মদ খায়..."

মায়ের দীর্ঘশ্বাস পড়ে। ভাবে ঠিকই তো বলেছে। তবু বলে- "তাই বলে তুই মদ ধরিসনি, বাবা। তোর বাপ তো অনেক খেয়ে গিয়েছে। তার হাতে আমার দশাটা দেখেছিস তো... তুইও আমার মুখে দিকে চাইবি না?" এর কিছুদিন পরেই মায়ের চোখে পড়ে পাভেল আগের মতো মদ খায় না, খিস্তি খেউড় করে না, মেয়েদের টিটকিরি দেয় না। এসব দেখে মা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু সাথে সাথে মনে সংশয় জাগে, একটা অজানা আশঙ্কায় মন ভরে ওঠে।

লেখক শ্রমিকদের এই মানসিক অবস্থার কথা সুন্দর করে বিশ্লেষণ করেছেন। এখানে দেখানো হয়েছে যে, পাভেলের মধ্যে যখন এরকম পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে তার কিছুদিন আগে থেকেই কারখানায় কিছু নতুন লোকের আনাগোনা শুরু হয়েছে। তারা অনেক ভালো ভালো কথা বলছে, কিন্তু শ্রমিকরা তাদের পুরোপুরি বিশ্বাস করতেও পারছে না। শ্রমিকদের এই মানসিক দোলাচলের বিবরণ দিয়ে লেখক বলছেন- 'দশের থেকে একটু আলাদা কেউ হলেই ওরা সন্দেহের চোখে দেখে। সে সন্দেহের কারণ তাদের অজানা। যেন ভয় পায় হোক পানসে জোলো, কিন্তু মোটের উপর একটা ধারায় চলছে তো জীবনটা। কে জানে কি ঝামেলা বাঁধাবে ঐসব লোকগুলো। নাই বা থাক সুখ, স্বস্তি তো আছে। জীবনের ভারি বোঝাটা একইভাবে বয়ে এনেছে ওরা, বইছে, বইবে। জেনে রেখেছে ও থেকে মুক্তি নেই। আর মুক্তিই যদি নেই, তবে হেরফের হলে দুঃখ বাড়বে বই কমবে না।'

এই সংশয়, দোলাচল শুরুতে মায়ের মধ্যেও ছিল। পাভেলের মধ্যে পরিবর্তন দেখে সেও ভয় পেত। যখন দেখত যে, তার ছেলে আর পাঁচটা ছেলের মতো মদ খায় না, হুল্লোড় করে না, কারখানায় নিজের ডিউটি ফাঁকি দেয় না। আর বাড়িতে যতক্ষণ থাকে শুধু বই পড়ে, তখন একটা অজানা আশঙ্কায় মায়ের মন ভরে যেত।

প্রথম দিকে পাভেল চুপচাপই থাকত, কিন্তু মায়ের মনের কথা কিছুটা বোঝারও চেষ্টা করত, বুঝতে পারত মায়ের মনের উদ্বেগ-আশঙ্কার কথা। তাই একসময় মায়ের সাথে খোলামেলা আলোচনা শুরু করে। মাকে বোঝায়, এ জীবন নরকের জীবন। মাকে সে এই জীবন থেকে মুক্তির কথা বলে। নতুন চেতনার আলোকে ধীরে ধীরে তার এই উপলব্ধি গড়ে ওঠে যে, মানুষ খারাপ নয়, যাকে খুব খারাপ বলে মনে হয়, তার মধ্যেও মনুষ্যত্ব আছে- যে পরিস্থিতির মধ্যে শ্রমিকরা থাকতে বাধ্য হয়, সেই পরিস্থিতিই তাদেরকে ক্রমাগত অমানুষ করে তোলে। তার এই নতুন উপলব্ধির কথা মাকে বোঝায়। বলে, "ভাব তো মা, কী জীবন আমাদের এখানে। তোমার বয়স চল্লিশ, তুমি কি সত্যি করে বেঁচেছ? বাবার কাছে মার খেয়েছ- এখন আমি বুঝি কেন বাবা তোমায় মারত। নিজে যে নরক ভোগ করেছে, তার শোধ তুলেছে তোমার উপর। কষ্ট পেয়েছে, অসহ্য মনে হয়েছে, কিন্তু কখনও বোঝেনি কেন এমন হয় ।..."

ছেলের মুখে নতুন এই কথাগুলো মায়ের মনে আলোড়ন তোলে। গর্বে বুক ভরে ওঠে। আবার ভয়ও হয়। কথাগুলোকে ভুলতে পারে না, আবার মনের মধ্যে প্রশ্ন উকি দেয়- "একা তুই কি করবি রে, বাবা?" মনের মধ্যে এই সংশয় ও দোলাচল নিয়েই মায়ের দিনগুলো কাটে। ভয় হয়, কিন্তু ছেলেকে বাধা দিতে মন চায় না।

ছেলে এই জীবন থেকে মুক্তির কথা বলে, এই মুক্তির বাণী যারা বহন করে নিয়ে আসে তাদের কথা বলে। বলে, "জীবনের শত্রুরা জানোয়ারের মতো ওদের তাড়া করে বেড়ায়, জেলে পোরে, ঘানি টানতে পাঠায়..." ছেলে মাকে বোঝায়- "আমি তাদের দেখেছি মা। তারাই মানুষের মতো মানুষ।" এরপর ছেলের আহ্বান আসে-"এখন তোমার কাছে আমার এইটুকু কথা, যদি আমায় ভালবাসো, আমায় বাধা দিও না, মা-মণি।" ছেলের ডাকে মা সাড়া না দিয়ে থাকে কী করে। ছেলেই তো তার সব। তার ছেলে কোনও অন্যায় করছে বলেও তো বলতে পারবে না। তাই সংশয় ভরা মন নিয়েও মা সাড়া দেয়, বলে- "তাই যা, তোর পথে তুই যা, আমি কখনও বাধা দেব না।"

এই হল মায়ের চেতনার উত্তরণের প্রথম ধাপ। যা ন্যায়, যা সত্য, সেই পথে ছেলেকে এগিয়ে দেওয়া। কিন্তু তখনও মা বিপ্লবী সংগ্রামের বাইরের দর্শক, মহৎ বলে তার প্রতি শ্রদ্ধা আছে, কিন্তু তা বাইরের দর্শক হিসেবেই।

এর পরের ধাপে আমরা দেখি, মায়ের সংসার আর শুধুমাত্র তার ছেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল না, তার বাড়িতে শুরু হল ছেলের বন্ধুদের আনাগোনা। প্রথমে খুব খোলা মনে নিতে পারে না। ভয় হয়, কী জানি, কী নতুন বিপদ হাজির হল। কিন্তু ভয় ভাঙতেও বেশি দেরি হল না। খুব কাছ থেকে তাদের দেখার পর মানুষগুলোকে ভাল লেগে যায়, তাদের নম্র, ভদ্র ব্যবহার, পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতার মনোভাব মায়ের মধ্যে নিজের অজান্তেই আকর্ষণ সৃষ্টি করে। ধীরে ধীরে মানুষগুলোকে ভালবাসতে শুরু করে। ছেলের বন্ধুরাও তাঁকে মায়ের সম্মান দেয়, পাভেলের মা থেকে নিলভনা সকলের মা হতে শুরু করে। তাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া, চা তৈরি করে দেওয়ার কাজ আনন্দের সাথেই করে।

ধীরে ধীরে মায়ের চেতনায় ছেলের কাজ সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা গড়ে উঠতে থাকে। মা সবকিছুই খুব মন দিয়ে পরখ করে, বুঝতে পারে তার ছেলের দলে যেমন শহরের লোকজন আছে, তেমনি ঐ কারখানার শ্রমিকরাও আছে। এমনকি এলাকার দাগী চোর দানিলের ছেলে নিকলাই ভেসভশ্চিকভকে দেখে মা বেশ অবাকই হয়। আবার জমিদার বাড়ির মেয়ে নাতাঝাকে দেখে বোঝে, এখানে শুধু হতদরিদ্র শ্রমিকরাই আসে না, বৈভবের মধ্যে যারা বড় হয়েছে তারাও আসে, আসে আদর্শের টানে। উন্নত আদর্শ ছাড়া যে উন্নত জীবনবোধ পাওয়া যায় না, তা নাতাঝার মতো মানুষেরা জীবন দিয়ে বোঝে। নিজের বাড়ি সম্পর্কে বলতে গিয়ে সে বলে- "বাপ মাকে ছেড়েছি? ও কিছু নয়। আমার বাবা ভাই সবাই রুক্ষ স্বভাবের মানুষ। আবার মদ খেয়ে টং হয়ে থাকে।..." নিজের সম্পর্কে বলে- "এক এক সময় আমি খুবই আনন্দ পাই। মনে হয়, আমার মতো সুখি বুঝি কেউ নেই।" তারপর গভীর আবেগে বলে- "যদি জানতেন, কী বিরাট কাজ আমরা হাতে নিয়েছি... যদি বুঝতেন।..."

মায়ের মধ্যে জানবার, বুঝবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। তার ছেলে ও তার বন্ধুরা যখন একসাথে পড়াশুনা করে, আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক করে, মা নীরবে বোঝার চেষ্টা করে। কথাগুলো বুঝতে পারে না, কিন্তু যে মনোরম শান্ত পরিবেশে ওরা কথা বলে তার সাথে নিজের বিগত জীবনের কথা স্মরণ করে- 'শ্রমিকরা এক সাথে হলেই হৈ-হুল্লোড় করত, অশ্লীল নোংরা ভাষায় কথা বলত, আর কী কুৎসিত ঠাট্টা তামাসাই না করত।' মায়ের মধ্যে একটা নতুন জীবনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়।

মা ওদের আলোচনা মন দিয়ে শোনে। ওরা আলোচনা করে- "কেন আমাদের সবকিছু জানা দরকার?

শুধু এক পেট খেতে পাওয়াটাই জীবনের সব নয়, আমরা বাঁচতে চাই, সাচ্চা মানুষের মতো বাঁচতে চাই।" ছেলের এইসব কথা শুনে মায়ের বুক গর্বে ভরে ওঠে, ছেলেকে বলে- "ভালোই করেছিস খোকা।"

এখন মা আর একটু ভালো করে বুঝতে পারে যে, তার ছেলে ও তার বন্ধুরা যে কাজ করছে সেটা ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আর ছেলের বন্ধুদের আরও কাছের মানুষ বলে মনে হয়। তাদের ভালো মন্দের সাথে আরও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়ে। তাই মা নিজেই একদিন ছেলেকে প্রস্তাব দেয়- "খখল এসে থাকুক এখানে। তোদের দুজনেরই সুবিধে হবে। দেখা করার জন্য ছুটোছুটি করে মরতে হবে না।"
পাভেল বলে, "তোমারই কষ্ট বাড়বে।"
মা স্বচ্ছন্দে জবাব দেয়- "তা না হয় বাড়ল। চিরকাল তো কষ্ট করেই এলাম, কিন্তু সেসব ভস্মে ঘি ঢেলেছি। এবার নয় একটা ছেলের মতো ছেলের জন্যই কষ্ট করলাম একটু।"

এই হল মায়ের বিপ্লবী হওয়ার সংগ্রামে উত্তরণের দ্বিতীয় ধাপ। এই পর্যায়ে মায়ের পরিবার ক্রমাগত বড় হতে শুরু করে। পরের ঘটনাক্রমে দেখি ছেলের বন্ধু খখল কীভাবে মায়ের কাছে আর একটা সন্তান হয়ে ওঠে। তাই একদিন গভীর আবেগে খখল মাকে বলে, "আপনিই হয়তো আমার নিজের মা। আমি কিনা আপনার কুচ্ছিৎ ছেলে। তাই লোকের সামনে আপনি স্বীকার করতে চান না।"
কথাগুলো শুনে মায়ের মন উথাল-পাথাল হয়, আদর উথলে উঠতে চায়।

এর পরের পর্যায়ে মাকে আমরা দেখি কর্মী হিসেবে। প্রথম যেদিন তার ছেলে তাকে শহরে একটা চিঠি পৌঁছে দেবার কাজ দিল, সেদিন মায়ের মনে যে আনন্দের শিহরণ লেগেছিল, তার সাথে অন্য কোনও জাগতিক আনন্দের তুলনা চলে না। এমনকি ছেলে যখন বলল, এই কাজে বিপদের ঝুঁকি আছে, তাতে সে ভয় পেল না।

আবার যখন কারখানায় তার ছেলের দলের লোকেরা শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করতে শুরু করল, তখন কারখানায় বেশ আলোড়ন পড়ে গেল। একদল যেমন সংগ্রামে এগিয়ে এল, অন্য আর একদলের মধ্যে দেখা গেল দ্বিধা আর সংশয়। সেই সংশয়ী মন নিয়ে যখন তারা মা'কে ছেলে সম্পর্কে সাবধান করতে এসেছে, তখন আমরা দেখি মায়ের মধ্যে তারা কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি। এখন আর মায়ের মনেই হয় না যে, তার ছেলেরা কোনও অন্যায় কাজ করছে।

মা বোঝে যে, ধীরে ধীরে সকলেই তার ছেলেকে নেতা হিসাবে মেনে নিয়েছে। শ্রমিক বস্তিতে বা কারখানায় কোনও শ্রমিক বিপদে পড়লেই ছুটে আসে পাভেলের কাছে, তার পরামর্শ চায়। এতে মা গর্ব অনুভব করে। আবার অজানা সংশয়ও উকি মারে মনের কোণে। তারপর এল কারখানায় প্রধম ধর্মঘটের দিন। জলাশয় পরিষ্কার করার অজুহাতে কারখানা কর্তৃপক্ষ যখন শ্রমিকদের উপর অতিরিক্ত ট্যাক্স বসানোর সিদ্ধান্ত নিল, তখন পাভেল ও তার বন্ধুরা শ্রমিকেদের সংগঠিত করল। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল প্রতিবাদ সভায় যে শ্রমিকরা জড়ো হয়েছিল তাদের বেশিরভাগই কর্তৃপক্ষের রক্তচক্ষুর কাছে ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু তার পাভেল এবং তার সাথীরা অকুতোভয়। ফলে কর্তৃপক্ষের বিষনজর তাদের উপরই এসে পড়ল। তাদেরই বাড়িতে পুলিশী তল্লাসী হল এবং তাদের জেল হল। সত্যের ঝাণ্ডা নিয়ে যারা এগিয়ে আসে প্রথমে তারা সংখ্যায় অল্পই থাকে- ইতিহাসের এই শিক্ষাই পুনরাবৃত্ত হল।

এরপর পাচ্ছি কর্মী হিসাবে মায়ের আর একটা পরিচয়- বিপ্লবী আন্দোলনের প্রত্যক্ষ কাজে হাতেখড়ি। পাভেলরা যখন জেলে, তখন বিপ্লবী দলের কাছে যে সমস্যাটা বড় হয়ে দেখা দিল, সেটা হল কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের মধ্যে প্রচার পত্র বিলি করবে কে? কারখানার গেটে কড়া পুলিশ পাহারা, চারিদিকে গোয়েন্দা- তাদের চোখে ধুলো দিয়ে শ্রমিকদের কাছে প্রচারপত্র পৌঁছে দেবে কে? এগিয়ে এল মা। যথেষ্ট দক্ষতার সাথে কাজটা সম্পন্নও করেছে। শুধু প্রত্যক্ষ কাজ করাই নয়, আমরা দেখেছি, কিভাবে খখলের উৎসাহে মা পড়াশুনাও শুরু করে দিয়েছে।

পাভেল জেলে যাওয়ার পরও মায়ের কখনও একা মনে হয়নি। পাভেলের বন্ধুদের আনাগোনা তো লেগেই আছে। তাদেরকে নিয়েই তৈরি হয় মায়ের নতুন ভাবাবেগ। খখলকে বলে, "আমি বুঝতে পারছি এখন, এই হল বাঁচার পথ। আন্দ্রেই আপনাকে আমি সত্যিই ভালবাসি। হয়তো পাভেলের চাইতেও বেশি।..."

ভাবতে তারপর মায়ের অন্তরের কথাগুলো সহজ সরলভাবে বেরিয়ে আসে- "এখন তো জেলে বসে আছে। সত্যি ভয় করে, কিন্তু আগের মতো ততটা নয়। এখন জীবনই অন্যরকম হয়ে গেছে, আমার ভয় ডরের চেহারাও বদলে গেছে। এখন সবার জন্যই ভয় করে। অমার মনটাই অন্যরকম হয়ে গেছে। আমার অন্তর মুক্ত হয়ে বাইরের দিকে চোখ মেলেছে। মনটা বড় ভারি হয়ে যায়, আবার একটা সুখও পাই। অনেক কিছুই বুঝিনে আমি। আপনারা যে ধর্মে বিশ্বাস করেন না, সেটা আমার বড় প্রাণে লাগে। কিন্তু কী করব? আপনারা সব হীরের মতো মানুষ। মানুষের জন্য, সত্যের জন্য দুনিয়ার দুঃখ মাথায় তুলে নিয়েছেন। কোন সত্য আপনাদের, তা বুঝি এখন। বুঝি বড় লোকগুলো যদ্দিন আছে, কিচ্ছু পাবে না সাধারণ মানুষেরা না একটু আনন্দ, না তার হকের পাওনা। এখন তো আপনাদের মধ্যে আছি। মাঝে মাঝে রাত্তির বেলা পুরনো সব কথা মনে হয়। ভাবি আমার জোয়ান বয়সের সব শক্তি পায়ের তলায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার কচি প্রাণটুকু হাতের মুঠোয় চেপে গেছে চূর্ণ হয়ে। ভারি কষ্ট হয় নিজের জন্য, মনটা তেতো হয়ে ওঠে। তবু আজকাল জীবনটা আমার অনেক ভালো হয়ে উঠেছে। একটু একটু করে নিজেকে বুঝতে পারছি..."

তারপর গভীর আবেগে বলে ওঠে- "হয়তো আপনাদের কাজকর্ম ঠিক বুঝিনে আমি। কিন্তু সকলকেই ভালবাসি। সবাই আমার আপনার জন, সবার জন্য ভাবি। অহরহ এই কামনাই করি সবাই যেন সুখী হয়। বিশেষ করে আপনি, আন্দ্রিউশা।"

চেতনার এই উত্তরণের পথে ধীরে ধীরে মায়ের আরও কাছে চলে আসে বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর এই ছেলে-মেয়েগুলো। কী গভীর বিশ্বাস ওদের। দিনে দিনে তার গভীরতা মা দেখছে চোখের সামনে। সংশয়ের রাস্তা থাকে না তাতে। দেখে মায়ের অবাক লাগে। এই অবাক লাগার মধ্যে কী যে সুখ। ওরা স্বপ্ন দেখে ন্যায়ের জয় হবে। ওদের এই স্বপ্ন এক অদ্ভুত উষ্ণতায় ও আদরে ভরে রাখে মায়ের বুকটা। তার মনকে সব চেয়ে নাড়া দেয় ওদের সহজ সরল ভাব, নিজের প্রতি মনোরম ঔদাসীন্য।

এই নতুন জীবনে তাকেও দরকার, এই একটা শান্ত চেতনা নিজেরই অজান্তে মনে গড়ে উঠেছে। কোনও কাজে যে সে লাগতে পারে একথা আগে কখনও ভাবেনি। এখন পরিষ্কার চোখে দেখতে পাচ্ছে, তাকে অনেকের দরকার। এ এক নতুন ব্যাপার। ভারি ভাল লাগে। হেঁট মাথাটা উঁচু হয়ে ওঠে।

এই নবলব্ধ মর্যাদাবোধ মাকে সামনের দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। পাভেল জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর যখন নতুন উদ্যমে, আরও শক্তি নিয়ে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন মায়ের আর আগের মতো ভয় হয় না। ছেলের জন্য ভাবনা হয়, কিন্তু এখন একটা বোধ মনকে শান্ত করে যে, পাভেল একা নয়, ওর মতো আরও অনেক ছেলেমেয়ে এই পথেই সংগ্রামে নেমেছে। তাই মে দিবসের মিছিলে যখন পাভেল লাল পতাকা নিয়ে এগোবে বলে ঠিক করল, তখন মায়ের মনের দ্বন্দ্ব সংঘাত খুব মুন্সিয়ানার সাথে লেখক তুলে ধরেছেন। মায়ের একটা মন ছেলেকে বাধা দিতে চায়- আজন্ম লালিত যে মন শুধুই ছেলের কল্যাণ চায়, ছেলেকে সুস্থ-সবল দেখতে চায়। আর একটা মন, যেটা বিপ্লবী মায়ের মন, সেই মন বলে, না, ওকে বাধা দিওনা। তাই ছেলে যখন তিরস্কারের সুরে বলে, কোথায় খুশি হবে! না, তার উল্টোটাই করছ! কবে যে আমাদের মায়েরা হাসতে হাসতে ছেলেদের মরতে পাঠাতে পারবে, তাই ভাবছি!" তখন মা বলে, "আমি তো বলিনি কিছু! তোকে আমি বাধা দিচ্ছি না। কিন্তু আমার যে কষ্ট হয়...কী করব, আমি যে মা..."

খুব অল্প কথায় মায়ের মনের দ্বন্দ্ব পাঠকের হৃদয়ের গভীরে আঘাত করে। আমরা বুঝতে পারি, শেষ পর্যন্ত বিপ্লবী মায়েরই জয় হয়। ছেলের মাথাটা বুকে চেপে ধরে গভীর ব্যথায় মা বলে ওঠে, "চুপ! একটি কথাও না। ভগবান জানেন, তোর পথেই যাবি তুই। কিন্তু আমার মনটাকে নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করিসনি। মা সন্তানের জন্য ভাববে না? না ভেবে সে কি পারে?... তোদের সবার জন্য আমি ভাবি। তোরা সবাই আমার আপনজন। আমি তোদের জন্য না ভাবলে আর কে ভাববে বল?...দেখছিসই তো, সবাই সবকিছু ছেড়ে চলেছে তোর পেছন পেছন..."

মা আর শুধু পাভেলের মা থাকে না, হয়ে ওঠে সকলের মা। হৃদয় দিয়ে এই কথাটা বোঝে খখল। তাই, পাভেলকে তিরস্কারের সুরে বলে- "শুনেছ? একটু বুঝতে চেষ্টা কর। তোমার চাইতে ঢের বেশি বড় ওঁর মনটা।"

পাভেল মাথা নিচু করে অর্ধোচ্চারিত ভাবে বলে, "মা ক্ষমা করো। এখন সব বুঝতে পারছি।" বিপ্লবী আদর্শকে আত্মীকরণের প্রশ্নে মা ও ছেলের মধ্যে ঐক্য আরও সুদৃঢ় হয়ে ওঠে।

এরপর পয়লা মে'র মিছিলে যে মাকে পাই, সে এক নতুন মা। ছেলে এগিয়ে চলেছে সামনের সারিতে লাল নিশান হাতে নিয়ে। মাও চলেছে সেই মিছিলে উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে। কোনও ভয়-ডর নেই। এমনকি ছেলে যখন পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে গেল, তখনও মায়ের মনে দেখা দিল না আগের মতো উৎকণ্ঠা। বরং বিশাল মিছিলে যোগ দিতে আসা কোনও এক ছেলের মা গভীর উৎকণ্ঠায় ছেলেকে মিছিলে যেতে নিষেধ করে, তখন মা তাকে সাহস দেয়, বলে, 'যেতে দিন ওকে। ভয় নেই। প্রথমে আমিও খুব ভয় পেয়েছিলাম। আমার ছেলেও গেছে- ওই দেখছেন? আগে আগে চলেছে নিশান হাতে নিয়ে।' তারপর তাকে সাহস দিয়ে বলে, 'ভয় কী? এ যে ধর্মের কাজ... একবার ভেবে দেখুন তো, যীশুখৃষ্টই কি থাকতেন মানুষ যদি তাঁর জন্য জান না দিত?'

পুলিশ যখন মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দিল, পাভেল ও তার সাথীদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেল, তখন সেই ছত্রভঙ্গ মিছিলের জনতাকে উদ্দেশ্য করে মা তার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে বলতে শুরু করে। জীবনে এই প্রথম। কিন্তু কোনও জড়তা নেই। জড়ো হওয়া মানুষের উদ্দেশ্যে মা বলতে শুরু করে- "ভগবানের দোহাই, শোন তোমরা! শোন! তোমরা সবাই সাচ্চা মানুষ... আপনজন ...আজ যা ঘটল, একবার নির্ভয়ে সেদিকে তাকাও দেখি! দুনিয়ার পথে বেরিয়েছে আমাদের ছেলেরা, আমাদেরই বুকের ধনরা বেরিয়েছে... তোমাদের সবার জন্য, তোমাদের শিশুদের জন্য পথে বেরিয়ে এসেছে। সুদিনের আশায় এই ক্রুশখানি নিয়ে বেরিয়েছে তারা। তারা নতুন জীবন চায়-একেবারে আলাদা জীবন- সত্যের জীবন- ন্যায়ের জীবন। সব মানুষের জন্য সুখের জীবন চায় তারা..."

এই মায়ের মধ্যে আমরা পাই একটা নতুন রূপ- ছেলের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে মা দাঁড়ান নিজের পায়ের উপর। একটা নতুন উপলব্ধি জন্ম নেয় মায়ের অন্তরে। মায়ের নবজন্মের সূচনা দিয়ে শেষ হয় উপন্যাসের প্রথম খণ্ড।
(পথিকৃৎ পত্রিকার মার্চ ২০২২ সংখ্যা থেকে নেওয়া)

আপনার মতামত অন্যান্য পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করুন
মতামত দিন
মতামতসমূহ
Avijit Jana
শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

মার্ক্সবাদী সাহিত্যের অণূপুঙ্খ মূল্যায়ন পড়লাম।সমাজ বিপ্লবের পরিপূরক উপন্যাস ম্যাক্সিম গোর্কির মা।এমন একটি মূল্যায়ন ও দৃষ্টিভঙ্গি পড়ার সুযোগ পেলাম পথিকৃৎ পেজে।ধন্যবাদ অনন্য পথিকৃৎ কে।

Avijit Jana
শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

মার্ক্সবাদী সাহিত্যের অণূপুঙ্খ মূল্যায়ন পড়লাম।সমাজ বিপ্লবের পরিপূরক উপন্যাস ম্যাক্সিম গোর্কির মা।এমন একটি মূল্যায়ন ও দৃষ্টিভঙ্গি পড়ার সুযোগ পেলাম পথিকৃৎ পেজে।ধন্যবাদ অনন্য পথিকৃৎ কে।

পথিকৃৎ

আমাদের পত্রিকা ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত থাকুন এবং সর্বশেষ খবর ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট নিয়মিত পান

যোগাযোগ

পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২

দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com

গুরুত্বপূর্ণ লিংকসমূহ

© Pathikrit. All Rights Reserved. Designed By GenxByte