আলিগড় জাতীয় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে ভাষণ দানের সুযোগ দিয়ে আমার প্রতি যে আস্থা, মহতী মর্যাদা জ্ঞাপন করা হয়েছে সেজন্য প্রথমেই আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ন্যস্ত এই মর্যাদার গুরুত্ব কিছুটা পরিমাণে আমাকে বিহ্বল করে তুলেছে। আমার একথা নেহাৎ প্রথাগত বিনয়বচন নয়, কেননা আমি নিজেই জানি, না যে এই উত্তুঙ্গ সম্মান পাবার মতো কিছু করেছি কিনা। স্বীকার করেছি কিনা। স্বীকার করতে হচ্ছে যে আপনাদের আমন্ত্রণ কিছুটা বিস্মিত চিত্তেই গ্রহণ করতে হয়েছে আমাকে। কেন না আমার পক্ষে বোঝা কঠিন হয়েছে যে কিভাবে উত্তর ভারতে অবস্থিত, রাজনৈতিক উত্তেজনার উত্তাপ যার জন্মসূত্রে, এমন এক ঐস্লামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ এক অনুষ্ঠানে আমার মতো একজন বিজ্ঞানের ছাত্র, বাঙালী, অ-মুসলমান এবং অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা হলো।...
যেভাবেই হোক অপ্রত্যাশিত এই আমন্ত্রণ আমার চোখকেও খুলে দিয়েছে। আমার বিশ্বাস, সমাগত বন্ধুবর্গ নিশ্চয়ই ভুল বুঝবেন না, যদি আমি কবুল করি যে সঙ্কীর্ণ সম্প্রদায়গত শিক্ষায়তনগুলি সম্পর্কে আমার তেমন প্রীতির মনোভাব নেই এবং সর্বদা আতঙ্কে থাকি পাছে সাধারণ প্রবণতা মতো এগুলি অন্ধ-সঙ্কীর্ণতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে আমার মতো একজন অ-মুসলমানকে আমন্ত্রণ আরেকভাবে আমাকে যৎপরোনাস্তি আনন্দিতও করেছে, কেননা এ হলো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালকমণ্ডলীর অন্তরে সক্রিয় উদারনৈতিক বিশ্বজনীন মানসিকতার অভ্রান্ত উদাহরণ।...
এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন কখনোই সঙ্কীর্ণতার ঘেরাটোপ এবং উৎকট সাম্প্রদায়িকতার গহ্বরে আটকে না পড়ে কিংবা গোঁড়ামি আর অন্ধ অজ্ঞানতার গুঁড়িপথে পতিত না হয়।...
স্বাধীনতা প্রথম, স্বাধীনতাই দ্বিতীয়, স্বাধীনতা চিরন্তন এক মহান আবেগকে মহনীয়ভাবেই প্রকাশ করেছিলেন আধুনিক ভারতের রূপকারদের অন্যতম স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, এই কথাটাই সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল রণধবনি হওয়া উচিত। নিছক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার প্রশাসনিক সার্বভৌমত্বের মতো শিক্ষায়তন সম্পর্কিত কেতাবি বিষয়গুলিতে এই স্বাধীনতা সীমায়িত থাকবে এটা বোঝাতে চাওয়া হয়নি বরং আরও ব্যাপকার্থে প্রয়োগযোগ্য করে এই স্বাধীনতার মর্মকে উপলব্ধি করতে হবে। এর মর্মে অবশ্যম্ভাবীভাবেই থাকতে হবে চিত্তের স্বাধীনতা-চিন্তার মুক্তি, দাসত্বহীন যুক্তির বিকাশ, বোধির বন্ধনমোচন-মানব সভ্যতার যুগযুগান্তকালের সর্বাপেক্ষা দুরূহ ও সর্বোচ্চ গৌরবের প্রাপ্তি। কর্তৃত্ববাদী অনুশাসন, পূর্ব নজির, মতবাদ সবকিছুকেই বোধির অনুসন্ধানী আলোয় নিরাবেগে ও নিরুত্তাপে যাচাই করে নিতে হবে। যদি দেখা যায় কিছু ঘাটতি আছে, ত্রুটি আছে কিছু, যদি মনে হয় অযৌক্তিক তবে সেগুলিকে আবর্জনার গাদায় নিক্ষেপ করতে হবে।...
মানবেতিহাসের সমগ্র পর্ব জুড়েই মানব-প্রগতির সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে কুসংস্কার, গোঁড়ামি, যুক্তিহীনতা। আর মানব মনের বিকাশের উপর জগদ্দল পাষাণ চাপা দিয়েছে সর্বনাশা অন্তর্শক্তিঘাতী কর্তৃত্ববাদী অনুশাসন ও মতান্ধতার প্রভাব। সভ্যতার অনুকূলে বিজ্ঞানের চিরন্তন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান যদি কিছু থেকে থাকে তবে আমি মনে করি, তা হল এই কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, সত্যকে জানার প্রবল প্রয়াস এবং যুক্তিকে নাড়া দেবার ক্ষমতা। আজকের এই সায়াহ্নবেলায় একজন বিজ্ঞানপথিক হিসাবে আপনাদের কাছে কিছু বলতে গিয়ে এই আবদেনই করব যে, সত্যের এই পতাকা, স্বাধীনতার এই কেতনকে সদা উড্ডীন রাখুন।
আমি যা বলছি, যদিও তা কিছুটা সতর্কবাণীর মতো শোনাতে পারে, তা সত্ত্বেও সত্য এটাই যে, আমার মন্তব্যগুলির বন্ধুত্বসুলভ পরামর্শ ছাড়া আর কোনো অর্থ নেই, আর এ নিয়ে আমারও বিন্দুমাত্র স্নায়বিক দুর্বলতা নেই। বরং পরিবর্তে আমি অনেক বেশি প্রত্যয়ী যে সত্য, খাঁটি শিক্ষা ও চিন্তার স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে যেমন ভাবে অতীতে ইসলামের বিকাশের প্রশ্নে এটি দৃষ্টান্ত রেখেছে। এই পরম্পরা, বলতে চাইছি ইসলামের বোধিগত পরম্পরা আমার জানা আছে, আমি স্মরণ করি বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন ও শিল্পকলার ক্ষেত্রে ইসলামধর্মাবলম্বী মানুষদের বিপুল অবদানকে। আমার স্মরণে আসে, মধ্যযুগে অ্যারিস্টটলীয় শব্দের দার্শনিক মর্ম নিয়ে নিষ্ফলা মহাবিতর্কে, (Logomachis) ঈশ্বরের মাতা ও ঈশ্বরের পুত্র সম্পর্কিত অন্তহীন ধর্মতাত্ত্বিক কূটকচালিতে খ্রীষ্টধর্ম যখন নিজেকে নিঃশেষিত করে তৃপ্ত থাকছিল, সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন নৈরাশ্যের কালে সত্যের আলোকবর্তিকাকে অনির্বাণ রাখতে ইসলাম কি ভূমিকাই না পালন করেছিল। বাগদাদ কায়রো, কর্ডোভা বা গ্রানাদার দৃশ্যাবলীর সুপ্রাচীন বৈভব, অনির্বচনীয় সুবাস আমার মানসপটে ভেসে ওঠে। নিজে মুসলমান না হলেও একজন এশীয়বাসী হিসাবে গর্বে আনন্দে আমার বুক ভরে ওঠে যখন ভাবি যে, সংস্কৃতি ও জ্ঞানের জগতে কি মহান বিজয়ই না হাসিল করেছে ইসলাম। আমার বিশ্বাস, আমার এই বন্ধুরা নিশ্চয়ই আমাকে মার্জনা করবেন যদি আমার হৃদয়প্লাবী ভালবাসা নিয়ে ঐস্লামিক ইতিহাসের এই বৈভবময় অধ্যায়ে আরও কিছুক্ষণ ইতঃস্তত বিচরণ করি ।...
□ ঐস্লামিক সংস্কৃতি □
আমার প্রশ্ন, জগৎটা কেমন হতো, কোথায় থাকতো বর্তমান সভ্যতা, যখন বর্বরদের অভিযানে ইউরোপে চিরায়ত যুগ অবর্ণনীয় অন্ধকার, নিঃসীম হতাশার রসাতলে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল তখন এই ধ্বংসের মাঝে ইসলামের আবির্ভাব যদি না চিরায়ত জ্ঞানের বীজকে জীবনদায়ী সত্য ও স্বাধীনতার পরিবেশ দিয়ে অসীম মমতায় সিঞ্চিত করে ফুলে ফলে পল্লবিত করে তুলত। প্রাচ্য, মিশর, গ্রীসের সমুদয় জ্ঞানকে সংরক্ষণ করেছিলেন, শুধু রক্ষা করাই নয় পরিশীলিত উন্নত ও সাধারণীকৃত করে তুলেছিলেন মধ্যযুগের ঐস্লামিক পণ্ডিত, বিজ্ঞানী ও দার্শনিকেরা। গিবন, সেডিল্লো, লেনপুল, ড্র্যাপার, সৈয়দ আমির আলি ও অপরাপর ঐতিহাসিকদের রচনাগুলি যদি পড়েন তবে সে যুগের পণ্ডিতদের অন্বেষণের সাহসে, গবেষণার মৌলিকত্বে, জ্ঞানের বহুমুখী শাখায় বিচরণের ক্ষমতায় শ্রদ্ধা ও বিস্ময়ে অদ্ভুত না হয়ে থাকতে পারবেন না।...
□ নবীর সময়কালে □
জ্ঞান-তৃষ্ণা এবং সত্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধই ইসলামের সারবস্তুকে গড়ে তুলেছে, নবী নিজে ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান জ্ঞানান্বেষক। সৈয়দ আমির আলি বলেছেন:
জ্ঞান ও বিজ্ঞানের প্রতি প্রগাঢ় অনুরক্তিই এই আরবদেশীয় নবীকে অপরাপর শিক্ষক-প্রচারকদের থেকে পৃথক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল এবং আধুনিক চিন্তার জগতের সঙ্গে তাঁকে নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট করেছিল। মক্কার পতনের পর ইসলাম ধর্মতত্বের সর্বজনীন কেন্দ্র (commonwealth) মদিনা এক আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল-শুধু আরবীয় জনস্রোতের কাছে নয়, বিদেশী অন্বেষকদের কাছেও। এখানে সমবেত হতেন উত্তর ও পশ্চিমের বহু বর্ণ, বহু জাতির মানুষ, পারসিক, শ্রীসিয়, সিরিয়, ইরাকীয়, আফ্রিকীয়রা। কিছু মানুষ যে স্রেফ কৌতূহলবশতঃ আসত তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু অধিকাংশই আসতেন জ্ঞানান্বেষণে ও ইসলামের প্রচারকের কথা শুনতে। তিনি জ্ঞানের মূল্য সম্পর্কেই উপদেশ দিতেন; "জ্ঞানার্জন করো, কেন না যে করে তার প্রতি ঈশ্বরের করুণা বর্ষিত হয়; জ্ঞানের আলোচনা কার্যত প্রভুরই প্রশংসা; জ্ঞানতৃষ্ণা যার রয়েছে তিনিই প্রভুর পরম প্রিয়; জ্ঞানোপদেশ হলো মহাদান, যে করে ঈশ্বরের প্রতি সেটাই ভক্তির এক বহিঃপ্রকাশ। জ্ঞানই কাউকে কোনটি নিষিদ্ধ কাজ কোনটি তা নয় বোঝার ক্ষমতা জোগায়। জ্ঞান বেহেস্তের পথ আলোকিত করে, মরুভূমিতে এটাই আমাদের বান্ধব। একাকীত্বের মধ্যে জ্ঞানই বহুজন-সমাজ, নির্বান্ধবের সাথী। আনন্দের পথ দেখায়, দুঃখ সইবার শক্তি দেয় জ্ঞান। বান্ধব পরিবৃতকালে জ্ঞানই আমাদের অলঙ্কার আবার আমাদের শত্রুর বিরুদ্ধে জ্ঞানই বর্ম। জ্ঞানের দ্বারাই এক ঈশ্বরের দাস ইহজগতেই ঈশ্বরসুলভস্তবে উন্নীত হতে পারে ও মহামহিমের পয়গম্বরদের মধ্যে বিশিষ্ট স্থান করে নিতে পারে, এবং পরকালে অনাবিল আনন্দ মাধুর্য লাভে সমর্থ হতে পারে।" তিনি প্রায়শই বলতেন, "জ্ঞানীর মসীধারা শহীদের রক্তধারার চেয়েও পবিত্র।" জ্ঞানার্জনের প্রয়োজনে 'চীনে গিয়েও নিতে হবে"-এভাবে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব তিনি শিষ্যদের বোঝাতেন। বলতেন, "জ্ঞানের সন্ধানে যে গৃহত্যাগ করেছে সে ঈশ্বরের পথেই চলেছে।" "যে জ্ঞানান্বেষণের পরিক্রমায় রত, ঈশ্বর তাকেই বেহেস্তের পথ দেখান।" কোরান গ্রন্থটি নিজেই অধ্যয়ন ও বিজ্ঞানের গুরুত্বের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে, আরবীয় উপদ্বীপ, তার কিছুটা উত্তর-পশ্চিমে ও উত্তর-পূর্ব দিকে ছড়ানো-ছিটানো কিছু জনপদ বিশিষ্ট তথাকথিত আরব দুনিয়ায় কোনো বৌদ্ধিক বিকাশের চিহ্নমাত্র ছিল না। কবিতা, ওজস্বিতা, বৈচারিক জ্যোতিষচর্চাই ছিল প্রাক্-ইসলাম আরবের চর্চার প্রিয় বিষয়। বিজ্ঞান ও সাহিত্যচর্চার কেউ ছিল না। নবীর বাণীই জাতির নিদ্রোত্থিত শক্তিকে নতুন বেগ সঞ্চারিত করেছিল। তাঁর জীবৎকালেই শিক্ষাকেন্দ্রের ভ্রূণ সৃষ্টি হয়েছিল, যার মধ্য থেকে পরবর্তীকালে বাগদাদ, সালানো, কায়রো, কর্ডোভার বিশ্ববিদ্যালয় রূপী মহীরূহের আবির্ভাব ঘটেছিল। এই কেন্দ্রেই নবী নিজে পরমাত্ম্যাচর্চার উপদেশ স্বরূপ বলেছিলেন- "একাগ্রচিত্তে একঘন্টা ধরে স্রষ্টার সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে চিন্তন সত্তর বছর ধরে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনার চেয়ে অনেক ভালো।" "একঘন্টা কাল বিজ্ঞান পাঠ শ্রবণ ও শিক্ষাগ্রহণ সহস্র শহীদের শবানুগমন বা সহস্র রজনী ব্যাপী প্রার্থনার জন্য ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে উৎকৃষ্টতর কাজ।" সদ্যোজাত জাতিরাষ্ট্রপুঞ্জের অতি প্রয়োজনীয় জ্ঞানের শাখাগুলি সম্পর্কে শিক্ষা দিতেন নবীর জামাই আলি। নথিপত্রে তাঁর উপদেশ যা পাওয়া গেছে তাতে দেখা যায় তিনি বলছেন-''বিজ্ঞানে পাণ্ডিত্যই সর্বোচ্চ সম্মান।" "জ্ঞানার্জনে যিনি জীবন উৎসর্গ করেন, তার মৃত্যু নেই-তিনি অমর।" "পাণ্ডিত্যই মানুষের শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার"। স্বভাবতই নবী ও পরবর্তীকালের তাঁর শিষ্যপ্রধানদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদারনৈতিক নীতির উৎস এবং সমস্ত শ্রেণির মানুষের শিক্ষার আগ্রহকে তা উদ্দীপ্ত করেছিল। প্রথম দিকের খালিফাদের আমলে আরব জাতির মধ্যে বিক্ষোভ-আন্দোলন ঘটলেও ইসলাম প্রভাবিত আদি নগরীগুলিতে শিক্ষা ও সাহিত্য চর্চায় কোনোভাবেই অবহেলা হয়নি। আলি ও তার ভাইপো (Cousin) কাব্য, ব্যাকরণ, ইতিহাস ও গণিতবিদ্যা সম্পর্কে প্রকাশ্যে বক্তৃতা করতেন। অন্যেরা শেখাতেন আবৃত্তি বা বাগ্মীতা বিদ্যা, কেউ কেউ হস্তাক্ষর (Caligraphy) শেখাতেন। এসবই ছিল সেই আদিযুগে জ্ঞানের অমূল্য শাখা।
□ আব্বাসী যুগ □
স্বয়ং ইসলাম ধর্ম প্রবর্তকের নিজের সৃষ্ট উদাহরণ ধর্মানুশাসন এ-রকম হওয়ার ফলে স্বাভাবিকভাবে এটাই প্রত্যাশিত যে, পরবর্তীকালে ইসলাম ধর্মের বিকাশ ও প্রসারের কারণে বিজ্ঞান ও শিক্ষাকলায় বিপুল গতিবেগ সঞ্চারিত হবে। এবং কার্যত ঘটেছিল তাই। বৌদ্ধিক জগতে যে অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হয় তার বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় জনৈক খ্রীষ্টান লেখকের লেখায়। আর যাই হোক, তাঁকে অন্ততঃ ইসলাম ধর্মের কৃতিত্বের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট এটা বলা যাবে না।
সারাসেনীয়রা (আরবভূমির মুসলমানরা) যে ক্ষিপ্রতায় রোম সাম্রাজ্য পদানত করেছিল সমান দ্রুততায় দর্শনাশাস্ত্র ও বিজ্ঞানের দুনিয়াতেও তাদের বিজয় অভিযান শুরু হয়ে যায়। হজরত মহম্মদের প্রয়াণের এক শতাব্দীরও কম সময়ের মধ্যে প্রধান প্রধান গ্রীক দার্শনিকদের গ্রন্থগুলির আরবীভাষায় অনুবাদ প্রকাশিত হয়। অমর গ্রীক কাব্য 'ইলিয়াড' ও 'অডিসি' যদিও সেগুলিতে অপ্রত্যক্ষভাবে বহু পৌরাণিক ঘটনার উল্লেখ আছে যেগুলি বিধর্মী বলে বিবেচিত হতে পারে। তৎসত্ত্বেও বুদ্ধিজীবীদের আগ্রহ বা কৌতূহল নিবৃত্তির জন্য সিরিয়ভাষায় অনুদিত হয়। খলিফা আল্ মনসুরের সময়ে (৭৫৩-৭৭৩ খ্রীষ্টাব্দ) শাসনকেন্দ্র বাগদাদে স্থানান্তরিত হয়। তিনি বাগদাদকে এক মনোরম নগরী হিসাবে গড়ে তোলেন। জ্যোতির্বিদ্যা অধ্যয়নে ও তার বিকাশে তিনি অনেক সময় ব্যয় করেন, আইনশাস্ত্র, ভেষজ বিজ্ঞানের শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেন। তাঁর পৌত্র হারুন-আল্-রশিদ (৭৮৬ খ্রীঃ) তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে আদেশ জারি করেন যে, তাঁর সাম্রাজ্যে প্রত্যেক মসজিদের লাগোয়া একটি করে বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে। কিন্তু এশীয় বিদ্যোৎসাহের স্বর্ণযুগ বলা যায় খলিফা আল্ মামুনের রাজত্বকালকে (৮১৩-৮৩২ খ্রীঃ)। তিনি বাগদাদকে বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্ররূপে গড়ে তোলেন, বিরাট বিরাট গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন এবং সর্বদা পণ্ডিতমণ্ডলীর দ্বারা পরিবৃত হয়ে থাকতেন।
পৃথিবী যে বৃত্তাকৃতি একথা জানার পর আল্-মামুন অঙ্কশাস্ত্রবিদ ও জ্যোতির্বিদদের আদেশ দিলেন ভূ-পৃষ্ঠে বৃহৎ এই ভূ-বৃত্তের এক ডিগ্রির দূরত্ব পরিমাপের। লোহিত সাগরের তীরে শিনার সমতলভূমিতে নক্ষত্রের উচ্চতা মাপক যন্ত্রের (astrolabe) সাহায্যে দিগন্তরেখা থেকে উচ্চতার ভিত্তিতে নির্ণীত এক ডিগ্রী তফাতে একই মধ্য রেখায় (maridian) প্রোথিত করা হলো দুটি দণ্ড। ওই দুই দণ্ডের মধ্যেকার দূরত্ব পরিমাপ করে দেখা গেল যে এই দূরত্বের দৈর্ঘ্য দু'লক্ষ হাশমি কিউবিক (এক কিউবিক প্রায় ১ হাতের মতো)। এই হিসাবে পৃথিবীর পূর্ণ পরিসীমার দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ২৪ হাজার মাইলের মতো-প্রকৃত মানের সঙ্গে যার ফারাক খুব বেশি নয়। কিন্তু যেহেতু একটিমাত্র পর্যবেক্ষণের দ্বারা বর্তুলাকার পৃথিবীর সুনির্দিষ্ট পরিমাপ করা যায় না, সেজন্য খলিফা (আল্-মামুন) মেসোপটেমিয়ার কুফার কাছে আরও একটি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করেন। তাঁর জ্যোতির্বিদেরা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে একই বিন্দু থেকে শুরু করে পৃথকভাবে একদল উত্তর দিকে অপর দল দক্ষিণ দিকে এক ডিগ্রিতে পতিত পরিধির অংশকে (arc) পরিমাপ করলেন রাজকীয় 'কিউবিট' এককে। এই হিসাবে এক কৌণিক ডিগ্রির দৈর্ঘ্যের সাথে প্রকৃত পরিমাপের ফারাক দেখা যায় ১/২ মাইলের বেশি নয়। এইসব হিসাবগুলিতে খলিফা পৃথিবীর গোলাকৃতির প্রামাণ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
ব্যাপক চর্চাপ্রসূত এই সমুন্নত রুচির ধারা সারাসেনীয় সাম্রাজ্য অভ্যন্তরীণ বাদ-বিসম্বাদের ফলে তিনটি অংশে খণ্ডিত হয়ে যাবার পরেও বজায় থাকে। এশীয় অঞ্চলে আব্বাসী, মিশরে ফতেমী এবং স্পেনে ওমিয়েদ বংশীয় শাসনের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল রাজনৈতিক স্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, শিল্প-সাহিত্য এবং বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও প্রসারিত ছিল।
মানসিক আনন্দ বিধায়ক ও সমুন্নতিমূলক শিক্ষা-কলার প্রতিটি বিভাগ নিয়ে ছিল সারাসেনীয়দের চর্চা। পরবর্তীকালে তারা গর্ববোধ করত যে অন্যান্য জাতির সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও ঐ সময়ে তাদের কবির সংখ্যা ছিল বেশি। বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে সারাসেনীয় পণ্ডিতদের কৃতিত্ব হচ্ছে তাঁরা ইউরোপীয় গ্রীকদের অনুকরণের পরিবর্তে আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রীকদের পদ্ধতিতে বিজ্ঞানের অনুশীলন করেছেন। তাঁরা বুঝেছিলেন, অনুমানের নির্ভরতায় বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটানো যাবে না, প্রকৃতি জগতের প্রয়োগগত অনুসন্ধানের মাধ্যমেই বিজ্ঞানের অগ্রগতি নিশ্চিত করা যায়। তাঁদের পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পর্যবেক্ষণ ও প্রায়োগিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। জ্যামিতি ও অঙ্কশাস্ত্রকে তাঁরা দেখতেন যুক্তিবিদ্যার উপকরণ বা হাতিয়ার হিসাবে। যন্ত্র বা গতিবিজ্ঞান, তরল পদার্থের স্থিতি সম্পর্কিত বিজ্ঞান বা আলোকবিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁদের অসংখ্য লেখায় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে কোনো সমস্যার সমাধানে তাঁরা পৌঁছাচ্ছেন প্রায়োগিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে বা যন্ত্রের সাহায্যে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। এভাবেই তাঁরা আমার প্রিয় বিষয় রসায়ন শাস্ত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন, উদ্ভাবন করেছেন শোধন-পাতন-ঊর্ধ্ব পাতন ও গলন-মিশ্রণের যন্ত্র, কোণ পরিমাপক যন্ত্র কোয়াড্রান্ট এবং নক্ষত্র ইত্যাদির উচ্চতা/দূরত্ব পরিমাপক যন্ত্র আবিষ্কারের দিকে নজর দিয়েছেন। রসায়নশাস্ত্রে তৌল-দণ্ডের ব্যবহার প্রবর্তন করেছেন যার তত্ত্বে তাঁদের ব্যুৎপত্তি ছিল। তাঁরা প্রস্তুত করেছেন আপেক্ষিক গুরুত্ব ও জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত তথ্যের সারণি। বাগদাদ, স্পেন ও সমরখন্দে-তিন কেন্দ্রেই এইভাবে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অগ্রগতি ঘটে চলেছিল। প্রভূত উন্নতি ঘটে জ্যামিতি ও ত্রিকোণমিতির ক্ষেত্রে, আবিষ্কৃত হয় বীজগণিত এবং পাটিগণিতে গৃহীত হয় ভারতীয় গণন পদ্ধতি।
□ গ্রন্থাগার □
সাধারণের জন্য গ্রন্থাগার স্থাপন ও তার উন্নয়নে অধ্যাবসায়ের সঙ্গে নানাবিধ গ্রন্থ সংগ্রহ করা হত। জানা যায় খলিফা আল্-মামুন শত শত উটের পিঠে চাপিয়ে অজস্র পাণ্ডুলিপি আনিয়েছিলেন। গ্রীক সম্রাট তৃতীয় মাইকেলের সাথে চুক্তির শর্ত হিসাবে তিনি কনস্টান্টিনোপল-এর একটি গ্রন্থাগার লাভ করেছিলেন। সেই অমূল্য সংগ্রহের মধ্যে ছিল আকাশের গঠন সম্পর্কিত টলেমির গাণিতিক গবেষণা। আল্-মামুন সাথে সাথে আরবি ভাষায় 'আলমাসেসত্' শিরোনামে তার অনুবাদ করিয়ে দেন। এই সংগ্রহের পরিমাণ কখনো কখনো হতো বিশাল। কায়রোর ফাতিমী গ্রন্থাগারে গ্রন্থসংখ্যা ছিল এক লক্ষ, সবগুলি পরিচ্ছন্ন হস্তাক্ষরে লিখিত ও বাঁধাই করা। এর মধ্যে শুধু জ্যোতির্বিদ্যা ও ভেষজ বিজ্ঞান সংক্রান্ত পাণ্ডুলিপিই ছিল সাড়ে ছয় হাজার। কায়রোয় বসবাসকারী ছাত্রদের অধ্যয়নের জন্য গ্রন্থ বাড়িতে নিয়ে যাবার সুযোগ ছিল গ্রন্থাগারের নিয়মাবলীতে। স্পেনের খলিফার বিরাট গ্রন্থাগারের গ্রন্থসংখ্যা শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়েছিল ছয় লক্ষে। পুস্তকের তালিকার সংখ্যাই ছিল ২৪ খণ্ড। এছাড়া আন্দালুসিয়ায় সাধারণের জন্য স্থাপিত হয়েছিল ৭০টি গ্রন্থাগার। অনেকের ব্যক্তিগত সংগ্রহও ছিল বিপুল। জনৈক বেসরকারী চিকিৎসক বুখারার সুলতানের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন কেননা তাঁর গ্রন্থাদি বহনের জন্যই লাগবে ৪ শত উট।
প্রত্যেক বড় বড় পাঠাগারের অনুলিখন বা ভাষান্তরকরণের একটি বিভাগ ছিল। মৌলিক বিষয়ের কাজের ক্ষেত্রে, কলেজ কর্তৃপক্ষের রেওয়াজ ছিল নির্বাচিত বিষয়টির রূপরেখা অধ্যাপকদের দিয়ে তৈরি করিয়ে রাখার। প্রত্যেক খলিফারই নিজস্ব ঐতিহাসিক থাকত। প্রণয় বা অন্যান্য কাহিনীর গ্রন্থ, যেমন 'এক সহস্র এক আরব্যরজনীর আনন্দ' সারাসেনীয় (আরবদেশীয়) সাম্রাজ্যের সৃজনশীল কল্পনাশক্তির সাক্ষ্য বহন করছে। এরই পাশাপাশি সমস্ত রকম বিষয়ে যেমন, ইতিহাস, বিচারবিদ্যা, রাজনীতি, দর্শন, জীবনী-যা কেবল প্রখ্যাত স্বনামধন্য ব্যক্তির জীবন নিয়েই নয়, খ্যাতিমান উট ও ঘোড়ার জীবনকাহিনী নিয়েও গ্রন্থ রচিত হত। এই গ্রন্থগুলি প্রকাশে কোনো বিধিনিষেধ বা নিয়ন্ত্রণ ছিল না। অবশ্য পরবর্তীকালে ধর্মতত্ত্ব বিষয়ক গ্রন্থাদি প্রকাশের ক্ষেত্রে অনুমতির প্রয়োজন হত। অসংখ্য সূত্র গ্রন্থ রেফারেন্সের বই ছিল ভূগোল, রাশিবিজ্ঞান, ইতিহাসের উপরে; ছিল প্রচুর অভিধান এবং বিষয়গুলির সার-সংক্ষেপিত বেশ কিছু আকর গ্রন্থ যেমন, মহম্মদ আবু আবদুল্লা রচিত 'এনসাইক্লোপেডিক ডিকশনারি অফ অল দি সায়েন্সেস' বা 'সমগ্র বিজ্ঞান শাস্ত্রের জ্ঞানকোষ অভিধান'। গ্রন্থগুলিতে ব্যবহৃত কাগজের বিশুদ্ধতা ও শুভ্রতা রক্ষার, বিভিন্ন রঙের কালির মিশ্রণের প্রয়োগ নৈপুণ্যের এবং গ্রন্থের শিরোনামে গিল্টি করা হরফ দিয়ে ঔজ্জ্বল্যবৃদ্ধির ও অন্যান্য অলংকরণের কাজ করা হতো দারুণ মর্যাদা দিয়ে।
□ শিক্ষার সার্বজনিক প্রসার □
সারাসেনীয় সাম্রাজ্যের সর্বত্র কলেজ স্থাপিত হয়েছিল। এই কলেজগুলি ছড়িয়ে ছিল মঙ্গোলিয়া, তাতারস্থান, পারস্য, মেসোপটেমিয়া, সিরিয়া, মিশর, উত্তর আফ্রিকা, ফেজ ও স্পেনে। জ্যোতির্বিজ্ঞান কলেজ ও মানমন্দিরের একটি ছিল রোম সাম্রাজ্যের চেয়েও আয়তনে বিপুল এই সাম্রাজ্যের একপ্রান্তসীমায় সমরখন্দে, অপরটি স্থাপিত ছিল অপরপ্রান্তে স্পেনের জিরাল্ডায়। শিক্ষার এই পৃষ্ঠপোষণা সম্পর্কে ঐতিহাসিক গিবন বলেছেন-"প্রদেশের স্বাধীন আমীরগণও সম্মানবৃদ্ধির জন্য রাজকীয় এই পদাঙ্ক অনুসারী ছিলেন এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিজ্ঞানের চর্চা ও সাফল্য লাভের ক্ষেত্রে বিচ্ছুরণের প্রাবল্য এসেছিল সমরখন্দ ও বোখারা থেকে ফেজ ও কর্ডোভা পর্যন্ত। সুলতানের এক উজীর বাগদাদে একটি কলেজ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে দুই লক্ষ স্বর্ণখণ্ড দান করেছিলেন এবং তার সঙ্গে বছরে ১৫ হাজার দিনার মুদ্রাপ্রদানে স্বীকৃত হয়েছিলেন। বিভিন্ন সময়ের শিক্ষা জগতের নতুন সাফল্যগুলি, অভিজাতের দুলাল থেকে মিস্তিরির সন্তান পর্যন্ত সমাজের প্রতিটি স্তরের প্রায় ছয় হাজারের শিক্ষার্থীর কাছে সংবাহিত হতো। দরিদ্র মেধাবী ছাত্রদের দেওয়া হতো পর্যাপ্ত পরিমাণের বৃত্তি। জ্ঞানী ও অধ্যবসায়ী অধ্যাপকের জন্য ছিল প্রচুর বাড়তি ভাতা। প্রতিটি শহরে আরবীয় সাহিত্য ভাণ্ডারের সৃষ্টিকর্মগুলির প্রতিলিপি উৎপাদনের ব্যবস্থা ছিল, পাঠ আগ্রহী বিদ্বজনেরা ও গৌরব বৃদ্ধির জন্য ধনাঢ্য ব্যক্তিরা সেগুলি সংগ্রহ করতেন।" সদাশয়তা ও ঔদার্য ছিল বিদ্যালয়গুলির পরিচালনার ভিত্তিস্বরূপ, অনেক সময়েই এই দায়িত্ব ন্যস্ত থাকত প্রবীণ জ্ঞানীমণ্ডলীর উপর, ইহুদিদের উপরও। কোন্ দেশের মানুষ বা কোন্ ধর্মমতের মানুষ এসব দিয়ে মানুষকে বিচার করা হতো না, বরং তিনি কতটা জ্ঞানী এটাই ছিল বিচারের মাপকাঠি। খলিফাশ্রেষ্ঠ আল্-মামুন ঘোষণা করেছিলেন,-"তাঁরাই ঈশ্বর মনোনীত সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে যোগ্য সেবক, যাঁদের জীবন জাতির জ্ঞানের প্রতিটি শাখার উন্নতিবিধানের জন্য উৎসর্গীকৃত। জ্ঞানের প্রচারক শিক্ষকরাই এই বিশ্বে প্রকৃত আলোকবর্তিকার বাহক ও বিধায়ক প্রতিনিধি। এঁদের সাহায্য ব্যতীত জাতি পুনরায় অজ্ঞানতা ও বর্বরতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।"
□ বিজ্ঞান ও ইসলাম □
কায়রোর মেডিক্যাল কলেজের দৃষ্টান্তের পরবর্তীতে অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য ছাত্রদের কঠিন পরীক্ষার ব্যবস্থা হয়। এতে কৃতকার্য হওয়ার পরই তাদের পেশার প্রবেশাধিকার মিলত। ইউরোপের প্রথম মেডিক্যাল কলেজটি সারাসেনীয়রাই প্রথম স্থাপন করেছিলেন ইটালির সালার্নোতে। স্পেনের সেভিল্লে শহরে প্রথম মানমন্দির বা নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটিও স্থাপন করেছিলেন এঁরাই। তৎকালীন প্রখ্যাত গণিতজ্ঞ ও রসায়নবিদ আবু মুসা জাফর (জেবের)-এর তত্ত্বাবধানে এই জ্যোতির্বিজ্ঞান কেন্দ্রটি ১১১৬ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত হয়। এর পরবর্তী পরিণতিও কম উল্লেখ্য নয়। স্পেন থেকে মুরদের (সারাসেনীয়) উৎখাতের পরবর্তীকালে এই জ্ঞানকেন্দ্রটিকে গীর্জার ঘন্টাঘরে রূপান্তরিত করা হয়। কেননা স্পেনীয়রা জানতই না কেন্দ্রটিকে কিভাবে ব্যবহার করা যায়।
উল্লেখিত বিপুল বিজ্ঞানচর্চা আন্দোলনের ফলাফল সম্পর্ক পর্যাপ্ত বিবরণ প্রদান আমাদের সীমিত জ্ঞানে সম্ভব নয়। এ সময়ে প্রাচীন বিজ্ঞানের বিপুল প্রসারের পাশাপাশি নতুন নতুন বিষয় সংযোজিত হচ্ছিল। ভারতীয় পাটিগাণিতিক গঠন পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়, এ এক তাৎপর্যপূর্ণ পদ্ধতির আবিষ্কার। এই পদ্ধতির মাধ্যমে সমস্ত সংখ্যাকেই এক থেকে দশ-এই কটি সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ সম্ভব, এর ফলে গণনার ক্ষেত্র সরলীকৃত হলো ও সমস্ত গাণিতিক গণনার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মেচিত হলো। বীজগণিত তথা বিশ্বজনীন পাটিগণিতে-অসংজ্ঞাত (Indeterminate) রাশির গণনা, সমস্ত ধরনের রাশির মধ্যে অন্তরসম্পর্ক অনুসন্ধান তা পাটিগাণিতিক বা জ্যামিতিক যাই হোক না কেন-সম্ভব হলো। ডায়োফ্যান্টাস যে বীজ রেখে গিয়েছিলেন তা থেকেই এগুলি পল্লবিত হয়েছিল। মহম্মদ বেন মুসা দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান তত্ত্ব ও ওমর বেন ইব্রাহিম ত্রিঘাত সমীকরণের তত্ত্ব আবিষ্কার করলেন। সারাসেনীয় পণ্ডিতেরা ত্রিকোণমিতিতেও আধুনিক রূপান্তর এনেছিলেন। আগে যেমন ছিল তার পরিবর্তে বৃত্তের জ্যাকে লম্ব ও অতিভুজের অনুপাত বা সাইনে প্রকাশ করে ত্রিকোণমিতিকে বিজ্ঞানের এক পৃথক শাখায় উন্নীত করেছিলেন। পূর্ববর্ণিত মুসা ছিলেন গোলকীয় ত্রিকোণমিতি (Spherical Trigonometry) প্রক্রিয়ার প্রণেতা; জমি জরিপ (Survey) সংক্রান্ত এমন অসাধারণ কাজ করেছিলেন যে সেগুলিকে এ বিষয়ের উপর গ্রীক পণ্ডিত ইউক্লিডের হারিয়ে যাওয়া কাজের অনুকৃতি বলে প্রচার করা হয়েছিল। জ্যোতির্বিদ্যায় শুধু বড় বড় সারণি তাঁরা প্রস্তুত করেননি, তাঁদের আকাশে দৃশ্যমান সমস্ত জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর মানচিত্রও তৈরী করেছিলেন। এগুলির মধ্যে বড় বড় জ্যোতিষ্কের আরবীয় নামকরণও করেছিলেন তাঁরা, যা অনেকের সর্বাধুনিক আকাশ-মানচিত্রে স্বনামে বিরাজ করছে। ইতিপূর্বে আমরা লক্ষ করেছি যে, তাঁরা পৃথিবীর আকার নির্ণয় করেছিলেন পৃথিবীতলের কৌণিক পরিবর্তনের ডিগ্রিগত ফারাক থেকে। সৌর ক্রান্তিরেখা বা গ্রহণ রেখার বক্রতা পরিমাপ, সূর্য ও চন্দ্রের নির্ভুল গতিপথের চিত্রও প্রস্তুত করেছিলেন তাঁরা। বৎসরের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ ও নিরক্ষীয় তলের সঠিক মাপ নির্ণয় করেছিলেন। আলবাতেগনিয়াস কৃত 'নক্ষত্র বিজ্ঞান' (দি সায়েন্স অব স্টারস) সংক্রান্ত কাজকে শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন বিজ্ঞানী লাপ্লাস। তিনি হাকেমের জ্যোতির্বিদ তথা মিশরের খলিফা (১০০০ খ্রীঃ) ইবন্ জুনিস-এর কর্মকাণ্ডের টিকে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অংশের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এতে আল্-মামুনের সময়কাল থেকে গ্রহণ, বিষুব ক্রান্তি, অয়নকাল, গ্রহ-সম্মেলন মুহূর্ত, নক্ষত্রাদির রহস্যময় আচরণ সম্পর্কিত ধারাবাহিক দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের ফলাফল সন্নিবেশিত রয়েছে一
এই পর্যালোচনাসমূহ বিশ্বজগতের নিয়মকানুনের বৈচিত্র্য বুঝবার ক্ষেত্রে যথেষ্ট আলোকপাত করেছিল। সারাসেনীয় (আরবীয়) জ্যোতির্বিদেরা জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও সেগুলির উন্নয়নে এবং নানা ধরনের ঘড়ি-জলঘড়ি, সূর্যঘড়ির সাহায্যে সময় পরিমাপের কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেছিলেন। তাঁরাই সর্বপ্রথম এই লক্ষ্যে দোলকের ব্যবহার প্রচলন করেন।
ব্যবহারিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে রসায়ন শাস্ত্রে তাঁরা বিপুল উন্নতি ঘটান। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কতকগুলি অনুঘটকের আবিষ্কার করেন তাঁরা - সালফিউরিক অ্যাসিড, নাইট্রিক অ্যাসিড, অ্যালকোহল এবং চিকিৎসা বিদ্যার ক্ষেত্রে এই বিজ্ঞানের প্রয়োগ ঘটান। গতিবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁরা পতনশীল বস্তুর নিয়ামক নীতি নির্দেশ করেন। মাধ্যাকর্ষণ সম্পর্কেও তাঁদের ধারণা ছিল এবং সে ধারণা নেহাৎ অস্পষ্টও নয়। যান্ত্রিক শক্তির তত্ত্ব সম্পর্কেও তাঁরা যথেষ্ট অবহিত ছিলেন। তরল পদার্থের স্থিতিবিজ্ঞানের (hydro Statics) ক্ষেত্রে বিভিন্ন বস্তুর আপেক্ষিক গুরুত্ব সম্বলিত সারণি তাঁরাই প্রথম তৈরি করেন এবং বস্তুর জলে ভাসা বা ডোবা সম্পর্কে গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখেন। আলোকবিজ্ঞানে তাঁরা চোখ থেকে আলোর রশ্মি বিচ্ছুরিত হয়ে বস্তুতে পতিত হয়-গ্রীকদের এই ভ্রান্ত ধারণা সংশোধন করেন এবং বিকল্পে বস্তু থেকেই বিচ্ছুরিত আলো চোখে পৌঁছায় এই তত্ত্বের প্রস্তাবনা করেন। আলোর প্রতিফলন ও প্রতিসরণ সম্পর্কেও তাঁরা অবহিত ছিলেন।
সে যুগের ঐস্লামিক গ্রন্থকারদের নক্ষত্রমণ্ডলীর মধ্যে অসাধারণ কয়েকজনের নাম আমি উল্লেখ করব। মহান চিকিৎসক ও দার্শনিক অবিসেন্না, কর্ডোভার এভেরোস, যিনি প্রধান ভাষ্যকার ছিলেন অ্যারিস্টটলের দর্শনচিন্তার-নব্য প্লেটোপন্থী যে চিন্তা সে সময়ে দর্শন জগতে বিপ্লব ঘটিয়ে চলছিল। এভেরোসের লক্ষ্য ছিল অ্যারিস্টটলের শিক্ষামালার সাথে কোরানের শিক্ষার সমন্বয় সাধন। বলা হয় তিনি নাকি সূর্যের কলঙ্ক আবিষ্কার করেছিলেন। আবু মুসা জাফর (খ্রীস্টান লেখকদের-জেবার) ছিলেন আধুনিক রসায়নশাস্ত্রের প্রকৃত স্রষ্টা, যাঁর নাম প্রিস্টলি ও লেভয়সিয়রের সঙ্গে একসাথে উচ্চারণের দাবি রাখে। আবু ওথমান (ওসমান) ছিলেন প্রাণীবিদ্যার লেখক। আল্-বিরুনী ছিলেন মণিরত্ন বিশারদ-তিনি তথ্যাদি সংগ্রহের জন্য ভারত ভ্রমণ করেছিলেন। রাহজেস, আল্-আব্বাস এবং আল্ বিথর ছিলেন উদ্ভিদ বিজ্ঞানী-শেষোক্ত জন নানা উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহের জন্য সারা বিশ্বে পরিভ্রমণ করেছেন। দার্শনিক আল-গাজ্জালি এবং আরব দুনিয়ার নিউটন নামে খ্যাত আল্-হাজেন সর্বকালের অবিস্মরণীয়দের অন্যতম।...
□ বিশেষ সম্প্রদায়গত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান □
সম্প্রদায়গত বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রায়শই এক বিপদের মোকাবিলা করতে হতে পারে, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে এক ডুবো-পর্বতশৃঙ্গের মতো আঘাত করতে পারে-আমি সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা ও বিচ্ছিন্ন মানসিকতার বিপদের কথা বলছি, যা আগেই উল্লেখিত।...
আমার দৃঢ়বিশ্বাস, সম্প্রদায়গত অসুন্দর মনোভাব এই প্রতিষ্ঠানের পবিত্র চৌহদ্দিকে কখনো কলুষিত করবে না, যদি কখনো শত্রু চুপিসারে ঢুকেও পড়ে শক্ত হাতেই তাকে দমন করা হবে।
□ ঐক্যবদ্ধ ভারত : ভারতীয় শিল্পকলায় ইসলামের অবদান □
বর্তমান ভারতের জাতীয় সত্তা এক যৌগিক সত্তা। বাইরের মানুষ বলবে ভিন্ন ভিন্ন জনসমষ্টির সম্মেলক রূপ হলো ভারতীয় জাতি। কিন্তু জ্ঞানালোকিত এই জনগোষ্ঠীসমূহ জন্মভূমির প্রতি অখণ্ড আনুগত্যের সোনালী সুতোয় গাঁথা মালার মতো। এই যৌগ সত্তার ছোট ছোট অংশীদারদের ছেড়ে দিলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শরিক হচ্ছে হিন্দু এবং মুসলমান। এই দুই অংশ ঐক্যবদ্ধ থাকলে ভারতের জাতিসত্তা নিরাপদ, নিশ্চিন্ত। এবং এদের ঐক্যবদ্ধ না থাকার কোনো কারণও থাকতে পারে না।
একটি বহু ব্যবহৃত উক্তি হচ্ছে-ভারতমাতার যমজ সন্তান হিন্দু ও মুসলমান। অবশ্য বহু কথিত বলেই এই উক্তির সত্যতা কমে যায় না। এই কাব্যিক আত্মগরিমা ভিত্তিহীন নয়। যে পরিস্থিতিতে বা কারণে মুসলমানদের ভারতে আগমন ঘটে তা এখন প্রাচীন ইতিহাসের বিষয়। বর্তমানে তাঁরা এই মাটিরই সন্তান এবং হিন্দুদের মতো এই ভূমির জন্মগত অধিবাসী। মুসলমান ও হিন্দুরা শত শত বছর ধরে পরস্পর ভাইয়ের মতো বাস করে আসছে। এদের জীবনচর্চা, স্বার্থ এবং আশা-আকাঙক্ষা পরস্পরের সঙ্গে শত বন্ধনে জড়িত। এতকাল পরে এখানকার মুসলমানদের ভারতকে কেবলমাত্র বিমাতা ভাবার এবং তাদের প্রকৃত স্বার্থ, প্রকৃত সম্পর্ক এবং প্রকৃত আনুগত্য অন্যত্র রক্ষিত এই ভ্রান্তিতে থাকার সুযোগ নেই। একই কারণে আজকে ইংল্যান্ডে বসবাসকারী ইংল্যান্ড জয়ী বীর উইলিয়ামের উত্তরপুরুষেরা কখনোই তাদের আনুগত্য ফরাসী দেশের কাছে গচ্ছিত রাখতে পারে না। এবং একই যুক্তিতে আমি বলি হিন্দুরাও আর্যদের উত্তরপুরুষ হিসাবে, মধ্য এশিয়ায় আজ হিজরত করতে যাবে না। এ ধরনের চিন্তাই হাস্যকর। এটাও ঘটনা নয় যে মুসলমানরা এই দেশে বসতিস্থাপন করেছে মাত্র, এই দেশের জন্য কিছু করেনি। বরঞ্চ তার বিপরীতে শিল্পে, স্থাপত্যে, সঙ্গীতে, সাহিত্যে, রাষ্ট্রব্যবস্থায় অসামান্য অবদান রেখেছে। বৈচিত্র্যময় ভারতীয় সংস্কৃতির ঠাসবুনোটকে ঐস্লামিক প্রতিভার স্পর্শ করে তুলেছে আরও বর্ণময়। মুসলমানদের পরানো এই উজ্জ্বল পোশাক ছাড়া না জানি সেই সংস্কৃতি কতো দীনহীন মনে হতো। এ বিষয়ে বিশদে বলা বাহুল্যমাত্র - একটা কুতুবমিনার, একটা সিকান্দ্রা এবং একটি তাজমহলই এই বক্তব্য প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট। এই হিন্দু-মুসলমান ভ্রাতৃত্ববোধ একদিনে গড়ে ওঠেনি। ইউরোপীয়দের ক্লান্তিহীন একঘেয়ে সোচ্চার প্রচারমতো এই সৌভ্রাতৃত্ব শুধু পশ্চিমীদের বিরুদ্ধে সর্বজনীন ঘৃণার আগুনে পুড়ে তৈরি হয়নি, বরং তার চেয়ে অনেক বেশি দিনের ও স্থায়ী চরিত্রের। মুঘল যুগেরও আগে পাঠান শাসনেও এই ভ্রাতৃত্ববোধের পরিচয় মেলে। ভারতবর্ষে ইসলামের প্রগতির ইতিহাস হিন্দু-মুসলমান সহযোগিতার ইতিহাস। মুসলমান নবাব বা সম্রাটদের স্বনামখ্যাত সেনাপতি, অর্থনীতিবিদ ও মন্ত্রীদের অনেকেই ছিলেন হিন্দু। সে সময়টা ছিল যখন নীতি ও তার প্রয়োগের মধ্যে ফারাক ছিল না। সত্যিই ভাবুন, দেড়শ বছর ইংরেজ রাজত্বের পর ভারতবর্ষের একটি রাজ্যে একজন মাত্র লর্ড সিনহা শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ায় আমরা আহ্লাদে আটখানা। আর এইরকম কত সিংহ-মানসিংহ, যশোবন্ত সিংহ, জয় সিংহ (মাত্র কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলো) আছেন, যাঁদের মুসলমান আমলে এর চেয়ে অনেক বেশি সম্মান ও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ইউরোপীয় একটা যুৎসই পদ্ধতি আছে মুসলমানদের হেয় করার জন্য। মহম্মদ তুঘলক বা আলাউদ্দিন খিলজীর মতো অপদার্থ বা ধর্মান্ধ কিছু সুলতানকে বাছাই করে হিন্দুদের তাদের অমানবিক অত্যাচারের কথা বলে জ্ঞান দেয়। এটা কিন্তু অসঙ্গত। মুসলমান আমলে ভারতবর্ষে সহনশীলতার সমসাময়িক ইউরোপের অবস্থানটা তুলনা করলেই সঠিক পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টির গুরুত্ব বিচার করা সম্ভব।...
□ সহনশীলতা ও মুসলমান শাসকগণ □
লোকে ভুলে যায় যে যখন তৎকালীন ইংল্যান্ডেশ্বরী তাঁর সূক্ষ্ম ঔচিত্যবোধের সাথে দ্বিমত পোষণকারী নিজের দুর্ভাগা প্রজাদের হয় আগুনে পুড়িয়ে মারছেন বা কারাগারে নিক্ষেপ করছেন, সেই সময়ে ভারতে মহামান্য মুঘল সম্রাট আকবর ঘোষণা করছেন বিশ্বজনীন সহনশীলতার নীতি, তিনি মৌলভি, পণ্ডিত, ইহুদি পুরোহিত, খ্রীস্টান যাজকদের তাঁর রাজসভায় আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের প্রত্যেকের ধর্মের গুণগত উৎকর্ষের প্রসঙ্গে তাঁদের সঙ্গে দার্শনিক আলোচনা করছেন। বক্তব্য উঠতে পারে যে, আকবরের বিষয়টি ব্যতিক্রম তাই মোগল সম্রাটদের প্রতিনিধি হিসাবে তাঁকে বিবেচনা করা যায় না। কিন্তু এর চেয়ে বড় ভুল কিছু হতে পারে না। উদারতা ও প্রজ্ঞা প্রসূত ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ছিল সকল মুঘল সম্রাটেরই সাম্রাজ্য চালনার সাধারণ নীতি, ব্যতিক্রম নয়।
হিন্দুদের প্রতি সম্রাট ঔরঙ্গজেবের অনুদারতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি সম্বন্ধে লেখালেখিতে অনেক কালি খরচা করা হয়েছে। তবু, ঔরঙ্গজেবের শাসনকাল সম্পর্কে ঐতিহাসিক এলফিনস্টোন যেমনটা বলেছেন, তা হলো "এটা প্রত্যয়িত হয়নি যে, ধর্মের কারণে কোনো হিন্দুকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়েছে, বা কারারুদ্ধ করা হয়েছে কিংবা তার কাছ থেকে সম্পত্তিকর আদায় করা হয়েছে অথবা প্রকাশ্যে পিতৃপূজার ধর্মানুষ্ঠানের কারণে কোনো হিন্দুকে জবাবদিহি দিতে হয়েছে।" ইতিহাস বলছে যে, গোঁড়া ধার্মিক ঔরঙ্গজেবের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনাপতিদের মধ্যে ছিলেন যশোবন্ত সিংহ ও জয় সিংহ।
উদাহরণ বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। বিংশ শতাব্দীর উদার সহনশীলতার আলোকে মুসলমান শাসকদের অখ্যাতি প্রচার সহজ। কিন্তু সমসাময়িক কালের খ্রীষ্টানদের ইতিহাস কী বলে? ইনকুইজিশনের (ক্যাথলিক বিচার সভায় ঈশ্বর নিন্দার জন্য শাস্তি) আতঙ্ক, অ্যালবিজেনশিয়ানদের (দঃ ফ্রান্সের এক বিশেষ খ্রীস্টান সম্প্রদায়) গণহত্যা কাণ্ডের ভয়াবহতা, দ্রোঘেদায় অলিভার ক্রমওয়েলের নৃশংস হত্যালীলা-যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিলটনের বেদনার্ত উক্তি "ক্রমওয়েল তুমিই পুরুষ সর্দার (ক্রমওয়েল দাউ চিফ অফ মেন)"। ইউরোপীয় বন্ধুদের কাছে আমার প্রশ্ন কেন মুসলমানদের বেলায় গলা দিয়ে মশাটা গিলতেও তোমাদের বেজায় কষ্ট অথচ খ্রীষ্টানদের বেলায় অবলীলায় উটও গলা দিয়ে নেমে যাচ্ছে?
শের শাহ ছিলেন পাঠান; হিন্দুদের সঙ্গে তিনি কী ধরনের ব্যবহার করতেন দেখা যাক। তাঁর পূর্ত বিভাগ ছিল বিখ্যাত, এ নিয়ে আমার আলাদা করে স্তুতির প্রয়োজন নেই। কিন্তু এটা অনেকে জানেন না যে তিনি যে অন্তর্দেশীয় সড়কটি (গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড) নির্মাণ করেছিলেন, তার দুপাশে খোলা হয়েছিল অসংখ্য সরাইখানা। যেখানে হিন্দুদের খাদ্য পরিবেশিত হতো হিন্দুদের দ্বারা, মুসলমানদের পরিবেশন করত মুসলমানরাই যাতে কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আবেগে আঘাত না লাগে। শের শাহ সম্পর্কে দুজন ইংরেজ ঐতিহাসিককে উদ্ধৃত করলেই যথেষ্ট হবে। ডব্লু ক্রুকসের মতে, "সম্রাটদের মধ্যে শের শাহ ছিলেন প্রথম যিনি জনগণের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে সাম্রাজ্য গঠনের প্রয়াসী হয়েছিলেন।" ঐতিহাসিক কীনে বলেছেন, "কোনো সরকারই, এমনকি ব্রিটিশ সরকারও এই পাঠান সম্রাটের মতো প্রাজ্ঞতার পরিচয় দিতে পারেননি।" আমি মনে করি মুঘল সম্রাটদের মহৎ পরস্পরা সম্পর্কে রেনানের অভিমতের উল্লেখ করা যথেষ্ট হবে। রোম সাম্রাজ্যে অ্যান্টোনীয় যুগ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন যে সম্রাট হাড্রিয়ান, অ্যান্টোনিয়াস পায়াস এবং মার্কাস অরেলিয়াসের মতো সম্রাটদের পর পৃথিবীতে ভারতের বাবর, হুমায়ুন এবং আকবর ছাড়া আর কোনো সম্রাটের নজির মেলে না যাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল জনকল্যাণমূলক কাজ করা। ভারতবাসীরা সেজন্য সকৃতজ্ঞ শ্রদ্ধায় আকবরের নামের আগে 'মহান' শব্দটি যোগ করে অমরত্ব প্রদান করেছে। যেমনটা করা হয়েছে একমাত্র অপর ভারতীয় সম্রাট অশোকের ক্ষেত্রে।
□ হিন্দু-মুসলমান একতা □
এই হিন্দু-মুসলমান একতা, ভারতের দুই মহান জাতির ভাবনা, আবেগ ও ঐতিহ্যের মিলন শুধু রাজনীতির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, সামাজিক কাঠামোর একেবারে অন্দরমহলে পর্যন্ত এর প্রবেশ ঘটেছে। এর কারণেই বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও ধর্মীয় ফলাফল আমরা দেখতে পেয়েছি। গুরু নানক, কবীর, চৈতন্য-এঁরা ছিলেন দুই সংস্কৃতির মিলনের ফলে উদ্ভুত ধর্মীয় আন্দোলনের প্রবক্তা। সম্ভবতঃ শুনলে আশ্চর্য লাগবে যে, বাংলার মুসলমান নবাব হুসেন শাহ সম্পর্কে সর্বশ্রেষ্ঠ বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতি বলেছেন-"পঞ্চগৌড়ের অধিপতি আপনি অমরত্ব লাভ করুন।" সেই সময়কালের বৈশিষ্ট্য এইটাই। ইসলামের গণতান্ত্রিক উদ্দীপনা শক্তির স্বাস্থ্যকর প্রভাবে হিন্দু সমাজের বহুদিনের সংস্কার জাতিভেদ প্রথার পাপ দূর করতে অনেকটা সহায়ক হয়েছিল। এবং হিন্দু সমাজে এনেছিল সর্ব্বজনীন আঁধার বিনাশী উদ্দীপনা। বাংলার বৈষ্ণব ধর্মীয় আন্দোলন ছিল এই নব জাগরণের প্রত্যক্ষ ফল। পারস্পরিক আদান-প্রদানের এই প্রক্রিয়ার প্রভাব এমন গভীর যে আজও মুসলমানদের মসজিদ বা পীর বাবার দরগাকে হিন্দুরা দ্বিধাহীন চিত্তে নিজেদের পবিত্র স্থানের মর্যাদা দেয় এবং সেই সব স্থানে তীর্থযাত্রায় যায়। একইভাবে মুসলমানরাও নির্দ্বিধায় হিন্দুদের পূজার্চনায় বা সামাজিক উৎসবে যোগ দান করে।
দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব ও সৌভ্রাতৃত্ববোধ এক লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হিসাবে দীর্ঘকাল প্রবহমান। তাই একে আমরা স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছি এবং কোনো রকম মন্তব্যের উদ্রেক করে না। এই কারণেই যখন আমরা প্রত্যক্ষ করি যে স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিরা অথবা কোনো এক শ্রেণীর মানুষ হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যে ফাটল ধরাবার চেষ্টা করছে এবং খুঁজে পেতে সুপ্ত ঈর্ষাকে উস্কে দিয়ে গনগনে করে তুলতে ইন্ধন ছড়ানো হচ্ছে, বিশেষত মুসলমানদের যখন আহ্বান জানানো হচ্ছে যে, হিন্দুদের স্বার্থ আর তাদের স্বার্থ পরস্পর বিরোধী যদি নাও হয় সম্পূর্ণত আলাদা; যখন তাদের বলা হয় মুসলমানদের প্রকৃত আনুগত্য ভারতবর্ষের প্রতি হওয়া উচিত নয়, বিদেশের অঙ্গুলি হেলনেই তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত, তখন আমাদের প্রচণ্ড ক্রোধের উদ্রেক হয়। আমি দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বলছি যে এই ধরনের মানসিকতা আমাদের একই মায়ের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার নামান্তর। ভারতমাতা হিন্দুদের বিমাতা না হলে মুসলমানদেরও বিমাতা নয়। এই মা খণ্ডিত আনুগত্য বরদাস্ত করেন না। মায়ের অন্যান্য সন্তানদের মতো মুসলমান সন্তানদের কাছেও অখণ্ড মাতৃভক্তি, আনুগত্য দাবি করেন ভারতমাতা। ভারতবর্ষের উন্নতি-সমৃদ্ধিই হবে আমাদের সকলের একমাত্র কাম্য। আমরা প্রথমে ভারতীয়, পরে হিন্দু, মুসলমান, খ্রীষ্টান, শিখ বা পার্সি। আমাদের স্মরণে থাকতে পারে বিখ্যাত ফরাসী রাজনীতিবিদ রিচলু-র কথা, যিনি রোমান ক্যাথলিক হলেও বা কার্ডিনালের টুপি পরলেও রোমের স্বার্থের আগে ফ্রান্সের স্বার্থ দেখতেন। এটাই তো সঠিক মনোভাব। এশীয় জাগরণের অত্যন্ত সম্ভাবনাপূর্ণ লক্ষণ হিসাবে বিশ্ব-ঐস্লামিক আন্দোলনের মহত্ব সম্পর্কে আমি অবশ্যই উদাসীন নই, সারা বিশ্বের ইসলাম ধর্মের অনুগামীদের প্রতি খলিফার ধর্মীয় আহ্বানের মহিমা সম্পর্কেও আমার আগ্রহের অভাব নেই। এইসব চাহিদাকে যথার্থ পরিপ্রেক্ষিতেই বিচার করতে হবে কিন্তু এগুলিকে কখনোই স্বাধীন সার্বভৌম জাতীয় জীবন প্রতিষ্ঠার জন্য ভারতমাতার আহ্বানের উপর স্থান দেওয়া চলে না। স্বদেশের বাইরের কোনো অঞ্চলের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি আনুগত্যের জোয়ারে আমাদের প্রিয় জন্মভূমির প্রতি আনুগত্যকে অবশ্যই ভেসে যেতে দেওয়া যায় না।
ইস্তাম্বুল থেকে পরিচালিত খিলাফত আন্দোলনের গতিচক্রের শলাকায় পরিণত হতে দিতে পারি না ভারতকে। ভারতবর্ষের স্বরাজ অর্জনই আমাদের একমাত্র জরুরী লক্ষ্য বাদবাকি সব কিছুর স্থান তারপরে, যথাস্থানে।
আমি নিশ্চিত যে, আমাদের অগ্রণী মুসলমান নেতৃবৃন্দের কেউই সেই ভুল করবেন না। আমি জানি যে তাঁরা একজন হিন্দু দেশপ্রেমিকের চেয়ে কোনো অংশেই দেশকে কম ভালবাসেন না। আমি শুধু তাঁদের বলব যে, তারা যেন মুসলমান সমাজের সাধারণ মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও দেশপ্রেমের অনুভূতি সঞ্চারিত করেন। উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জাতীয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
গত দু'দশকের ভারতের ইতিহাস-জাতীয় নবজাগরণের ইতিহাস। নবচেতনার এই পটভূমিতে লর্ড কার্জনের বাংলার অঙ্গচ্ছেদের বিরচিত পরিকল্পনা ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আগুনকে উক্সে দিয়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটালো। এরই ফলাফল হলো ১৯০৫। জাতি যেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করল। শত শত বছরের নিঃসাড়তার অবসানে সমগ্র সমাজে মহৎ আবেগ স্পন্দিত হলো। জাতির ধমনীতে নতুন প্রাণশক্তির প্রবাহ দেখা দিল। বিদেশী প্রভুদের উপর দাসসুলভ নির্ভরতা, আধুনিক শিক্ষার আলোক ও সর্ব বিষয়ে পথপ্রদর্শনের জন্য পশ্চিমের মুখাপেক্ষিতা, নিজেদের মৃত্যুসম জড়তা ও গতিহীনতায় দেশে লজ্জাবোধ জাগ্রত হলো। এবং নবাবিষ্কৃত আত্মমর্যাদায় অবস্থার পরিবর্তনের দাবির সঙ্গে সোচ্চারিত হলো স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি, স্বনির্ভর জাতীয় উদ্যোগের দাবি। উচ্চারিত হলো নতুন দাবি-স্বরাজ চাই, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক স্বরাজ। তখন থেকেই স্বরাজের জন্য সংগ্রাম চলছে। দিনে দিনে তা আরো প্রসারিত, আরো সুগভীর, আরো সমৃদ্ধ হয়েছে। আর আজ সারা দেশ সেই সংগ্রামে প্লাবিত। ইতিমধ্যে বিশ্ব ঘটনাপ্রবাহ দ্রুতগতিতে ঘটে চলেছে। জাপানের রোমাঞ্চকর জয়লাভের পর পরই ঘটল চীনের বিপ্লব, তুরস্কের তরুণ তুর্কী আন্দোলন, মধ্য ও নিকট প্রাচ্যে বিশ্ব ঐস্লামিক আন্দোলন, তুরস্ক-ইটালির যুদ্ধ, বলকান যুদ্ধ, শেষমেশ এলো ১৯১৪ সালের সর্বনাশা ঘটনা-বিশ্বযুদ্ধ যার বজ্রনির্ঘোষ বিশ্বকে হতচকিত করে দিল। এই বিশ্বযুদ্ধের পিছু পিছু এলো রুশদেশের অত্যাশ্চর্য বলশেভিক বিপ্লব ও অন্যান্য অতি তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল যার পূর্বানুমান অসম্ভব। এইসব বিস্ফোরক ঘটনাবলীর অভিঘাতে ভারতবর্ষের মূলে নাড়া পড়েছে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর, নিজস্ব পথে নিজের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার অর্জনের সঙ্কল্প হয়েছে আরো দৃঢ়, আরো অনমনীয়। আপন প্রতিভা ও ঐতিহ্য উপযোগী শিক্ষার জন্য জাতীয় প্রতিষ্ঠানের দাবি আরো জোরালো হচ্ছে। এই দাবি অর্জনের উপর আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।...
□ জাতীয় শিক্ষা : 'জাতীয়' আখ্যার অর্থ □
'জাতীয়' শিক্ষা শব্দগুচ্ছ বহুল ব্যবহারে ক্লিন্ন। 'জাতীয়' শব্দটি অসংখ্য দুঃখের অশুভ উৎস। কখনো কখনো এই শব্দগুলির ব্যাখ্যা করা হয় যে এটা এমন এক ব্যবস্থা যা যাবতীয় বিদেশী সংস্কৃতির বিষয় সযত্নে বর্জন করে চলবে, পশ্চিমী দেশসমূহের অবদানে সমৃদ্ধ সভ্যতার সমস্ত উপাদান কঠোরভাবে পরিহার করবে। এটা পাশ্চাত্য সভ্যতার যাবতীয়কে বয়কট এবং দেশের সবকিছুকে নির্বিচার শ্রদ্ধায় গ্রহণ করার সমার্থক হয়ে উঠেছে। মনস্তাত্ত্বিক বিচারে এ ধরনের মানসিকতা বিস্ময়কর নয়। এটা হচ্ছে উনবিংশ শতাব্দীতে পশ্চিমের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণের মনোভাবের বিপরীত মেরু-তে উপনীত দোলকের দোলনের মতো। কিন্তু এটা সঠিক নয়। পূর্বেকার মেরুদণ্ডহীন মানসিকতার মতোই এটা জাতীয় জীবনের পক্ষে সমান ক্ষতিকর।...
'জাতীয়' এই শব্দটি তাই যথাসম্ভব সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা প্রয়োজন, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তা হয় না। হিন্দুদের এক প্রভাবশালী অংশ এই কথাটি ব্যবহার করেন বেদের যুগে, নিদেনপক্ষে রামায়ণ-মহাভারতের যুগে প্রত্যাবর্তনের সমার্থক হিসাবে, আবার মুসলমানদের মনে এই কথাটি ইসলামের গৌরবজনক অতীত ইতিহাসের স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে। আপনারা যে কোনো শিক্ষিত হিন্দু বা মুসলমানকে জিজ্ঞাসা করুন সে 'জাতীয়' কথাটি বলতে কি বোঝে, দেখবেন সে তার তালগোল পাকানো ধারণা থেকে কতকগুলি কথা আউড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই মধ্যযুগীয় চিন্তাভাবনা, এই সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদ, এইভাবে অতীতের দিকে কান পেতে থাকার দুর্বলতায় কাজ হবে না; আমাদের জাতীয় জীবনস্রোত কখনই পিছন দিকে উজিয়ে যেতে পারে না। কঠোর ও একান্ত বিচ্ছিন্নতার মধ্যে আমাদের অগ্রগতির চাবিকাঠি লুকিয়ে থাকতে পারে না, বরং তা বিরাজ করছে আধুনিক প্রগতিশীল বিশ্বের সঙ্গে আমাদের সক্রিয় আদান প্রদানের মধ্যে। আমরা প্রাচ্য সভ্যতার উপর পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাবকে অস্বীকার করতে পারি। গত কয়েক শতাব্দীতে ইউরোপের প্রগতি ও এশিয়ার স্তব্ধগতির প্রতি উটপাখীর মতো চোখ বুজে থেকে লাভ নেই। সত্যের অনুসন্ধানে কোনো লজ্জা নেই, দেশভেদ নেই। সত্যের কোনো সীমার বাঁধন নেই, সত্য সর্বদাই আন্তর্জাতিক। ইসলামের কাছে এটা কোনো নতুন বিষয় নয়। কিছু আগেই আমার আলোচনায় ইসলামধর্মের কাছে আমার কৃতজ্ঞতা বিশদে প্রকাশ করেছি। খলিফা মনসুরের সময়ে ভারতীয় পণ্ডিতরা তাঁর সভায় আমন্ত্রিত হতেন, তাঁদের সহায়তায়, খলিফা হিন্দু আয়ুর্বেদের প্রামাণ্য গ্রন্থ 'চরক' এবং 'সিদ্ধান্ত' অনুবাদ করিয়েছিলেন। এমনকি গজনীর মামুদ, হিন্দুরা যাকে অত্যুৎসাহী মূর্তি ধবংসকারী কালাপাহাড় হিসাবে জানেন, তাঁরও রাজসভা আলোকিত করতেন বিভিন্ন দেশের বিদ্বজন, কবি। আল-বেরুনি, দাকিকি, উনসারী এবং কাব্যের রাজকুমার ফিরদৌসী গজনীর রাজসভাকে মহিমান্বিত করেছিলেন। এই আল-বেরুনি ছিলেন সর্বশাস্ত্র বিশারদ, গ্রীক ও সংস্কৃতে মাতৃভাষার মতোই অনর্গল বলতে পারতেন। সনাতন হিন্দুধর্মের দুর্গ বারাণসীতে তিনি সংস্কৃত অধ্যয়ন করেছিলেন এবং হিন্দুদের শিখিয়েছিলেন গ্রীকগণিত শাস্ত্র।...
'জাতীয়' শব্দটির মর্মমূলে এই দৃষ্টিভঙ্গিই থাকতে হবে। শিক্ষা-সংস্কৃতি কেন্দ্রগুলিতে সংগঠিত শিক্ষণ পদ্ধতির লক্ষ্য হবে দেশের যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতীয় মর্যাদাবোধ সঞ্চারিত করা এবং জাতির সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করা।...
আমাদের সম্পদ সীমিত, আমাদের দেশ দরিদ্র ও আমাদের সঙ্গতি অনুযায়ীই আমাদের চলতে হবে। শিক্ষাকে দুর্মূল্য করা উচিত হবে না আমাদের, তাহলে শিক্ষা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।...
বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য ইট-কাঠ-পাথর নয় মানুষ, এবং এক বৌদ্ধিক পরিবেশ সৃজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্মমূল।
শিক্ষা দরিদ্রের জন্য নয়, ধনীদের বিলাসবস্তু-এই ধরনের ধারণা আমাদের কাছে বর্বর চিন্তা মনে হয়, আমরা প্রাচ্যবাসীরা এটা বরদাস্ত করতে পারব না, আমাদের সমগ্র ঐতিহ্যই এর বিরোধী। আমাদের ঐতিহ্য বরাবরই দেখা গেছে পণ্ডিতব্যক্তি মাত্রেই দরিদ্র, লক্ষ্মীর সাথে সরস্বতীর সদাই বিরোধ।...
"সাধারণ জীবন যাপন এবং উচ্চমার্গীয় চিন্তা" -এইই ছিল প্রাচ্যের আবহমানকালের আদর্শ এবং ইসলামেও সেই একই কথা বলে। বাইজান্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াস যখন খলিফা ওমরের কাছে চুক্তির জন্য দূতদের পাঠান, তখন তাঁরা সর্বশক্তিমান এই খলিফাকে প্রাসাদে খুঁজে পাননি, আবিষ্কার করেছিলেন মদিনার মসজিদের সিঁড়িতে ভিখারীদের সারিতে নিদ্রিত অবস্থায়। এমনই অকৃত্রিম ছিল তাঁদের সারল্য।...
কাগজ দস্তাবেজ, আসবাব, যন্ত্রপাতির ধাঁধায় আমাদের সারবস্তুকে হারিয়ে যেতে দিতে পারি না, দেবী সরস্বতীকে ইট, কাঠ, পাথরের স্তূপে দমবন্ধ হয়ে মরতে দিতে পারি না আমরা।...
শিক্ষা যেন কোনোভাবেই আংশিক বা একপেশে না হয়, মানব সংস্কৃতি বিষয়ক শিক্ষায় অবশ্যই অবহেলা করা যাবে না কিন্তু সেই সাথে বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও কারিগরী বিষয়ে ছাত্রদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে।
সঙ্গীত, চিত্রকলা, কাব্য এবং অন্যান্য চারুশিল্পকে উৎসাহিত করে শিক্ষাকে পূর্ণাঙ্গ, সুসমঞ্জস্য ও সুরভিত সুখময় করে তুলতে হবে - গদ্যময় আধুনিক ভারতীয় জীবনে এসবের অত্যন্ত অভাব রয়েছে। আমাদের ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করতে হবে পুরুষোচিত ক্রীড়া কসরতে ও দুঃসাহসী কাজকর্মে,...
□ ইসলামধর্মে গণতন্ত্র □
মানুষ গড়ার এই কর্মযজ্ঞে ইসলাম ধর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গণতন্ত্র হলো ইসলামের বার্তা, এ গণতন্ত্র হচ্ছে মানুষের নৈতিক ও মানসিক বিকাশের গণতন্ত্র। এই ব্যাপারে আমাদের হিন্দু সমাজ মারাত্মক অসুবিধার সম্মুখীন। আমাদের সমাজ খাড়াখাড়িভাবে, আড়াআড়িভাবে এবং আরও বিভিন্নভাবে জাতিভেদপ্রথার জটিল বেড়াজালে বহুধা বিভক্ত।...
গণতন্ত্রের মর্মবাণী সমস্ত শ্রেণী, সম্প্রদায়, জাত-পাত, বর্ণের মানুষের মধ্যে ক্রমশ সঞ্চারিত হয়ে ভারতকে এক ঐক্যবদ্ধ সুসম্বন্ধ, শক্তিশালী পৌরুষদীপ্ত স্বাধীন জাতিতে পরিণত করুক যা ছিল একদা এশিয়ার গৌরব ও বিশ্বের বিস্ময়, ভারতবর্ষ আপন স্বাধীনতার আনন্দে উদ্বেল হবার সাথে সাথে পৃথিবীর দুর্দশাগ্রস্ত অবসন্ন জাতিগুলির পাশে সামর্থ নিয়ে দাঁড়াক, এই আমার আশা। ■
সূত্র : মইনুল হাসান সম্পাদিত "মুসলিম সমাজ এবং এই সময়" - ২য় খণ্ড
(পথিকৃৎ পত্রিকার আগস্ট ২০১৫ সংখ্যা থেকে নেওয়া)
পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২
দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com